কোভিডের ইন্ডিয়া ভেরিয়েন্ট : আমাদের আশু করণীয়

Sun, May 9, 2021 10:36 AM

কোভিডের ইন্ডিয়া ভেরিয়েন্ট : আমাদের আশু করণীয়

ড. জিয়া হায়দার: ভারতের মতো বাংলাদেশেও কোরোনার ভয়াবহ তাণ্ডব যে কোনো সময়ই শুরু হতে পারে। ইতিমধ্যেই কয়েকজন কোভিড-১৯  রোগীর শরীরে তথাকথিত “ইন্ডিয়ান ভেরিয়েন্ট” শনাক্ত করেছে আইইডিসিআর। এমনিতেই দেশের হাসপাতালগুলির চিত্র ভয়াবহ।প্রথম থেকেই  বিরূপ পরিস্থিতিতে থেকেও মানুষের সেবা দিতে চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সহ সকল স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু স্বাস্থ্যখাতে অনেক বছরের জমে থাকা অনিয়ম, প্রতিটি ক্ষেত্রে অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ইত্যাদি এই চেষ্টার ফসল অনেকাংশেই ম্লান করে দিচ্ছে।একদিকে মৃত্যুর মিছিল, সাধারণ মানুষের আহাজারি, আর আরেকদিকে সিন্ডিকেটবাজ একদল পশুর বড়োলোক থেকে আরো বড়োলোক হওয়ার প্রতিযোগিতা। কোরোনার ভয়াবহতা, আর জরুরি ভিত্তিতে আসা   বৈদেশিক সাহায্য এদের সামনে এনে দিয়েছে সম্পদ বানানোর এক মহোৎসবের সুযোগ! সততা নিয়ে ডাক্তার সহ যে সকল মুষ্টিমেয় সরকারি কর্মচারী সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে চান, তারা ওই পশুদের পায়ের চাপে পিষ্ট। মানসন্মান নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।

যাইহোক, বলছিলাম বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান ভেরিয়েন্টের অনুপ্রবেশ আর সম্ভাব্য ভয়াবহতার সম্ভবনার কথা। কিছুদিন পূর্বে সরকার দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন। এটাই প্রথম নয়, অনুরূপ চেষ্টা অতীতেও করা হয়েছিল।কিন্তু কোনো বারেই এটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। আমার মতে তিনটি প্রধান  কারণে লকডাউন বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রথমত, ঘনবসতি এবং বড়ো শহরগুলোতে  অস্থায়ীভাবে বাসরত বিশাল জনসংখা, দ্বিতীয়ত, সাধারণ জনগণের একটা বড়ো অংশের মধ্যে কোভিড-১৯  কে তোয়াক্কা না করার প্রবণতা, আর তৃতীয়ত, লকডাউন বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা সম্পর্কে অনাস্থা।প্রথম কারণটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা।বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে কথা বললেও জেনারেল এরশাদ ছাড়া সকল সরকারেরই রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ছিল।ফলশ্রুতিতে আজ ঢাকা শহর পরিণত হয়েছে বিশ্বের সব চেয়ে বড়ো “অপরিকল্পিত বস্তিতে”। বিশেষ করে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ COVID-19 কে তোয়াক্কা করে না, কারণ প্রথম থেকেই তাদের জন্য কোনোরকম সম্মিলিত প্রচার প্রচারণার ব্যবস্থা করা হয়নি, সকল দলের গণপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়নি, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গড়িমসি ছিল, সমাজের উচ্চবিত্তরা সহ প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতারা রোল মডেলের ভূমিকা নিতে পারেনি। বৈশ্বিক মহামারী চলাকালীন সময়েও সাধারণ মানুষ দেখেছে কি করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বড় ধরণের জনসমাগম হচ্ছে, সমাজের উচ্চবিত্তরা জমকালোভাবে জন্মদিন-বিয়ের অনুষ্ঠান উদযাপন করছে, যেখানে সরকারি মন্ত্রী, এমপি, আমলারাও পরিবার সহ যোগ দিচ্ছেন। সুতরাং, সাধারণ মানুষ সন্দিহান আসলেই সরকার লকডাউন এর সঠিক বাস্তবায়ন চান কিনা।

দেশের ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েছে, এবং এখনও হচ্ছে। আমরা কথা বলি, লিখি, তাতে নীতিনির্ধারণী মহলের কিবা আসে যায়। সেদিনতো স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক সাহেব জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বেশি কথা বলতে নিষেধই করে দিলেন। কিন্তু তার পরেও কাউকে না কাউকে তো কথা বলতেই হয়। সামাজিক মাধ্যম তো বন্ধ করে রাখা যাবে না। সত্য প্রকাশে বাধা আসবেই।কিন্তু তা বলে সত্য কি একেবারেই অপ্রকাশিত থাকবে? কোনো কালেই তা থাকেনি ।

লকডাউন বাংলাদেশের জনসংখা এবং অর্থনৈতিক  বাস্তবতায় টেকসই কোনো সমাধান নয়, এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে এটা আমাদের মতো অধিক জনবহুল দেশে বাস্তবায়ন যোগ্য নয়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো ছাড়া এর আর কোনো সুফল আছে বলে আমার মনে হয়না। কিন্তু যেটা করা যায় এবং করতেই হবে, এমন সব কাজের বাস্তনায়নের প্রতি সরকারকে অবশ্যই মনোনিবেশ করতে হবে।

প্রথমত, যে ভাবেই হোক যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে দেশের বেশিরভাগ মানুষকে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের আওতায় আনতেই হবে।ইন্ডিয়া থেকে ভ্যাকসিন আসবে না তা বাংলাদেশের মানুষ অনেক আগেই টের পেয়েছে। আশার কথা সরকার চীন, রাশিয়া, আমেরিকা থেকে ভ্যাকসিন আনার চেষ্টা করছে। এই চেষ্টাকে অবশই সফল করতে হবে। সাথে সাথে সারা দেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট করার সব ব্যবস্থা এখনই শেষ করতে হবে। তানাহলে ভ্যাকসিন দেশে আসলেও তা কাঙ্খিত জনগণের মাঝে পৌঁছুবে না ।

দ্বিতীয়ত, যতদিন পর্যন্ত কোভিড-১৯  কে বৈশ্বিক মহামারী হিসাবে বিবেচনা করা হবে, ততদিন সকল ধরণের রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমাবেশ ও অনুষ্ঠান আইন দিয়ে নিষিদ্ধ করতে হবে। আইন অমান্য করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক নেতা এবং সুউচ্চ পদে আসীন আমলাও যেন শাস্তির আওতার বাইরে না থাকে।  জীবন এবং জীবিকার প্রয়োজন ছাড়া অকারণে ঘরের বাইরে যাওয়া অনিদৃস্ট কালের জন্য নিষিদ্ধ হতে হবে | ঈদের জন্য কাপড়-প্রসাধনী কেনা, আর হাওয়া খাওয়ার জন্য ঘোরাঘুরি করার সাথে জীবন-জীবিকার কোনো সম্পর্ক নাই।এক দিকে মানুষ মারা যাচ্ছে, সহায়-সম্বলহীনভাবে ক্ষুধার্ত জীবন কাটাচ্ছে, আর আরেকদিকে কিছু মানুষ লাগামহীন ভাবে লাফাচ্ছে - ওটা ভাবতে গেলেও কষ্ট লাগে ।

তৃতীয়ত, বাস্তবিক কারণে সামাজিক দূরত্ব মানতে না পারলেও বাইরে বেরোনোর সময় সঠিক ভাবে মাস্ক তো পড়া যায়? অবশ্যই সকলের মাস্ক পরাকে আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে অবশ্য করণীয় করতে হবে। শুধু আইন নয় - সামাজিক ভাবেও সকলকে মাস্ক পড়তে বাধ্য করতে হবে। কোভিড-১৯  এর সংক্রমণ ঠেকাতে ভ্যাকসিন নেওয়া আর মাস্ক পড়ার কোনো বিকল্প নাই।

চতুর্থত, কোভিড-১৯  এর চিকিৎসায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার  দুর্বল দিকগুলো শনাক্ত করে এখনই তার প্রতিকার করতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, উপজিলা পর্যন্ত সকল হাসপাতালে যাতে করে COVID-19 এর চিকিৎসা পাওয়া যায়, সেই লক্ষে স্বাস্থ্য কর্মীদের অতি জরুরি  ভিত্তিতে দ্রুত  প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয়ভাবে চিকিৎসার গাইডেলিনে তৈরী করে সেই অনুযায়ী স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে| সকল হাসপাতালে চিকিৎসার গাইডলাইনের কপি পাঠিয়ে দিতে হবে। জিলা শহরের  হাসপাতাল থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের সকল হাসপাতালগুলোকে কোবিদ এর আধুনিক এবং উচ্চমানের চিকিৎসা দেওয়ার উপযোগী করতে হবে। প্রশিক্ষিত ডাক্তার নার্সের ব্যবস্থা  করতে হবে, নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর  বসাতে হবে, এইসিইউ র পরিধি বাড়াতে হবে এবং সাথে সাথে স্বাস্থ্য কর্মীদের জরুরি  কালীন বাটার ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। কেনাকাটায় দুর্নীতি কমাতে  পারলে ডাক্তার নার্সদের ভাতা অথবা ইন্সেন্টিভ দেওয়ার অর্থের যোগান দেওয়া কোনো ব্যাপারই হতে পারে  না। তা ছাড়া বিশ্ব ব্যাঙ্ক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক  সহ অন্যান্য দাতা সংস্থার জরুরি প্রকল্পের  টাকার যোগান তো আছেই।

সর্বোপরি, কোভিড-১৯  এর মতো সাংঘাতিক মহামারী ঠেকাতে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির কোনো বিকল্প নাই। পৃথিবী এবং দেশের এই ক্রান্তিকালেও যারা দেশকে বিভক্ত করছেন, ঝগড়া-ফেসাদ করছেন, জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী কাজ করছেন -  তাদেরকে আমরা ভুলে গেলেও ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না ।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান