২য় বর্ষ সংখ্যা ৪৯, জুলাই ০৬, ২০১১ । বুধবার 

কলকাতা আমার চন্দ্রকলা 

 

প্রবীর বিকাশ সরকার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

দ্বিতীয় কলকাতা দর্শন:

দ্বিতীয়বার কলকাতা দর্শন আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। অত্যন্ত স্মরণীয় ঘটনা। দীর্ঘ তিনটি মাস সেখানে কাটানোর ফলে অনেক স্মৃতির জন্ম হয়েছিল। যদিওবা সব মনে নেই এখন। কলকাতা ভ্রমণের আগে চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। পার্ট টাইম কাজ আর লেখালেখি করব চিন্তা করলাম। ফুলটাইম চাকরি করলে লেখালেখি করা যায় না। আগের মতো বেশি বেতনের চাকরি এখন আর নেই কোথাও। বয়সও পঞ্চাশের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। জাপানে পঁয়ত্রিশ বছরের পর ভালো কাজ পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য।
আজুমা স্যার অনেক দিন ধরেই আমাকে বলছিলেন, জাপান-বাংলা সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করার জন্য। অনেক ইতিহাস আছে, না লিখে রাখলে এই ইতিহাসটা হারিয়ে যাবে। আপনি কাজটা করে রাখুন। আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হবেন না ঠিকই কারণ যুগ পাল্টে গিয়ে যান্ত্রিক হয়ে গেছে, তারপরও মানুষ একদিন যন্ত্রপাতি-মেশিনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানবতাবাদের জয় হবে। রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন যে জন্য লড়াই আর আরাধনা করে গেছেন। জাপানকে তিনি ভারতের পরে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলেন। বারংবার জাপানে এসেছেন। জাপানি ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রকৃতি থেকে অনেক কিছু আহরণ করেছেন। অনেক জাপানি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। বহু জাপানি তাঁর প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট ছিলেন, এখনো জাপানে রবীন্দ্রনাথের নাম মুছে যায়নি। বহু ঘটনা, বহু স্মৃতি, তথ্য-উপাত্ত আছে যেগুলো হারিয়ে যাবে। আমি যৎসামান্য কাজ করেছি। আমার কাছে প্রচুর গ্রন্থ, তথ্যাদি আছে সেগুলোর কপি করে রাখুন, আপনি নিজেও খোঁজ করে দেখুন আরও তথ্য পাবেন। আমার বিশ্বাস আপনি ছাড়া এই মহাকাজটি আর কেউ সম্পন্ন করতে পারবেন না সেই জাপানিও নেই, বাঙালিও নেই। আমার শরীরটা ভালো থাকলে এই কাজটি করে যেতাম। আপনি ইতিহাসের ছাত্র, সাহিত্যচর্চা করেন, পত্রিকা সম্পাদনা করেন, জাপানি জানেন, পড়তে পারেন, স্ত্রীও জাপানি কাজেই আপনিই একেবারে উপযুক্ত ব্যক্তি।
গবেষণা বিষয়টি নিয়ে আমি মাঝে মাঝে আমার স্ত্রীর সঙ্গেও আলাপ করেছি। আজুমা স্যারের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। কেইকো মাদামের কাছে আমার স্ত্রী বাংলা ভাষা শিখেছে। স্যারের বাসায় অনেক বার আড্ডা দিয়েছি একসঙ্গে। আমার স্ত্রী নোরিকো বলল, জীবনে টাকাকড়ির যেমন প্রয়োজন আবার সমাজে অবদান রাখাটাও জরুরি। গবেষণা করতে গেলে প্রচুর পয়সা দরকার, কোনোখান থেকে স্কলারশিপ পেলে না হয় ভালো হত।
আমি বললাম, রবীন্দ্রনাথের ব্যাপার, বর্তমান অবস্থায় পুরনো বিষয় কোন্ প্রতিষ্ঠান আর স্কলারশিপ দেবে? মেয়েটা সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে বিশাল টাকার দরকার হবে। জাপানে উচ্চশিক্ষা খুব ব্যয়বহুল সে তুমি নিজেও ভালো করে জানো। তবুও আজুমা স্যার গুরুজন বলে কথা, তাছাড়া রবীন্দ্রনাথকেও অবশ্যই ফেলে দেবার বিষয় নয়। ভেবেচিন্তে এগুতে হবে।
আমার নিজেরও ইচ্ছে নেই তা নয়। শুধু রবীন্দ্র-জাপান সম্পর্কই নয়, জাপান-বাংলা সকল সম্পর্ক নিয়েই কাজ করতে চাই। শতবর্ষ প্রাচীন সম্পর্ক বলে কথা! ইতিহাস আকারে লিখে রেখে গেলে ভবিষ্যতে দুজাতির অনাগত প্রজন্মের কাজে লাগতেও পারে। এই কাজগুলো করার জন্যই হয়ত ঈশ্বর আমাকে জাপানে পাঠিয়েছেন। আমার তো আমেরিকা যাবার কথা ছিল! স্যারকে সমস্যার কথা খুলে বললাম। স্যার বললেন, ছোটখাটো স্কলারশিপ একটা ব্যবস্থা করা যাবে। আপনার সঙ্গে তো তোয়ামাসানের বন্ধুত্ব আছে। তাঁকে আমি অনুরোধ করব।
অকিসুকে তোয়ামা হচ্ছেন জাপানের ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর প্রভূত প্রভাবশালী রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব গুরু মিৎসুরু তোয়ামার (১৮৫৫-১৯৪৪) নাতি। গুরু তোয়ামাই মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু এবং হেরম্বলাল গুপ্ত, চীনের জাতির পিতা ডঃ সান-ইয়াৎ সেন প্রমুখকে জাপানে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিলেন। সে আরেক অজানাপ্রায় কাহিনী। অকিসুকে তোয়ামা স্যার একসময় প্রভাবশালী কট্টোর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ ও পরবর্তীকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সোনোদা সুনাও’র একান্ত সচিব ছিলেন। একবার মন্ত্রীর সঙ্গে চীনদেশ ভ্রমণ করার সুবাদে সেখানে তাঁর পিতামহোর সুনাম শুনে অভিভূত হন। জাপানে ফিরে এসে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন বিস্মৃত পিতামহোর নাম, ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে। এ জন্য গঠন করেন ‘কুরেতাকেকাই:এশিয়া ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন। এশিয়াবাদীদের একটি চিন্তাবিনিময় সংস্থা। তিনি এর চেয়ারম্যান। (এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছি জানা অজানা জাপান প্রথম পর্বে, প্রকাশকাল ২০০৭।) আজুমা স্যার এই তোয়ামা স্যারের কথাই বলছিলেন যে, তাঁকে অনুরোধ করে একটি বৃত্তির ব্যবস্থা করবেন। তিনি বললেন, রবীন্দ্র-জাপান সম্পর্কিত ইতিহাস তো লিখবেনই তার আগে একটি জরুরি গবেষণা আপনাকে করতে হবে।
আমি বললাম, কোথায়, কিভাবে? আর বিষয়টি কী স্যার?
নেতাজিকে নিয়ে। তাঁর ‘জাতীয়তাবাদের স্বরূপ এবং এশিয়ার ভবিষ্যৎ’ সম্পর্কে। গবেষণা করবেন রেইতাকু বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আমি এখন তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি পড়াচ্ছি। নেতাজি সম্পর্কে বহু তথ্য এখনো জাপানে রয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। তাঁর প্রকৃত ভিশনটা কি ছিল সেটা খুঁজে বের করতে হবে, কাজটা সহজ নয়। কিন্তু আপনি পারবেন। জাপান-বাংলা সম্পর্কের বিষয়ে আপনার অভিনিবেশটা অন্যরকম আমি দেখেছি।
আমি বললাম, স্যার। তাতে তো অনেক টাকা লাগবে। সময় লাগবে কমপক্ষে চার বছর। কার অধীনে গবেষণা করব?  স্যার বললেন, কোনো বিশেষজ্ঞ নেই এটা সত্যি কথা। নিজেই করতে হবে কারো অধীনে নয়। আর যদি চান তো বিশ্বভারতীতে করতে পারেন। তাতে অল্প টাকায় হয়ে যাবে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা বরাবরই দরিদ্র থাকেন। দরিদ্র না হলে প্রকৃত কাজ করা যায় না। আমি একদিন তবু আপনাকে রেইতাকু বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরিয়ে দেখাব। কাজটা করুন আর নাই করুন।
২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে একদিন রবিবারে বাসায় ডাকলেন। গেলে পরে স্যার আমাকে বাংলায় হাতে লেখা একটি প্রবন্ধ দিলেন টাইপ করে দেবার জন্য। বললেন, এটা সম্পাদনাও করে দেবেন কলকাতার দেশ পত্রিকা বইসংখ্যা প্রকাশ করছে আমার একটি লেখা চেয়েছে।
আমি বললাম, তথাস্তু স্যার।
বাসায় এসে বাংলায় টাইপ এবং প্রিন্টআউট করে ফ্যাক্সে পাঠালাম। তিনি সেটাকে বেশ কয়েকবার ঠিকঠাক করলেন। ফ্যাক্সে আমাকে পাঠালেন। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ চলল। প্রবন্ধটি ছিল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ‘রবীন্দ্রনাথের চোখে জুজুৎসু’ আমি সম্পাদনা করে দিলে সেটি তিনি পাঠালেন ফ্যাক্সে দেশ অফিসে। আমার নাম কৃতজ্ঞতাস্বরূপ দিতে চেয়েছিলেন আমি নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু যখন সৌজন্য সংখ্যা একটি পাঠালেন আমাকে দেখলাম প্রবন্ধটি আমি যেভাবে টাইপ ও সম্পাদনা করে দিয়েছিলাম দাঁড়ি, কমা হুবহু প্রকাশিত হয়েছে। আরও দেখলাম শেষের দিকে একটি নোট: এই প্রবন্ধ লেখার সময় আমার প্রিয় বাঙালি বন্ধু প্রবীরবিকাশ সরকার মহাশয়ের সহৃদয় সহযোগিতা পেয়েছি। তাঁকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। 
আজুমা স্যার যে সত্যিই জাপানি এবং উদার মনের মানুষ এই পরিচয় পেয়ে অভিভূত হলাম! এটা এক পরম প্রাপ্তি হয়ে রইল আমার জীবনে। 
এরপর সত্যি সত্যি একদিন আজুমা স্যার আমাকে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়টি ঘুরিয়ে দেখালেন। বেশ কয়েকজন অধ্যাপক এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বললেন, এর নাম মিঃ সরকার, বাংলাদেশের নাগরিক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ওপর গবেষণা করবেন এখানে আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি।
শুধু তাই নয়, তোয়ামা স্যারের কাছে চিঠিও লিখলেন স্কলারশিপের ব্যাপারে। তোয়ামা স্যার সেটা পেয়ে রাজিও হয়ে গেলেন। কবে থেকে টাকা লাগবে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন তাঁর সঙ্গে একদিন সাক্ষাৎ করতে গেলে। কিন্তু এর মধ্যে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে গেল! যার কারণে এই প্রকল্পটাই ভেস্তে গেল। এর জন্য আমি আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না।
একদিন নীলাঞ্জনের একটি মেইল পেলাম। সে লিখেছে সে জাপানে আসছে কিছুদিনের মধ্যে। স্যারের অবস্থা দেখার জন্য আর সুমনদা একবার হিরোশিমা যেতে চান। আমি সুমনদাকে চিনলাম না। নীলাঞ্জনকে সরাসরি ফোন করলাম। সে বলল, আসলে জাপানে যেতে চাই একাধিক কারণে। এখানে কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমার বেতন খুব কম পাচ্ছি। স্যার অসুস্থ এ জন্য মনটা ভালো নেই, তাঁকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। স্যার সচল থাকা অবস্থায় কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করতেই হবে। আর সুমনদা হচ্ছে প্রখ্যাত সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায়, দীর্ঘদিন দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। তিনি একটি দৈনিক খবরের কাগজ প্রকাশ করতে চান। তাই জাপানি মেশিন এবং আধুনিক মুদ্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে একটি ধারণা নেবার জন্য জাপানে যেতে আগ্রহী, সেইসঙ্গে হিরোশিমা জাদুঘরও দেখতে চাইছেন। এখন আমাকে ধরেছেন, আমি বলেছি যে, প্রবীরদা ছাড়া আর কেউ নেই জাপানে আমাদেরকে গাইড করতে পারে। আমি আপনার সম্পর্কে তাঁকে বিস্তারিত বলেছি যে, আপনি দীর্ঘ বছর জাপানে প্রিন্টিং এবং পাবলিশিং জগতে আছেন। আপনি তথ্য এবং উপদেশ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন।
আজুমা স্যার নীলাঞ্জন ও সুমন চট্টোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণপত্র পাঠালেন। তাঁদের ভিসাও হয়ে গেল যথারীতি। স্যার আমাকে একটি কাগজ দিয়ে বললেন, এখানে পুরো প্ল্যান আছে কোথায় কোথায় তাদেরকে নিয়ে যেতে হবে। আমি তো অসুস্থ দেখতেই পাচ্ছেন, আপনাকে কিন্তু গাইড করতে হবে। আমি যা পারব সেটাও লিখিত আছে। ভালো করে দেখুন। আর আপনাকে কষ্ট করে দুজনকে হিরোশিমা নিয়ে যেতে হবে।
আমি বললাম, তথাস্তু স্যার। আপনি চিন্তা করবেন না।
বাসায় ফিরে এসে পরিকল্পনাটি পড়ে দেখলাম তিনটি দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপরে। প্রথমটি হচ্ছে, একটি জাতীয় দৈনিকের অফিস এবং ছাপাখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ইয়াসুকুনি মন্দিরে নিয়ে যাওয়া। তৃতীয়টি, হিরোশিমা ঘুরিয়ে আনা। তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমি ভেবে দেখলাম জাপানের সবচেয়ে প্রচারবহুল দৈনিক পত্রিকা ইয়োমিউরিশিম্বুন (এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে প্রচারবহুল সংবাদপত্র বলেও কথিত আছে) এক কোটি দশ লক্ষ প্রচার সংখ্যা। সেটা দেখালেই ভালো হবে। আর ইয়াসুকুনি মন্দির দেখানোর জন্য ইউকো তোজোসানকে অনুরোধ করলে এই দুটি কাজের ব্যবস্থা করে দেবেন। নীলাঞ্জন আসছে জানলে খুশি হবেন, এর আগে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। সে জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তোজো হিদেকির সাংঘাতিক ভক্ত। ইউকো তোজো তাঁরই দৌহিত্রী, তিনি গবেষক, পরিবেশকর্মী এবং রাজনীতিক হিসেবে জাপানে খ্যাতিমান; খুবই প্রভাবশালী মহিলা। তাঁকে ফোন করে বললাম, নীলাঞ্জন আসছে, সঙ্গে একজন নামকরা সাংবাদিক তিনি একটি জাতীয় দৈনিকের অফিস এবং ইয়াসুকুনি মন্দির পরিদর্শন করতে চান। এই ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাইছি, সাক্ষাতে সব কথা বলতে চাই।
এক কথাতেই তিনি বললেন, এ আর এমনকি কাজ! নীলাঞ্জন আসছে সে তো খুশির খবর। তুমি আসো, কথা বলব। তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না অনেক দিন, বউ, মেয়ে ভালো আছে তো?
তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম একদিন বিকেলবেলা টোকিওর ব্যস্ত আওয়ামা শহরে তাঁর অফিসে। বললেন, ইয়োমিউরি পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম সেখানকার ম্যানেজার বললেন সুন্দর অফিস, লেটেস্ট মেশিন এবং কর্মপদ্ধতি দেখতে হলে দৈনিক সানকেইশিম্বুন হলে ভালো হবে। যদি বলো এখনই আলাপ করে নিতে পারি। আমি বললাম, তথাস্তু। সানকেই খুবই মডার্ণ পত্রিকা সেটাই করুন। তিনি তৎক্ষণাৎ টেলিফোন করলেন কাকে যেন। সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেল এবং তারিখ ও সময়ও স্থির করে ফেললাম। ক’জন আসবে জিজ্ঞেস করাতে আমি বললাম, তিনজন।
এরপর ইয়াসুকুনি মন্দিরের ব্যাপারে বললেন, দুপুর ঠিক দুটোর সময় ইয়াসুকুনি মন্দিরে চলে যাবে সেখানে ওয়াদাসান নামে একজন কর্মকর্তা তোমাদেরকে রিসিভ করবেন এবং প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন। তারপর সবচেয়ে উপরের বেদিতে প্রার্থনা করতে যাবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী যান। ঠিক আছে? কোনো অসুবিধে হবে না।
ইউকোসানকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফিরে এসে স্যারকে শুধু বললাম, ব্যবস্থা করে এসেছি।
স্যারের অস্পষ্ট কন্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারলাম, শরীরের অবস্থা ভালো নয় তাঁর।
কেইকো মাদামকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, স্যারের শরীরের কী অবস্থা। কণ্ঠস্বর শুনে কেমন হল যেন। 
তিনি বললেন, ঐ তো আগের মতো। কিডনি তো দুটোই নষ্ট হয়ে গেছে। চোখে একদম দেখতে পান না। সব খাবারই লবনছাড়া সিদ্ধ করে দিচ্ছি। বসতে পারেন না। প্রেসার বেড়ে গেছে বলে ডায়ালিস করতে সমস্যা হচ্ছে। শারীরিক এই অসুস্থতা আর কেন্দ্র নিয়ে উদ্ভূত সমস্যার কথা চিন্তা করে মনমেজাজ বিগড়ে গেছে।
আমার মনে কেমন যেন একটা অস্থিরতা দেখা দিল কেইকো মাদামের কথা শোনার পর। এই অসুস্থ শরীর নিয়ে স্যার কি ঠিকমতো সুমনদাকে আতিথেয়তা দিতে পারবেন?
