ইরাকে ভাগ্যাহত এক বাংলাদেশীর কথা
শোভন শামস্
সোলেমানিয়া থেকে ইরবিল হয়ে বাগদাদে প্রথম ছুটিতে আসলাম প্রায় তিনমাস পর। এবার নতুন একটা হোটেলে উঠলাম। আগের হোটেলের কাছেই ফন্দুফ আল জোহরা বা জোহরা হোটেল। বেশ সুন্দর হোটেল তবে বহু বছর নিয়মিত গেষ্ট না থাকাতে যা হয় তাই। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কেমন যেন নিষ্প্রান ভাব। এবার কিছু কিছু গেষ্ট আসাতে হোটেলটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দুই চারজন করে কর্মচারী কাজে যোগ দিচ্ছে। লিফটে করে রিসিপশন থেকে আমাদের ফ্লোরে এলাম। বেশ বড় রুম এসি ও অন্যান্য সব কিছু আধুনিক তবে ছোয়ার অভাবে এখানেও ম্লান ভাব। হোটেলে এসে একটু গুছিয়ে বের হব তখনই রিং বেজে উঠলো। রিসিপশন থেকে জানালো নীচে একজন বাংলাদেশী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা নীচে নেমে বাগদাদে বাংলাদেশী দেখে অবাক হলাম । পরিচয় হলো, তার নাম আরমান সাথে সাথেই আরমান ভাই হয়ে গেলেন। প্রায় ১০ বছর তিনি ইরাকে আছেন। প্রথমে কোন একটা কোম্পানীতে চাকুরী নিয়ে এসেছিলেন তখন ইরাকের রমরমা অবস্থা। তার পরই নেমে এলো দুর্ভাগ্যের মেঘ। ইরাক - ইরাণ যুদ্ধ শুরু হলো। কোম্পানী গুলো তাদের ব্যবসা আস্তে আস্তে গুটিয়ে নেয়া শুরু করল। বিদেশী শ্রমিক ছাটাই শুরু হলো। এক সময় প্রায় সব বিদেশীকে দেশে পাঠানো হলো। আরমান ভাই ততদিনে নিজেই আরবী ভাষা শিখে বাগদাদে মোটামুটি স্বাবলম্ভি হয়ে গেছেন। ছোট খাট ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করেছেন এবং দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন সবাই খুশী তার ও ব্যবস্যা দিন দিন বেড়ে গিয়েছিল। দেশের অর্থনীতির যে এই করুন অবস্থা হবে তা কোন ইরাকী স্বপ্নেও হয়ত ভাবেনি। কারণ তাদের জন্মের পর থেকে অভাব কি জানতই না। আরমান ভাই টাকা জমাতে জমাতে প্রায় চল্লিশ হাজার দিনার জমিয়ে ফেলল ব্যাংকে। তিনিও ভাবেনি এত দামী দিনার পানির দামে বিক্রয় হবে। তখন এক দিনার তিন দশমিক তিন আমেরিকান ডলার। ১৯৯৬ - ৯৭ তে ১ ডলারে ২০০০ দিনার পাওয়া যেত। আরমান ভাই এর জমানো টাকার কোন দামই রইল না। রক্ত দিয়ে উপার্জিত সেই অর্থের টানে তিনি আর দেশে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছিলেন না। কি নিয়ে যাবেন কি বলবেন সবাইকে। ইরাকে বিদেশীদেরকেও থাকতে দিচ্ছে না। তবে ভাল ইরাকীও অনেক আছে। তাদের অনুরোধ করে মাটি কামড়ে দুঃখ ব্যাথা সয়ে তিনি এবং তার মতো আরো অনেকে ইরাকের বিভিন্ন জায়গায় ঠিকানা বিহীন অবস্থায় কোন রকম জীবন যাপন করছেন। বাংলাদেশীরা বাগদাদে আসাতে তিনি যেন প্রান ফিরে পাচ্ছিলেন। আমাদের জন্য কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আমরা তার অবস্থা ভেবে তাকে বললাম আমাদের গাইড হিসেবে থাকতে। তারপরও এটা ওটা তিনি কিনে দিতে চান। আমরা আপত্তি করি মাঝে মাঝে মন খারাপ করেন। বাগদাদ আসলেই আরমান ভাই এসে দেখা করতেন। আগেই হোটেলের বন্দোবস্ত করে রাখতেন। হোটেল আগে ঠিক করে রাখাতে হতো কারণ ইরাক সরকার বিদেশীদের জন্য কয়েকটা দামী ফাইভ ষ্টার হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। এই হোটেল গুলোতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল বেশ ভাল এবং এখানে বসবাস কারীরা যেখানেই যেত নিরাপত্তার লোকজন তাদের আশেপাশেই থাকত। এছাড়া অন্যান্য হোটেলে থাকা আউট অব বাউন্ড। ধরা পড়লে হোটেল কর্তৃপক্ষ ও বিদেশী গেষ্ট সবারই সমস্যা হবে। ৫ তারা হোটেল গুলোর ভাড়া ২০০-২৫০ আমেরিকান ডলার অথচ বাগদাদে ২০-২৫ ডলারে ভাল হোটেল ছিল তখন। বাংলাদেশের মানুষ এবং মুসলমান হিসেবে আমরা হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে বিশেষ সুবিধাও পেতাম। বুঝতাম যে পুলিশ এ ব্যাপারে জানে তবে আমাদের জন্য এসব নিয়মকানুন আনঅফিসিয়ালি কিছু শিথিল করে দিয়েছিল ইরাকী কর্তৃপক্ষ।
আরমান ভাই আমাদের নিয়ে নিত্য নতুন জায়গায় যেতেন। আরবী চমৎকার বলতে পারতেন কাজেই কোন সমস্যা ছিল না। আমরা দেশে আসার সময় আরমান ভাই চিঠি ও মাঝে মাঝে কিছু টাকা পাঠাতেন পরিবারের কাছে আমরা যথাসাধ্য তাকে সাহায্য করতাম। এগুলো নিয়ে যেতে ও দেশের খবর এনে দেয়ার ব্যাপারে। একবার তিনি আমাদের বেশ ভাল করেই ধরলেন তার বাসায় যেতেই হবে। আমরা যতই না বলি তিনি ততই অভিমান করেন শেষমেষ রাজি হলাম। বিকালের দিকে ট্যাক্সি করে তার ডেরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। শহর ছাড়িয়ে বেশ দুরে একটা ফ্যাক্টরীতে তিনি কোন রকম দিন গুজরান করেন যথাসময়ে ফ্যাক্টরীর সামনে চলে এলাম।
বর্তমানে তা বন্ধ তবে বোঝা যায় এক সময় বিশাল কর্মকান্ড চলত এখানে। বিশাল এলাকা জুড়ে মিল ও গোডাউন আমরা হেটে হেটে একটা গ্যারেজ এর কাছে গেলাম এটার দোতলায় কষ্ট করে ৪/৫ জন বাংলাদেশী এক সাথে থাকে। কোন কিছু উপার্জন করে সবাই মিলে বেশ কষ্টে দিন পার করেন। কথায় বলে বাংগালীর আন্তরিকতার অভাব নেই। আমরা অবাক হয়ে গেলাম আমাদের জন্য বাগদাদে ইলিস মাছ,বেগুন রান্না কোক, মাংস পোলাউ ইত্যাদির বিশাল আয়োজন দেখে খুবই আন্তরিকতার সাথে গল্প করে খেয়ে সময় কাটালাম। রাত্রি নেমে এসেছিল সবাই মিলে কিছুক্ষণ হাঁটলামও গল্প হলো। শেষে ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। ট্যাক্সি ওই এলাকাতে কম বলে হেঁটে মূল রাস্তায় এসেছিলাম। এখনো ইরাকের অবস্থা ফিরেনি। তাই আরমান ভাইয়ের মত অনেকে হয়ত সেখানে সুদিনের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। একদিন হয়ত তাদের স্বপ্ন সফল হবে। তাদের সেই সঞ্চিত অর্থ তার পূর্ব মূল্যে পাবে এবং দেশে ফিরে তারা পারিবার পরিজন নিয়ে সুখে দিন কাটাবেন। মানুষের দুঃখের আরেক দিক দেখা হলো এই বাগদাদের প্রবাস জীবনে।