দেশ চলছে জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের দর্শনে

Mon, Nov 16, 2020 12:53 AM

দেশ চলছে জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের দর্শনে

শরিফুল হাসান: আমি জানি না আপনাদের এমন উপলব্ধি হয় কী না। তবে আমার প্রায়ই মনে হয়, আওয়ামী লীগ একযুগ ধরে ক্ষমতায় থাকেলেও বঙ্গবন্ধু বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নয়, দেশ চলছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের দর্শনে। ৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর নিজেদের ক্ষমতা সুসংসহত করতে তারা যে পথে চলেছেন সেই দর্শনেই এখন চলছে বাংলাদেশ।প্রধান দর্শন শুধু ক্ষমতায় থাকা। বঙ্গবন্ধুর দর্শন বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু বলার জন্য বলা।

সর্বশেষ উদাহরণ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে ‘মূর্তি’ বলে নির্মাণ বন্ধের দাবি, অন্যথায় কঠোর কর্মসূচির হুমকি। আচ্ছা এমন কথা যদি সাধারণ কোন মানুষ বলতেন কী হতো? আমি নিশ্চিত তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করার লোকের কোন অভাব হতো না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন কথা বলার পরেও চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিনপুত্র নওফেল এবং মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম ছাড়া কাউকে কথা বলতে শুনিনি।

মাঝে মধ্যে গত ১২ বছেরর শাসনামাল বুঝতে চেষ্টা করি। দেশের অবকাঠামো ও আর্থিক উন্নয়ন হচ্ছে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু দেশ তার মূল্যবোধ থেকে হারাচ্ছে। এরশাদ বা জিয়াউর রহমানের সেই একই দর্শন। একদিকে দুর্নীতি, লুটপাট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব বিপরীতে উন্নয়নের গল্প আর প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্ষমতায়ন।

আমি জানি না বাংলাদেশের ভবিষ্যত কী। আপনাদের মনে করিয়ে দেই, ২০১৭ সালের ২৬ মের কথা। হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে গ্রীক দেবী থেমিসের আদলে গড়া ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্যটি অপসারণ করা হয়েছিল মধ্যরাতে।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রগতিশীল ব্যক্তিরা ভাস্কর্যটি অপসারণের বিরোধিতা করে আসছিলেন। কিন্তু তাদের কথা শোনেনি এই রাষ্ট্র। বরং গণভবনে কওমি মাদ্রাসার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা এখানে থাকা উচিত নয়। গ্রিক থেমিসের মূর্তি আমাদের এখানে কেন আসবে।’

ভাস্কর্যটির নির্মাতা মৃণাল হক সেদিন সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার কিছু বলার নেই। এটা কী করে গ্রিক ভাস্কর্য হলো? এটি বাঙালি নারী যার পরনে শাড়ি। এখন এটি ভেঙে ফেললে এরপর বলা হবে অপরাজেয় বাংলা ভাঙা হোক। অন্যান্য ভাস্কর্য সরানো হোক'।

মৃণাল হক এই তো মাত্র কয়েকদিন আগে এই ২২ আগস্ট মারা গেলেন। তার বাসা ছিল গুলশান-১ এ। আমাকে রিকশায় করে বাসায় যাওয়ার পথে রোজ তার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে হয়। তার নিজের এই বাড়িটির সামনে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ অনেক ভাস্কর্য ছিল। কিন্তু মাসখানেক আগে খেয়াল করলাম স্পাইডার মানে বাকি সব সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কারও বোঝার উপায় নেই এটি কোন ভাস্করের বাড়ি।

হুমায়ুন আজাদ তো তার জীবনদশায় কোপ খেয়ে গেছেন। আমি জানি না আরজ আলী মাতুব্বর বেঁচে থাকলে আজ তার বইগুলো লিখতে পারতেন কী না! জানি না আহমদ শরীফ বা আহমদ ছফা আজ বেঁচে থাকলে তাদের লেখালেখি নিয়ে কেনা পরিস্থিতিতে পড়তেন। নতুন যে পথে বাংলাদেশ হাঁটছে আমি জানি না এর ভবিষ্যত কী?

আজ সকালে মৃণাল হকের বাড়ির সামনে দিয়ে আসার সময় মনে পড়ছিলো তার কথাগুলো। একদিন বলা হবে অপরাজেয় বাংলা ভাঙা হোক। অন্যান্য ভাস্কর্য সরানো হো। আমারও এখন তাই মনে হচ্ছে। আমার ভয় হচ্ছে এই দেশ থেকে একদিন সত্যিই সত্যিই না বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেয়া হয়। আমার ভীষণ ভয় হয়! আমাদের জীবনদশায় বঙ্গবন্ধুর চরম অবমানা দেখে যেতে না হয়।

আফসোস ইতিহাস থেকে আমরা কোন শিক্ষা নেই না। আমি জানি না নীতি নির্ধারকেরা কী ভাবেন। মনে রাখবেন, বাংলাদেশ এখন যে পথে হাঁটছে যে উন্নয়নের কথা বলছে তেমন উন্নয়ন আরও অনেক দেশে ছিল। কিন্তু গণতন্ত্র, সুশাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী দলকে গণতান্ত্রিক চর্চায় না আনার কারণে বহুদেশ ধ্বংস হয়ে গেছে।

আমি নিশ্চিত আমরা সবাই এই বাংলাদেশকে ভালোবাসি। আপনাদের সবাইকে মনে করিয়ে তেই, বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র মুসলিম দেশ যারা ত্রিশ লাখ শহীদের বিনিময়ে একটি দেশ পেয়েছে যেই দেশের স্বাধীনতা চায়নি পৃথিবীর পরাশিক্তগুলো, যেই দেশের স্বাধীনতা চায়নি আমেরিকা, চীন কিংবা আরবদের মোড়ল সৌদি আরব।

আমার মাঝে মধ্যে ভীষণ ভয় হয়। এক রোহিঙ্গা সংকটেরই তো কোন সমাধান নেই। এরপর আবার তীব্র মূল্যবোধের সংকট, প্রতিক্রিয়াশীলদের আস্ফালন, দুর্নীতি-লুটপাট, সুশাসনের অভাব। জানি না বাংলাদেশের ভবিষ্যত কী? শুধু একটাই চাওয়া, ভালো থাকুক এখানকার ১৭ কোটি মানুষ। ভালো থাকুক এখানকার মুসলামন, হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিষ্ঠান-আদিবাসী দাবিদার, নারী পুরুষ-শিশু-সবাই। ভালো থাকুক বাংলাদেশ।

লেখকের ফেসবুক পোস্ট


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান