২য় বর্ষ সংখ্যা ৪৯, জুলাই ০৬, ২০১১ । বুধবার 

কলকাতা আমার চন্দ্রকলা  

 

প্রবীর বিকাশ সরকার
(পূর্ব প্রকাশের পর)

রাতে ফিরলাম। মানসদা গাড়ি করে উল্টাডাঙার ব্রীজের গোড়ায় নামিয়ে দিলেন। আমরা দৌড়ে গিয়ে একটি বাসে চড়লাম। রাত তখন নয়টা। গাড়ি কম কিন্তু প্রচন্ড ভিড়। বাসের মধ্যে ভ্যাপসা গরম। গান বাজছে। বাইরে গাড়ির হর্ণের অসহ্য চিৎকার একেবারে ঢাকার মতো। শহরের কোথাও মিসমিসে অন্ধকার কোথাও ভুতুড়ে আলো।
বাসের একেবারে পেছনের লম্বা সিটের কোণ থেকে একজন লোক উঠে গেলে আমি বসে পড়লাম। বিপুল দাঁড়িয়ে রইল। টুকটাক কথা বলছিলাম পূর্ববঙ্গের ভাষায়। আমার পোশাক-আশাক দেখে পাশের একজন বৃদ্ধ লোক মৃদু স্বরে বললেন, বাবু কি ঢাকার লোক?
আমি বললাম, না দাদা, তবে বাংলাদেশের লোক। বাইরে থাকি। কলকাতায় একটা কাজে এসেছি। এই বন্ধুর বাসায় উঠেছি বারাসাতে।
ও বারাসাতে! ওখানে তো সবাই বাংলাদেশ থেকে এসে বসত গেড়েছে। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, সবই অদৃষ্ট। কেউ কি সাধ করে পৈত্রিক ভিটেমাটি ফেলে অন্যদেশে আসতে চায়! সবই কপাল।
আমি বললাম, হ্যাঁ, ওখানে অনেক বাংলাদেশি আছেন এখন। আরও আসছে, আসতে থাকবে।
হ। এটাই ভারতের স্বাধীনতার ফল, বাংলাদেশ হওয়ারও ফল।.....আমরাও ওপারেরই লোক। মুক্তিযুদ্ধের সময় পালিয়ে এসে বশির হাটে শরণার্থী ছিলাম। দেশ স্বাধীন হলে পরে ফিরে গেলাম। বাড়িটা ফিরে পেলেও ধানী জায়গাজমি আর পেলাম না। কত দেনদরবার করলাম। মামলা মোকদ্দমা করে সঞ্চয়ও শেষ করলাম। তারপর বাড়ি বিক্রি করে এখানেই চলে এলাম। এই স্বাধীনতার কোনো দরকার ছিল না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংখ্যালঘুদের অভিভাবক কেউ রইল না। কে শোনে কার কথা! বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে মুসলমানের জন্য, হিন্দু-বৌদ্ধদের জন্য নয়!.....একেই বলে অদৃষ্ট।

বঙ্গবন্ধু ঠিকই চিন্তা করেছিলেন। যুদ্ধ করে স্বাধীন হতে চাননি, আস্তে আস্তে তিনি বাংলাদেশকে আলোচনার মাধ্যমে একদিন স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন। যুদ্ধ, রক্তপাত এড়াতে পাকিস্তানিদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ভারতভাগের সময়কার রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা দেখে যে, যুদ্ধ করলে আমাদেরই বেশি ক্ষতি হবে। দেশ, সমজের বিরাট পরিবর্তন হবে, মানুষের মনমানসিকতাও বদলে যাবে। কিন্তু ভুট্টোর প্ররোচনায় পাকিস্তানি সেনাকর্তারা সমঝোতা চায়নি। বাংলাদেশ একসময় হাতছাড়া হয়ে যাবে এই আশঙ্কায় তারা বাঙালিকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ তাই অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। অথচ সমঝোতার মাধ্যমে হলে পরে আমাদের রক্তও দিতে হত না, বাপদাদার জমিজমা পৈত্রিক সম্পদও হারাতে হত না। হায়রে অভাগার কপাল! বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া বাঙালি জাতিকে সমালাতে পারলেন না। একা তাঁর পক্ষে সামলানোও সম্ভবপর ছিল না। তাঁকেও জীবন দিতে হল একদিন। কী লাভ হল এই স্বাধীনতা পেয়ে?

কথাগুলো বলেই বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। সেটা এসে আমাকেও ছুঁয়ে গেল। বড় মূল্যবান কথা বলেছেন। শিক্ষিত লোক বলেই মনে হল, যদিওবা বেশবাস ছন্নছাড়া, দিকভ্রান্ত একজন মানুষের।

আমি অন্ধকারে বৃদ্ধের চেহারাটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম। স্পষ্ট দেখতে পারলাম না। পরনে মোটা ধুতি আর ফতুয়া। ফতুয়াটা ডান কাঁধের ওপর ছেঁড়া। চোয়ালের হাড় বেরিয়ে গেছে তাঁর। মাথায় শুভ্র চুল। শরীর থেকে তীব্র নোনা ঘামের গন্ধ। ডান হাতে একটি বড় চটের ফোলা ফোলা ব্যাগ। ভিতরে কি আছে জানি না।
কৌতূহলবশত মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কি করছেন? চাকরি?
নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন। মৃদু স্বরে বললেন, ওপারের লোকদের কে চাকরি দেবে এখানে? আমরা ভোটব্যাংকের বাইরে। ভোট ব্যাংকের লোক হলে কলেকারখানায় কাজ করতে পারতাম। আমরা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। গ্রামের দিকে বড়বাবুদের জমিতে কাজ করি। আর বাঁশ-বেত দিয়ে এটা সেটা তৈরি করে কলকাতায় এনে বিক্রি করি। এভাবেই পেট চলে যাচ্ছে বাবু। .......কি আর করব? সবই অদৃষ্ট। বলে তিনি উঠে সামনের দিকে লোকজন ঠেলে চলে গেলেন। বিপুল সেখানে বসল। কানে কানে বলল, প্রবীরদা, বাসে, ট্রেনে ওপারের ভাষায় কথা না বলাই ভালো।

হুম! মনটা হঠাৎ করে দারুণ ঝুলে গেল আমার। এরকম একজন দুজন নয় অনেক লোকের সঙ্গে এখানে সেখানে পরে আলাপ হয়েছে আমার। কেউ দ্বিতীয় শ্রেণীর কেউবা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের জীবন যাপন করছেন এই দেশে পিতৃভূমি-মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে এসে। তবুও ভালো যে, পার্টির সদস্য হওয়ার কারণে অন্ততপক্ষে নিরাপত্তাটুকু আছে। বৌ, মেয়েকে নিয়ে রাতের বেলা দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় না। একজন তো বলেই বসলেন, যারা হিন্দু মেয়েগো লুটের মাল মনে করে তারাই বেশি ধর্ম পালন করে। সেই ধর্ম পালন কইরা দেশের জাতীয় কোনো উন্নতি করবার পারে না! তাইলে ধর্ম রইল কই! বিদেশি সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না, আবার কয় স্বাধীনতার কথা! লজ্জা নাইক্যা! গা-গতর দিয়াও পারে না, ধর্ম দিয়াও পারে না দ্যাশটারে আগাইয়া নিতে। তয় ওগো দিয়া কি হইবো, কন দেহি ভাই? ওগো একটাই শক্তি আছে হিন্দুগো জোর কইর্যাা খেদাইতে পারে, মরদরা আর কিছু পারে না!

আবার মনে হল, এপারের বাঙালিরাই বা কী এমন করতে পেরেছে? হিন্দুদের হয়ত এখানে নিরাপত্তা আছে ঐ টুকুই তো। বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির বারোটা কি এরাও বাজায়নি? এখনো বাজিয়ে যাচ্ছে না? লাল বিপ্লবী পোশাকের আড়ালে শোষকের চেহারাই তো দেখা যাচ্ছে। এদের আবার অধিকাংশই হচ্ছে পূর্ববাংলা থেকে আগত না হয় বংশোদ্ভূত। বাঙালির পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ আত্মবিস্মৃত, নিস্তেজ মনোবৃত্তি। বাঙালি নিজেই মরেছে। কেউ তাকে মারেনি। অথবা যারা মেরেছে কোনো না কোনোভাবে তাদেরই মুখাপেক্ষী এখানকার নেতারা। তো আর স্বাধীনতা পেয়ে লাভ হলটা কী! হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান বলে নয়। বাঙালির জাতিসত্তা পাল্টে গেছে, জেনমটাই বদলে গেছে! ডিএনএ বিগড়ে গেছে। তাই অর্থহীন, অহেতুক অপকান্ডেই তার আনন্দ, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতারণাই আজকে তার বাঁচার কৌশল হয়ে পড়েছে। এর জন্য দুদেশের রাজনীতিকরা দায়ী। যেহেতু বাঙালির প্রধান হর্তাকর্তাই হচ্ছে রাজনীতিকরা। তথাপি ক’জন আর সত্যিকার রাজনীতিক সবাই তো দেখছি ভুয়া। জাতিকে মুক্তি দেবার মতন মেধা তো কারো মাথায় আছে বলে প্রমাণ পেলাম না সেই পঁচাত্তর সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত! 

বাস থেকে নেমে বাসার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিপুল বলল, চতুর্দিকে ‘পার্টি’র লোকজন, চ্যালাচামুন্ডারা আছে। কান খাড়া করে রাখে। কলকাতার চেহারা পুঁজিবাদের রূপ নিচ্ছে ঠিকই কিন্তু এখনো পূর্ববাংলার লোকজনদের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। কোন্ কথা থেকে কোন্ কথা চলে আসবে সেটাকে কেন্দ্র করে ওরা বিশ্রী পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলা যায় না। এমন অহরহ হচ্ছে।

বেরার কাছ থেকে ফোন এলো। বলল, প্রবীরদা, আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব আপনার বইয়ের ব্যাপারে। কষ্ট করে কলেজ স্ট্রীটের কফি হাউসের কাছে আসতে হবে।
তথাস্তু বলে এক বিকেলে বিপুলকে নিয়ে পান্ডুলিপিসহ বেরার সঙ্গে দেখা করলাম। বললাম, চলো ঐতিহাসিক কফিহাউসে এক কাপ কফি পান করি।
বেরা বলল, না দাদা। আরেক দিন খাওয়া যাবে। আমি অনেক দূর থেকে এসেছি স্টুডিওর কাজ ফেলে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। বুঝতেই পারছেন খেটেখাওয়া মানুষ। আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমি চলে যাব। আপনারা বাকি কথা বলে নেবেন। ছেলেটি ভালো এবং আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রকাশনা লাইনে আছে বহুদিন। আশা করি ভালো কাজ করে দেবে। আমি আপনার সম্পর্কে সব বলেছি।
কফি হাউসটা দেখলাম। পুরনো নোংরা দুতলা একটি দালান। প্রবেশ মুখটা অপরিষ্কার এবং অন্ধকারপ্রায়। এটাই কলকাতার সাংস্কৃতিক অহঙ্কার। যাক আরেক দিন আসা যাবে। এখান থেকে জোর কদমে ভিড় ঠেলে ঠেলে আমরা এসে পৌঁছুলাম মিউনিসিপালিটি বাজারে। এও শতাধিক বছরের পুরনো দ্বিতল এক বিশাল দালান। দুতলা জুড়ে অসংখ্য দোকান, বারান্দাতেও মালামাল আর হকারদের পসরা সাজিয়ে বসা। হাঁটার উপায় নেই। কত বিচিত্র পণ্যসামগ্রীর সমাবেশ। নোংরা, দুর্গন্ধময়, অন্ধকার বিশেষ করে কাঁচাবাজারটি। কিন্তু অনেক সস্তা মালামাল এটা স্বীকার করতে হবে। আর দেশীয় পণ্যই প্রায় সব। কাজ শেষ করে বিপুল বাজারও করল এখানে।

দুতলার একটি ছোট্ট কক্ষে বইপত্রে ঠাসা আনন্দের দোকান বা দপ্তর। বেশির ভাগ বইই তার আনন্দ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আর বইগুলো হল বাংলা ক্লাসিক সাহিত্য। বঙ্কিম, রবীন্দ্র, শরৎ, তারাশঙ্কর, বিভূতি, নজরুল, মুজতবা, ফাল্গুনী, বনফুল প্রমুখের জনপ্রিয় গ্রন্থগুলোর রিপ্রিন্ট। প্রচ্ছদ নতুন করে সস্তা শিল্পীদের দিয়ে আঁকিয়ে, সস্তা কাগজে ট্রেসিং পেপার থেকে প্লেইট করে ছাপিয়ে ব্যবসা করছে দেদারসে। কপিরাইটের কোনো বালাই নেই কারণ পঞ্চাশ বছর পেরোলে এসবের ঝামেলা নেই। তাছাড়া বাঙালি কপিরাইটের ধার ধারেও না। ক্লাসিক শিশুতোষ বইও রিপ্রিন্ট করছে নির্দ্বিধায়। রুচিবোধ বলতে কোনো পদার্থ নেই তার কাজেকর্মে। বাইরে বারান্দায় দেখলাম একটি ছেলে বই সাজিয়ে বড় বড় প্যাকেট করছে। বই চালানের কাজ চলছে বুঝতে দেরি হল না। কিন্তু কোথায় যাবে জানি না।

কোনো রকমে বসা যায় তিন জন লোক সামান্য জায়গায়। একটি চেয়ারে আমি বসলাম। নেইমকার্ড বিনিময় হল। হালকা গোঁফ, গোলাগাল ফর্সা মুখ, ছোট চোখ কিন্তু অসম্ভব তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, বেঁটে করে মেদযুক্ত শরীরের ছেলেটিকে দেখে আমার মনে সন্তোষজনক কোনো অনুভূতি হল না। কী যে বই করে দেবে আমার এই ছেলেটি কে জানে!
যাহোক, তার সঙ্গে কথা হল, ভালো কাগজে ১০০০ বই করে দেবে। কভার ডিজাইন, পেইজ মেকআপ ও ট্রেসিং আমি করে দেব। বই কলকাতা বইমেলা শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ আগে ডেলিভারি দেবে। বইটি যৌথভাবে মানচিত্র পাবলিশার্স, জাপান ও আনন্দ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হবে। কপিরাইট আমার স্ত্রীর নামে। বই সে সাপ্লাই দেবে বিভিন্ন দোকান ও জায়গায়। টোটাল টাকার অর্থেক আগে দিতে হবে।
আমি তার সব শর্তেই রাজি হলাম। কিন্তু মনের মধ্যে একটা কাঁটা খচখচ করতে লাগল। আমি শেষে দুটি কথা বললাম, আনন্দবাবু, আমি খুব সহজসরল মানুষ। বেরা আমার ছোটভাইয়ের মতো। প্রকাশনা ব্যবসায় আপনার বিশ্বস্ততা ও সুনামের কথা অনেকবার শুনেছি। এই বিশ্বাসেই আপনার কাছে আসা। আশা করি বইটি ভালো ছাপা হবে। কোয়ালিটির কোনো দরকার নেই। কারণ বাঙালি কোয়ালিটি বোঝে না। দামে সস্তা উজ্জ্বল রং একটু চোখে লাগলেই যা ইচ্ছে তাই কিনে ফেলে। আমি সতেরো বছর বয়স থেকে মুদ্রণ ও প্রকাশনার জগতে আছি। জাপানে ১৯৮৬ সাল থেকে এখনো জড়িত। ফাইন এবং কোয়ালিটি প্রিন্টিং এর জন্য জাপান এখন বিশ্বসেরা। সেদেশে কাজ শিখে কাজ করে জীবন চালাচ্ছি। যে প্রিন্টিং ভারতবর্ষ দেখেনি সেই কাজ জাপানে করছি। কাজেই জাপানের চেয়ে ভালো আমি আশা করি না, শুধু চাই বইটি যাতে ভদ্রপাঠক-পাঠিকা হাতে নিতে পারেন। ব্যাস, টাকা পয়সার কথা চিন্তা করবেন না। যদি আশানুরূপ কাজ করে দেন তাহলে আরও কাজ আছে। সবিনয় অনুরোধ রইল।
আনন্দ ছোট্ট চোখ দুটো বিস্ফারিত করে আমার দিকে চেয়ে থাকল। আমি ব্যাগ থেকে কয়েকটি জাপানি বই, ম্যাগাজিন, পত্রিকা, পোস্টার, ক্যালেন্ডার, গাড়ি ও ক্যামেরার ক্যাটালগ বের করে দেখালাম। বললাম, এগুলোর কালার সেপারেশন, প্লেইট ম্যাকিং, কোয়ালিটি মেন্টেইন আমার হাতে করা।
সে নাড়াচাড়া করে বলল, দাদা, এসব কাজ এদেশে আমরা কখনো দেখিনি, করতেও পারব না।
আমি বললাম, বাঙালির বাচ্চা পারে না এমন কোনো কাজ নেই পৃথিবীতে। চেষ্টা করতে হবে। জাপানিরা পারলে আমরাও পারব।
এর বেশি আর লেকচার দিলাম না। কারণ বাঙালির ধৈর্যগুণ এবং গ্রহণক্ষমতা খুব কম। বস্তাপচা শিক্ষাব্যবস্থার কারণে এটা হয়েছে। যারা উৎরে গেছে বা মানুষ হয়েছে নিজেদের একনিষ্ঠ অধ্যাবসায় এবং অভিনিবেশের জন্য আর অন্য কোনো কারণে নয়।

বেরাকে যেতে দিলাম না। তার সামনেই সব কথাবার্তা এবং সিদ্ধান্ত হল। বেরা বলল, প্রবীরদা, চিন্তা করবেন না ও ভালো কাজই করে দেবে।
বিপুল কিছু বলল না সম্ভবত জাপানের অভিজ্ঞতার আলোকে এবং আমার কাজ সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকার কারণে চুপই করে থাকল। তবে আনন্দকে সেও অনুরোধ জানিয়ে আমাদের সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে নামল। বেরাকে বিদায় দিলাম। সে চলে গেলে পরে কাঁচাবাজারে প্রবেশ করলাম। বাজার মানে কুমিল্লার রাজগঞ্জ কাঁচাবাজারের স্মৃতি মনে পড়ে গেল। সারাবছরই হাঁটু পর্যন্ত ময়লা লাগিয়ে বাজার করতে হয়। কুমিল্লার চেয়ে কিছুটা মন্দের ভালো বলতে হয় এই বাজারটাকে।

পরের দিন সকালেই বিপুল বলল, প্রবীরদা, চলুন একটা ছেলে আছে এখানে। সিল্কপ্রিন্টের কাজ করে। আমার স্কুলের খাম, লেটারপ্যাড, মেমোশীট, নেইমকার্ড ওই করে দিয়েছে। তাকে দিয়ে পেইজম্যাকিং এবং ট্রেসিংটা করিয়ে ফেলি। আগে আগে মেটার না দিলে সময়মতো বই হাতে আসবে না। এখানে সময়মতো কোনো কাজ হয় না।  দেখবেন কী অবস্থা এই দেশের! এর আগে তো কিছুটা দেখে গেছেনই।
তড়িঘড়ি পান্ডুলিপি নিয়ে বিপুলের সঙ্গে বেরোলাম। স্টেশনের ওপারে অনেকটা হাঁটতে হয় এরকম একটি জায়গায় একটি বাড়ির একটি কক্ষে ছেলেটি মানে পিন্টুর কারখানা। পার্টিশন দিয়ে দুটি কক্ষ করেছে। বাইরেরটিতে কম্পিউটারে কাজ করা হয়, ভিতরেরটিতে সিল্ক প্রিন্টিং। রঙের কড়া গন্ধে শরীর পর্যন্ত গন্ধ হয়ে যায়। বেশিক্ষণ থাকলে মাথা ঝিম ঝিম করে। তার এখানে অধিকাংশ কাজই হয় নেইমকার্ড, প্যাড, মেমোশীট, হ্যান্ডবিল আর মাঝেমধ্যে সংকলনের কাজ। পূজো এলে কিছু সংকলনের কাজ হয়। সিল্কপ্রিন্টে ৩ থেকে ৫ ফর্মার কাজ এক পাতা এক পাতা করে ছাপানো চিন্তাই করতে পারি না! সস্তা বলে সবাই এটা করে। অফসেট এখানে ব্যয়বহুল। জাপানে উল্টো। সিল্কপ্রিন্ট ব্যয়বহুল অফসেট প্রিন্টিং এর চেয়ে।
তাকে অনুরোধ করা হল বইয়ের মেটার তৈরি করে দেবার জন্য। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল, ফন্ট নিয়ে। বাংলা সফটওয়্যার ভিন্ন বলে বিজয় ফন্ট সাপোর্ট করছে না। বললাম, নো প্রবলেম। সব ঠিক করে দিচ্ছি।
তাকে সরিয়ে দিয়ে সঙ্গে করে আনা বিজয় সিস্টেম, ফন্ট ইনস্টল করে দিলাম। টেস্ট প্রিন্ট করে দেখালাম। সব ঠিক আছে। এমনকি জাপান থেকে ফাইন কোয়ালিটির ট্রেসিং পেপার কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম সেটাতেও টেস্ট প্রিন্ট করে দেখালাম। পার পেইজ এবং ট্রেসিং এর দরদামও করলাম না। সে যা দাবি করল তাতেই রাজি হলাম, শুধু বললাম, অক্ষর আর অক্ষরের লাইন যাতে মোটা ও চিকন না হয়, যাতে একই পরিমাণে থাকে সেটা ভালো করে খেয়াল রাখবেন। প্রতিটি পেইজ এর ট্রেসিং পরীক্ষা করে নেবেন।
তাকে অর্ধেক টাকা অগ্রীমও দিলাম। যাতে মনোযোগ দিয়ে কাজ করে। বললাম, কতদিন লাগবে? আমি প্রচ্ছদটা করে ফেলব দুদিনের মধ্যে।
কী যেন হিসেব করে বলল, হাতে বেশ কিছু কাজ আছে। সাত দিন সময় দিন এর মধ্যে হয়ে যাবে। আমি ফোন করে জানাবো আপনাকে বা বিপুলদাকে।
তথাস্তু বলে তার কাঁধ চাপড়ে চলে এলাম। বললাম, বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকব দাদা আর আসতে পারব না কিন্তু।
কোনো চিন্তা করবেন না, সিরিয়াসলি কাজ করে দেব, বলল পিন্টু। তারও পূর্বপুরুষ পূর্ব বাংলার।

আমি জাপানে আসার পর থেকেই খুব কম বাঙালিকেই বিশ্বাস করতে শিখেছি। আনন্দের মতো তাকেও বিশ্বাস করলাম না। কারণ আমি জানি বাঙালি কাজ গ্রহণ করে খুব সিরিয়াসলি কিন্তু করে দেয় খুব কেয়ারলেসলি। যে কারণে রেজাল্ট হয় বাজে। হারায় বিশ্বাস। বাঙালির খেয়ালিপনা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বলেই বিদেশিরা বাঙালিকে বিশ্বাস করতে চায় না। বলা ভালো, বৃটিশরাও বাঙালিকে কোনোদিন বিশ্বাস করেনি। লর্ড ম্যাকলে বাঙালি জাতি সম্পর্কে কী নির্মম খাঁটি মন্তব্যই না করে গেছেন!

বাসায় ফিরে বিপুলকে বললাম, বিপুল। বইয়ের কাজটা নিয়ে মনটা শান্ত হতে পারছে না। কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে নাতো ভাই? 
বিপুল একটা সিগারেট ধরিয়ে দীর্ঘ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, প্রবীরদা। আমি একেবারেই সদ্য আসা একটি মানুষ। এখানকার মানুষ, সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। আমি কী বলতে পারি বলুন?
অকাট্য যুক্তি। বিপুল কি করবে, মাত্র এসেছে সে এখানে। লড়াই করছে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার নিমিত্তে একটি আশ্রয় নির্মাণের লক্ষ্যে। মনে মনে মনকে শান্ত্বনা দিলাম, একটি বই বৈ তো কিছু নয়! ভালো না হলে আবার প্রকাশ করা যাবে। ধাক্কা না খেলে কিছুই শেখা যায় না এই পৃথিবীতে। মৃত্যু পর্যন্ত শিখে যেতেই হবে।

প্রচ্ছদটা করে ফেললাম, প্রিন্ট আউট করলাম। আহামরি করলাম না এই কারণে যে, সাধারণ পাঠক বই-ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ নিয়ে ভাবে না। তাছাড়া বইয়ের বিষয়বস্তুকে সুস্পষ্ট করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি প্রচ্ছদে তুলে ধরলাম।

এক বিকেলে স্বপ্না প্রিন্টার্স থেকে ফোন এলো বিপুলের কাছে। তারা ৫০ টাকাতেই রাজি হয়েছে। মেটার কবে দেয়া হবে জানাতে বলেছে। আমি বিপুলকে বললাম, জসিমকে একটা ফোন করে দাও যে কাগজ, ছাপা ও পাঠানোর খরচবাবদ এত টাকা লাগবে। যাতে দ্রুত টাকা পাঠায় তোমার নামে।

পরের দিন আমরা গিয়ে স্বপ্না প্রিন্টিং কোম্পানিতে গেলাম। বিশাল বড় জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফটকের কাছে নাম লিখিয়ে ভেতরে ঢুকতে হল। দুতলার একটি ঘরে সাক্ষাৎ হল ম্যানেজার বয়সে তরুণ সুদর্শন আলোকবাবু এবং তাঁর উপরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের একজনের সঙ্গে নামটি মনে পড়ছে না। খুব আগ্রহসহকারে আমাদের কথাবার্তা শুনলেন তাঁরা। মানসদার এক কথাতেই তারা রাজি হয়েছেন বললেন। চা-পর্বে আমি মানচিত্রের পুরনো কিছু কপি দেখালাম। নেড়েচেড়ে দেখে অলোকবাবু বললেন, সত্যি পারফেক্ট ছাপা যাকে বলে! জাপানের কিছু কিছু কাজ আমরা মাঝে মাঝে করে থাকি তবে সেগুলো বাণিজ্যিক ক্যাটালগ। আমাদের একটি মেশিন আছে জাপানি আকিয়ামা কোম্পানির তৈরি। জাপান থেকে নতুন কেনা হয়েছিল অনেক বছর আগে কিন্তু এখনও ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। ঐ মেশিনেই আপনাদের কাগজটা ছাপা হবে।
বিপুল বলল, আপনাদের এখানে তো অনেক বিখ্যাত কাগজ ছাপা হয়। ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি ভাষার.....
হ্যাঁ। এখানে হয় আবার আরেকটি কারখানা আছে কলকাতায় সেখানেও ছাপা হয়। পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও কারখানা আছে। ২৪ ঘন্টা কাজ হয় আমাদের প্রতিটি কারখানায়। চলুন না মেশিনগুলো দেখাই আপনাদেরকে।
কয়েকটি দালান ঘরে অনেকগুলো মেশিন, বাই কালার থেকে শুরু করে চার কালারের রোটারি মেশিন পর্যন্ত। বড় বড় রোল কাগজ থেকে ছাপা হয়ে চলেছে অনরবত। মেশিনের শব্দে কান বন্ধ হবার উপক্রম। দেখলাম আনন্দমেলা ও সানন্দা ছাপা হচ্ছে। আকিয়ামা প্রিন্টিং মেশিনটিও দেখালেন।
আমি বললাম, জাপানের কাগজ জাপানি মেশিনে বাহ্ চমৎকার! চার কালার তো একইসঙ্গে ছাপা হবে তাই না?
হ্যাঁ হ্যাঁ। চারটা ইম্প্রেশন এক সঙ্গেই হবে। রঙের কোনো গড়মিল হবে না। আমাদের অপারেটররা সকলেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
কাগজটির প্রকাশক চাচ্ছেন যদি ছাপা ভালো হয় তাহলে নিয়মিত এখানে ছাপতে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে পারমিশন নিয়ে কাজ করা যাবে বললেন মানসদা।
তা করা যাবে। এবারও আপনাদের কাগজের পারমিশন মানসদাই করে দিচ্ছেন, কথা হয়েছে। পারমিশন ছাড়া কিন্তু আমরা ছাপতে পারি না। ছাপার ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ তথ্য মন্ত্রণালয় খুবই কড়াকড়ি করে থাকে। আর বাইরের কাজ হলে তো আরও কঠিন অবস্থা! 
বেরিয়ে আসার সময় বললাম, জাপানি আর্ট পেপার পাওয়া যাবে তো। আমরা ৭০ গ্রাম দিতে চাই।
তা পাওয়া যাবে। আমাদের স্টকেই আছে।
আচ্ছা, সানন্দা আর আনন্দমেলার যে কাগজ ওটা কি ভারতেই তৈরি কাগজ?
না না না। ওগুলো ফিন্ল্যান্ড থেকে আনন্দবাজার পত্রিকা আমদানি করে থাকে। আনন্দ পাবলিশার্সের বইয়ের কাগজও ওই দেশ থেকে আমদানিকৃত।
আমি বললাম, এই কাগজগুলো বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। কারণ ছাপানোর মতো মেশিন নেই বলে।

(চলবে)