হেফাজতের কমিটি বাতিল নিয়ে বিমোহিত হওয়ার কিছু নেই

Sun, Apr 25, 2021 9:35 PM

হেফাজতের কমিটি বাতিল নিয়ে বিমোহিত হওয়ার কিছু নেই

ইমতিয়াজ মাহমুদ: ১) হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে বা বাতিল হয়েছে এইসব কারবারে বিমোহিত হবার বা আমোদিত হবার বা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কিছু নাই। এই সংগঠনটি রয়ে গেছে। আর সংগঠনটি যদি ভেঙেও যায়, সেইসব লোকজন ও সংগঠন ওরাও ঠিকই রয়ে যাচ্ছে। এর সমর্থকরা রয়ে যাচ্ছে। ওদের দাবীগুলিও রয়ে গেছে। মনে রাখবেন হেফাজতে ইসলাম একটি ফেডারেশন ধরণের সংগঠন। এর যে কমিটি, সেই কমিটির লোকেরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ বা মাদ্রাসার প্রতিনিধি। ওরা কেউই কোথাও যাচ্ছে না এবং ওরা কেউই আগামীকাল সকাল থেকে ওদের নীতি কর্মসূচী ইত্যাদি ভুলে যাবে না। 

মৌলিক সমস্যা ভুলে যাবেন না। মৌলিক সমস্যা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা কি? সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করা এবং সেই অনুযায়ী বৈষম্য করা। এটা স্বীকার করুন যে আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতা একটি বড় সমস্যা। যারা বলেন বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, তারা হয় বোকা অথবা মিথ্যা কথা বলেন। বাংলাদেশের (প্রায়) প্রতিটা স্কুলে শিক্ষকরা সাম্প্রদায়িকতা শিক্ষা দেন। সামাজিকভাবে আমরা সকলেই কমবেশি সাম্প্রদায়িক আচরণ করি। বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষই ভারতকে শত্রু রাষ্ট্র মনে করে কারণ ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু।

আর আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলি যেসব আছে ওরাও সাম্প্রদায়িকতা দুর করতে চায় কিনা সেই নিয়েও আমার রীতিমত সন্দেহ রয়েছে। যতক্ষণ সাম্প্রদায়িক লোকজন আমার দলের পক্ষে থাকে বা আমার দলের জন্যে সুবিধাজনক কাজ করে ততক্ষণ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আমাদের দলগুলি কোন সমস্যা দেখেন না। বরং ওরা একটা সীমিত মাত্রায় সাম্প্রদায়িকতা বজায় রেখে সেটা থেকে সুবিধা আদায় করাটাই রাজনৈতিক দলগুলি সুবিধাজনক মনে করে।

(২)

সাম্প্রদায়িকতা একদিনে আমাদের দেশে আসেনি। এটা দীর্ঘদিনের পুরাণ সমস্যা। স্বাধীনতার পর আমাদের উদ্যোগ ছিল সুযোগ ছিল ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকতা থেকে বের হয়ে আসার। সেটা করা যায়নি। কার দোষ, কেন করা গেলনা, কে ভুল করেছে সেগুলি নিয়ে আলাপ করতে পারেন- কিন্তু সেই আলোচনা না করেও যেটা আমরা বলতে পারি যে ১৯৭৫এর পর থেকে দেশ আবার সাম্প্রদায়িকতার পথেই রওনা হয়েছে। আর আজকে যেখানে আছি সেটা তো দেখতেই পাচ্ছেন।

সাম্প্রদায়িকতা একটা পুরাণ সমস্যা। এটা চট করে একদিন, দুইদিন বা একবছর দুই বছরে দুর হবে না। একটা দুইটা আইন পরিবর্তন করে বা নয়া কোন আইন তৈরি করেও এই সমস্যা দুর হবে না। এটা করতে সময় লাগে। যে লোকগুলি আজকে সাম্প্রদায়িক নীতিমালা ধারণ করে- মনে করে যে এটা মুসলমানের দেশ, এই দেশে মুসলমানের নাগরিক অধিকার হিন্দুদের চেয়ে বেশী- সেই লোকটি তার এই মতামত সম্ভবত তার জীবদ্দশায় পরিবর্তন করবে না। আপনি যদি একটা নয়া অসাম্প্রদায়িক প্রজন্ম তৈরি করতে পারেন তাইলেই ধীরে ধীরে পুরনো সাম্প্রদায়িকতা সমাজ থেকে, ইংরেজিতে বললে, ফ্ল্যাশ আউট হয়ে যাবে। এইটা ছাড়া কোন উপায় নাই।

এইটা কিভাবে করবেন? দুইটা কাজ করতে হবে। প্রথম হচ্ছে শিশু কিশোরদের জন্যে এখন যে মাদ্রাসা শিক্ষা আছে, সেটাকে মূলধারার স্কুল কলেজের সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। প্রতিটা শিশুর জন্যে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা রাষ্ট্রীয় খরচে দেওয়ার ব্যাবস্থা করতে হবে এবং সেইখানে শহর ও গ্রামের স্কুলগুলির মধ্যে শিক্ষার মানের সমতা আনতে হবে। এইটা সহজ নয়, একদিন দুইদিনে করার মত কাজ নয়। কাল সকালেই যদি আপনি কমি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেন, তাইলে তো হবে না। যেসব ছেলেগুলি মাদ্রাসায় যায় ওদের জন্যে আধুনিক শিক্ষার ব্যাবস্থা করা এবং সকল শিশুর মৌলিক চাহিদাগুলির দায়িত্ব নেওয়া, এইগুলি যদি রাষ্ট্র না করে তাইলে কওমি মাদ্রাসা বন্ধ হবে না।

