> মালয়েশিয়ায় ৩ লাখ শ্রমিকের পাসপোর্ট লাভ অনিশ্চিত!
মালয়েশিয়ায় ৩ লাখ শ্রমিকের পাসপোর্ট লাভ অনিশ্চিত!
গৌতম রায়, কুয়ালালামপুর থেকে
মালয়েশিয়া সরকার যখন অবৈধ বিদেশী শ্রমিকদের ওয়ার্ক পারমিট দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ তখন ৩ লাখ শ্রমিকের পাসপোর্ট প্রদানে জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। পাসপোর্ট বিতরনে হাইকমিশনকে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ থেকে ২৫ টি টীম পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ৩ মাসেও ২৫ টীম দিয়ে ৩ লাখ শ্রমিকের হাতে মেশিন রিডেবল্ পাসপোর্ট প্রদানের ঘাটতি পূরন হবে না। সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হাতের মুঠোয় ওয়ার্ক পারমিটের সুযোগ পেয়েও পাসপোর্ট সমস্যার কারনে হয়তো বৈধ হতে পারবে না বহু শ্রমিক। আর সরকারী পরিকল্পনার ব্যর্থতায় শ্রমিকরা বৈধ হতে বাধাগ্রস্থ হলে তা বর্তমান সরকারের সামনে নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে। এ ব্যর্থতা প্রকাশ পেলে যেমন সরকার বিরোধী শক্তির ইস্যু হতে পারে তেমনি বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তায়ও ধ্বস নামতে পারে। এ স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারকে আরো সচেতন হতে হবে বলে প্রবাসীরা মনে করেন।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সরকারের ত্রুটিপূর্ন সিদ্ধান্তের কারনে বাংলাদেশে বহু শুভ কাজ সফল হয় না। কিন্তু মালয়েশিয়ায় বহুল প্রত্যাশিত বাংলাদেশী শ্রমিকদের ওয়ার্ক পারমিট বিষয়ে কোন অদূরদর্শী বা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হলে বহু শ্রমিকের ভবিষ্যত অন্ধকার হয়ে যাবে। মালয়েশিয়া সরকার ওয়ার্ক পারমিট প্রদানের ঘোষনা দেয়া মাত্রই নতুন করে পাসপোর্ট করার হিড়িক পড়ে যাবে এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনে চাপ বাড়বে। আর এই স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারকে এখনই সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতায় কোন শ্রমিক বৈধ হতে না পারলে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে এ ইস্যুকে সামনে রেখে জনমত সৃষ্টি করে জনসমর্থন আদায় করে নিতে পারে। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্দ হয়ে উঠতে পারে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের পরিবারগুলো। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় অবৈধ শ্রমিকদের জন্য পাসপোর্ট বিতরনে সরকারী পরিকল্পনায় ধারনা করা হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ অবৈধ শ্রমিকের পাসপোর্ট বিতরনের ক্ষেত্রে সরকারকে হিমসিম খেতে হবে। কারন ৩ লাখ পাসপোর্ট ইস্যুর জন্য যে জনবল ও প্রস্তুতি প্রয়োজন তার ধারে কাছেও নেই সরকারী পরিকল্পনা। এতে বিপাকে পড়বে ওয়ার্ক পারমিট প্রত্যাশী শ্রমিকরা। হাতের মুঠোয় সুযোগ পেয়েও হা করে চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে।
কেন ৩ লাখ পাসপোর্ট প্রয়োজন?
গত কলিং ভিসায় মালয়েশিয়ায় ৪ লাখ ৭১ হাজার শ্রমিক আসে। শ্রমিকরা মালয়েশিয়া আসার পরপরই দালাল, এজেন্ট বা মালিকরা পাসপোর্টগুলো তাদের অধীনে নিয়ে যায়। চাকুরী না পেয়ে বা আউটসোর্সি কোম্পানী ও বিভিন্ন মালিকদের প্রতারনার শিকার হয়ে তখন থেকেই দলে দলে শ্রমিকরা কোম্পানীতে পাসপোর্ট ফেলেই অন্যত্র পালিয়ে গিয়ে স্বেচ্ছায় অবৈধ হতে বাধ্য হয়েছে। তৎকালে হাইকমিশনের একচেটিয়া দুর্নীতির কারনে বহু ভূয়া কোম্পানীতে এবং ছোট খাট কোম্পানীতেও প্রয়োজনাতিরিক্ত শ্রমিক সরবরাহের অনুমোদন দিয়ে শ্রমিকদের সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এসব শ্রমিকরা দেশের এখানে সেখানে পন্যদরে বিক্রি হয়েছে। প্রতারিত শ্রমিকরাই শুধু নয়, কর্মরত শ্রমিকদের হাতেও তাদের পাসপোর্ট নেই। অনেকে দালালকে ভিসা নবায়নের জন্য টাকা ও পাসপোর্ট তুলে দিলে দালাল সবকিছু নিয়েই উধাও হয়ে গেছে। এছাড়া মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনে ভিসা নবায়নের জন্য জমা দেয়ার পরও মাসের পর মাস হাজার হাজার শ্রমিক পাসপোর্টের মুখ দেখতে পায়নি। ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ন হবার পাশাপাশি অনেকের পাসেপার্টের মেয়াদও পেরিয়ে গেছে। বৈধভাবে আসা শ্রমিকদের পাশাপাশি বহু বাংলাদেশী যুবক মালয়েশিয়ায় ট্যুরিষ্ট ভিসায় এসেও অবৈধ হয়েছে এবং তাদের পাসপোর্টের কোন হদিস নেই। এতকিছুর পরও গত কয়েকটি বছর যারা একান্ত বাধ্য হয়ে মালিকের কাজে অল্প বেতনে জিম্মি হয়ে চাকুরী করছেন তারাও মালয়েশিয়া সরকারের দেয়া এ সুবর্ন সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুরানো পাসপোর্ট ফেলে নতুন পাসপোর্টে পারমিট লাগাতে চাইবেন। এসব বিষয় পর্যলোচনা করে ধারনা করা হচ্ছে গত কয়েক বছরে ক্রমশঃ ৩ লাখ শ্রমিকের পাসপোর্ট গায়েব হয়ে গেছে এবং ভিসা থাকলেও শতকরা ৯৫ জন শ্রমিকের অধীনেই তাদের পাসপোর্ট নেই। কমপক্ষে এই ৩ লাখ শ্রমিকের ওয়ার্ক পারমিট ভিসার জন্য নতুন পাসপোর্ট প্রয়োজন হবে। শুধু অবৈধ শ্রমিকই নয় একই সময়ে প্রয়োজন হতে পারে অন্যান্য পেশাজীবি বাংলাদেশী বা ছাত্রদের পাসপোর্টও। এ সময়ে অনেকের পাসপোর্ট মেয়াদ শেষ হতে পারে, চুরি, নষ্ট হতে পারে বা পাসপোর্টের পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যেতে পারে।
একটি পরিসংখ্যান। ১ লাখ পাসপোর্ট বিতরন সম্ভব
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই সরকার ২৫ টি টীম মালয়েশিয়া পাঠাবে পাসপোর্ট বিতরনের জন্য। প্রতি টীমে সদস্য সংখ্যা ২। এছাড়া হাইকমিশনেরও থাকবে আরো ২ টি টীম। অর্থাৎ ৫৪ জন বিশিষ্ট ২৭ টি টীম ৩ লাখ শ্রমিকের পাসপোর্ট বিতরন যুদ্ধে অংশ নিবে। বর্তমানে ডিজিটাল পাসপোর্ট ইস্যু করতে জম্মনিবন্ধন বা ভোটার আইডি কার্ড প্রয়োজন হচ্ছে। জম্মনিবন্ধন বা ভোটার আইডি কার্ডের নম্বর ছাড়া ফরম অসম্পূর্ন থাকবে। আর অসম্পূর্ন ফরম কম্পিউটারে গ্রহনযোগ্য হবে না। রয়েছে ছবি তোলা, ফিঙ্গার প্রিন্ট ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক নিয়ম কানুন। হাইকমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব আনুষ্ঠানিকতা সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে একজন শ্রমিকের জন্য ব্যয় হয় কমপক্ষে ২০ মিনিট সময়। সে হিসাবে প্রতি টীমের ২ জন সদস্য ঘন্টায় ৬ জনকে পাসপোর্ট দিতে পারে। দৈনিক অক্লান্ত শ্রম দিয়ে ১০ ঘন্টা কাজ করলেও একটি টীম ৬০ টি পাসপোর্ট দিতে পারবে। এর মধ্যে সাময়িক কর্মবিরতি বা অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষার কারনে ১০ টি পাসপোর্ট কম ডেলিভারি হতে পারে। তাহলে গড়ে দৈনিক ৫০ টি করে পাসপোর্ট বিতরন হলে ২৭ টি টীমের পক্ষে ধারাবাহিক কাজ করে গেলেও দৈনিক ১,৩৫০ পাসপোর্ট বিতরন সম্ভব।
মালয়েশিয়া সরকার ওয়ার্ক পারমিটের জন্য ৩ মাসের সময়সীমা নির্ধারন করে দিলে ঐ টীম ছুটির দিন ও শুক্রবারের জুম্মার নামাজের সময়সূচী অনুযায়ী কর্মবিরতির পর সময় পাবে মাত্র ৭২ দিন। এ হিসাবে ২৭ টি টীমকে দৈনিক গড়ে ৪,১৬৬ টি পাসপোর্ট বিতরন করতে হবে। যা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। অথচ সেখানে বিতরন হবে গড়ে ১,৩৫০ টি পাসপোর্ট। দৈনিক পাসপোর্ট ঘাটতি থাকছে ২,৮১৬ টি। যেখানে ৩ মাসে প্রায় ৩ লাখ পাসপোর্ট দরকার সেখানে ২৭ টি টীমের পক্ষে বিতরন করা সম্ভব ৯৭,২০০ পাসপোর্ট বা ১ লাখ পাসপোর্ট। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে বাকী শ্রমিকরা কি পাসপোর্টের কারনে বৈধ হতে পারবে না? এ প্রশ্নের সমাধান করতে হবে সরকারকেই। এ সংকট উত্তরনের জন্য হয় সরকারকে অতিরিক্ত তিনগুন টীম পাঠাতে হবে নতুবা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো বা মালয়েশিয়া সরকারকে বাংলাদেশীদের জন্য সময় বাড়িয়ে ৯ মাস করতে হবে। যা রীতিমত অসম্ভব। এছাড়া আর কোন পথ নেই।
যেভাবে সংকট কাটানো যায়
সরকারী সূত্রে জানা গেছে, উক্ত ২৭ টি টীমের ৩ মাসের জন্যই টিএ, ডিএ বাবদ খরচ পড়বে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা। অথচ সরকার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের এ অর্থ সাশ্রয় করে খুব সহজ উপায়ে এ সংকট মোকাবেলা করে যথাসময়ে ৩ লাখ শ্রমিকের হাতেই পাসপোর্ট তুলে দেয়া সম্ভব। এর চেয়ে অনেক কম টাকা খরচ করে বাংলাদেশ হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ও অধ্যায়নরত কয়েক ’শ শিক্ষিত যুবক ও ছাত্রকে সাময়িক দায়িত্ব দিলে যথাসময়ে ৩ লাখ পাসপোর্ট বিতরন সম্ভব। এতে একদিকে যেমন অর্থের সাশ্রয় হবে তেমনি মালয়েশিয়ায় শিক্ষিত বাংলাদেশী যুবকরাও সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এছাড়া জন্ম নিবন্ধন সনদ বা ভোটার আইডি কার্ডের বাধ্যবাত্তাও শিথিল করতে হবে। মেশিন রিডেবল্ পাসপোর্টের পাশাপাশি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও অর্ডিনারি বা হাতে লেখা পাসপোর্টও বিতরন করতে হবে এই জটিল সংকট উত্তরনের প্রয়োজনে। কাল বিলম্ব না করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই। কারন সময় ঘনিয়ে আসছে। মালয়েশিয়া সরকার যে কোন মুহুর্তে সকল বিদেশী শ্রমিকের বৈধতাকরনের ঘোষনাটি দিতে পারে।