[০২] নীলাঞ্জনরা এলো মার্চ মাসের মাঝামাঝি, জাপানে তখনো প্রচন্ড শীত। টোকিওর বাইরে বরফ পড়ছে। হিরোশিমা তো বরফেই ঢাকা। তারা এসে শিনজুকু শহরের একটি হোটেলে উঠলেন। সবই করলেন কেইকো মাদাম এই বুড়ো বয়সে, পারেনও তিনি! স্বামীকে হাসপাতালে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, এখানে-সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য ৬৫ বছর বয়সে এসে গাড়ির ড্রাইভিং লাইলেন্স তুলেছেন! ভাবতেই পারি না! আমি আর সাক্ষাৎ করতে যায়নি তাদের সঙ্গে ব্যস্ততার কারণে। তবে ফোনে নীলাঞ্জন এবং সুমনদার সঙ্গে আলাপ হল। নীলাঞ্জন বলল, স্যার আপনার গবেষণার জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছেন, শুনে ভালো লাগল। স্যারের বাসায় সুমনদাকে নিয়ে গিয়েছিলাম, তিনি সেখানে আপনার কাগজ মানচিত্র দেখে অভিভূত হয়েছেন! গ্লোসি পেপারে, আধুনিক গ্রাফিক্স ডিজাইনে ছাপা দেখে বললেন, প্রবাস থেকে এত সুন্দর কাগজ বার হয় ধারণা ছিল না তাঁর! তিনি আমাকে বলছেন, আপনাকে প্রস্তাব দেবার জন্য আপনি কলকাতায় চলে আসুন, সুমনদার কাগজে কাজ করবেন আর সেইসঙ্গে গবেষণাও করতে পারবেন। আপনার লংটার্ম ভিসার ব্যবস্থা করবেন তিনি। আজুমা স্যারও শুনে খুশি হলেন। বিষয়টি কিন্তু সিরিয়াস, শুনলাম আপনি কোম্পানি ছেড়ে দিচ্ছেন এ বছর।
প্রস্তাবটি মন্দ নয়। বরং লোভনীয়। নোরিকোর সঙ্গে আলাপ করলে সে বলল, এ তো খুবই ভালো প্রস্তাব। কিন্তু আসলেই কি তা হবে? এটা সম্ভব হবে বলে তো আমার মন বলে না। তবু দ্যাখো হলে ভালো, না হলে নেই। দুর্ভাবনার কোনো কারণ নেই। অভিজ্ঞতা, প্রতিভা থাকলে কাজের অভাব হবে না।
কী আশ্চর্য নোরিকোর ধারণাই সঠিক হয়ে গেল! অবশ্য দেখেছি তার ধারণা প্রায়ই ফলে, এর আগেও দেখেছি। যেদিন নীলাঞ্জনদেরকে নিয়ে যাব পত্রিকা অফিস এবং মন্দিরে এর দুদিন আগে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি ঘটল! সেদিন ছিল শনিবার। অফিস ছিল দুপুর বারোটা পর্যন্ত। বাসায় এসে খেয়েদেয়ে যেই কম্পিউটার খুলে বসতে যাব এমন সময় মোবাইলে আজুমা স্যার ফোন করলেন। রীতিমাফিক কোনো সম্ভাষণ নেই, ভূমিকা নেই সপ্তমে চড়ে ওঠা কণ্ঠে বাংলাতেই বললেন, একি করেছেন আপনি! আপনি আমার মানসম্মান ধূলিস্যাৎ করে দিলেন! কেন আমাকে না জানিয়ে এমন কাজটি করলেন?
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! কী বলছেন স্যার আমাকে! আমি তো কিছুই করিনি যাতে করে স্যারের মানসম্মান ধূলিস্যাৎ হয়ে যেতে পারে! এত রেগে আছেন যে আমার ভয় করছিল তাঁর হার্ট না ফেল করে! আমি ঠান্ডা মাথায় বললাম, স্যার। ভুল বুঝবেন না। আপনার সঙ্গে জাপানে আসার পর থেকে সম্পর্ক। কোনোদিন ভুলেও বেয়াদপি করেছি বলে স্মরণ করতে পারছি না। স্যার, আমি এমন কিছুই করিনি যাতে করে আপনি ছোট হতে পারেন। তবু খুলে বলুন আমি কী করেছি?
তিনি তেমনি রাগতস্বরে বললেন, আমি কী আপনাকে বলেছি নীলাঞ্জনদেরকে ইয়াসুকুনি মন্দিরে আপনি নিয়ে যাবেন!
আমি তো এই কথা শুনে থ! আমি বললাম, স্যার, যে কাগজটি আপনি আমাকে দিয়েছেন সেখানে স্পষ্ট করেই সেটা লিখিত আছে। পত্রিকা অফিস, ইয়াসুকুনি মন্দির এবং হিরোশিমাতে তাদেরকে গাইড করতে হবে আমাকে। সেই দায়িত্বই আপনি আমাকে দিয়েছেন। আরেকবার ভালো করে পড়ে দেখুন।
তিনি প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, কখনোই নয়! আমি ইউকো তোজোসানকে অনুরোধ করব বলে মনে মনে ঠিক করে  রেখেছিলাম। আপনাকে কখনোই আমি বলিনি ইউকোসানকে বলে তাদেরকে ইয়াসুকুনি মন্দিরে নিয়ে যান। ঠিক আছে আপনি যান, আমার আর দরকার নেই! বলেই টেলিফোন কেটে দিলেন।
আমি তো পাথর হয়ে গেলাম যেন এই ঘটনায়! মেজাজ আমারও চড়ে গেল। ফ্রিজ থেকে একটা বিয়ার বের করে ডগ ডগ করে পুরোটাই মেরে দিলাম। তারপর বাইরে গিয়ে ম্যানশনের কাছেই একটি উদ্যানে বসে কয়েকটি সিগারেট ধ্বংস করলাম। সন্ধ্যায় নোরিকো ফিরে এলে তাকে সব খুলে বললাম। সেই কাগজটি খুলে দেখালাম। সে বলল, এমন তো হবার কথা নয়। তবে আজুমা স্যার এমনিতেই মাটির মতো কোমল, কিন্তু রেগে গেলে হুঁশজ্ঞান থাকে না সেটা আমি তাঁর ঘনিষ্ঠজনের কাছে শুনেছি। কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। চিন্তা করে দ্যাখো। ইউকো তোজোসানকে ফোন করে দেখতে পারো আসলে কী ঘটেছে।
আমি ইউকোসানকে ফোন করলাম। তখন তিনি বললেন, ভালোই হয়েছে তুমি ফোন করেছ। সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে! আজুমা স্যার আমাকে অনুরোধ করেছিলেন নীলাঞ্জনদেরকে তিনি ইয়াসুকুনি মন্দির দেখাতে চান, ব্যবস্থা করার জন্য। আমি বললাম, সরকারসান তো এসেছিল এই ব্যাপারে আমি মন্দির পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। ঠিক আছে আপনিও যদি যেতে চান আমি গুউজিসামাকে (প্রধান পুরোহিত) বলে দেখছি। গুউজিসামাকে অনুরোধ করতে তিনি রাজি হলেন। আমি স্যারকে জানালাম সেটা। এর মধ্যে কী হয়েছে জানো? আজুমা স্যার তো শিক্ষক মানুষ তিনি অতিথি দুজনের পরিচয় দিয়ে একটি দীর্ঘ চিঠি ফ্যাক্স করেছেন গুউজিসামাকে। সেই চিঠি পড়ে গুউজিসামা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন! আমাকে ফোন করে বললেন, কে এই অধ্যাপক কাজুও আজুমা! জাপানি হয়েও তিনি জানেন না ইয়াসুকুনি মন্দিরে কোনো মৃত মানুষের অস্থি বা দেহভস্ম সমাধিস্থ করা হয় না! এখানে সমাহিত করা হয় মৃতের আত্মাকে শিন্তোও ধর্মমতে! এটা জাপানি বলতে সবাই জানে। না, আপনি বলে দিন অধ্যাপক আজুমা এখানে আসতে পারবেন না। কী কান্ড হয়ে গেল দেখি সরকারসান। আমি গুউজিসানের কথা কিভাবে স্যারকে বলি! স্যার যে ভুল করেছেন, সেটা ভুলই। তিনি শিন্তোও ধর্ম সম্পর্কে জানবেন না এটা কিভাবে মনে করি, এত বড় পন্ডিত মানুষ! বয়স হয়েছে হয়ত ভুলে লিখে ফেলেছেন। কিন্তু গুউজিসামা তো আজুমা স্যারকে চেনেন না, তার উপর তিনি  বড় কড়া মেজাজের মানুষ। আমি তখন আজুমা স্যারকে ঐ ভুলের কথা না বলে, শুধু বললাম, স্যার গুউজিসামা সরকারসানসহ তিনজনকেই আসার অনুমতি দিয়েছেন, এর বেশি লোক তিনি আশা করছেন না।.........বুঝতে পেরেছ ঘটনাটা এবার, উনার রাগান্বিত হওয়ার কি কারণটা? এখন তিনি মনে করছেন তুমি কিছু একটা ষড়যন্ত্র করে তাঁর ইয়াসুকুনি মন্দিরে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছ। তাতে তাঁর আত্মসম্মানে লেগেছে। কারণ তিনি চেয়েছিলেন ইয়াসুকুনি মন্দিরে তিনি নীলাঞ্জনদেরকে নিয়ে যাবেন এটা হবে তাঁর বড় একটি কৃতিত্ব। কেননা ইয়াসুকুনি মন্দিরের গুউজিসামার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সর্বোচ্চ বেদিতে উঠে প্রার্থনা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। এই জন্য তোমার ওপর রেগে আছেন। আসলে ঘটনার জন্য তিনিই দায়ী, তাই না? তুমি স্যারের এই আচরণের জন্য খুব ব্যথা পেয়েছ বুঝতে পারছি। মানবসম্পর্ক যে কখন কী হয়ে যায় সত্যি বলা মুশকিল!
এই ঘটনায় আমার মন খুব ভেঙ্গে গেল। আরও গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেলাম যখন নীলাঞ্জন ও সুমনদাকে নিয়ে আমি মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের কক্ষে সাক্ষাৎ করতে গেলাম ওয়াদাসানের তত্ত্বাবধানে। বয়সে প্রবীণ প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে প্রায় পনেরো মিনিট কথা বললাম। নেতাজি সম্পর্কে, বিচারপতি পাল সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করলেন তিনি। আমরা বাঙালি জেনে খুব খুশি হলেন। তারপর মন্দিরের সর্বোচ্চ বেদিতে উঠে প্রার্থনা করলাম। সেখানে আমি দুজনকে ইয়াসুকুনি মন্দির সম্পর্কে ব্যাখ্যা করলাম। নেমে এসে আবার প্রধান পুরোহিত আমাদেরকে ডাকলেন চা পান করার জন্য। আমরা তাঁর সঙ্গে চা পান করলাম এবং ছবি তুললাম।
যখন প্রধান পুরোহিতের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম দেখতে পেলাম আজুমা স্যার এবং কেইকো মাদাম বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার মাথাটা ঘুরে উঠল! অসুস্থ স্যারকে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন কেইকো মাদাম শীতের মধ্যে! আজুমা স্যারের চোখ জ্বলছে। ওয়াদাসান কি ভেবে বললেন, আপনারাও আসুন, প্রার্থনা করবেন, গুউজিসামার সঙ্গে দেখা হবে। কিন্তু তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন। আমার দুচোখ ভিজে এলো এই দৃশ্য দেখে। নীলাঞ্জন এবং সুমনদাও বিমর্ষ হয়ে গেল। আমি স্যারের কাছে মাথা নত করে ক্ষমা চাইলাম। বললাম, স্যার, আমি কিছুদিনের জন্য জাপানের বাইরে চলে যাচ্ছি। আপনার সঙ্গে কাজ করার আর সৌভাগ্য হল না। আপনি আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন, তার ঋণ শোধ করতে পারব না। তবে আপনার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে।
তিনি কিছু বললেন না।
সুমনদা বললেন, আমার ঠান্ডাটা সহ্য হচ্ছে না। আমি স্যারের সঙ্গে গাড়িতে চলে যাই। নীলাঞ্জন তুই দেখে আয় পত্রিকা অফিস। তোর কাছ থেকে পরে শুনে নেব।
আমি নীলাঞ্জনকে সঙ্গে নিয়ে দৈনিক সানকেইশিম্বুন পত্রিকা অফিস এবং ছাপাখানা দেখালাম। সে অভিভূত হয়ে গেল দেখে! বলল, যতই বলুন ভারতে এত সুন্দর সিস্টেম এবং ওয়ার্কফ্লো গড়ে তোলা যাবে না। এসব জাপানিদেরই মানায়। সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল, এর মধ্যে বৃষ্টি পড়া শুরু হল। ভিজে ভিজে একটি কফিশপে প্রবেশ করে গরম কফি খেলাম দুজনে। নানা কথা বললাম, কি ভেবে নীলাঞ্জন বলল, প্রবীরদা, যা হবার তো হয়েছে, এই নিয়ে আর মনে কষ্ট রাখবেন না। স্যারের বয়স হয়েছে, তার ওপর অসুস্থ। কর্মপাগল মানুষ অসুস্থ হলে পরে এমনিতেই মাথা বিগড়ে যায়। আর এত বড় একটি ব্যয়বহুল প্রজেক্ট তাঁর হাতে খুব দুশ্চিন্তা করছেন। স্যারের সঙ্গে রাগারাগি করে আপনি ভারত-জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র থেকে সরে যাবেন না, প্লীজ। খুব কষ্ট পাব। আপনাকে আমাদের খুব দরকার। এই জাপানে কোন্ বাঙালি আর জাপানি আছেন আপনি এবং আজুমা স্যার ছাড়া? কে এতখানি করবে আমাদের জন্য আমি ভালো করেই জানি। কেন্দ্রে আমার ফুলটাইমার হিসেবে কাজ করার কথা, কিন্তু তা হবে বলে মনে হয় না। অনেক কিছুই হচ্ছে আড়ালে-আবডালে। তবু আমি কোনো না কোনোভাবে এর সঙ্গে জড়িত থাকবই কারণ এর ব্রেইনচাইল্ড হচ্ছি আমি।
আমি নীলাঞ্জনকে কিছু বললাম না, শুধু বললাম, হিরোশিমা যাবার দিন সময়মতো চলে এসো টোকিও স্টেশনে তা নাহলে ট্রেন পাব না। বুলেট ট্রেন ঘড়ির কাঁটা মেনে চলাচল করে।
আমি অত্যন্ত বিষণœ মনে নীলাঞ্জনকে বিদায় দিয়ে ঘরে ফিরলাম। কি হতে গিয়ে যে কী হয়ে গেল বোঝার শক্তিটাই হারিয়ে ফেললাম।
ভালোভাবেই হিরোশিমা তাদেরকে ঘুরিয়ে আনলাম। হোটেলের বুকিং দিয়ে রেখেছিল নোরিকো। জাদুঘরটা দেখলাম দুপুর বেলা। সুমনদা সব দেখলেন না, বললেন, তোমরা দ্যাখো। এত ভীবৎস্য দৃশ্য আমার সহ্য হচ্ছে না, বলে নিচে নেমে বসে রইলেন। আমরা তো এর আগে দেখেছি। কাজেই সুমনদাকে নিয়ে বেরিয়ে স্টেশন সংলগ্ন হোটেলের আশেপাশে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে গেলাম। তারা কেনাকাটা করল অনেকক্ষণ। তারপর হোটেলে ফিরে ডিনার খেয়ে সুমনদা ঘুমিয়ে পড়লেন, খুব ক্লান্ত ছিলেন বলে। তাছাড়া খুব শীতে কাবু হয়ে গেছেন। আমি আর নীলাঞ্জন দুটো বিয়ার খেলাম রেস্টুরেন্টে, কথাবার্তা বলে গভীর রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন বেশ বেলা করে উঠলাম। চেকআউট করে বিকেল পর্যন্ত এখাসে সেখানে বেড়িয়ে সময় কাটালাম। 

ফেরার সময় ট্রেনের মধ্যে সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখলেন নানা রকম কথা বলে সুমনদা। খুব হাসিখুশি মানুষ। এক সময় বললেন, আমিও বাঙাল, ঘটি নই। আমাদের মূল বাড়ি ছিল ফরিদপুরে।
টোকিওতে নেমে আবার ট্রেন ধরে রাত দশটার দিকে নারিতা এয়ারপোর্টে চলে গেলাম। কারণ সুমদার ফ্লাইট পরের দিন খুব সকালে। তাই এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এক হোটেলে রাত কাটাতে চান। হোটেলে সহজেই রুম পাওয়া গেল। আমরা দুজনে একটি রুমে আর সুমনদা একটি রুমে। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা চলল, বিয়ার পান করলাম। সুমনদা তাঁর সাংবাদিক জীবনের অনেক ঘটনা আমাদেরকে বললেন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন নরওয়েতে সেটি আনন্দবাজার পত্রিকাতে বিস্তারিত ছাপা হয়েছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মেয়ে অনিতা বসুর সাক্ষাৎকারও সুমনদা নিয়েছিলেন। মহাচীন ভ্রমণ সম্পর্কেও দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন।  
পরের দিন খুব সকালে সুমনদা চলে গেলেন। উল্লেখ্য যে, হিরোশিমা যাওয়া-আসা এবং দুটো হোটেলে থাকার সব খরচ বহন করেছেন সুমনদা।
ফেরার পথে নীলাঞ্জনকে আজুমা স্যারের বাসার দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় ফিরে এলাম। এর পর দুদিন ছিল নীলাঞ্জন আজুমা স্যারের বাসায়। ফোনে কথা হয়েছে, বলেছে, স্যার নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। আপনি আর স্যারের উপর রাগ করবেন না। কলকাতায় এলে দেখা হবে।
আজুমা স্যারের সঙ্গে এই ঘটনা, জাপানের অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা আমাকে ক্রমশ গ্রাস করতে লাগল। বার বার মনে হতে লাগল বাংলাদেশ নামক দেশটির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ভারত উঠছে দ্রুতগতিতে। জাপানি কোম্পানিগুলো ছুটছে এখন চীন থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য-কলকারখানা গুটিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার দিকে। নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, বার্মা এবং বাংলাদেশে জাপানিসহ বিদেশি কোম্পানির কোনো আগ্রহ নেই বিনিয়োগ বা যৌথবাণিজ্যের ক্ষেত্রে। বন্ধুবর রফিকুল আলম এবং আমি দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছি জাপানি কোম্পানিকে বাংলাদেশে আগ্রহী করে তোলার জন্য। কিন্তু টাকার টাকা গেছে, মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে কোনো লাভ হয়নি। বাংলাদেশ সরকারেরই যেখানে আগ্রহ নেই আমরা কি করব? জাপানে বাংলাদেশি হিসেবে কোনো ভবিষ্যৎ যেমন নেই তেমনি স্বদেশেও নেই। এখানে প্রবাসী যারা বিভিন্ন ব্যবসা করছে তাদের অবস্থাও ভালো বলা যাবে না। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সৃষ্টি হয়েছে বিস্তর এক দূরত্ব যা অতিক্রম করা কষ্টসাধ্য। ফলে আইনকানুনহীন মগের মুল্লুক বাংলাদেশে নিরাপদে কিছু করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে মনে হতে লাগল।
(চলবে)