তাইলে ধর্মীয় শিক্ষার কি হবে? ধর্মীয় শিক্ষাকেও আপনার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সাথে নিয়ে আসতে হবে। কেউ যদি ধর্ম শিখতে চায়, সে পড়তে পারবে। কিন্তু একটা পর্যায় পর্যন্ত, ধরেন ক্লাস এইট পর্যন্ত, সবাই একই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

(৩)

দ্বিতীয় কাজ যেটা সেটা আপনি আগামী কালই শুরু করে দিতে পারেন। প্রাইমারি এবং হাই স্কুলের শিক্ষকদের জন্যে যেসব ট্রেইনিং কারিকুলাম আছে সেইখানে একটু হাত দিতে হবে। পিটিআই এবং বিএড এইসব কোর্সে এমনসব উপাদান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে করে ওরা স্কুলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা না ছড়ায়। যাতে কর এইসব শিক্ষকরা নিজেরা অনুধাবন করতে পারেন সাম্প্রদায়িকতা কি এবং কেন সাম্প্রদায়িকতা জিনিসটা ভাল না। শিক্ষকরা নিজেরা যদি এই শিক্ষাটা না পান এবং নিজেরা যদি অসাম্প্রদায়িক না হন, তাইলে ওরা কথায় কথায় স্কুলের ক্লাস রুমে ছাত্রদেরকে অবশ্যই শেখাবেন যে হিন্দুরা খারাপ, হিন্দুরা এই দেশের পূর্ণ নাগরিক না, এইটা মুসলমানের দেশ ইত্যাদি।

আর স্কুলের কারিকুলামের তো পরিবর্তন করতেই হবে। আপনি হিন্দু লেখকদের লেখা বাদ দিবেন, শিশুদের পাঠ্যপুস্তকের ছবিতে শিশুদের পোশাকের ইসলামিকরন করবেন তাইলে হেফাজত নেতাদেরকে যতই পিটাতে থাকেন না কেন ছেলেমেয়েরা তো শিখবে হেফাজতের শেখানো বুলি। স্কুলের কারিকুলা পাল্টাতে হবে যাতে করে একটি শিশু কোন অবস্থাতেই না ভাবে যে সে মুসমলান ঘরে জন্মেছে বলে এই দেশে তার নাগরিক মর্যাদা একটা হিন্দু ছেলের চেয়ে বেশী বা ওর হিন্দু বন্ধুটি কেবল ধর্মের কারণে মানুষ হিসাবে ওর চেয়ে কোন অংশে ঊন।

এই যে কাজগুলি, এগুলি তো সেরকম কঠিন কোন কাজ নয়। কিন্তু এইটুকু করতে গেলেও জাতি হিসাবে আমাদের একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয় যদি এইরকম একটা সিদ্ধান্ত আমরা জাতীয় ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নিতে পারি। পূর্ণ ঐক্যমত্য তো হবে না, মোটামুটি বেশীরভাগ রাজনৈতিক গ্রুপগুলির মতামত নিয়ে সিদ্ধান্তটা নিতে পারলেই হয়। নীতিগতভাবে সিদ্ধান্তটা যদি নিতে পারি, তাইলে বাকি কাজগুলি অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একটু কঠিন। কারণ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলি কেউই নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসাবে চিহ্নিত করতে চায় না। সবাই নিজেদেরকে মুসলমানদের দল হিসাবেই পরিচয় দিতে চায়। এইখানেই হেফাজতের শক্তি।

(৪)

আর এইখানেই আমাদের দায়িত্ব। আমাদের দায়িত্ব মানে কি? কাদের দায়িত্ব? যারা সাচ্চা সেক্যুলার রাজনৈতিক দল আছে ওদের দায়িত্ব। যারা গল্প কবিতা লেখেন, যারা ছবি আঁকেন, সিনেমা তৈরি করেন, খবরের কাগজে লেখেন, গান করেন এরা সকলে। যারা আসলেই অসাম্প্রদায়িক কিন্তু 'বিকল্প নাই' বলে আওয়ামী লীগের তল্পিবাহক হয়েছেন তাঁদের দায়িত্ব। যারা পেশাজীবী আছেন তাঁদের দায়িত্ব। এইসব লোক কি করবেন? আপনারা সকলে মিলে যদি স্পষ্ট করে একটা জমায়েত তৈরি করতে পারেন যেখান থেকে এই বার্তাটা যাবে যে ভাই, অসাম্প্রদায়িক না হলে আমরা আপনাদের কাউকেই ভোট দিব না।

এই জমায়েতটা কিন্তু খুব বড় হবার দরকার করে না এবং এই জমায়েতটা কোন একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হবারও দরকার নাই। শুধু যদি এই ধারনাটা দিতে পারেন যে আন্তরিকভাবে অসাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতা চায় ওদের সংখ্যা খুব কম না তাইলেই হবে।  ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কি জানেন? এইরকম লোকের সংখ্যা যারা আসলেই আন্তরিকভাবে অসাম্প্রদায়িকতা চায় বা ধর্মনিরপেক্ষতা চায় এদের প্রকৃত সংখ্যা কিন্তু এইরকম একটা জমায়েত তৈরি করার জন্যে পর্যাপ্ত। কিন্তু এদের একটা বড় অংশ ঐ 'বিকল্প নাই' যুক্তিতে আওয়ামী লীগের তল্পিবাহক হয়ে বসে আছেন।

এই যে অংশটা আমরা, আমরা যদি আমাদের সকলের মতামত এই একটা প্রশ্নে একসাথে জানাতে পারি তাইলে কাজটা অনেকটা এগিয়ে যায়। না, চিরতরে সাম্প্রদায়িকতা দুর হওয়া সেটাতে তো সময় লাগবে, কিন্তু প্রাথমিক পদক্ষেপগুলি শুরু করে দেওয়া যাবে আরকি।

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান