জাপানে লুকাস? প্রশ্ন টা শুনে ভড়কে গেলেন বুঝি?

Sat, Feb 6, 2021 11:22 PM

জাপানে লুকাস? প্রশ্ন টা শুনে ভড়কে গেলেন বুঝি?

শামীমুজ্জামান : জাপান গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের ২৯শে নভেম্বর জিওস্টেশনারি কক্ষপথে যে উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) টি পাঠিয়েছে তাতে যুক্ত করেছে লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তঃ স্যাটেলাইট উচ্চ গতির ডেটা রিলে বা তথ্য (ডেটা, আডিও, ভিডিও ইত্যাদি) যোগাযোগ ব্যবস্থা। যোগাযোগের এই পদ্ধতিকে সংক্ষেপে বলা হচ্ছে লুকাস বা LUCAS (Laser Utilizing Communication System) যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় লেজারের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবী থেকে মহাশূন্যে তথ্য প্রদানের প্রথম ঘটনা টি ঘটেছিল ১৯৬৮ সালের ২০ জানুয়ারী। চন্দ্র ল্যান্ডার Surveyor 7-এর টিভি ক্যমেরা অ্যারিজোনা আর ক্যালিফোর্নিয়ার পৃথক অবজারভেটরি থেকে পাঠানো দুটি আর্গন লেজার রশ্মি সঠিক ভাবে সনাক্ত করতে পারলো ঐ দিন। মহাশূন্যে থেকে পৃথিবীতে লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য আদানের সফলতা আসে ১৯৯৫ সালে জাপানের JAXA's ETS-VI জিও স্যাটেলাইট আর টোকিওর 1.5-m NICT's গ্রাউন্ড স্টেশনের যোগাযোগে।

আচ্ছা, লেজারের মাধ্যমে তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা কেন?

১৯৮৮ সালের শেষ দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষের ক্লাস তখনো শুরু হয়েছে কি হয় নি। আমার ছেলেবালার বন্ধু রমু (রমেন দাশ Ramen Das ) অনেকটা জোর করেই আমাকে চট্টগ্রামের ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে নিয়ে গেল কম্পিউটার শিখবার জন্য। কথা ছিল ভালো না লাগলে আমি ছড়ে দিব। ও এরই মধ্যে dBaseIII+ পর্যন্ত শিখে ফেলেছে। ওর আগ্রহ প্রগ্রামিং শেখা। আমিও ওর দেখাদেখি Fortran 77 কোর্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। [আমার জীবনে রমুর এই অবদান ভুলার নয়। আমরা ক্লাস সিক্স থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাস্টার্স পর্যন্ত এক সাথে ছিলাম]।

যাই হোক, আমাদের সামনে ইন্টেলের প্রথম জেনারেশন ০৮৬ মাইক্রো প্রসেসরের কম্পিউটার। ভারবাটিমের সোয়া পাঁচ ইঞ্চির ফ্লপি ঢুকিয়ে প্রোগ্রাম লিখে কম্পাইল করছি। কি এক্সাইটমেন্ট আমাদের। কিছুদিন পরে ২০ এমবি হার্ড ড্রাইভ এলো। সোয়া পাঁচ ইঞ্চির ফ্লপির বদলে সাড়ে তিন ইঞ্চির ফ্লপি। ০৮৬ মাইক্রো প্রসেসরের বদলে ২৮৬ মাইক্রো প্রসেসর। কম্পিউটার কি ফ্যাস্ট কাজ করছে। এক্সাইটমেন্ট কম্পিউটারের গতির মতই বেড়ে চলেছে।

এরই মধ্যে আমাদের Fortran 77 শেখা শেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগ্রামিং জানি দেখে আমার বেশ ভালোই ডিমান্ড তৈরী হল। অধ্যাপক থেকে শুরু করে এমফিল মাস্টার্স-এর ছাত্রদের নানাবিধ এনালাইসিস করে দিচ্ছি। ক্যাপাসের নাসের ভাই Naser Khan আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। উনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে Flora লিমিটেড-এ যোগ দিয়েছেন। Flora লিমিটেড তখন Compac কম্পিউটার আর ডট ম্যাট্রিক্স প্রিন্টার নিয়ে আসছে বাংলাদেশে। একদিন আমাকে জানালেন, বিজ্ঞান অনূষদের ডিন অফিসে ৩৮৬ প্রসেসরের Compac ইনসটল করবেন। আমিও গেলাম তাঁর চেলা হয়ে। সেই প্রথম কেসিং-এর ভেতর মাদার বোর্ড, প্রসেসর, র‍্যাম দেখলাম। প্রসেসরটি দেখিয়ে বললেন, তুমি কি জানো, এটা সোনার চেয়েও দামী। (ঐ দাম দিয়ে এখন ৪টি অত্যাধুনিক কম্পিউটার কেনা যায়) তাঁর কাছ থেকে প্রথম জেনেছিলাম, ফ্লপি ডিক্স ছাড়াও এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে ফাইল নেয়া যায় নেটওয়ার্ক করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়তে পড়তে নেটওয়ার্কিং বা এক কম্পিউটারের সাথে অন্য কম্পিউটারের যোগাযোগের বিষয়টা খোলাসা হতে থাকলো। বুঝতে পারলাম নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে বাংলাদেশে তখনো কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং-এর কোন অবকাঠামই গড়ে উঠে নাই। ইন্টারনেট? সেটা আবার কী? এই ঘটনাটা মাত্র ২৮ বছর আগের।

পাশ্চাত্যে তখন ইন্টারনেট একটা শেপ নেয়া শুরু করেছে। টেলিযোগাযোগ ব্যাবস্থা কপার তারের যুগ থেকে ফাইবার অপটিকে প্রবেশ করছে। এক দিকে কম্পিউটারের ক্ষমতা বৃদ্ধি অন্যদিকে ফাইবার অপটিক দিয়ে পুরো পৃথিবীকে মুড়িয়ে ফেলতে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো মাঠে। এটাই ছিল ৯০ দশকের বিপ্লব, যা আজকের ইন্টারনেট আর তথ্য প্রযুক্তির বুনিয়াদ। প্রথমে বিচ্ছিন্ন থাকলেও বাংলাদেশে-এই বিবর্তনের পূর্ণ ছোঁয়া আসে ২০০৭-এর পরে।

খেয়াল করুন, তথ্যের যোগাযোগ এখন তামার তারে বিদ্যুতের বদলে কাঁচের তারে আলোর মাধ্যমে ঘটছে। ফাইবার অপটিক এক আসাধারণ প্রযুক্তি। আলোকে একপ্রান্তে কোড করে কাঁচের তারে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে, অন্য প্রান্ত থেকে সেই আলোকে ডিকোড করে ডিভাইসে সাজিয়ে দেয়া হচ্ছে চোখের পলকে। আমরা এখন ধুম ধাম করে মেগাবাইট, গিগাবাইট তথ্য আমাদের ডিভাইসে ডাউনলড করে ফেলছি। তামার তারে এতো দ্রুতগতির তথ্য যোগাযোগ কখনই সম্ভব ছিল না। আলো, আমাদের জীবনকে যেন আরও আলোকিত করে তুলেছে।

পৃথিবীতে তার বসানো যায় অনায়াসেই। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে কিংবা মাটির নীচে বোরিং করে পুরে পৃথিবীকে ফাইবার অপটিক ক্যাবল দিয়ে মুড়ে ফেলা গেলও, মহাশূন্যে সেই সুযোগ নেই। অন্যদিকে তথ্যের ব্যাপ্তি আজকাল এতো বিশাল যে প্রতি সেকেন্ডে গিগাবিটের মতো ডেটা আদান প্রদান করার জন্যে আলো ছাড়া অন্য কোন উপায়ও নেই। মহাকাশে তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় তাই লেজারের ছাড়া কোন বিকল্প আছে কি?

লুকাসের মতো প্রযুক্তির আরেকটি বড় সুবিধা, এটি আলোর গতিতে এক স্থান থেক অন্য স্থানে ভ্রমণ করে। যা প্রচলিত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গের চেয়ে দ্রুতগতির। ফলে লক্ষ কোটি মাইল দূরের মহাকাশযান কে নিয়ন্ত্রণ করাও হবে সহজ।

কি হবে ভবিষ্যতে?

স্পেসএক্স, ফেসবুক এবং গুগলের মতো বহুজাতিক কর্পোরেশন এবং একাধিক স্টার্টআপ বর্তমানে লেজার যোগাযোগ প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধারণা (কনসেপ্ট) যাচাই বাছাই করছেন। সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক অ্যাপ্লিকেশনগুলি কাজ করবে উপগ্রহের আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে। এই সংযোগের জন্য মহাশূন্যে স্থাপিত হবে লেজার দিয়ে তৈরী উচ্চ-কার্যকারিতা সম্পন্ন অপটিক্যাল ব্যাকবোন।

অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশনগুলির মধ্যে রয়েছে উপগ্রহ, বিমান কিংবা মানবহীন বিমানীয় বাহন (Unmanned Aerial Vehicle/ইউএভি) থেকে ভূমিতে সরাসরি প্রতি মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ ডেটা আদান প্রদান করা। লো অরবিটে হাজার হাজার স্যাটেলাইটের সমারোহ ঘটিয়ে উচ্চ-গতির ইন্টারনেট সরবরাহ ইত্যাদি।

স্পেসএক্স, অ্যামাজন, ওয়ান-ওয়েব এই তিন প্রতিষ্ঠান আগামী ৮ বছরে প্রায় ৬০ হাজার স্যাটেলাইট লো এবং মিড অরবিটে পাঠাবে। স্পেসএক্স এফসিসির কাছ থেকে এরই মধ্যে ১২ হাজার স্যাটেলাইট পাঠানোর অনুমতি নিয়ে ফেলেছে।

৯০-এর দশকের কম্পিউটার প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ আর ফাইবার অপটিক নেটওয়ারকিং-এর বিপ্লবের মতোই এই দশকে ঘটতে যাচ্ছে আরেকটি বিপ্লবের। যার সুফল পেতে আমাদের হয়তো ২৮ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। শুরু হবে স্যাটেলাইট নেটওয়ারকিং-এর যুগ। তৈরী হবে স্যাটেলাইট নির্ভর ডিভাইস আর এ্যাপ। যার অনেক কিছুই হয়তো বাংলাদেশের ছেলে মেয়েরা বানাবে। এখনি সময় ওদের কে তৈরী করা।

লেখক: শামীমুজ্জামান, ভার্চুয়্যাল আমেরিকান কোম্পানিজ লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট থেকে


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান