তাপস-খোকন বিতর্ক ঃ কিসের আলামত?

Tue, Jan 12, 2021 11:33 PM

তাপস-খোকন বিতর্ক ঃ কিসের আলামত?

মোঃ মাহমুদ হাসান :ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ফজলে নুর তাপস জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তের উত্তরাধিকার, মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম বীর সেনানী, মুজিব বাহিনীর অন্যতম সংগঠক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির সন্তান। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুরতম পৈশাচিক ঘটনায় পিতা-মাতাকে হারিয়ে জীবনের নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজকের পর্যায়ে উপনীত হয়েছেন। ব্যক্তি জীবনে শিশুকাল থেকেই যে পরিমাণ ঝড়-ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে ব্যারিস্টার তাপস হয়েছেন তা জীবন সংগ্রামের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিন তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তার ও প্রমান দিয়েছেন।সুধীজনেরা তাকে একজন সজ্জন, প্রতিশ্রুতিশীল, সুশীল, সদালাপী দেশপ্রেমিক বলেই অভিহিত করেন।

 

অনিয়ম, অনাচার, আর সমন্বয়হীনতার বিপরীতে দূর্নীতিমুক্ত সিটি করপোরেশন গড়ার প্রত্যয়ে, পরিচ্ছন্ন ঢাকা- সবুজ ঢাকার মানসে নির্বাচনপূর্ব সময়ে ফজলে নুর তাপসের বক্তব্য সমুহ ঢাকাবাসীকে দারুণভাবে আশাবাদী করেছিল। জন আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে মেয়র তাপস এগিয়ে যাচ্ছেন, বিভিন্ন গন মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সমুহ তারই প্রমাণ বহন করে। অনিয়ম দূর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত প্রকৌশলী কর্মকর্তাদের বিতাড়িত করে দায়িত্ব গ্রহণের পক্ষকালেই উইপোকা দমনে কঠোরতার জানান দিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষার দৃঢ়তা আশাবাদী করেছে ঢাকাবাসীকে। দেশের আমজনতা ও যখন শেখ হাসিনার উন্নয়ন মিশনে তরুণ প্রজন্মের যোগ্য সহযোগী হিসেবে তাপসকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে, সেই শুভক্ষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্থ সহচর, আওয়ামীলীগের দুর্দিনের কান্ডারি, স্বৈরাচার, সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ঢাকার সাবেক মেয়র হানিফের সন্তান সাঈদ খোকন যখন বলেন, মেয়র তাপস সিটি করপোরেশনে শত শত কোটি টাকা নিজস্ব ব্যাংকে স্থানান্তর করে কোটি কোটি টাকা লাভ করেছেন,আশাবাদী মানুষের মনোজগতে তখন প্রলয়ঙ্করী বেদনার ঝড় প্রসারিত হয়। নগর পিতার চেয়ার হারানো খোকনের বক্তব্যে জাতি বিভ্রান্ত হয়,হতাশায় নিমজ্জিত হয় আশাবাদী মানুষ। আওয়ামী লীগেরই ছায়াতলে থেকে, দলীয় বটবৃক্ষের শরণাপন্ন না হয়ে, আইন আদালতের আশ্রয় না নিয়ে রাজপথে যে অভিযোগটি তিনি তুলেছেন-এই আত্মঘাতী প্রচারনা কিসের আলামত?

 

সাঈদ খোকন সদ্য সাবেক মেয়র, ডেংগুতে অতিষ্ঠ ঢাকাবাসী তাকে একজন ব্যর্থ মেয়র হিসেবেই জানে, আর বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে তিনি শতাব্দীর মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব, জনতার মঞ্চের রুপকার, ঢাকার সফল মেয়র, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় মানববর্ম রচনা করে জীবন রক্ষাকারী হানিফ ভাইয়ের সন্তান।তাই তো ঢাকা দক্ষিণের মনোনয়ন না দিলেও বিমর্ষ খোকনকে মাতৃস্নেহে কাছে টেনে নেন, মেয়র নির্বাচনে তাপসের পাশে খোকনকে চান, দলীয় কর্মকান্ডে প্রত্যাশা করেন খোকনের সরব উপস্থিতি। সাঈদ খোকন সদ্য সাবেক মেয়র, যে বয়সে শেখ হাসিনার বদান্যতায়, ঢাকাবাসীর সমর্থনে নগরপিতার চেয়ারে বসেছিলেন সেটি কি নিতান্তই তার যোগ্যতার প্রাপ্তি ছিল, যদি তাই না হয় তবে সেই কৃতজ্ঞতায় নতজানু হয়ে ও তো জননেত্রীর শরণাপন্ন হতে পারতেন, সেটি সম্ভব না হলে আইনের কপাটটি কি বন্ধ ছিল?

 

সংবাদ মাধ্যমের বরাতে দেশবাসী জানতে পারে, সাঈদ খোকনের আমলে নকশা বহির্ভূত উপায়ে ৯১১ টি দোকান বরাদ্দ হয়েছিল, বিডি নিউজ ২৪ এর তথ্যমতে ব্যবসায়ীরা বলছেন ৩৫ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন প্রক্রিয়ায় সাবেক নগরপিতা জড়িত, বিপরীতে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট অবৈধ ঘোষণা করে যখন উচ্ছেদ অভিযান চলমান তখন সুপ্রিম কোর্টের কদম পোয়ারার সামনে দাঁড়িয়ে গতকাল খোকন বলেছেন, বর্তমান নগরপিতা ইতিমধ্যে ব্যক্তিগত লাভের আশায় করপোরেশনের শতকোটি টাকা নিজ মালিকানাধীন ব্যাংকে স্থানান্তর করেছেন। দূর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে বিশ্বাসী সরকারের নীতিমালার সংগে দুটো অভিযোগই সাংঘর্ষিক। তথ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিষয়টি দু'জনের ব্যক্তিগত বললেও সচ্ছতার নিমিত্তে জনস্বার্থে কোনভাবেই এর আইনি ফয়সালার বিকল্প নেই।

 

আজকাল অনেকেই বলেন, জামাতে ইসলাম বিলীন হয়ে গেছে, কেউবা বলেন বিএনপি অস্তিত্বের সংকটে, আমি এর কোনটির সাথেই একমত নই। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী যে দেশে ৪০% বেশি মানুষ প্রো-পাকিস্তান ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ সে দেশে কিছু সংখ্যক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি আর কিছু রাজনৈতিক মামলা মোকদ্দমা দৃশ্যমান পাকিস্তানপন্থীদের আত্নগোপনে নিলেও বিলীন হওয়ার পরিবর্তে প্রতিশোধ স্পৃহায় সংঘটিত হওয়ারই সুযোগ করে দিয়েছে। আর অদৃশ্য এই বিরোধী রাজনীতির সুযোগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ই যেন বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে, সারাদেশে চলমান স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের চিত্রই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ঢাকা সিটির বর্তমান আর সাবেক নগরপিতার বাকযুদ্ধ ও এর থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। নীতি নির্ধারকরা ব্যক্তিগত বিষয় বলে এমন ঘটনাকে পাস কাটালেও আখেরে তার পরিনতি খারাপ হতেই বাধ্য। কানাডা প্রবাসী প্রথিতযশা সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর পরস্পরের এই বাকযুদ্ধে, 'কে সত্য-কে মিথ্যে' অনুসন্ধানের যৌক্তিক দাবি তুললেও আমজনতা  আপাত দৃষ্টিতে একে পাওয়া না পাওয়ার লড়াই বলেই মনে করে।

 

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি আর নানা জনমিতির সূচকে বিস্ময়কর অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় তার সমকক্ষ কোন রাজনীতিবিদ আজ বাংলাদেশে নেই। দূর্নীতি আর অনাচার কে নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়ন সংগ্রামের সফল পরিসমাপ্তি তার হাতেই সম্ভব বলে জাতি বিশ্বাস করে। আজ দূর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত তদন্তাধীন ১৬০ জনের তালিকা প্রকাশ সচ্ছতার পক্ষে  সরকারের সুদৃঢ় মনোভাবের ই পরিচায়ক। পদ্মাসেতুর গল্পে সচ্ছতা প্রমাণ করে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক বিশ্বে তার ভাবমূর্তিকে যখন সমুজ্জ্বল করেছেন, ক্যাসিনো কান্ডে নিজ দলে দাপুটেদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়াকে যখন দেশবাসী অভিনন্দিত করেছে, সেই সময়ে তারই অনুসারী স্নেহধন্য তাপস- খোকনের বিতর্কে জাতি বিভ্রান্ত হচ্ছে।

 

অতি সাম্প্রতিক কালে এক দাপুটে এমপি পুত্র কান্ডে সরকারের গৃহীত দ্রুত পদক্ষেপ গণমানুষের প্রত্যাশার সংগে সংগতিপূর্ণ হলেও প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চাপে পরে দাপুটে এমপি ক'দিন আত্নগোপনে থাকলেও অতি দ্রুত সময়ে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ব্যাংকের দাবীকৃত জমি পূনঃদখল করে ক্ষমতার দৃশ্যপটে আবারও উদিত হয়েছেন। সরদার বংশের এই নেতাও পুরান ঢাকার জনপ্রিয় মানুষ তবে সাঈদ খোকনের ভাবমূর্তির সাথে কিছুটা তফাৎ তো আছেই। ঢাকার শেষ পঞ্চায়েত নেতা মরহুম মাজেদ সরদারের নাতি, অবিভক্ত ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য হানিফ পুত্র খোকনের প্রতি ঢাকাবাসীর যেমন ভালোবাসা আছে, শেখ হাসিনার ভালোবাসার ও ঘাটতি নেই। তবে সচ্ছতা আর জবাবদিহিতার প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় বিধি বিধানকে অবজ্ঞার সুযোগ তো কারো নেই।উন্নয়ন আর অগ্রগতির প্রশ্নে শেখ হাসিনার গ্রহনযোগ্যতা যখন অসীম উচ্চতায়,স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী কে সামনে রেখে দূর্নীতি আর অনাচার প্রতিরোধে সত্যিকারের জিরো টলারেন্সের এখনি তো শ্রেষ্ঠ সময়। তাই দল আর দেশপ্রেমের বিচারে কোন অনুকম্পা নয়, তাপস- খোকন বিতর্কে ও জন সম্পদে ভাগাভাগির হিসাব থাকলে কঠোরতা সেখানেও চাই!!

লেখক ঃ কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

ক্যালগেরী, কানাডা,জানুয়ারী ১১, ২০২১


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান