রুমানাকে নিয়ে কথা
ফারজানা শাম্মী
বসন্তের সুন্দর সকাল- রোববার, ১২ই জুন। পড়ন্ত দুপুরে রোদমাখানো ফুরফুরে মন নিয়েই বাসায় ফিরছি। অভ্যেসমতো ল্যাপটপ অন করে চোখ বুলাচ্ছিলাম ফেসবুকে। আমার সাংবাদিক বন্ধু কিশোয়ার লায়লার ওয়ালপোস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নির্যাতিত হওয়ার সংবাদ এবং সাথে নির্যাতিতার পাষণ্ড স্বামীর ছবি। এ ধরনের সংবাদগুলো একইসঙ্গে ক্ষোভ, হতাশা ও যন্ত্রণা দেয় বলে সাধারণত আমি এড়িয়ে চলি। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ থমকে গেলো আমার স্কুলের বন্ধু রুমানার ছবির পাশে ‘Pray for Rumana Mam’ শিরোনামে। নিজের অজান্তেই সেই পেইজে ক্লিক করে ওয়াল পোস্টগুলো পড়তে লাগলাম। বোকার মতো আমার মনে হতে লাগলো, কোথাও কোনো ভুল হয়েছে। এমন ভয়ংকর নিষ্ঠুরতার সংবাদের পাতায় কেন আমার বন্ধুর ছবি ছাপা হবে? ফিরে গেলাম কিশোয়ারের ওয়ালে পোস্ট করা সংবাদের লিংকগুলোতে।তন্ন তন্ন করে পড়লাম প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, মানবজমিন আরো যত টুকরো খবর, মন্তব্য কিংবা মতামত। নাহ্কোথাও ভুল ছাপা হয়নি- শিউরে উঠলাম, মন ও মস্তিষ্ক চিৎকার করে কেঁদে উঠলো এমন নৃশংসতায়। অবুঝের মতো আমার মন বলতে লাগলো এ মিথ্যা সংবাদ দেশের সংবাদপত্রগুলো কি সব একযোগে হলুদ সাংবাদিকতায় মেতে উঠলো নাকি! দিশেহারা আমি ফোন করলাম এখানে থাকা স্কুলেরই এক বন্ধুর কাছে এই আশায় যে ও বলবে নাহ্ রে, এ আমাদের রুমানা নয়। আমাকে স্তব্ধ করে দিয়ে বুবলা জানালো, হ্যাঁ, এ আমাদেরই বন্ধু রুমানা। ফোনের দু’প্রান্তে দু’চোখে ভরা কান্না নিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলাম দুই বন্ধু। ঢাকায় তখন অনেক রাত। অপেক্ষায় রইলাম কখন যোগাযোগ করতে পাবো ঢাকার বন্ধুদের সাথে। মনে ক্ষীণ আশা, জানবো এ মিথ্যা! রুমানা কানাডা আসার পরে ফেসবুকের মাধ্যমে কথা হয়েছিলো ওর সাথে। আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, সামারে টরন্টোতে বেড়িয়ে যাবার। ওর সাথে শেষ যোগাযোগ গত মে মাসে। ওর জন্মদিনে ওর ফেসবুকের পাতায় শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। হঠাৎ কি যেন মনে হলো, রুমানার ফেসবুকটা দেখতে ইচ্ছে হলো খুব, মনে হলা যেন ওকে খুঁজে পাবো ওখানে। ফেসবুক বলে দেবে রুমানা ভালো আছে, সুস্থ্য আছে। কিন্তু নেই, ফেসবুকের ফ্রেণ্ডলিস্ট থেকে ও উধাউ! ওর প্রোফাইল খুঁজে পেলাম না। বুবলাও একই কথা জানালো। রুমানা দেশে আছে এটা জানতামনা আমি- বুবলার কাছে জানলাম। যাবার আগে কথা হয়েছিলো ওর সাথে। জানিয়েছিলো মেয়েটাকে দেখতে যেতে চায়, বন্ধুদের সাথে দেখা নাহয় পরে কখনও করা যাবে। আর কখনও কি রুমানা দেখতে পাবে ওর বন্ধুদের- আমাদের কিংবা ওর মেয়ে আনুশেহকে!
ভয়াবহ যন্ত্রনায় ছটফট করতে লাগলাম। কেমন যেন ভয় করতে লাগলো আমার। প্রীতিকে ফোন করলাম। ও আমার স্কুলের বন্ধু, লণ্ডনে থাকে। ভীষণ আবেগপ্রবণ, আমার গলা শুনেই অস্থির হয়ে বললো, কি হয়েছে তোর? এমন শোনাচ্ছে কেন তোর গলা? খবরটা বললাম ওকে। চিৎকার করে কেঁদে উঠলো ও। এ প্রান্তে আমি নীরবে চোখ মুছলাম। সে রাতটা যে কী দু:সহ ছিলো বুবলা, প্রীতি ও আমার এবং আরো অনেকের যারা রুমানার কাছের কিংবা পরিচিত।
পরদিন, তারপর দিন এবং তারও পরের দিন- প্রতিটি দিন এলো নিষ্ঠুর থেকে নিষ্ঠুরতম সংবাদ নিয়ে। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত আমরা বন্ধুর প্রার্থনা করে যাচ্ছি কেবল রুমানার সুস্থ্যতার-দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবার, নরপশুটার উপযুক্ত শাস্তির। স্রষ্টা তুমি যদি সত্য হও এমন ভয়াবহ অন্যায়ের উপযুক্ত বিচার হবে- এতগুলো মানুষের প্রার্থনা, কান্না বৃথা যাবে না।
রুমানাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে প্রতিদিনই। কিছু অসুস্থ লেখাও প্রকাশ পাচ্ছে। সে লেখাগুলো পড়লে বিবমিষা পায়, ঘেন্না লাগে। বাকরুদ্ধ হয়ে যাই- এমন অসুস্থ্ চিন্তাও আসে মানুষের মনে। এলোমেলো হয়ে যায় ভাবনাগুলো রাগে, ক্ষোভে। আর কন নারী অন্ধ হলে, জ্বলেপুড়ে মরলে আমরা অধিকার সচেতন হবো! আর কতোটা পথ পার হলে আমরা নারীকে মানুষ বলে ভাববো! এ পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এটা মগজে ঢোকাতে আর কত ত্যাগ করতে হবে, কত প্রাণ দিতে হবে!
নারী-পুরুষের সম্পর্ক ভালোবাসার, শ্রদ্ধার, বিশ্বাসের, ভরসার। যে সম্পর্ক শ্রদ্ধা করতে শেখায়না একে অপরকে, নিরাপত্তা দেয়না, ভরসা দেয়না, সেই সম্পর্কে আর যাই থাকুক, ভালোবাসা নেই- সে সম্পর্ক কোনো সুস্থ সম্পর্ক নয়।
রুমানা বলেছে, ও তার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে এতগুলো বছর সব অত্যাচার মুখ বুঁজে সহ্য করেছে। কেনো রুমানা? কেনো বোঝোনি, একটা অসুস্থ সম্পর্ক কতোটা ভবিষ্যত আর নিরাপত্তা দিতে পারে তোমাকে আর তোমার মেয়েকে? তুমি তো শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত বাংলাদেশের অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়েটি নও! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাঙ্গনের শিক্ষক তুমি। তোমার সাথে কেন গ্রামের অশিক্ষিত নির্যাতিতা মেয়েটির কোনো পার্থক্য থাকবে না! এ কেমন কথা! সেই মেয়েটি মুখ বুঁজে সব সহ্য করে কারণ সমাজের দোহাই দিয়ে তাকে তার বাবা-মাও আশ্রয় দেয় না। গলায় ফাঁস দিয়ে, নয়তো মার খেতে খেতে মরে যেতে তার মুক্তি মেলে। ভীষণ ভালো মেয়ে ছিলে তুমি, এই ভালো মেয়ের শিকল ছিঁড়ে একবার যদি প্রতিবাদ করতে! আমরা সবাই তোমার পাশে সাহস হয়ে এসে দাঁড়াতাম- বিশ্বাস করো, আজও যেমন আছি!
প্রচলিত সামাজিক প্রথা কিংবা সমাজ ব্যবস্থাকে আমরা দায়ী করি কিছু হলেই। কিন্তু ক’জন আমরা এগিয়ে আসি সমাজ বদলাতে, কু-প্রথাগুলোর চর্চা না করে সমাজকে আলোকিত করতে। আলাদিনের দৈত্য এসেতো এক ফুঁয়ে সমাজ বদলে দেবে না। আমাদের সমাজ আমাদেরই বদলাতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের যতটুকু আলো আছে, আমরা তা ছড়িয়ে দেবো- আজ আমরা নারী-পুরুষ সবাই প্রতিজ্ঞা করি আমার জানা একটি নারীও যদি কখনও নির্যাতিত হয়, আমি যেন তার প্রতিবাদের কণ্ঠ হই, তার পাশে যেয়ে সাহস হয়ে দাঁড়াই। রুমানার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণের সাধ্য আমাদের নেই। কিন্তু এটুকুতো আমরা করতে পারি, যেন আর কোনো রুমানা পৃথিবীর আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। আর একজন রুমানাও যেন নীরবে সহ্য না করে কোনো অন্যায় আচরণ।
টরন্টো