সেরামের সিইও’র দেশত্যাগ আর বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদন 

Tue, May 4, 2021 10:04 PM

সেরামের সিইও’র দেশত্যাগ আর বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদন 

ড. শোয়েব সাঈদ: টক শো আর কলামে অনেকবার উল্ল্যেখ করেছি কোভিড ভ্যাকসিনের চাহিদা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৭০-৮০%, ডাবল ডোজের হিসেবে প্রায় ১২০০ কোটির মত। বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন উৎপাদকের ১০০% সক্ষমতায় বার্ষিক উৎপাদন দেড়শ কোটি ডোজ ফলে অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন উৎপাদন করে কোভিড ভ্যাকসিনের চাহিদার যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে উৎপাদকরা। খুব সাধারণ যে কোন রোগে ঔষধের পরিমান বৈশ্বিক জনসংখ্যার কিছু অংশ মাত্র এবং সেটি বিশ্বের ধনী গরীব অনেক দেশেই তৈরি হয়। সেই হিসেবে কোভিড ভ্যাকসিনের চাহিদা নজিরবিহীন মাত্রায় অথচ সক্ষমতা মাত্র কয়েকটি দেশের হাতে এবং এর উৎপাদন কর্মযজ্ঞ মূলত জটিল এক আয়োজন।

ঔষধের চেয়ে অনেক স্পর্শকাতর এবং কারিগরিভাবে চ্যালেঞ্জিং হচ্ছে ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রক্রিয়া। বিশ্বের অন্যতম ভ্যাকসিন  উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও হুট করে উৎপাদনের পরিমান বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়না। এই বিষয়টি বিশেষজ্ঞরা বারবারই বলে এসেছেন। 

এখন দেখা যাচ্ছে ভ্যাকসিন গ্লোবালাইজেশন বনাম ন্যাশনালিজমের তীব্র টানাপোড়েনে আর ভ্যাকসিন রাজনীতি আর উৎপাদন সক্ষমতার জটিল সাংঘর্ষিক অবস্থায় নিরাপত্তার কারণে সেরাম সিইও আদর পুনাওয়ালাকে ভারত ছেড়ে ব্রিটেনে চলে যেতে হয়েছে।

টাইমস’এর কাছে সাক্ষাৎকারে আদর পুনাওয়ালা বলেন, ভ্যাকসিন তৈরি করার প্রক্রিয়া খুব জটিল। ইচ্ছা করলেই তার উৎপাদন বাড়ানো যায় না। ভারতের জনসংখ্যা বিপুল। সবার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক ডোজ তৈরি করা সহজ কাজ নয়। ভারতে বহু প্রভাবশালী মানুষ তাকে ফোন করে দ্রুত ভ্যাকসিন পাঠাতে বলেছিলেন। এই চাপে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এবার আসি বাংলাদেশে। এই পরিস্থিতিতে সেরামের ওয়াদাকৃত  ভ্যাকসিনের  বাংলাদেশে আসার আশা  প্রায় ছেড়েই দিতে হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রীকে দেখলাম সেটিই বলছেন।

সেরাম সংকট অর্থাৎ বাংলাদেশে কোভিশিল্ড আসা বন্ধ হবার পর হঠাৎ করে বাংলাদেশে স্পুটনিক ভ্যাকসিন সহ চাইনিজ ভ্যাকসিন উৎপাদন নিয়ে  কর্তৃপক্ষ আর কিছু ফার্মা কোম্পানি বেশ আশার বাণী শুনাচ্ছেন আমাদের। ভ্যাকসিন উৎপাদন নিয়ে আমি ইন্সেপ্টা ভ্যাকসিন লিমিটেডের  একটি পাওয়ার পয়েন্ট  উপস্থাপনা দেখেছি ইন্টারনেটে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল অণুজীব বিদ্যায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বলা যায় কোভিড ভ্যাকসিন টোল ম্যানুফেকচারিং এর জন্যে বাংলাদেশের ফার্মা কোম্পানিগুলো কতটুকু প্রস্তুত কিংবা কোভিডের নির্দিষ্ট কোন ভ্যাকসিনের আলোকে উনাদের প্রোডাকশন লাইন কতটুকু সহায়ক অথবা প্রয়োজনীয় লাইন এডজাস্টমেন্টের সম্ভাব্যতা এবং  প্রয়োজনীয় সময় নিয়ে বিস্তারিত ধারণা থাকাটা অত্যাবশ্যক। প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদনে উদ্ভাবকদের সমমানের সেট আপটা জরুরী।

আমরা করতে পারব এ ধরনের বায়বীয় আলোচনার চাইতে করতে পারার কোন স্তরে আছেন, এবং এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলোর সম্ভাব্য মাত্রা নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যাকসিনের উৎপাদনের অভিজ্ঞতা আছে বলেই কোভিড ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারব কেন্দ্রিক হাইপোথেটিক্যাল মিডিয়া ভিত্তিক আলোচনার চাইতে  নির্দিষ্ট ভ্যাকসিনটি উৎপাদনে বাস্তবে সংযুক্ত থাকাটা জরুরী।

বিদেশী ভ্যাকসিন কোম্পানির সাথে প্রাথমিক আলোচনা, সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রোডাকশন লাইন, মান নিয়ন্ত্রণ, সাপ্লাই চেইনের মত বিষয়গুলোতে যথেষ্ট সময় দরকার। রাজনৈতিক আশ্বাস আর ভ্যাকসিন  উৎপাদনের মত জটিল বিষয়ের ব্যবস্থাপনা, শিডিউল একই পথের পথিক  হওয়া উচিত নয়।

উন্নত দেশগুলোতে ভ্যাকসিন কার্যক্রম যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, ২-৩ মাসের মধ্যে পরিস্থিতির  ব্যাপক পরিবর্তন হবে। টিকাদানে আমাদের অচলায়তন ভেঙ্গে অগ্রগতিটা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। টিকা আর স্বাস্থ্যবিধির যুগপৎ অভিযান ছাড়া বিকল্প পথ নেই।  

উন্নত দেশগুলোতে টিকাদানে অগ্রগতি সাপেক্ষে চাহিদা কমে আসার সাথে সাথে আমাদের ভ্যাকসিনে এক্সেস বাড়বে। এই ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লক্ষ্যে আমাদের ভ্যাকসিন সংগ্রহে মনোযোগী হওয়াটা ভীষণ জরুরী। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে বাংলাদেশে ভ্যাকসিনের টোল ম্যানুফেকচারিং এর সম্ভাব্যতা সঠিকভাবে যাচাই করে সামনে অগ্রসর হওয়াটা জরুরী।

লেখক: ড. শোয়েব সাঈদ, অণুজীব বিজ্ঞানী।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান