প্রবন্ধ
গল্প
> চৌধুরী আমজাদ খার কবর থেকে উঠে আসার পর
কবিতা
সাহিত্যের খবর
সন্ধি
অংশু মোস্তাফিজ
এক. রিকন্ডিশন একটা টয়োটা কিনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো বাদল। এবার থামার সময় হয়েছে। চারদিক কি অদ্ভুত নিয়মেই না দৌঁড়াচ্ছে। কি বিভৎস্য এক একজন মানুষের দৌঁড়। জন্মদৌঁড়। আমি আর দৌঁড়াবো না। হাটবো না। প্রয়োজন নেই। পেছনের জীবনটার দিকে চোখ বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলছিল বাদল। একা একা কথা বলার অভ্যেস কয়েক বছরের। গাড়ি কেনার খবরটা কয়েকজনকে জানাতে ইচ্ছে করছিল। যাদের সাথে মেশা হয়না এক দশক সময়। এক দশক। দীর্ঘ সময়। নিজেকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা মুখপ্রিয় বাদলের অনেক কষ্টের ছিল। ছিল না উপায়। কি অপ্রিয় সময়গুলো দুর্দান্ত ঝড় হয়ে বয়ে গেছে ওর উপর দিয়ে। ভাবতে কষ্ট হয়। আরো একটি বড় ধরণের শ্বাস ফেলে জিন্সের পকেটে হাত দিলে সেলফোন খুঁজতে। না নেই। থাকার কথাও নয়। মাস ছয়েক হয় একবারে ব্যবসা অফ করে সবগুলো সেলফোন বন্ধ করা হয়েছে। তবু অবচেতন মন ফোনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। এখন পরিচিত কেউ ওর ঠিকানা জানে না।
ভাবনাটা আরো আগের কিন্তু তেইশ বছর বয়সে এসে পরিচিতদের ঘোষণা দিয়েছিল, যে দিন বয়স তেত্রিশ হবে সেদিন গাড়ি কিনবে। যে করেই হোক। রিকন্ডিশন টয়োটা। দৈনতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে মাখামাখি করে জীবন কাটানো বাদলের ঘোষণা যে শুনেছিল সেই হেসেছিল সেদিন। একজন বলেওছিল, টয়োটা কেন, ফেরারী কিনলেই পারিস! স্বপ্নবাজ বাদল দৃঢ মানুষের মত বলেছিল, না টয়োটা। রিকন্ডিশন টয়োটা। উপস্থিত সবাই দাঁত বের করে খলখল করে হেসেছিল। বাদলও হেসেছিল। কিন্তু তারপরের এক দশকে আর হাসা হয়নি।
আজ ওর বয়স সমস্ত তেত্রিশ। ছাব্বিশ বছর বয়সে এসে ব্রান্ড নিউ ল্যান্ডক্লুজার কেনার মত উপার্জন হয়েছিল বাদলের। কিন্তু বাদল অপেক্ষা করছিল তেত্রিশের। রিকন্ডিশন একটা টয়োটার। যখন পকেট ভর্তি টাকা থাকে তখন আর ভাগ্য বিট্রয় করে না। দিনভর উন্মাদের মত গাড়ি নিয়ে ছুটলো বাদল। আজই শেষ ছোটা। চক্রভাগ্যে একটা দিনের জন্যই ওর এতোসব আয়োজন। নিদ্রিষ্ট গন্তব্য নেই। সামনে যে মোড় পড়ছে সেদিকেই ঘুরাচ্ছে স্টিয়ারিং। জীবনের মতই আবিস্কার করছে রাস্তার মোড়। জীবন আর রাস্তা দুটো একই জিনিস। একবার ইচ্ছে হলো সোজা অনিতার বুটিক হাউসে যাবে। অনিতার মুখোমুখি বলবে, আমার পথ শেষ তাই তোমার কাছে এসেছি। অনিতা বলবে, ওদিক দিয়েই ফিরে যাও। ভুল জায়গায় এসেছো। এমনটি ভেবে আর বনানীর দিকে যাওয়া হলো না। শনি রবিবার বনানীর বুটিক হাউসে বসে অনিতা। অন্যদিনগুলোতে মিরপুরের দুটোতে। আজকাল অনিতাও রুম থেকে বেরুতে চায় না। বাদল অনিতার ভাব বুঝে ওঠে না। একবার ভাবে ওর মতই কি অনিতাও! না তা হবে কেন? এত সুন্দর একটা মেয়ে, ওকে কোন দাগ মানায় না। আবার ভাবে তা না হলে একা মেয়ে এভাবে আকাশ খুড়ে খুড়ে উপড়ের দিকে যায় কিভাবে? কোন উত্তর বেরুই না। মিরপুর এগারোতে পাশাপাশি দু’জনার ফ্ল্যাট। রাত্রি নিবাস। পাশাপাশি থেকেও কথা বলা হয়নি তেমন। বাড়ির সব বাসিন্দাদের এক উৎসবে দু’জনার পরিচয়। অন্যরা সবাই হাসাহাসি করছিল, এত বয়সেও ওদের ব্যাচেলর থাকা নিয়ে। তাও আবার দু’জনই পাশাপাশি। সেখান থেকেই দু’জনের স্বল্প স্বল্প আলাপে দীর্ঘ ঘণিষ্ঠতা। দুপুরের দিকে কয়েকটা লালনের গানের সিডি কিনেছিল। গাড়িতে বসে এখনো ওগুলোই শুনছে বাদল। এক দশক পর নিজের ইচ্ছেয় গান শোনা। লালনের গানে বিশেষ টান ছিলো। দুরন্ত কৌশরে। প্রথম যৌবনে। এলাকার নামী এক গুরুর কাছে গান শিখতেও শুরু করেছিল। সময়মত টাকা দিতে না পারায় গান শেখা আর হয়নি। টাকার অভাবে অপ্রাপ্তির এমন অসংখ্য ঘটনা আছে। আজ এতো বছর পর এইসব পুরনো কথা মনে পড়ছে।
রাত বারোটার দিকে রুমে ফিরে ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের খামটা চোখে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। মন খারাপ হবার কথা নয়। আর একটা মাত্র ইচ্ছে বাকী আছে। সবই তো পুরণ হলো। এবার শুধু একবারের জন্য হলেও সেক্সের স্বাদ। তেত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত সেক্স করা হয়নি। সুযোগ সময় কম আসেনি। তেইশ বছর বয়সে ব্যর্থ হবার পর বাদল সে সুযোগ আর নিতে চায়নি। অপেক্ষা ছিল তেত্রিশের। এখন হবে। অজস্র টাকা আছে। কিছুটা সময়ও আছে। কিন্তু আজ মৃত্যু পরোয়ানা হাতে নিয়ে এতোটা আগে মরতে ইচ্ছে করছে না। আজ থেকে শুয়ে বসে কাটালেও কয়েক যুগ পেরুবে নিশ্চিন্তে। এমন অবস্থানের জন্য কম শ্রম আর মেধা যায়নি। এভারেস্ট আরোহনের মত সেকেন্ডে সেকেন্ডে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনে এগুতে হয়েছে। অবশেষে দশ বছরের রোবট মানব হয়ে বাদলের এটুকু অর্জন। হাসন রাজা মননের বাদল বাস্তবতার যাতাকলে পিশে পিশে আজ কথিত সভ্যতার বুকে চড়ে হাসার যোগ্যতা নিজের দখলে নিয়েছে। এত কষ্ট করে এসে মৃত্যুর খবর ভাল লাগছে না। ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে আরো একবার ফোন করলো বাদল। রিপোর্ট আরো একবার চেক করা যায় কি না। ওপাশ থেকে জানানো হলো, তিনটে ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে চেক করা হয়েছে। সবারই একই রিপোর্ট। মনে পড়লো, তেইশ বছর বয়সেই মাথার সমস্য দেখা দিয়েছিল। স্রেফ টাকার অভাবে পরীক্ষা কিংবা চিকিৎস্যা করা সম্ভব হয়নি। কাউকে বলাও হয়নি। মাকেও না। আজ টাকা থেকেও আর চিকিৎস্যার সময় নেই। ফোন রেখে সিগ্রেট জ্বালালো বাদল। এতক্ষণে পাশের ফ্ল্যাটে চলে এসেছে অনিতা। ওকে ফোন করে জানাতে ইচ্ছে করছে, অনিতা আমার ব্রেণ ক্যান্সার। খুব স্বল্প সময়ের জন্য আমি আছি। তোমার কাছে চলে আসি? অনিতা বলবে, চাপা রাখো। আমি অনেক ক্লান্ত। এখন তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বাদল বলতে পারতো আমার কাছে তিনটে ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের রিপোর্ট আছে। গত রাতে রিপোর্টগুলো হাতে পেয়েছি। তাছাড়া আজ আমার জন্মদিন। জন্মদিনে মিথ্যে বলার ইচ্ছে নেই। না বাদল বললো না। উপোর্যপুরি কাউকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা ভাল নয়। স্মৃতি হাতরিয়ে শোভাকে ফোন করলো। শোভা কৈশরের প্রেমিকা। ঐ সময় দায়ভার নেবার মত ক্ষমতা ছিলনা বলে শোভাকে হারাতে হয়েছিল। স্বামী সন্তানসহ এখন এই শহরেই থাকে। বছর চারেক আগে ফার্মগেটে দেখা। তবু শোভা অটুট ধরে রেখেছে ওর সৌন্দর্য। ব্রেণ ক্যান্সারের খবর অন্তত একজনকে শোনাতে শোভাকে ফোন করেছিল বাদল। শোভা বাদলের পরিচয় জেনেই বললো, মাস তিনেক হয় স্বামী চাকুরি হারিয়েছে। ভীষন বিপদে কাটছে দিনকাল। ঠিকানা দিয়ে শোভাকে সাবা বুটিক হাউসে যেতে বললো বাদল। তারপর খট করে রিসিভার রেখে দিলো। নিশ্চিত কাল শোভা যাবে। বাদল পাঠিয়েছে শুনে ভাল মানের একটা কাজ দেবে অনিতা। বাদল আর অনিতা দু’জনেই বড্ড একা। ভাল করে মেশা না হলেও মনস্তাত্বিক যোগ আছে কোথাও। ভদকার বোতল খুলে গলায় ঢাললো বাদল। কাউকে জানানো হলো না। মা থাকলে হয়তো জানানো যেতো। মা- চলে যাবার আগে ছেলের মাথায় নারকোল তেল দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ভদ্রমহিলা। দেয়া হয়নি তার। সময় স্বল্পতার জন্য টাকা পয়সা চিন্তার কারন হলো। এতোগুলো টাকা কাকে দিয়ে যাওয়া যায়। সম্ভাব্য উত্তর সহজে বেরুলো না। দীর্ঘ সময় যোগাযোগ ছিন্ন স্বজনদের দেয়া যেতো। ছোট ভাইয়ের ছেলেটার কথা মনে পড়ছে। ওর বয়স এখন চার। এখনো দেখা হয়নি। ওর নামে যদি টাকাগুলো দিয়ে যেত তাহলে কিছুটা স্বস্থ্যি মিলতো। বড় হয়ে ছেলেটা জানতে তার বড় চাচা মারা যাবার আগে তার নামে কয়েক কোটি টাকা রেখে গেছে, যার সাথে দেখাই হয়নি তাহলে ব্যাপারটা অদ্ভুত সুন্দর দাঁড়াতো। কিন্তু টাকাগুলো ভাল নয়। ভাইয়ের ছেলেকে দেয়া যাবে না। তেইশ বছরের আগের জীবন যাত্রা বাদলকে বাধ্য করেছে ভাল মন্দের হিসেব ভুলে যেতে। বিশেষত উনিশ থেকে তেইশ-এই চার বছরের অর্ধাহার অনাহারের চালচিত্র বাধ্য করেছে আজ এখানে দাঁড়াতে। আপাদমস্তক হতাশাগ্রস্ত বাদলের সামনে মাদক আসক্তি ধেকে ব্যবসার সুবর্ণ সুযোগ হয়ে ধরা দিয়েছিল। ক’জন সহযোগী নিয়ে মাদক ব্যবসা পাল্টে দিয়েছে ওর জীবনের সংজ্ঞা। কয়েকদিন ভেবে বাদল সিদ্ধান্ত নিলো, মৃত্যুর পর ওর টাকা দিয়ে দেশব্যাপি যতগুলো সম্ভব লাইব্রেরী করার। অবশিষ্ট দিনগুলো লাইব্রেরী বাস্তবায়নের কাজেই ব্যয় হতে থাকলো। তখনো সেক্স নামক একটা চাওয়া অধরা।
দুই.
পত্রিকায় কবিতা পড়ে শ্যামলকে ফোন করেছিল অনিতা। অনিতার নাম অনিতা নয়। সাবরিনা। পরিচিতরা সাবা বলে ডাকে। সাবাকে অনিতা বানিয়েছে শ্যামল। বগুড়ায় দু’জনার বাস। সাবা গ্রামের মেয়ে। সবে অনার্সে ভর্তি হয়ে শহরে উঠেছে। সাবলেট থাকে। বন্দি পাখীকে মুক্ত করে দিলে ক্ষণিকেই সব স্বাধীনতার স্বাদ নিতে চায়। বেশি ওড়ে। ডানা ভেঙে ফেলে। সাবারও অনেকটা হয়েছে তাই। গ্রামের সুবোধ সুন্দর মেয়ে শহরে এসে স্বাধীনতার স্বাদ নিতে চেয়ে জড়িয়েছে মানসিক পলিটিক্সে। শ্যামল- এক আধুনিক কবির প্রাগৈতিহাসিক ফাঁদ। সাবা এ ফাঁদে তারপরও পা দিতে চায়নি। মাস ছয়েক শ্যামলের সাথে মিশে আটকে গেছে মায়া ফ্যাক্টরে। এক ভাবগম্ভীর আলোচনায় সাবাকে শ্যামল বললো, জীবনে অনেক স্বাদ আহ্লাদ থাকে মানুষের। সবার স্বপ্ন পুরন সাধ্যে কুলোয় না। জীর্ণ জীবনের সাথে সঙ্গোম করতে করতে রুচিহীনতায় ভুগছি। একটু আধুনিকতার স্বাদ নিতে চাই। অন্তত একবারের জন্য হলেও। সাবা নিরব হয়ে শুনছিল। শ্যামল সাবার হাতে হাত রেখে বললো, কিছু টাকা জমিয়েছি। আমার ইচ্ছে এক অত্যাধুনিক পরিবেশে জোৎøাবিহার করবো। শহরের অত্যাধুনিক এক হোটেলের নাম বলে বললো ওখানে বেলকনিতে বসে কাটাবো এক জোৎøাøাত রাত। সাবা তুমি আমার পাশে থাকবে। সাবা চমকে উঠে না বললো। শরীরে নিঃশ্বাসেরও ছোঁয়া দেবোনা বলে আস্থা দিলো শ্যামল। সাবা শ্যামলকে বিশ্বাস করলো। এক জোৎøাঝড়া রাতে তাই শ্যামলের পাশে হেটে উঠেছিল শহরের এক নাম্বার হোটেলে। এক কবিকে এক রাতের সঙ্গ দিয়ে বিমূর্তবাদের অংশ হতে চাইলো সাবা। কিন্তু শ্যামল সেদিন কবি ছিল না। কবিরা সব সময় কবি থাকে না। সাজানো নাটকের দক্ষ অভিনেতাও হয়ে ওঠে কখনো কখনো। খল অভিনেতা বলাটাই যথার্থ। হাই ভ্যলিউমে গান চালিয়ে দিয়ে উন্মাদের মত খেতে চাইলো সাবার প্রথম শরীর। সাবা আধুনিক হতে চাইলেও সতিত্ব বিসর্জন দিতে তখনো নারাজ। শ্যামলকে প্রতিশ্র“তি ও মনুষত্ব জাগিয়ে দেবার বৃথা চেষ্টাও। কিন্তু শ্যামল তখন মানুষ নয়- একজন পুরুষ। সাবার তখন সতের। শ্যামলের সাতাশ। শরীর অসমর্থন করেনি কিন্তু নিজের কাছে বড্ড পরাজিত মনে হয়েছিল সাবার। একজন কবির কাছে নারীত্বের অবমাননা অসহ্য মনে হয়েছিল। স্বভাবতই সাবা ছিল এক টুকরো চঞ্চল প্রাণ। সাবা মানে উচ্ছলতা। সাবা মানে সম্পূর্ণতা। কিন্তু সে রাতের পর সাবা বদলে গেল। হোটেল থেকে ফিরে দীর্ঘ সময় কেঁদে নিথর হয়ে গেল সাবা। বিশ্বাস বিপর্যয়ে পুড়ে গেল চঞ্চলতা- উচ্ছলতা। দ্বিতীয় বিপর্যয় আসতে পনের দিনও সময় লাগেনি। সাবা যে বাড়িতে সাবলেট থাকতো সে বাড়ির কর্তাকে মামা বলে সম্বোন্ধন করতো। সেদিন মামা ছাড়া বাড়ির সবাই আত্মীয়ের বাড়িতে। ঝুম বৃষ্টির রাত। মধ্য রাতে অর্ধেকেরও কম বয়সী সাবার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করেনি মামা। সাবা সেদিন কান্নার চেয়ে গ্রাম শহরের তুলনা করতে চাইলো বেশি করে। কোনভাবেই বাড়িতে এসব জানানো যাবে না। তাহলে পড়াশোনা শেষ। সাবার স্বপ্ন ছিল চাটার্ড ব্যাংকে চাকুরি করবে। তাই কম্প্রোমাইজের চেষ্টা। সাবলেট ছেড়ে এক ছাত্রী হোস্টেলে উঠলো সাবা। কিছুদিন পর নাচ শেখার জন্য অতিরিক্ত টাকার দরকার হলে একটা পার্ট টাইম জব নিলো। সুন্দরী প্রেজেন্টেবল মেয়ে, জব পেতে অসুবিধে হলো না। কিন্তু সে একই কাহিনী। তিন মাসের মধ্যেই বসের লালসার শিকার। বসের পর অফিসের কলিগ, ক্লাসের দু’একজন বয়ফ্রেন্ডদের সাথে বেডে যেতে বেশি সময় লাগেনি। নিজের সাথে এভাবে বারবার হারার পর সাবা এক হিন্দি সিনেমা দেখে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসলো। অনেক হয়েছে আর নয়। এবার অর্জনের পালা। এমনিতেই যখন ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে নিজেকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে তখন টাচ ভ্যালু নিলে ক্ষতি কি? ব্যাস একটা সিদ্ধান্তে জীবনের মোড় পাল্টে গেল। সাবা তখন সাবরিনা কিংবা সাবা থেকে হয়ে উঠলো অনিতা। কড়া দামে খুব অল্প সময়েই অনিতা হয়ে উঠলো শহরের প্রথম শ্রেণীর কট। শহরের বয়স্ক ধনীক শ্রেনী লুফে নিলো অনিতাকে। দিনদিন সমবয়সীদের হাতের নাগালের বাইরে চলে গেল অনিতা। অনিতার মূল্য এই শ্রেণীর উপার্জনে কুলোয় না। তাই ফ্রেন্ডের চেয়ে ফ্রেন্ডের বাবা হয়ে উঠলো অনিতার প্রিয়জন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রবাসী পাখী অনিতাকে চমকে দিলো। পাঁচ পুরুষের সঙ্গে বেশ্যা আর বত্রিশ বছর বয়সে নারী। কোথায় তবে অবস্থান আমার? অনিতা নিজেকে খুঁজে পেলো না ভাবনা ত্রিসীমানায়। কত পঞ্চপুরুষের ঝড়ো রাত দিন ওকে বেশ্যার থেকে মহানতর করে তুলেছে। নারী হতে ঢের বাঁকী এখনো। সবে পেরুলো কুড়ি। অনার্স শেষ করে তিনটে ব্যাংক এ্যাকাউন্টের হিসেব দেখে আরেকবার চমকে ওঠা। এই বয়সে কোন মেয়ের এতোটা উপার্জন হতে পারে! ব্যাংক থেকে সবগুলো টাকা তুলে তার মাঝে বিবস্ত্র ঘুমোতে ইচ্ছে করলো অনিতার। টাকা তো নয়, ওগুলো শরীরেরই এক একটি অংশ। প্রচন্ড নেশায় নির্জিব করতে ইচ্ছে করলো নিজেকে। কিন্তু না, টাকার নেশার কাছে মাদক সামান্যই। আরো টাকা চাই। আরো। অনিতা ধরেই নিলো অনেকদিন আগে মৃত্যু হয়েছে ওর। চার বছর আগে শ্যামলের সাথে প্রথম যে রাত, সে রাতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে। তারপরের বেঁচে থাকা বোনাস টাইম। বোনাস টাইমে হাত খুলে খেলাটাই আনন্দ। এ আনন্দে নিজেকে ভাসাতে ভাসাতে ঢাকার দিকে পা বাড়ালো অনিতা। নির্ধারিত উচ্চ মূল্যে সমস্যা হচ্ছিলো প্রথম দিকে। অনিতা আরো আকর্ষিত করতে নামকরা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হলো। আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। অনিতা নিজেকে গড়ে তুললো মেট্রোপলিটন ধাঁচের প্রেজেন্টেবল করে। এক ধাপেই মূল্য হয়ে গেল দ্বিগুন। আরো ছয় বছর এক চেটিয়া নিজের বিজয়োৎসব দেখার পর থামতে চাওয়া। সম্ভব নয় জেনেও একটা পিছুটান তৈরীর ইচ্ছে জাগলো। বাবা মা, স্বজনদের সাথে সম্পর্ক শেষ হয়েছে এ জীবন শুরুও দ্বিতীয় বছরেই। তারপর অনিতা সুতো ছেড়া রঙ্গিন ঘুড়ি।
প্রচুর টাকা ইনভেস্ট করে মিরপুরে পরীক্ষামূলক সাবা বুটিক হাউস শুরু করেছিল অনিতা। লাক ফেবার। সাফল্য পেতে সময় লাগেনি। অনিতা তিনটে বড় বুটিক হাউসের সত্ত্বাধিকারী যখন বয়স একত্রিশ। এখন বড় বেশি ঘর বাধতে ইচ্ছে করে কারো সাথে। আর ভাললাগে না। একা একা এত টাকা দিয়ে কি হবে? সময় ঠিক হয়ে উঠলো সতীন। বাদলের কথা মনে পড়ে। ভালবাসাও হয়ে গেছে বাদলের প্রতি। রাত্রি নিবাস নামক বাড়িতে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে দু’জনের অবস্থান। বাদল অনিতাকে কিম্বা শুধু সঙ্গ চায় এটা অনিতা জানে। কিন্তু উপায় নেই। অনিতার নারী হতে অর্থাৎ বত্রিশা হতে যখন মাস চারেক বাকী তখন ধরা পড়লো এইডস। অনিবার্য মৃত্যুর সাথে বাদলকে জড়াতে চায়নি অনিতা। তাই বারবার ফেরানো।
তিন.
সেদিন অনিতার জন্মদিন। পূর্ণ বয়স্কা। বত্রিশা। নারী হবার মহেন্দ্রক্ষণ উপলক্ষ্যে অনিতার ফ্ল্যাটে বাদলের আমন্ত্রণ। দু’জনারই শারিরীক অবস্থা করুন। যে কোন সময় কলিংবেল টেপার আশায় দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু। বাদল অনিতাকে মুখোমুখি বসিয়ে খুলে দিলো অতীতের সব ডালপালা। অনিতাও যখন সব বলে ফেললো তখন রাত শেষের দিকে। কান্না পাচ্ছে দু’জনারই। অনিতা বাদলকে আহ্বান জানালো ওর শেষ ইচ্ছে পুরণের। বাদল সারা দিলো। প্রথম এবং শেষ আলিঙ্গন আর ভালবাসার সমুদ্রে ডুবে যেতে চাইলো ওরা। কিন্তু স্বাদ অনুভবের সময় পেল না বাদল- অনিতারও পাওয়া হলো না ভালবাসার অনুভূতি। অলৈকিক কলিংবেল বাজলো। দরজা খুললো। মৃত্যু চুম্বনে দু’জন আঁধারে ডুবে গেলে জগৎময় ভোরের আলো ফুটলো।