স্মৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল

Tue, Jul 27, 2021 11:54 PM

স্মৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল

তানভির জহির

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

শিল্প-সংস্কৃতির কোন শাখায় তেমন কোন রকম দখল না থাকা সত্ত্বেও করার তাগাদা প্রবল থাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলে যোগ দিলাম। ভেবেছিলাম আর পাঁচজন সংস্কৃতিকর্মীর সঙ্গগুনে নিজেও ওরকম হয়ে উঠবো। ভুল ভেবেছিলাম।

কিন্তু যে সঙ্গীতশিল্পী গান গেয়ে আসর মাতান তাঁর বসবার জন্যে তাকিয়াটা বিছিয়ে দিতে হয়, তিনি গানের ফাঁকে আদা-চায়ে চুমুক দিতে চাইলে চা-টা বানিয়ে কিম্বা এগিয়ে দিতে হয়। এঁরা শিল্পীর সহযোগী, সহযোগী-শিল্পী না হলেও। শিল্পীর দলেরই লোক তারা। অভিনয় বিভাগে সেই হিসেবে আমিও সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হলাম। ভালোই হয়েছিলো। খুব জরুরী একটা শিক্ষা অর্জন করেছিলাম সেখানে। দল বেঁধে কাজ করবার শিক্ষা, টিমওয়ার্ক।

শিক্ষাটা দিয়েছিলেন মুনির ভাই। তিনি বলেছিলেন সাংস্কৃতিক দলের কর্মপরিকল্পনা করেন যারা তাঁরা বুদ্ধিমান মানুষ, আর করেন দলের মাথা অর্থাৎ লাকি ভাই। তিনি অন্যের সাথে পরামর্শ করে পরিকল্পনা করতেন কিনা জানিনা। অন্তত আমার সাথে করতেন না। দলের হয়ে যারা নাচ-গান-অভিনয় করে মঞ্চ আলো করতেন তাঁরা দলের মুখমণ্ডলস্বরূপ। এঁদেরকে দেখেই অনেকে দলকে চিনতেন। বিরূপাক্ষ পালকে দেখলেই যেমন অনেকের ক্ষুধা লাগতো। আর দলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যারা খাটা-খানি করতো তাঁরা দলের হাতপাস্বরূপ। এই হাত পায়ের গুরুত্ব মুখমণ্ডলের চেয়ে কম বা বেশি নয়। তাঁরা সবাই একই দেহের অংশ। এই মানবদেহের উপমাটা আমার খুব মনে ধরেছিল। হাতপায়ের গুরুত্ব বুঝতে পেরে কাজে উৎসাহ পেতাম। এই সময় বুঝতে পারি আমার মতো হাতপা দলে আরও অনেক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে দলে পারফর্মারদের চেয়ে কাজের লোক ছিল বেশি, কারণ পারফর্মারদের অনেকে কাজের লোকও ছিলেন, যদিও কাজের লোক সবাই পারফর্মার ছিলেন না।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সাথে আমার যোগাযোগ যতটা মনে করতে পারি তার পুরোটাই সুখস্মৃতি, কিছুমাত্র তিক্ততা নেই এর মধ্যে। সদস্য হওয়ার জন্যে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে লাকি ভাইয়ের চোখা চোখা প্রশ্নের বোকা বোকা উত্তর দিয়েও ফেল মারতে পারলাম না। শ্যামল চৌধুরী'দা, সুজিত ভাই, লেমন ভাই, সামলু ভাই, পিনু'দা এমন অনেকেই দলের সঙ্গীতের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন দলের সবাই মিলে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে হবে একটা অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটা হয়েছিলো কলাভবন ও রেজিস্টার বিল্ডিঙয়ের মধ্যিখানের সবুজ মাঠে। টিএসসির দোতলার অনুশীলন কক্ষের মধ্যে যে কয়জন উপস্থিত ছিল তাঁদের সবাইকে নিয়েই গানের মহড়া শুরু করতে চাইলেন লাকী ভাই। মূল দায়িত্ব বোধহয় শ্যামল চৌধুরীর। কপালের ফেরে আমিও সেখানে ছিলাম। ঠাণ্ডা মাথায় শ্যামল'দাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম ভুল মানুষকে গানের দলে টানতে চাইছিলেন তিনি। জীবনে বহু কাজে ব্যর্থ হয়েছি, তাঁকেও বুঝাতে ব্যর্থ হলাম। ফলে দাঁড়াতে হল গান গাইতে। সামান্য সময়ের অনুশীলনেই তিনি ভুল বুঝতে পেরে আমাকে দল থেকে বের করে দিলেন, আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তাঁর গর্ব ছিল সবাইকে দিয়েই তিনি গান গাওয়াতে পারতেন। আমাকে দিয়ে সেটা হল না। তাঁর গর্ব খর্ব করতে পেরে ভারি আনন্দ পেয়েছিলাম।

 

লোকনাট্যদল আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল এক নয়, তবে দলের নাটক বিভাগের সদস্যরাই লোকনাট্যদলে কাজ করতেন। টিএসসির দোতলায় মহড়া হচ্ছিলো তার। লাকি ভাই বললেন যারা নাটকে অভিনয় করছিলো না তাদেরও মহড়া দেখা উচিৎ কারণ সেখান থেকে ভবিষ্যৎ নাট্যশিল্পীদের শেখার আছে অনেক কিছু। তাই সেখানে গিয়ে বসে থাকতাম। তখন এ মিড সামার নাইটস ড্রিম নাটকে সাইফুল ভাই লাইস্যান্ডার সেজে লাফঝাফ করছেন, রিতা সেজেগুজে হারমিয়া হত, সুনীতা'দি হতো হেলেনা। লাকি ভাই সাজতেন নিক বটম। ভারি আগ্রহ নিয়ে দেখতাম। সবগুলো চরিত্রের নাম মনে নেই। একদিন সকালের দিকে গেছি মহড়া দেখতে। দেখি মহড়াকক্ষে থমথমে পরিবেশ, কাজ বন্ধ। কিসলু ভাইকে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন একজন গুণ্ডা প্রকৃতির ছাত্র একটু আগে সেখানে গিয়ে তম্বি করেছে, দুএকটা চেয়ারও ভেঙ্গেছে, কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করেও থাকতে পারে। দাবী করে গেছে যেন টিএসসিতে এসব “বেলেল্লাপনা” না করা হয়। কোন কাজটা বেলেল্লাপনা এবং কেন সে এমনটা দাবী করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন এসব গুণ্ডা ছেলেদের মনের গতিপ্রকৃতি তিনি বুঝতে পারেন না। যারা বিএনপি করে তারা কি নিজেরাই নিজেদের কাজ ব্যাখ্যা করতে পারে? এই গুণ্ডাটা ছিল ছাত্রদলের নেতা তকদির হোসেন জসিম, বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা দখল করে অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করছিলো সে। এর পরে যতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম এক আদর্শের সৈনিকদের মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেছি। দুএকজন ছাড়া এদের কারো মধ্যে আদর্শের কোন লক্ষণ দেখিনি।

 

গাজিপুরের বনাঞ্চলে একটা বাংলো লাকি ভাইয়ের মনে ধরেছিল। তিনি চেয়েছিলেন সাংস্কৃতিক দলের একটা পিকনিকের আয়োজন করতে সেখানে। তিনি বলেছিলেন দেশের সমস্ত সুন্দর জায়গাই সেনাবাহিনীর জন্যে সংরক্ষিত থাকতে পারে না। সেটা ছিল সেনাশাসনের সময়। দেশের ভালো সবকিছুই তখন সেনাবাহিনীর জন্যে বরাদ্দ থাকতো। পিকনিকে অনেক মজার প্রতিযোগিতা হয়েছিলো। একটা ছিল দৌড়ের। দৌড় হয়েছিলো পাকা রাস্তার ওপর। মেয়েদের দৌড়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটে, একটা মেয়ে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যায় পাকা রাস্তায়। তাঁর হাতপায়ের অনেক জায়গায় ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরুতে থাকে। তাঁকে ধরাধরি করে বাংলোর ভেতরে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পিকনিকের বাকি অংশের প্রায় সবটাই মেয়েটার কাটে সেই ঘরে শুয়ে। এমন সুন্দর একটা জায়গায় পিকনিক করতে গিয়ে মেয়েটাকে ঘরে আটকে থাকতে হচ্ছে ভেবে খারাপ লাগছিলো ওর জন্যে। তাই একবার ওর ঘরে গেলাম কথা বলতে। একটু পরেই বুঝতে পারলাম আমার সাথে কথা বলায় উৎসাহ পাচ্ছিলেন না তিনি। ফলে তাঁকে বিরক্ত করি নি আর। বেশ কিছুদিন পরে মেয়েটাকে দেখলাম টিএসসিতে, পাঁচিলের ওপর বসে আর দুএকজন বান্ধবীর সাথে চা পান করছিলেন। তখন টিএসসিতে দেয়ালে উপর বসে চা খাওয়ার আনন্দ অন্যরকম ছিল।

সাংস্কৃতিক দলের খুব উৎসাহী ও সক্রিয় সদস্য ছিলেন যারা তাঁদের অনেকেরই নাম মনে আছে। যে মেয়েটা নাম সবচেয়ে বেশি মনে আছে তার নাম মেহেরুন্নেসা লাকি। স্ত্রীর নাম কি বিস্মৃত হবার সুযোগ থাকে বলুন ! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থাকাকালীন তার সাথে সু-সম্পর্ক তৈরি হয় আর অল্পসময় পরে তাকেই বিয়ে করি। সেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের সদস্য ছিলো। তবে আমার মতো নির্গুণ সদস্য নয়, সুকণ্ঠী গায়িকা। যদিও দলে সে ততটা সক্রিয় ছিলো না । সে রোকেয়া হলে থাকত আর অবসরে হলে বসেই বান্ধবীদের সাথে গুলতানি মারতে পছন্দ করত। আমার মতো টিএসসিতে এসে ভ্যারেণ্ডা ভাজতো না। লাকিই আমাকে দলের এই স্মৃতিচারণের উদ্যোগটার সন্ধান দেন। ধন্যবাদ মেহেরুন্নেসা লাকি! তোমার কারণেই কিছু একটা লিখতে পারলাম।

 

ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট সকলকে যারা এই মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন কারণ স্মৃতি সতত সুখের।

 

জয়তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জয়তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান