অনাবিল আনন্দে ভরা দিনগুলো

Tue, Aug 31, 2021 9:42 AM

অনাবিল আনন্দে ভরা দিনগুলো

সুনীতা সাহা রায় : (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল একটি আন্দোলনের নাম, একটি জাগরণের নাম,  এমন একটি নাম যে,যে কোন অবস্থান এ থেকে চিন্তা করলেই চোখে মুখে আনন্দের ছোঁয়া চলে আসে। সেই সময়ের কত শত স্মৃতি সব লিখে শেষ করা যাবেনা ।জীবনকে আনন্দের বন্যায় ভাষিয়ে দিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করার আনন্দঘন সময় ছিল সাংস্কৃতিক দলের সময়গুলো। এটা একান্তই  আমার উপলব্ধি। সেই সময়গুলো অল্প করে গুছিয়ে বলা খুব কঠিন, তবুও চেষ্টা করছি।

প্রিয় বন্ধু আহমেদ হোসেন দায়িত্ব নিয়েছে দলের সদস্যদের স্মৃতিচারণ লিপিবদ্ধ করার। নিজে ভালো লিখতে পারিনা বলে কোন ভাবেই সাহস পাচ্ছিলাম না। দাদামনির উৎসাহে আর বন্ধুর অনুরোধে চেষ্টা করছি।

 

এবার একটু নিজের কথা দিয়ে শুরু করছি। সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্ম হয়ে ছোটবেলা থেকেই গান শেখার সুযোগ হয়েছিল। আমার বাবা ছিলেন একমাত্র শ্রোতা,আর পরিবারের মা,মামা, মাসী, পিসি, কাকা, ভাই, বোন সবাই গান করতেন।মা অসাধারণ  গাইতেন। আর ছোট মামা শুশান্ত সাহা সেই সময়ে তুখোড় অলরাউন্ডার ছিলেন। তাকে দেখেই নাচ,নাটকের প্রতি উৎসাহিত হওয়া। একেবারে ছোটবেলাতেই ভারতেশ্বরী হোমস্ এ পড়তে যাওয়া, আর সেখানে পড়াকালীন সময়ে নিয়মিত সবাই নাচ,গান,নাটক করতো, আমিও এই মাধ্যমগুলোতে পুরোপুরি জড়িত ছিলাম। তারপর কলেজেও সব অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করেছি।

 

তারপর এক সময় দাদামনি শান্তনু সাহা রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো এবং কিছুদিন পর সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হলো। দাদা যখন ছুটির দিনে বাড়ী ফিরতো তখন আমার প্রশ্নের বন্যা বয়ে যেত। কোথায় অনুষ্ঠান হবে ? কি কি গান করবে? কারা করবে? আরও কতকিছু। মাঝে মাঝে রাগ হয়ে বলতো "তুই কি কাউকে চিনিস?" তবুও বলতাম বলনা প্লিজ। সেই সময়ে ভাবতাম কবে  আমিও ঐ দলের সদস্য হতে পারবো। দেখতে দেখতে একদিন সেই সুযোগ এসে গেল । শান্তনুর ছোট বোন বা যে কোন কারনেই হোক খুব সহজেই দলে ঠাঁই হয়েছিল। অডিশন কেমন হয়েছিল এখন আর মনে নেই।

 

 আমাদের দলের প্রধান বহুল আলোচিত  শ্রদ্ধেয় লিয়াকত আলী লাকী। কি এক অসাধারন ক্ষমতায় আবদ্ধ করে রেখেছিলেন সবাইকে। সবার মনের মনিকোঠায় বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলেন। কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই দলের সমস্ত সদস্যরা দিনের পর দিন সময় দিয়ে সমস্ত অনুষ্ঠান গুলোকে সাফল্যমন্ডিত করেছে। এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রিয় লাকী ভাইয়ের জন্য। লাকী ভাই শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি একজন শিল্পের কারখানা।অসাধারণ ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব।

 

আমার জীবনের সবচাইতে আনন্দের সময় ছিল সেই সময়টা। দলের হয়ে প্রায় সব মাধ্যমেই অংশগ্রহণ করেছি, যদিও নাচটাই আমার প্রধান বিষয় ছিল।বিশ্ববিদ্যালয় দিবস, কবিতা উৎসব, টিএসসি চত্বরে, বিভিন্ন হলগুলোতে, টিএসসি সড়ক দ্বীপে, শহীদ মিনারে, দেশের বিভিন্ন জেলাতে, অলিতে, গলিতে, অনুষ্ঠান এর ধুম চলেছে। আমাদের অনুষ্ঠিনগুলি সুপরিকল্পিত। মহড়া হতে দিনের পর দিন। কখনো অনুষ্ঠান পেয়েছি তুমুল হাততালি, আবার কখনো কখনো সমালোচনা, অর্ধেক অনুষ্ঠান করে চলে যাওয়া, অনুষ্ঠান বন্ধ করা। পুরো সময়টা ছিল রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাল। মিছিল, মিটিং, টিয়ার গ্যাস,লাঠি চার্জ, বিনা নোটিসে হল ছেড়ে দেয়া, সব কিছুই ছিল সেই সময়ে। এসব কোনকিছুই  লাকী ভাইয়ের দলকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। দল তার নিজের গতিতে চলেছে। আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল পুরো জাতির কাছে দৃষ্টান্ত। তৎকালীন  পত্রিকার ছবিগুলো সে কথাই বলে।

 

দলের সবার সাথেই আমার ভীষন ঘনিষ্ঠতা ছিল। সবার নাম লিখে শেষ করা যাবে না। তাই নাম উল্লেখ করছি না, সেইজন্য ক্ষমা চাইছি। তবে টিএসসিতে জামান স্যার অবসর নেয়ার পর প্রিয় মুনীর ভাইয়ের রুমে আড্ডা, অমায়িক রহিম ভাইয়ের স্নেহ, মিষ্টি ডালিয়া আপার মধুর ব্যবহার, প্রিয় বন্ধুদের সান্নিধ্য, ধাম গ্রুপের সাথে রিহার্সেল ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে যাওয়া- ফিরে এসে সবার কাছে বকা খাওয়া, ভ্যান গাড়িতে চড়ে গান গেয়ে মেডিক্যাল এর ক্যান্টিন খেতে যাওয়া, সাইন্স ল্যাবরেটরিতে লিপি আপার অফিসে দল বেঁধে ধর্না দেয়া, ওনাদের ক্যান্টিন এ খেতে যাওয়া, এসব স্মৃতি বড়ই আনন্দদায়ক। খুব মনে পড়ে টিএসসির সেই বাচ্চা ছেলেটির কথা- দৌড়ে এসে বলতো "আপা কাপটা ভালো কইরা ধুইসি, চা খাইবেন না"। পেয়ারু ভাইয়ের স্টুডিওতে যাওয়া। রিহার্সেলের ফাঁকে চা,সিংগারা,পুরী খাওয়া। আরো কত শত মধুর স্মৃতি।

 

সেই সময়ে কত বিষয় নিয়ে গল্প হতো আর গল্প নিয়ে নির্মল হাসির বন্যা বয়ে যেত। জীবনটা তখন কতো সহজ ছিল।এক নির্মল, অনাবিল আনন্দে ভরা। কত ছোট ছোট বিষয়ে সবাই আনন্দিত হতো, বিনা দ্বিধায় সবাই সবাইকে সাহায্য করতো। জীবনটা আসলে তখন স্বপ্নের মত বয়ে চলেছিল। চিন্তা,ভাবনাহীন শুধুই উচ্ছ্বল আনন্দে ভরা। আর এই সবকিছুই সম্ভব হয়েছিল দলের গুরু প্রিয় লাকী ভাইয়ের কারণে । ওনার সান্নিধ্যে এমন কোন মুহূর্ত কখনো খারাপ কাটেনি। লাকী ভাইয়ের মজার গল্প সবার কাজের উৎসাহ যোগাত, উনি ছিলেন আমাদের মধ্যমনি। প্রার্থনা  করি লাকী ভাই যেনো সবসময় ভালো থাকেন সবাইকে নিয়ে।

 

রোকেয়া হলের পনেরো নাম্বারের কথা উল্লেখ না করলেই নয়, সবাই আমরা দলের সদস্য ছিলাম। নাচ, গান, নাটক, আবৃত্তি, উপস্থাপনা সব মাধ্যমগুলোতে । কৃষ্টি, আল্পনা,অনিতা,সুনীতা - এই চার নাম চির জীবনের জন্য আবদ্ধ হয়ে আছে। বাস্তবতার কারনে দুরত্ব হলেও মনের দুরত্ব কম হয়নি, আর তাই এখনো নিয়মিত যোগাযোগ হয় আমাদের।

" আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী" এই শ্লোগান নিয়ে চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। সুন্দরের প্রতিনিধিত্ব করেছেন নির্বিশেষে সবাই। তবে সুন্দরের পিছনে অসুন্দরও কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছে। যদিও তা কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। সুন্দর সব সময়ই সুন্দর, সুন্দরের কোন বিকল্প ব্যাখ্যা নেই। তাই সবাই সুন্দরকেই বেঁছে নিয়েছে আর সুন্দরের জয় হয়েছে।

 

সবাই খুব  ভালো থাকুন আনন্দে থাকুন এই প্রার্থনা।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান