করোনা মহামারী এবং কতিপয় ’সর্ব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ’ সমাচার

Wed, Jan 13, 2021 10:49 AM

করোনা মহামারী এবং কতিপয় ’সর্ব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ’ সমাচার

সৈয়দ ফজলে রউফ: করোনা প্যান্ডেমিক শুরু হবার পর থেকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে করোনা'র কারণে বিশ্বব্যাপী বিপুল পরিমান মানুষের মৃত্যু ও নানাবিধ মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিতে দু:খিত হবার পাশাপাশি একজন অণুজীববিজ্ঞানী হিসাবে যে ব্যাপারটা আমাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করেছে তাহলো প্যান্ডেমিক ও এ সম্পর্কিত খণ্ডিত, অর্ধসত্য, মিথ্যা তথ্য, সংবাদ ও প্রোপাগান্ডা'র ব্যাপক প্রচারণা।সোশ্যাল মিডিয়া'র কল্যানে এর ক্ষতিকর প্রভাব করোনার মতোই ভয়াবহ আকার ধারণ করে একটি সমান্তরাল মহামারী হিসাবে যা ব্যাপকভাবে 'ইনফোডেমিক' নামে পরিচিতি পেয়েছে।অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকেই সম্পূর্ণ নতুন করোনা ভাইরাস COV-২ সম্পর্কে মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করে আসছে - যা জনমনে এ সম্পর্কে বিজ্ঞান ভিত্তিক সঠিক জ্ঞান বিতরণের বিপরীতে ভুল, অসত্য ও মিথ্যা জ্ঞানের প্রসার ঘটিয়েছে।

 প্রকৃত বিজ্ঞান গবেষকমাত্রই  কেবলমাত্র  সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে জনসম্মুখে জ্ঞান বিতরণের কাজটি করে থাকেন।সস্তা জনপ্রিয়তা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় খ্যাতি'র লালসা নিশ্চিতভাবেই কোনো প্রকৃত বিজ্ঞান গবেষককে সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত করবেনা। এছাড়াও যেকোনো ধর্মবিশ্বাসী একজন ধার্মিক ব্যক্তিও জনসম্মুখে জেনেশুনে খণ্ডিত, অর্ধসত্য ও মিথ্যা কথা বলা থেকে নিজেকে সর্বভাবে বিরত রাখার চেষ্টা করেন, এবং অন্যকেও তা করতে অনুপ্রাণিত করেন।

একজন অণুজীববিজ্ঞানী ও দীর্ঘদিন জনস্বাস্থ্য গবেষণায় সংশ্লিষ্ট থাকার তাগিদে প্যানডেমিকের শুরু থেকেই বাংলাদেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু একটা করার প্রয়োজন মনে করি। দেশ-বিদেশের বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী অণুজীববিদের উদ্যোগে স্বল্প সামর্থ্যে যার যতটুকু সম্ভব তা নিয়েই করোনা প্যানডেমিকের 'ইন্ফোডেমিক' মোকাবেলায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সহজ বাংলায় একটি ফ্যাক্টচেক পেজ চালু করা হয়, যাতে দেশ-বিদেশের বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ও গবেষকদের পাশাপাশি নিজেও শরিক হই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল প্যান্ডেমিক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে যে সমস্ত খণ্ডিত, অর্ধসত্য, মিথ্যা তথ্য রয়েছে সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খণ্ডন করা এবং করোনা প্যান্ডেমিক সম্পর্কে কেবলমাত্র সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য সহজ ভাষায় পরিবেশন করা। অল্প সময়ের ব্যবধানেই পেজটি অনেক মানুষের মাঝে পৌঁছায়।

দু:খজনক হলেও সত্য, প্যানডেমিকের শুরু থেকেই বাংলাদেশে কিছু জ্ঞানপাপী যাদের করোনা ভাইরাস, এয়ারবর্ন ইনফেকশন, জিনোম সিকুয়েন্সিং, ইম্যুনিটি, ভ্যাক্সিন, ইনফেকশন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, আইসিডিডিআরবি'র মতো বিভিন্ন রিসার্চ অর্গানাইজেশন, ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স ইত্যাদি নিয়ে প্রতক্ষ্য কোনো ধরণের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও সর্ববিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসাবে পাবলিক স্ফিয়ারে নিজেকে জাহির করে যাচ্ছেন - এবং অনবরত খণ্ডিত, অর্ধসত্য, মিথ্যা তথ্য ও কন্সপিরেসি থিউরি মার্কা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন। করোনা বলে কিছু নেই, এটা ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার সৃষ্টি, আমাদের করোনায় কিছু হবেনা, ২০২১ সালের এপ্রিলের আগে পৃথিবীতে করোনা ভ্যাক্সিন আসবেনা - প্যানডেমিকের শুরু থেকে এধরণের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালানোর চেষ্টা করেছে কিছু সর্ববিষয়ে বিশেষজ্ঞ।এধরণের প্রোপাগান্ডা মানুষকে সচেতনতার বিপরীতে বরং উদাসীনতা তৈরিতেই বেশি কাজ করেছে।এর বিপরীতে বাংলাদেশে যারা ভাইরোলজি এয়ারবর্ন ইনফেকশন, জিনোম সিকুয়েন্সিং, ইম্যুনিটি, ভ্যাক্সিন, ইনফেকশন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট -এর এর প্রকৃত বিশেষজ্ঞ তারা না জেনে কথা বলা বা মানুষকে ভুল তথ্য থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন।করোনা প্যানডেমিকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত নিকট আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন, নিকট পরিবারের দুজন সদস্যসহ কয়েকজন স্বজনের মৃত্যুও হয়েছে করোনা ইনফেকশনে।এবং জনমনে এধরণের ব্যাপক উদাসীনতার পেছেন তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের সোশ্যাল মিডিয়ায় শঠতাপূর্ন মিথ্যা প্রোপাগান্ডাকেই আমি অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হিসাবে দায়ী করবো।এবং স্রষ্টার কাছে তাদের এই শঠতা ও ভণ্ডামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করি।

আমি চিন্তিত পাবলিক স্ফিয়ারে এইসব জ্ঞানপাপীদের অনবরত খণ্ডিত, ভুল ও ক্ষেত্র বিশেষে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন দেখে l আমি দু:খিত বেচারা পাবলিক সেটা না বুঝেই খেয়ে যাচ্ছে।

দুটো কথা দিয়ে চিঠিটা শেষ করতে চাই,

১. You can fool all the people some of the time and some of the people all the time, but you cannot fool all the people all the time.

২. দয়া করে ছোটবেলায় পড়া ঈশপের গল্পের মিথ্যাবাদী রাখালের গল্পের শেষদৃশ্যের কথা মনে রাখবেন

প্যান্ডেমিকে পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার শুভকামনা।

লেখক: সৈয়দ ফজলে রউফ,  বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয়ান অণুজীববিজ্ঞানী

লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান