ইনফোডেমিক লড়তে নেতৃত্বের দায়

Fri, Jan 29, 2021 1:40 PM

 ইনফোডেমিক লড়তে নেতৃত্বের দায়

সৈয়দ ফজলে রউফ: ২০২০ সালের শুরু থেকেই করোনা প্যান্ডেমিকের  পাশাপাশি বিশ্বব্যাপি ব্যাপকভাবে যা ছড়িয়েছে তা হলো করোনা সম্পর্কিত মিথ্যা, খণ্ডিত, ভুল তথ্য এবং গুজবের সমাহার। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে করোনা ভাইরাসের মতোই ভাইরাল হওয়া এই ভুল তথ্যের মহামারী'র নাম দেয়া হয়েছে ইনফোডেমিক । আমেরিকার বিদায়ী রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপি রাজনীতিক, ধর্মীয়, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক -বিভিন্ন অঙ্গনের নেতৃত্ব, সেলিব্রিটি ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতভাবে শুরু থেকেই এই ইনফোডেমিকের পালে হাওয়া দিয়ে এসেছেন। দু:খজনক হলেও সত্য কিছু চিকিৎসক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও গবেষকও -তাদের মনগড়া, খণ্ডিত বা মিথ্যা তথ্য,উপাত্ত ও গবেষণা নিয়ে এই ইনফোডেমিক ভাইরালে শরিক হয়েছেন।এর বিপরীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন এবং পরবর্তীতে তার বিপরীত তথ্যের অবতারণা - জনগণের মাঝে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতা রাখতে পারেনি।

বাংলাদেশেও রয়েছে এই ইনফোডেমিকের ফেয়ার শেয়ার।অপেক্ষাকৃত কম বিজ্ঞানমনস্কতা ও হাতে হাতে ইন্টারনেটের কল্যানে বাংলাদেশেও করোনা সংক্রান্ত গুজব ভাইরাল হতে বেশি সময় লাগেনি। জাতিগত ও ধর্মীয়ভাবে আমাদের শক্তিশালী করোনা প্রতিরোধীক্ষমতা'র মতো বিজ্ঞান গবেষণাহীন মিথ্যা দাবি শুরু থেকেই বাংলাদেশে করোনা প্যান্ডেমিককে ডাউন প্লে করেছে। করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার রেওয়াজ পৃথিবীর অন্যতম ঘন বসতিপূর্ণ বাংলাদেশে এসে মুখ থুবড়ে পরেছে।

প্রচলিত ইনফোডেমিকের মধ্যে অন্যতম ব্যাপক প্রচলিত খণ্ডিত বা অর্ধ সত্য তথ্য হলো বাংলাদেশে করোনা কেস এবং করোনা জনিত মৃত্যু খুব কম। এখানে যে তথ্যটি খণ্ডিত বা অর্ধসত্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা হলো 'কেস' সংখ্যা।কেস সংখ্যা এর অর্থ হলো রিপোর্টেড কেস মানে যতটি করোনা টেস্ট করা হয়েছে তার মধ্যে যে কয়টি করোনা পজেটিভ এসেছে। খুব সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় যে যত বেশি করোনা টেস্ট করা হবে সেই অনুপাতে পজেটিভ টেস্টের সংখ্যা বা কেস সংখ্যাও বাড়বে। যেমন তুলনামূলকভাবে বলা যায় প্রতি ১০ লাখ মানুষে যুক্তরাষ্ট্রে  টেস্ট করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার, পজেটিভ কেস সংখ্যা প্রতি ১০ লাখে প্রায় ৮০ হাজার,  যুক্তরাজ্যে প্রতি ১০ লাখ মানুষে টেস্ট করা হয়েছে ১০ লাখের একটু বেশি, পজেটিভ কেস সংখ্যায় প্রতি ১০ লাখে প্রায় ৫৫ হাজার, ভারতে প্রতি ১০ লাখ মানুষে টেস্ট করা হয়েছে প্রায় ১লাখ ৪০ হাজার, পজেটিভ কেস সংখ্যা প্রতি ১০ লাখে প্রায় ৮ হাজার। এর বিপরীতে বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষে টেস্ট করা হয়েছে ২১ হাজারের একটু বেশি এবং পজেটিভ কেস সংখ্যায় প্রতি ১০ লাখে প্রায় ৩,৩০০। (তথ্যসূত্র: ওয়াল্ডোমিটার, জানুয়ারি, ২৮, ২০২০)।

 প্রসঙ্গত বলা যায়,  যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি, যুক্তরাজ্যের প্রায় ৭ কোটি, ভারতের প্রায় ১৪০ কোটি এবং বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি। অর্থাৎ জনসংখ্যার তুলনায় খুবই একটা ক্ষুদ্র সংখ্যার টেস্ট করে ১৭ কোটির জনসংখ্যার একটি দেশের করোনা পরিস্থিতি এবং করোনাজনিত মৃত্যুর প্রকৃত অবস্থা জানা বৈজ্ঞানিকভাবে খুব একটা সহজ না।

এর সমান্তরালে ভুয়া এন৯৫ মাস্ক আমদানি, করোনা টেস্টিং জালিয়াতি, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ছাড়া বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টিনে ও সাধারণ ছুটির নামে লকডাউনের ল্যাজেগোবরে অবস্থা, শাহেদ-সাবরিনা কাণ্ডে -করোনা নিয়ন্ত্রনে গৃহীত প্রায় সব পদক্ষেপ বৃহত্তর জনমানুষের কতটুকু আস্থা অর্জন করতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।এরকম একটা পরিস্থিতিতে ইনফোডেমিকের যেন সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হয়েছে করোনা ভ্যাক্সিন নিয়ে। মিথ্যা প্রোপাগান্ডা আর কনস্পিরেসি থিওরিস্টদের যেন এক মিলন মেলা বাংলাদেশ। জীবনে ভাইরাস নিয়ে যে কোনো গবেষণা করেনি, ভ্যাক্সিন ডিজাইন বা ভ্যাক্সিন ট্রায়াল সম্পর্কে যাদের নূন্যতম কোনো অভিজ্ঞতা নেই সেই সব তথাকথিত বিজ্ঞানী-গবেষক'রা করোনা ও ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ হিসাবে মিডিয়ায় মনগড়া তথ্য বিলিয়ে যাচ্ছেন। এর ওপরে আগুনে ঘি ঢালার মতো যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার প্রাচীন দ্বন্দ্ব। এই যখন বাস্তবতা, তখন সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব থেকেই ভারতের দুই ভ্যাক্সিন কম্পানি প্রকাশ্যে একে অন্যের বিরুদ্ধে দাবি করছে তাদের ভ্যাক্সিনে পানি ছাড়া কিছুই নেই। এতো কিছুর মধ্যে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় সবার মুখেই যেনো এক কথা - সবার শেষে ভ্যাক্সিন নেব। এধরণের দাবি যে মোটের ওপর ভারতীয় ভ্যাক্সিনের ব্যাপারে বাংলাদেশিদের আস্থা শূন্যের কোটায় নিয়ে আসবে তা নিয়ে আর বিশেষ গবেষণার প্রয়োজন হয়না।

করোনা ভ্যাক্সিন'কে নিয়ে ইনফোডেমিকের সেকেন্ড ওয়েভ কঠোরভাবে মোকাবেলাটা ভীষণ জরুরি।রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সেলিব্রিটি সকল নেতৃস্থানীয়দের উচিৎ লড়াইটা সামনে থেকে করা। সংকটটা যখন বিশ্বাসের তখন আস্থা ফেরানোটাই সবচেয়ে জরুরি।

ইনফোডেমিক লড়তে ‘আপনারা আগে, আমি শেষে বলে- নেতৃত্বের দায় মোটেই এড়াতে পারেননা।

লেখক: ড. সৈয়দ ফজলে রউফ। কানাডায় বসবাসরত অণুজীববিজ্ঞানী।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান