প্রবন্ধ
> কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনীতি চিন্তা
গল্প
কবিতা
প্রবাস যৌবন
আইয়ুব আহমেদ দুলাল
বিদেশের কথা প্রথম শুনে সব লোকেই হাসে
আনন্দে চারপা উপরে তুলে ধেই ধেই নাচে,
যাওয়ার সময় বিদায় চেয়ে খুঁজে খুঁজে নেয় ঠিকানা
বিদেশে গিয়ে টাকা পাঠাবে কারো কোন অভাব রবে না,
যাওয়ার কালে অশ্রুজলে মা দেন মাথা মুছে
বলে; দোয়া করো মা, এবার তোমার দুঃখ যাবে ঘুঁছে,
কেঁদো না মা, বিদায় নিয়ে বলবে মাগো আসি
খানিক দুরে পিছন ফিরে চক্ষু মুছে হাসি,
মা কাঁদে ছেলের শোকে বিদেশ চলে যায়
কে জানে কে বেঁচে থাকলে কবে দেখা হয় ?
ব্যাগ কাঁধে পরাণ কাঁন্দে সোনার দেশটি ছাড়তে
সখ করে যায় কেউ কেউ, কেউবা না পারতে,
কেউ কেউ ছুটে যায় সোনার হরিণ লালসায়
উড়ে বেড়ানো টাকা নেবে মোটা মোটা বস্তায়।
যাওয়ার পরে একদিনে তার কলিজা যায় উল্টে
আশার বানী শুধানো মন নিমিষে যায় পাল্টে,
বলে; কী ভুল করেছি মা, কেন বিদেশ এলাম
জীবন-যৌবন-সখ-আহ্লাদ বন্দীখানায় দিলাম,
ফিরে যেতে পারি তবে মান যাবে সব চলে
লাখো টাকা খরচাদি ভাসবে বানের জলে,
জমিজমা বন্ধক দিয়ে টাকা কামাতে এলাম
সুখের জীবন রেখে কঠিন কষ্ট বেছে নিলাম,
জীবনে কভু ধুইনি কাপড়, বাজার করিনি লাজে
এখন সবই করতে হয় যতই লাগুক বাজে,
তীব্র উত্তাপ মাথায় নিয়ে করতে হয় কাজ
কোথায় নয়া জামা কাপড় কোথায় ডিস্কো সাজ,
জ্বর হয়, সর্দি হয়, লুকিয়ে কাঁদি ভেউ ভেউ
ব্যস্ত সবাই যে যার কাজে খোঁজ লয়না কেউ,
এমন দুঃখের প্রবাস জীবন যদি জানতাম আগে
দেশেই কিছু করে নিতাম যত কষ্টই লাগে।
দেখতে দেখতে বছর যায়, ইনকামপাতি কম
মাস শেষে বেতন পেয়ে বন্ধ হয় দম,
এই বেতন নিজেরই হয়না, পাঠাবে কী বাড়ী
কোথায় গেল স্বপ্নপুরী, কোথায় স্বপ্নের গাড়ী,
তবুও, কষ্টেশিষ্টে জানটা রেখে জমা করতে হয়
এদিক সেদিন ধার-দেনা করে বাড়ীতে পাঠায়,
চিন্তা চাপে মাথার ভেতর বাবা-মা কেমন আছে
ভাইবোনেরা না খেয়ে হয়ত স্কুলে চলে গেছে,
সাধ্যমত চেষ্টা করে সবাইকে খুশী রাখতে চায়
তারা ভাবে বাছা আমার মোটা অংকের বেতন পায়,
জমি কিনে, বাগান কিনে, বোনকে বিয়ে দেয়
তারপরেও ছোট ভাইয়ে ব্যবসার টাকা চায়,
কষ্ট তার বোঝে না কেউ স্বপ্নে সবাই বিভোর
টাকার নেশায় ভুলে যায় আপনকে করে পর,
মনের কষ্ট মনে থাকে প্রকাশিবে যাকে
প্রবাসে সবার একই কষ্ট বলতে যাবে কাকে ?
আগের মত ভাবনা হয় না, মনে ছিল ঢেউ
প্রেম ছিল, প্রেমিকা ছিল, পাশে ছিল কেউ,
জীবনে কত স্বপ্ন ছিল কোথায় গেল হায়
বাস্তবের কষাঘাতে সবই ভুলে যায়।
তিনটি বছর পার হলেও জমা হয়না টাকা
মাস শেষে বাড়ী পাঠালে পকেট থাকে ফাঁকা,
মাথা ধরে চুল ছিঁড়ে তখন বিকল্প চিন্তা করে
কাজের শেষে বাইরে গিয়ে ঘন্টায় কাজ ধরে,
সেখান থেকে আয় হয় বাড়তি কিছু পয়সা
মনের মাঝে খুঁজে পায় ছুটি যাওয়ার ভরসা,
কাজ শেষে গোসল করে রাত বারোটা বাজে
রান্না করে খেয়ে ঘুমায় পাঁচটায় ফের কাজে।
পাঁচ বছর পর কষ্টেশিষ্টে পয়সা কিছু জমে
মুখে হাসি ফুটে ওঠে বুকের চাপ’টা কমে,
নতুন করে মনে জাগে পুরানো সেই স্বপন
আশায় আশায় করে যায় সুখের বীজ বপন,
মনে হতেই অজান্তে সে একা একা হাসে
কখনোবা বদ্ধ কক্ষে ধিতাং ধিতাং নাচে,
লাফিয়ে উঠে সামনে ধরে ছোট্ট একখান আয়না
লালটু চেহারা বেগুন-পোড়া চোখ ফেরানো যায় না,
তবুও পায় সান্তনা, পরীর চোখে অকর্মা নয়
বুক ফুলিয়ে সামনে যাওয়ার প্রবল সাহস খুঁজে পায়,
হালাল কর্মে গাল ভাঙ্গলেও চেহারা একদম মন্দ না
শ্রমের রসে সুগন্ধ রয় ওটা ঘামের গন্ধ না।
গলায় দিয়ে সোনার চেইন, বাঁধে একখান পেডি
ঢোলা সাহেবী সুট পরে হয়ে যায় রেডী,
লেছরায়ে লেছরায়ে হাঁটে সাহেব দাঁড়ায় কোমর ভেঙ্গে
যথেষ্ট তার মিল পাওয়া যায় দাঁড়কাকের সঙ্গে,
বিমানের ভেতর উঠে সাহেব ভাব ছড়িয়ে বসে
ভাবের মাত্রা বেড়ে যায় যখন বিমানবালা আসে,
মুড নিয়ে ঢোলা-সাহেব এটা ওটা চায়
বিদ্যুষী বিমানবালাকে যেন কাজের বুয়া পায়।
দেশে পৌঁছে চেকিং শেষে এয়ারপোর্ট ত্যাগ ক’রে
বাহিরে বাবা-ভাই দাঁড়িয়ে থাকে লোহার শিক ধরে,
ছুটে গিয়ে ভাইকে ধরে ক’রে আলিঙ্গন
বাবার বুকে ঢলে পড়ে ক’রে ক্রন্দন,
মায়ের কথা মনে পড়ে বোন কেমন আছে
জল্দি করে চলো বাড়ী কারে কিংবা বাসে,
বহুদিন পরে খোকাবাবু দম টেনে লয়
একটু আধটু ইংরেজী মেখে শুদ্ধ কথা কয়,
দেশের পানে চেয়ে দেখে অনেক পরিবর্তন
এরই ফাঁকে জীবন থেকে পাঁচটি বছর কর্তন,
ঘর দেখে, বাড়ী দেখে, দেখে নতুন স্বপ্ন
পরীর কথা মনে করে আনমনে হয় মগ্ন,
বাড়ী গেলে ছুটে আসে প্রতীক্ষারত মা’য়
বুকের মানিক জড়িয়ে ধরে একটু শান্তি পায়।
কত কথা মনে পড়ে, পুরানো যত স্মৃতি
পাড়াময় ঘুরতে বের হয় প্রাণে ছন্দ গীতি,
পরীকে শেষে দেখতে যায় গায়ে নতুন জামা
আঙ্গিনায় গেলে ছোট্ট খোকা ডাকে এসে মামা,
চম্কে উঠে চক্ষু তুলে দেখে সামনে পরী
সবুজ একখান শাড়ী পরা লাল পাইরে জরি,
কেমন আছো ? বলার মত সাহস পায় না আর
ভাবে, যাকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল সে এখন কার ?
একমাস পরে বিয়ে ক’রে টুকটুকে বউ দেখে
দুইমাস পরে ঋনের ভারে প্রবাসে যায় রেখে,
একা থাকে সাধের বউ ঘরের এক কোণে
বুকটা সতীর ভেঙ্গে পড়ে পতি বিহনে,
মন কাঁদে, প্রাণ কাঁদে, কাঁদে তার হিয়া
প্রণয়কাতর করে বন্ধু গেল ছাড়িয়া,
প্রশ্ন জাগে মনের মাঝে শুধাতে না পারে
বুকের উপর পাথর রুষ্ট দেখাবে যে কারে,
এমন সোনার যৌবন তার অঙ্গার হয়ে যায়
মজবুত লোহার পিঞ্ছরেও বেঁধে রাখা দায়,
বদ্ধ ছিল নদীর জোয়ার মরা খালের মত
তটের বাঁধ ধসেনি কভু হেনেছে আঘাত শত,
পতির ছোঁয়ার উত্তাল সাগর, খাল-নদী সব ভাসে
আমানতের জিনিসগুলো ক্যামনে রাখবে ক্যাশে,
পতিহীনা সতী নারীর মন বসে না ঘরে
জানালা খুলে দেখলে নজরে পরপুরুষ পড়ে,
এমনি করে সোনার যৌবন কয়দিন রাখবে বেঁধে
দিবা নিশি আঁচল ভিজে নীরবে কেঁদে কেঁদে,
চটফট করে অন্তরাত্মা রইতে না পারে ঘর
শেষে পরপুরুষ হয় আপন, আপন হয়ে যায় পর,
দিশেহারা হয়ে মা লিখে জলদি করে আয় বাছা
টাকা পয়সার দরকার নেই আগে বংশের মান বাঁচা।
সবার বেলায় হয় না এমন কেউবা ঘরে থাকে
শত ঝড়-ঝঞ্ছা হলেও নারী কেউবা ধৈর্য্য রাখে।
অন্যদিকে, পতিবর ছেড়ে ঘর থাকে পরবাসে
মনটা করে উড়–উড়– পাগলা বাতাসে,
মনে চলে উতল হাওয়া রঙিন মুখটা ভীড়ে
রাত বিরাতে আনমনে সে কাঁথা বালিশ ছিঁড়ে,
বউখান ঘরে ফেলে রেখে বিদেশ গিয়ে কাৎরায়
দিনে-রাতে-কর্মক্ষেত্রে শুধু বামপাশে হাতরায়,
মনের পাখি না পেয়ে সে হা-হুতাশ করে
দুনিয়াদারী গুড়িয়ে যায় সর্বনাশা ঝড়ে,
আকাশ ভাঙ্গে, পাহাড় ভাঙ্গে, ফাটে বুকের জমিন
প্রিয়াহীন দিনের-পর-দিন জীবনটা হয় বিলিন,
ফোন করে সে যখন তখন দিনে রাতে মিলে
মাসের বেতন পুরোটা যায় টেলিফোনের বিলে।
এমনি করে জীবনটা তার জটিল হয়ে উঠে
বছর না পেরোতে আবার ঘরের পানে ছুটে,
ছুটি পেলে ভাগ্যবান, পয়সা থাকলে ভাল
বউয়ের টানে গোল্লায় গেছে স্বজনদের মুখ কালো,
পাঁচ বছরে এলো একবার অনেক ডাকার পরে
বিয়ের বছর যেতে না যেতে এসে পড়ল ঘরে,
প্রিয়জনের তাচ্ছিল্য ভাব বিষের মত বিঁধে
ক্রমাম্বয়ে সংসারে এসে অশান্তি দানা বাঁধে।
সেই সফরে মাল’টাকে পায় নতুন এক রুপে
ভালবাসার গোপন স্মৃতি রেখে আসে চুপে,
ঘষা মেরে মাল থেকে সে তুলে দেয় ল
কানে কানে বলে কথা- ‘বউ কথা ক’,
নয় মাসে বউ মা হয়ে যায় প্রবাসী হয় বাবা
খুশীর জোয়ার বয়ে চলে ঠেকায় তাদের কেবা,
সন্তান পেয়ে মায়ের তখন ব্যস্ত সময় কাটে
যৌবন জোয়ার শিথিল হয়ে সুস্থ্য জীবন ঘটে।
ব্যতিক্রম কোন নিয়ম নয়, কথায় কথায় আসে
তার মাঝেও প্রবাসী কেউ চক্রান্তের জালে ফাঁসে,
কিছু কিছু রমণীজন ছেড়ে যায় ঘর
স্বামী-সন্তান ভুলে গিয়ে বেছে নেয় বর।
চার বছর পর রাত গভীরে আসে আবার বাড়ী
ছেলের জন্যে নিয়ে আসে নতুন খেল্না গাড়ী,
ভোরে দেখে একলোক মায়ের সাথে সুয়ে
জুতা একটা হাতে নিয়ে মারে ছেলে নুয়ে,
কোন্ বেটা তুই, কোথ্থেকে এলি, বল্ জলদি করে
মাইর খেয়েও তাকে তখন বুকে জড়িয়ে ধরে,
কী যে জীবন বেঁচে নিলাম; বেচারা প্রবাসী ভাবে
এমন বদ্-কপাল দুনিয়ায় কে পেয়েছে কবে ?
বাবা বলো, মা বুঝাবে- এটা তোমার বাবা
আদরের সন্তান ভাবে তখন কোথ্থেকে এলো হাবা,
হা হয়ে সে দেখে মুখে প্রবাসী খায় ধোকা
অন্য বাচ্চার সাথে যখন ডাকে তাকে কাকা,
দুঃখে তখন পরান যায় করবে যে কিবা
আদর চুমে শেখাতে যায় বলো একবার ‘বাবা’।
দেখতে দেখতে বয়স গড়ায় চল্লিশ আপ্
কীভাবে যে সময় যায় ওরে বাপ্রে বাপ্ !
ভাববে বসে; জীবনের সব সাধগুলো বাকী
প্রবাস জীবন সত্যি বুঝি দিল আমায় ফাঁকি,
যৌবন জোয়ারে ভাটা পড়বে আগে বুঝি নাই
বিদেশ থেকে দেশে এসে উচ্ছিষ্ট সব পাই,
আর থাকা নয় বিদেশে মোর আসতে হবে ফিরে
এই সফরই শেষ সফর থাকতে হবে ঘরে।
পয়তাল্লিশের কোটায় এসে করে হাহাকার
কাজ নাই, কর্ম নাই, পুরোদমে বেকার,
আয়ের পথ নিয়ে তখন কুল পায় না ভাবার
উপায় খুঁজে না পেয়ে করে মুরগীর খামার,
আগের মতই কষ্টেশিষ্টে দিনগুলো যায় কেটে
এছাড়া সে খুঁজে পায় না অন্য উপায় ঘেঁটে,
মনের কষ্ট মনে থাকে শুধাতে না পারে
শত চেষ্টায় সোনার জীবন আর আসেনা ফিরে।
কখনোবা দিবাস্বপ্নে তারুন্য জেগে ওঠে
রোমাঞ্চিত হলেও কেমন ভ্যাপ্সা বাতাস জুটে,
শান্তি যেন হয়ে যায় অচিন দেশের রাজকন্যা
কলিজা ফেটে বের হয় অশ্রুজলের অসীম বন্যা,
সর্বহারা, অসহায়, কিংবা বিরহী প্রেমিক ভাবে বসে
অনুশোচনায়, আপসোসে, মনের কষ্টে মুষ্টি কষে,
অমন সোনার যৌবন বুঝি হয়ে গেল ফিকে
প্রয়োজনের সময় রেখেছিলাম পরবাসের সিকে।
পঞ্চাশে গিয়ে হিসাব কষে দেখে কাকাবাবু
রোগে শোকে ডায়াবেটিসে হয়ে গেছে কাবু,
তবুও ভাবে; কী পেলাম আর কীবা হারালাম
ফাইনাল একাউন্টে বড় একটা শুন্য পেলাম,
অর্থ দিয়ে করলাম সম্পদ, বেছে না হয় পেলাম টাকা
সোনার যৌবন হারিয়ে গেল বিনিময়ে সবই ফাঁকা,
যাওয়ার কালে রেখে গেলাম মনহরন নেত্রকোণা
প্রবাস শেষে এসে পেলাম লম্বা এক ছেঁড়া তেঁনা,
সুখের জীবন পাওয়ার জন্য গিয়েছিলাম পরবাসে
এখন দেখি ভাল ছিল চলে যাওয়া বনবাসে,
দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল জীবনের ধাপ
প্রবাসী হয়ে থাকা যেন মস্ত অভিশাপ।
ষাট বয়সে মরণ চিন্তা রোজা নামাজে ব’সে
অবসরে কবিতা বানায় কবির কথার রেশে ঃ-
এখন যৌবন যার, রোমাঞ্চ করিবার সময় তার
পঁচিশ বছর বয়স যার, সংসার করিবার সময় তার
পয়ত্রিশ বছর পার, প্রবাসী হওয়ার সময় তার
পয়তাল্লিশ হল যার, ফিরে আসার সময় তার
সুখের জীবন আছে যার, হিসাব কষার সময় তার।
এতে কিছু অংশ ক্ষয় হলেও কিছু অংশ বাকী রয়
এক জীবনে সেইটুকু লাভ যেইটুকু স্বাদ পাওয়া যায়।
প্রবাসীর কষ্ট বোঝে না কেউ, বোঝে স্বার্থপরতা
টাকার যন্ত্র হতে গেলেই জীবনে বাজে বারোটা,
সুখের আসায় শুধু শুধু নিষ্ফল হয় সাধন
প্রবাস মানেই অশ্রুবিহীন শুষ্ক মরুদ্যান।
কী সুন্দর প্রবাস জীবন, বাহ্ !
অট্টহাসিতে অশ্রুপাত- হা হা হা হা হাহ্।