ঢা বি সাংস্কৃতিক দল: গৌরবে সৌরভে স্মৃতিতে অমলিন

Fri, Sep 3, 2021 12:22 AM

ঢা বি সাংস্কৃতিক দল: গৌরবে সৌরভে স্মৃতিতে অমলিন

শামীমা চৌধুরী এলিস : (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো। বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

ছবিটা সাদাকালো। কিছুটা অস্পষ্ট। চার দশকের বিবর্তনে বিবর্ন। তবে ছবিটির বিষয় ঝকঝকে আয়নার মতো। সেই ঝকঝকে আয়নায় আমি দেখছি এক উজ্জ্বল-উচ্ছ্ল দীপ্তময় প্রহর। এক গৌরবময়  অধ্যায়। যে অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই অধ্যায়ের সুখময় রেশ আজও গৌরবে,সৌরভে স্মৃতিতে অমলিন।

প্রথম ছবিটিতে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের এক ঝাঁক তরুণ। সারাদিনের ক্লাস শেষে এদের ঠিকানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি।  রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী  বা আদর্শের ভিন্নতা  থাকলেও এখানকার আদর্শ  কেবল শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চা। কেউ সঙ্গীত, কেউ আবৃত্তি, কেউ নাটক, কেউ নৃত্য, কেউ স্ক্রিপ্ট রাইটিং নিয়ে মহা ব্যস্ত। হতাশা, নেশা , তথাকথিত কলুষ রাজনীতির ঢেউ এখানে লাগেনি। এদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড উৎসব মুখর করে রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন। সেই উৎসবের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে দেশ জুড়ে। ছবিটির সর্ব বাঁয়ের দ্বিতীয় মানুষটি একুশে পদক বিজয়ী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লিয়াকত আলী লাকি। তিনি ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি একাধারে ছিলেন সঙ্গীত শিল্পী,নাট্যশিল্পী,লেখক, নাট্য নির্দেশক,অভিনেতা, সংগঠক। এই সবগুলো গুনের  সমুন্বয়ে  তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ¯œাত  যাঁর ব্যক্তিত্বের ক্যরিশমা,গাইড, পরিশ্রম , ভালোবাসা এই তরুণদের নিয়ে আসে সাংস্কৃতির ছায়াতলে। তাঁর কাছে রাজনৈতিক মতাদর্শ নয় , গুনই ছিলো প্রধান। কবে এড়িয়ে চলতেন স্বাধীনতা বিরোধীদের।  লাকি ভাই যিনি আজও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের শত ব্যস্ততার  ভেতরেও কাছে টেনে নেন তাঁর সাংষ্কৃতিক দলে প্রিয়জনদের।

 

দ্বিতীয় ছবিটিতে সাংস্কৃতিক দলের সাভারে  জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবার দৃশ্য। আরেকটি ছবিতে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় নৃত্যের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করছেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান। পাশে আরেক প্রখ্যাত নৃত্য শিল্পী নৃত্যগুরু রাহিজা খানম ঝুনু। সাযোগিতা করছি আমি , আনিস (প্রয়াত),লাকি ভাই। অরেকটি ছবিতে গানের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করছে আনিস। মঞ্চে  ওস্তাদ আখতার সাদমানী , নীলুফার ইয়াসমীন। সহযোগিতা করছি আমি আর লাকি ভাই। ছবিগুলোর কথা বলা হলো এ কারণে ,এখনকার ছেলেমেয়েরা দেখুক -  জানুক সেই স্বর্ণ অধ্যায়ের কথা।

 

এই দলটি লাকি ভাই গড়ে তুলেছিলেন এমন একটা  সময় যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত হানছে ক্ষমতার রোমশ কালো হাত। পাঁচ বছর আগে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ হন স্বপরিবারে। দেশ জুড়ে অবরুদ্ধ শোক। রাজনীতিতে চলছে  ভাঙ্গা গড়ার খেলা।  ডাকসুর  ক্ষমতায় জাসদ ছাত্রলীগ। লাকি ভাই নতুন স্বপ্ন দেখলেন, নতুন স্বপ্ন দেখালেন। লাকি ভাইয়ের উদ্দেশ্য , ধ্যন জ্ঞান  এ দেশে সুস্থ সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। তাঁর সপ্নের সাথে এক হলো কিছু তরুণের স্বপ্ন। গড়ে উঠলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।

 

আমি আশির দশকের কিছু কথা বলছি। এই দলের সাংস্কৃতিক চর্চা চলতো বিভাগ অনুযায়ী। নাটক,সঙ্গীত,আবৃত্তি,নৃত্য আলাদা আলাদা বিভাগ। আবার যার অনেক গুণ সে একাধিক বিভাগের সদস্য হতে পারতো। যেমন ডালিয়া আহমেদ আবৃত্তি ও নৃত্য দুটো বিভাগেরই সদস্য ছিলো। সদস্য হতে হলে ছাপানো ফর্মে আবেদন করতে হতো । তারপর হতো ইন্টারভিউ। রীতিমত পরীক্ষা। দুরু দুরু বক্ষে সেই পরীক্ষা দিয়েছিলাম বেশ মনে আছে। আমি গান গাইতাম । কিন্তু চর্চা না থাকায় সঙ্গীতে আবেদন করার সাহস পাইনি। কারণ যোগ্যতার বিষয়ে লাকি ভাই ছাড় দিতেননা। আমার বিষয় ছিল আবৃত্তি। সিলেক্ট হওয়ার পর প্রত্যেককে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। লাকি ভাই ছাড়াও দেশ বরেন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা আমাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। আমাদের আবৃত্তি বিভাগে তৎকালীন ভারতের এনএসডি থেকে পাশ করে আসা ভাস্বর বন্দোপাধ্যায় প্রশিক্ষণ দিতেন। এ ছাড়াও নরেন স্যার, আশরাফুল আলম,জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, বিপ্লব বালা ইনারাও অতিথি প্রশিক্ষক হিসেবে আসতেন। আবৃত্তি বিভাগ থেকে  আমরা অনেগুলো প্রডাকশন করেছিলাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বিষ্ফোরণের বৃন্দ গান’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চন্ডালিকা’ ইত্যাদি।। চন্ডালিকায় আমি মায়ের রোলটি করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, জাতীয় দিবসগুলোতে আমরা অংশ নিতাম। এই বিভাগে আমরা যারা নিয়মিত অংশ নিতাম তাদের মধ্যে আমি ছাড়্ওা গীতিআরা নাসরিন, ডালিয়াআহমেদ,জেসমিন, নাসিম আহমেদ,শায়লাআহমেদ লিপি,চয়ন,ইব্রাহিম ফাতমী,আনিস,জুবায়ের আহমেদ নয়ন, রহিমা আক্তারসহ (এ মুহুর্ত্তে¡ অনেকের নাম মনে করতে পারছিনা) অনেকেই ছিলাম। প্রত্যেকে ভালো পারফরমার ছিল। প্রত্যেক বিভাগের  পারপরমেন্স ছিলো খুবই উঁচুমাপের। আমাদের পথ নাটক স্বৈরেচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আমাদের অনেকেই এখন দেশের প্রথিতযশা শিল্পী।  আমাদের সবচেয়ে বড় অবদান আমরা স্বৈরেচার বিরোধী গণ আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলাম। আমাদের জীবনে ঝুঁকি ছিল তবুও পিছুপা হইনি। আমাদের সঙ্গীতে, নৃত্যের ঝংকারে , আবৃত্তির ছন্দে, নাটকের সংলাপের ভেতরে ছিলো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সাহসী উচ্চারণ। ডাকসুর সাংস্কৃতিক উৎসবের বিভিন্ন দায়িত্বও আমরা পালন করেছি লাকি ভাইয়ের নেতৃত্বে।

 

আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে -আয়োজনে দেশবিদেশের খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতি আমাদের গর্বিত করে তুলতো। একবার ভারতের বরেন্য শিল্পী ভুপেন হাজারিকা  এসেছিলেন। সেই আন্তরিক সময়টুকু আজও হৃদয়ে  ধারন করে আছি।

৮০-৯০ দশক এরপর পেরিয়ে গেছে এতো গুলো বছর। ব্যক্তিগত- পেশাগত কারণে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়েছি বটে তবে রয়ে গেছি হৃদয়ের কাছাকাছি। স্মৃতিতেও জমেছে ধুলো। অনেকে চলে গেছে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে। তারপরেও আমাদের প্রিয় সহযোদ্ধা অসি.লতা,শ্যামল এদের আন্তরিক উদ্যোগে আমরা বেশ কয়েকবার মিলিত হয়েছি- সেখানে লাকি ভাইয়ের উপস্থিতি ছিল  সরব। বিশেষ করে লাকি ভাইয়ের একুশে পদক প্রপ্তিতে সংবর্ধনার অনুষ্ঠানটির কথা স্মরণীয়। ২০২০ (করোনা সংক্রমনের আগে)  সালে আমরা পেলাম সংবর্ধনা। মনে হলো, না আমরা আজও ফুরিয়ে যাইনি। এখনও আমরা জেগে উঠতে পারি-জাগাতে পারি। আয়োজকদের কাছে ঋণের শেষ নাই। আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক দল থেকে যে শুদ্ধ শিক্ষা পেয়েছি তার আলোয় আজও পথ চলতে পারি সাবলিল ভাবে। অন্তত মানুষকে ভালোবাসতে পারি, বাঙলার মাটির মাটির গন্ধ মাখা সাংস্কৃতির কথা বলতে পারি।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান