মলিদানন্দের ঈদবেলা

Thu, May 13, 2021 5:27 PM

মলিদানন্দের ঈদবেলা

সঙ্গীতা ইয়াসমিন: দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পরে সম্ভাব্য চাঁদরাতের সন্ধ্যায় বড়রা থাকতেন রেডিওতে কান পেতে  সংবাদের অপেক্ষায় কখন ঘোষিকা বা সংবাদ পাঠিকা তাঁর সুরেলা কণ্ঠে বলে উঠবেন, ঈদ মোবারক! সাওয়ালের চাঁদ দেখা গেছে। আর আমরা ছোটরা কান উচিয়ে থাকতাম কখন নজরুলের চির পরিচিত চির মধুর সেই আনন্দসুর বেজে উঠবে ইথারের ধ্বনিতে। সত্যি নজরুলের সেই গানটি ছাড়া ঈদের আগমন বার্তা আজও যেনো অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। যেইমাত্র “ ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” বেজে উঠল আর আমাদের ছোটদের দল হই হই করে বাইরে নেমে পড়লাম চাঁদমামাকে খুঁজে বের করতে। কখনও সখনও আমাদের অভিযান সফল হত বৈকি! আবার কখনও বা বিফল মনোরথে রেডিওর বাণীকেই শিরোধার্য মেনে ঘরে ফিরতাম 

 

চাঁদ দেখার খবরের সাথে সাথে রান্নাঘরেও ধুম পড়ে যেত। চাঁদ রাতে মাকে কখনও ঘুমাতে দেখিনি। বাবাও মায়ের সাথে কাজে হাত লাগাতেন, তবে, বাবা ঘন্টা দুয়েক ঘুমালেও মা ফজর না পড়ে চোখ বুজতেন না। সব পদ রান্না শেষ হলে সেসব ঠান্ডা করে মিটসেফে তুলে রাখতে আর রান্নাশেষের পরিচ্ছন্নতার কাজেই মায়ের রাত শেষ। আমাদের শৈশবে মিটসেফ অতি দরকারী বস্তুটি ছিল ছোটদের অতি লোভনীয় বাক্স। মা সব ভালো ভালো খাবার রান্না করে মিটসেফে তালা মেরে রেখে দিতেন। আমরাও ওঁত পেতে থাকতাম, যদি মা ভুল করে চাবির গোছা কোথাও ফেলে যান, তখনই কেল্লা ফতে! মিটসেফের পায়ের তলায় খানদানী আয়োজনে জলঘরা নামে (মাটির তৈরি একপ্রকার পানিদানি) থাকতো জল ভর্তি। যাতে পিঁপড়ে ভাইয়েরা আমাদের খাবারে ভাগ বসাতে না পারেমিটসেফের ওপরের থাকগুলোতে নেট দেওয়া থাকতো, যাতে শৈত্য-তাপের যাতায়াত অবাধ হয় এবং কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

 

ঈদের খাবার মানেই নানা পদের মিষ্টিজাতীয় খাবারের বাহার। ঘিয়ে ভাজা জর্দা সেমাই, দুধ সুজির হালুয়া, পাক্কান পিঠা আর খেজুর পাটালির পায়েশ। সব পদের মধ্যে যিনি আজ নামকরণের সার্থকতা নিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল তার নাম ‘মলিদা’। এই বিশেষ পদটি তৈরিতে সময়, পরিশ্রম এবং মনোযোগ যে পরিমাণ দেওয়া হত তা রীতিমত এক মহাযজ্ঞ। এই মলিদার আকর্ষণেই ঈদের আনন্দ বহুগুণে বেড়ে যেত বড়দের অনেকের কাছেই। এটি মূলত একধরনের পানীয়, যাকে কেবল পানীয় হিসেবেই পান করা যায় আবার পায়শের জনপ্রিয় সঙ্গী হিসেবেও অতি সুস্বাদু। সুতরাং এই অভিজাত পদের আয়োজন কেবল ঈদের দিনেই নয়, বহু আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হত রূপেগুণে যাতে একে সর্বেসর্বা করে তোলা যায়। চালের গুড়ার সাথে শাঁসওয়ালা ঝুনো নারকেল, খইয়ের স্বল্পাংশ, শাঁস ওয়ালা ডাব এসব ছাড়া মলিদাই হয় না। এর স্বাদবৈচিত্র্য, পরিবেশনপ্রণালী, এবং গন্ধ-রূপ ছিল অন্যান্যদের ভীড়ে রীতিমত ঈর্ষাণ্বিত। এককথায় তিনি ছিলেন আপন গুণে আপনি ধন্যা। শ্রেণীভেদের দিক থেকেও তিনি জমিদার কন্যা। একে তৈরি করা যেমন শ্রমসাধ্য এবং ব্যয়বহুলও বটে।

 

ঈদে আমার ভোজনবিলাসী বাবার খাবারের আয়োজন যেনতেন হলে কোনোপ্রকারেই চলত না। তিনি নিজে রান্নাঘরে গিয়ে সব কঠোর নজরদারীতে রাখতেন। কোনো পদে মা একটু ঘি এর পরিমাণ কম দিলেন কিনা, নারকোলের দুধ কিংবা গরুর দুধ কম হল কিনা সব ছিল তাঁর নখদর্পণে। খেতে যেমন নিজে ভালোবাসতেন মানুষকে খাওয়াতেও খুব পছন্দ করতেন উজার করে। মনে পড়ে, বাবার অনেক বন্ধু, আমাদের দূর- দুরান্তের আত্মীয়-স্বজনেরা কেবল এই বিশেষ মলিদা খেতে ছুটে আসতেন ঈদের দিনে আমাদের বাড়িতে। মাকে প্রায়শই দ্বিতীয় দফায় সেই মলিদা বানাতে হত, ঢাউস সাইজের গামলায়

 

আমাদের ঈদ মানেই মায়ের ওপর বিশাল কর্মযজ্ঞ। মায়ের বড় সন্তান আর মেয়ে হওয়াতে সেই যজ্ঞের তাপ আমার গায়েও কিছুমাত্র কম লাগত না। নতুন জামা-জুতো পরে ফুলপরী সেজে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ খুব একটা মিলত না। আমাদের নতুন জামা-জুতো পাওয়ার রেওয়াজ ছিল না ঈদে, কিংবা ঈদি। মিলিটারি বাবার অনেক নিয়মই ছিল প্রথাবিরোধী। তাঁর অকাট্য যুক্তির কাছে শিশুমন যতই কেঁদেকেটে আকুল হোক, হাকিম নড়লেও বাবার হুকুম নড়ত না। অন্য শিশুদের মত শৈশবের সব অমল আনন্দে আমাদের ছিল না নিঃশেষ অধিকার। যদিও বড় হয়ে যখন বাবার সেই কঠোরতার পেছনের গল্পটা জেনেছি তখন আর বেদনার বেনোজলে ভাসেনি মন; বরং আনন্দই পেয়েছি

 

নতুন জামা নেই তাতে কী? অপেক্ষাকৃত কম পরা জামাটিকে ৫৭০ সাবানে ধুইয়ে ভাতের মারে চুবিয়ে রোদে শুকানো হত। অতঃপর বালিশের নিচে টানটান করে রেখেই বাংলা মেথডে ইস্তিরি করা হত। কখনও বা লৌহ নির্মিত ইস্তিরিও ব্যবহার করা হত অতি সন্তর্পণে। ঈদের দিনে অতি ভোরে ঘুম থেকে উঠে গোসল করা ছিল অনেকটা ফরজের মত। তারপরে সেই যত্নে রাখা কাপড় পরে লাল ফিতেয় ঝুটি বেঁধে, সেজেগুজে বাবার সাথে ঈদগাহে যেতাম। আনন্দের প্রথম কিস্তি (জামা-জুতোহীন) বাদ পড়ায় এই ঈদগাহে যেতে পারার আনন্দে আমরা সত্যিই মাতোয়ারা হয়ে থাকতাম।  

 

ঠিক কত বছর বয়স অব্দি যেতাম ঈদগাহে এখন সেসব মনে পড়ে নাতবে, আমরা তিন বোন একত্রে বাবার সাথে দাদাজানের কবর জিয়ারত করতে যেতাম প্রথমে প্রতি ঈদে। তারপরে যেতাম ঈদগাহ ময়দানে পথে যেতে যেতে বাবা সকলের সাথে কোলাকুলি করতেন কুশল বিনিময় করে। অন্যান্যরা বাবাকে বলতেন, “হাওলাদার সাহেব, আপনি কন্যাদের নিয়ে ঈদগাহে যাচ্ছেন? বাবা হাসিমুখে বলতেন, হ্যাঁ, আল্লাহ আমাকে তো কন্যাসন্তানই দিয়েছেন। আমি তাদেরকে নিয়েই যাই।” জানি না আজকের বাংলাদেশের গ্রামে আদৌ এটা সম্ভব হয় কি না। ঈদগাহে গিয়ে আমরাও বাবার আশেপাশে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতাম। নামাজ শেষে বাবার সাথে অনেক আত্মীয় যারা শহরে থাকেন, বাবার বন্ধু, সকলকে নিয়ে বাড়ি ফিরতামততক্ষণে, মা-ও নিজে তৈরি হয়ে আছেন, তাঁর রসুইঘর মৌ মৌ গন্ধে অতিথির অপেক্ষায় বেশ সরগরম।

 

ঈদগাহে যাবার আগে ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করতে হত। সব ঘরের বিছানা  গোছানো ছিল অন্যতম; ফুলতোলা চাদরে, বালিশের কভার, টেবিল-চেয়ারও ঢেকে দিতাম সুন্দর হাতের কাজ করা কভার দিয়ে। মায়ের হাতের সুস্বাদু রান্নার মত সুচিকর্মেও তিনি ছিলেন সুনিপুণা। মায়ের হাতের সেলাই ফ্রেমে এঁটে আমাদের বসার ঘরের দেয়ালে টানানো ছিল, যা দেখে সবাই জিজ্ঞেস করতেন, এসব কি সেলাই নাকি প্রিন্টেড? মনে হত যেনো রঙিণ ছাপানো কাপড়ের টুকরো ফ্রেমে আঁটা হয়েছে। মায়ের রান্না আর সেলাইয়ের গুণগান শত্রুর মুখেও ছিল সমান স্তুতির। আমাদের মায়েদের সংসার কর্মে ষোলো আনা গৃহিণী হয়ে ওঠা ছাড়া কীইবা করার ছিল তখনকার দিনে!

 

ঈদের দিনে এতো সব মিষ্টি পদের পরে দুপুরে কিংবা রাতে পোলাও, ঝাল মাংস না হলে জমত না। তবে, ঝাল মাংসের সাথে কোর্মাও থাকতেই হত আইনানুগ পদ হিসেবে। পোলাও তো সঙ্গী ছাড়া একলা চলতে পারে না মায়ের নিজেরও কোর্মা ছিল পছন্দের তালিকায়। মায়ের পোষা মুরগী-মোরগ, ডিম দিয়েই ডিমের কোর্মা, ঝাল মাংস হয়ে যেত। আমার মায়ের ছিল সংসার ভরা ঘর! কী ছিল না নিজের হাতে? বয়াম ভরা ঘি নিজের হাতেই তুলতেন। সেই ঘিয়ের সুঘ্রাণে আর নারকেলের দুধের মিশেলে কোর্মা হয়ে উঠত ইন্দ্রপুরীর দেবতাদের প্রসাদযাকে দর্শনে অর্ধেক ভোজন হয়ে যেত

 

ছেলেবেলার ঈদের স্মৃতিতে সে বিষয়টি হীরকোজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে আছে সেটি না বললে ঈদের স্মৃতিচারণ অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। সেই খুশি সবার সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার শিক্ষাটা সেই শৈশবেই দিয়েছিলেন বাবা; আমাদের খানিকটা বঞ্চিত করেই। কেনো আমাদের বাবা নতুন কাপড় কিনতে অনাগ্রহী ছিলেন জেনেছি পরে। আমাদের আশেপাশে তখন অনেকগুলো দরিদ্র পরিবার ছিল যাদের নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য ছিল না। আমরা নতুন কাপড় পরে আনন্দ করলে ওদের মনোকষ্টের কারণ হব, এতে তো আনন্দ ভাগাভগি হল না, বরং অন্যের আনন্দে ভাটা পড়ল! যদিও আমার বাবা-মা সাধ্যমত চেষ্টা করতেন ওদের সাহায্যের জন্য, তবে পেরে উঠতেন না। যখন বুঝতে শিখেছি এর মর্মার্থ, সেদিন থেকে বাবার জন্য গর্বে বুকের পাটাতন দুই হাত চওড়া হয়ে ওঠে।

 

মজার ব্যপার হল, আজও আমার পরিবারে সেই একই রেওয়াজ, আমরা অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ঈদে কাপড় কেনা হয় না। আমরা সেভাবেই বেড়ে উঠেছি। আমাদের সন্তানেরাও ঈদ মানেই নতুন কাপড় নিতে হয়, সেটা মাথায়ই রাখে না।

 

সকল ধর্মীয় উৎসবের দুটো দিক থাকে, সামাজিক ও ধর্মীয়। ঈদ উদযাপনের মধ্য দিয়ে আমরা শিখি ঈদ মানে ধনী-দরিদ্র সব ভেদাভেদ ভুলে সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। ঈদ মানে মহামিলন। প্রতিবেশীর প্রতিও আমাদের দায়িত্বের কথা, তাঁদের আনন্দ আয়োজনেও আমাদের করণীয় থাকে ঈদ আমাদের তাইই শেখায়। এ কারণেই ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে উদার করে, মহৎ করে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজকাল আমরা ধর্মের মূল বার্তা থেকে সরে যাচ্ছিআমরা কেবল এর আচারিক দিকটা পালনে জোর দিচ্ছি। এর মূল বার্তাটা সঠিকভাবে প্রয়োগ করছি না ব্যক্তিগত কিংবা সমাজ জীবনে।

 

আজকের সমাজে বড় বেশি ব্যক্তিগত লাভালাভের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আমাদের বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে বহুগুণে। ধর্মের সেই শিক্ষাটাই এখন জরুরী হয়ে উঠেছে, যেখানে ঈদ মানে মহামিলন! সেই আনন্দযজ্ঞে সকলের নিমন্ত্রণ! যেখানে অসাম্প্রদায়িকতা, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, পারস্পারিক শ্রদ্ধা ভালোবাসার এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হবে। যা সমাজকে করবে সমৃদ্ধ এবং গড়বে শক্তিশালী সম্প্রদায়-জাতিআর সেটিই তো আমাদের কাম্য হওয়া উচিত

 

যখন অনেকের কাছেই ছেলেবেলার ঈদানন্দের গল্প শুনি, মিলিয়ে দেখি আমাদের আনন্দের রঙটা ছিল খানিকটা ধুসর কিন্তু তার অন্তর্নিহিত যে আবেদন, যে শিক্ষা, যে মূল বার্তা ছিল সেটি আমাদের হৃদয় আকাশে নক্ষত্র হয়ে আজও জ্বলজ্বল করছে।

 

অতিমারীর এই মহাসঙ্কটে সকলের ঈদ একরকম হবে না। তবুও সবার সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি। দূরের ও কাছের সবার মঙ্গল প্রার্থনায় ঈদ মোবারক

 

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, টরন্টো, কানাডা থেকে।

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান