লেখক কি হতেই হবে? 

Sat, Feb 13, 2021 9:22 PM

লেখক কি হতেই হবে? 

শোয়েব সাঈদ: আমাদের সময় পত্রিকায় রাজনৈতিক ভাষ্যকার, লেখক জনাব মহিউদ্দিন আহমদের অভিযোগ দেখলাম উনার লেখা হুবহু মেরে দিয়ে ফেসবুকে আর পত্রিকায় অন্যের নামে ছাপা হবার ঘটনায়।

না, এটি নতুন কোন অভিযোগ নয়, লেখালিখির সাথে জড়িত জনদের এধরনের চুরিচামারির সাথে মাঝে মধ্যেই দেখা সাক্ষাৎ হয়। তবে এগুলো প্রতিরোধে কঠোর হওয়া উচিত। 

আমার অনেকবার হয়েছে, আমার নামটি বাদে বাকী লেখাটুকু দাড়ি, কমা সহ হুবহু ছাপিয়ে দেবার ঘটনাও আছে।

মানুষ হচ্ছে বুদ্ধিভিত্তিক বৈচিত্র্যে বিস্ময়কর ক্ষমতাধর এক প্রাণী। নানাগুনের সমাহারে আবার সবার সবগুন থাকবে তাও কিন্তু নয়। তবে প্রায় সবারই কোন না কোন শক্তিশালী দক্ষতার পাশাপাশি অদক্ষতার ক্ষেত্রও থাকে।

অসম্ভব মেধাবী মানুষ, কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারেন না,  আবার বলতে পারছেন কিন্তু গুছিয়ে লিখতে পারেন না। এই অবস্থায় সহজাত অদক্ষতার জায়গায় সময় নষ্ট না করে সহজাত দক্ষতার জায়গায় বেশী বেশী নক করাই তো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ।

লেখা যার সহজাত দক্ষতা নয়, উনার তো চুরি করে লেখক সাজার দরকার নেই।  নিজের দক্ষতার জায়গায় আলো ছড়িয়ে প্রকাশিত হওন।

লেখক হবার তো কোন শর্টকার্ট রাস্তা নেই, এর জন্যে দরকার চর্চা আর পড়াশুনা যার অভাব থাকলে নকল করার প্রবণতা তো জাগবেই। একজন নিষ্ঠাবান লেখক লিখতে যে সময় দেন, লেখাটির জন্যে পড়াশুনায়ও যথেষ্ট সময় দিতে হয়। গরুর রচনার সময়কাল থেকে স্তর উত্তরণ না হলে লেখক হবেন কি করে? যার পড়ার অভ্যাস নেই তাঁর তো লেখক হতে চাওয়া উচিত নয়।

সমাজে মানুষ কতকিছু হতে চায়, দক্ষতা থাকলে হতে বাধা নেই, পথটা অবৈধ না হলেই হল। আপনার আয়-রুজি, পদ পদবির ঝলকানিতে সমাজে একটা পরিচয় আছে, আরও নতুন নতুন পরিচয় দরকার, এর সাথে সহজাত জ্ঞান বুদ্ধি চর্চায় দক্ষতা আছে, সময়ও দেন, ভালো লিখেন,  মন্দ তো নয়,  লেখালিখি করতেই পারেন, তাতে সমাজ উপকৃত হয়। 

কিন্তু জ্ঞান বুদ্ধি চর্চার সহজাত অদক্ষতায় শুধু আর্থিক গরিমায় হঠাৎ লেখক হবার ইচ্ছে  হলে লোক হাসিয়ে ক্লাউনও হতে পারেন।

এসব ইচ্ছে অনিচ্ছার মাঝে মূল প্রশ্নটা হচ্ছে লেখক কি হতেই হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরটি কিন্তু খুব সহজ নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর উৎসজাত অনেকগুলো ফ্যাক্টর যার অন্যতম হচ্ছে “লোভ”। আর্থিক লোভের পাশাপাশি  জাতে উঠার “লোভ”টিও কিন্তু খুব ভয়ানক হয়ে উঠছে ক্রমশ। “বেগম পাড়া” লুটেরা  কনসেপ্টে আর্থিক আর জাতে উঠার উভয় লোভই কিন্তু  বিরাজমান।   

লোভের এই ব্যাধি গ্রাস করছে উচ্চ শিক্ষিত সুশীল সমাজ থেকে আমলা, রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী থেকে স্বল্প শিক্ষিত অদক্ষ জনশক্তিকে পর্যন্ত।

আমাদের দেশে ডিসি, এসপি, মেজর, ওসি ইত্যাদি সেজে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতারণাগুলোর মধ্যে শুধু আর্থিক স্বার্থ নয়, দীর্ঘদিন ধরে সমাজে ক্ষমতার অবাধ চর্চার যে পকেটগুলো তৈরি হয়েছে তার প্রতি মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা জনিত আকাঙ্ক্ষাও জড়িত, জড়িত “আমি একটা কিছুর” মেকি ভাবসাব। 

পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত সমাজে ক্ষমতার এমন সব ভারসাম্যহীন পকেট সৃষ্টির সুযোগ নেই, জনগণের কাছে এই সব পদপদবির কোন আবেদনও নেই, সুতরাং প্রতারণার ক্ষেত্রও নেই।

প্রবাসী বা অভিবাসীদের মধ্যে প্রথম জেনারেশনে আবার আমাদের সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকটির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। জনাব মহিউদ্দিন আহমদের অভিযোগ যার দিকে তিনি আবার ভিয়েনা প্রবাসী। 

অনেক প্রবাসী বা অভিবাসীদের মধ্যে সত্যিকারের পজিশনের চাইতে গ্ল্যামার সর্বস্ব পরিচয়টি অনেক বেশী আকর্ষণীয়। প্রথম জেনারেশনের অনেক অভিবাসীর ফেসবুকে পরিচয়ের বিবরণ দেখে মাথা ঘুরে যাবার অবস্থা। চারিদিকে হাজার হাজার বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেটের ছড়াছড়ি।

অনেক ক্ষেত্রে কর্পোরেট চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ইত্যাদি নানা ভারী ভারী পদ-পদবীর আয়বিহীন কাগুজে ভিড়ে সত্য-মিথ্যার লুকোচুরিতে বিভ্রান্তি অনিবার্য। অভিবাসী জীবনে কন্সালটেন্ট পদটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশী এবিউজড। বিয়েশাদীতে প্রবাসী পাত্র নির্বাচনে এগুলি বাড়তি সংশয়ের ক্ষেত্র বটে।

কিন্তু অভিবাসীদের দ্বিতীয় জেনারেশন অর্থাৎ প্রবাসে শিক্ষা দীক্ষায় বেঁড়ে উঠা সন্তানদের কাছে এই হাস্যকর বিষয়গুলির কোন আবেদন নেই বরং লজ্জা শরমের বিষয়। সততা আর নিষ্ঠায় আলোকিত যার যার অবস্থানটুকু ছাড়া বাড়তি কোন প্রকাশ নেই এদের। পিতামাতার দেশীয় স্টাইলে পদ পদবীর গ্ল্যামারে নিজের সত্যিকারের অবস্থানটুকুকে অপমানিত করতে এদের অনিহা এবং এই অনিহাই এদেরকে সত্যিকারের পজিশন ছুঁতে সাহায্য করছে বৈকি।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান