আমেরিকার নির্বাচন: ভোটের পরও ভোট আছে!

Fri, Nov 6, 2020 9:11 AM

আমেরিকার নির্বাচন: ভোটের পরও ভোট আছে!

সোহেল মাহমুদ: ধরুন নেভাডায় পপুলার ভোটে জো বাইডেনের জয় হলো। রীতি অনুযায়ী সব ইলেকটোরাল ভোট তার থলেতে যাবে। এর মানে, বিজয়ের জন্য ডেমোক্রেট শিবিরের যে ২৭০টি ভোটের দরকার, তা কিন্তু এই এক নেভাডা স্টেটে জয় পেলে হয়ে যায়। সেখানে এগিয়ে জো।

পাঁচটা স্টেটের ফল আসার অপেক্ষায়। ভোট গোণা চলছে। নেভাডা বাদে বাকি সবগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হলে তার ইলেকটোরাল ভোট হবে ২৬৮। জো বাইডেন থেকে মাত্র দু'টি কম। প্রশ্ন হচ্ছে, নেভাডায় জয়ী হলেই কি জো প্রেসিডেন্ট?

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় বুধবারের পরের সোমবার মানে ১৪ ডিসেম্বর ইলেকটরদের বৈঠক আর ভোটাভুটি হবে। সেদিন তারা ভোট দেবেন নিজেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী। মানে, যে দল থেকে তারা মনোনীত হয়েছেন সে দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু, বাধ্য কি? আমেরিকার সংবিধান কিংবা ফেডারেল আইন কোনটিই এ বিষয়ে তাদের জন্য কোন সীমানা তৈরি করেনি। এর মানে, জয় পরাজয়ের ব্যবধান কম হলে গণেশ উল্টেও যেতে পারে। নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট না দিলে, কিংবা অনুপস্থিত থাকলে। 

কিভাবে সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। সে ইতিহাস আসে। ফেইথলেস ইলেকটররা এ কাজ করতে পারেন। যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, যে দলের জন্য ভোট দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সে দলের প্রার্থীকে ভোট না দিলেই হলো। ফ্লোর বদল করার মতো। নিজ দলের প্রার্থীর বাইরে ভোট দেয়া যাবে না, এমন কোন ধারা মার্কিন সংবিধানে বা ফেডারেল আইনে নেই। কোন কোন স্টেটে এ বিষয়ে কোন নির্দেশনাও নেই। সাউথ ক্যারোলিনায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায় ফৌজদারি জরিমানায় সীমাবদ্ধ। কোন কোন স্টেটে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের দায়ে একজন ইলেকটরকে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার বিধান আছে। নিউ মেক্সিকোতে এটা চতুর্থ মাত্রার ফেলোনি। ৩১ টি স্টেট এবং ডিসিতে নানা বিধিবিধান আছে ফেইথলেস ইলেকটরদের নিয়ে। ওকলাহামায় ১,০০০ ডলার জরিমানার বিধানও আছে। মিশিগানের আইনটা খানিক ভালো। কেউ প্রতিশ্রুতি ভাঙলে, নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে ব্যর্থ হলে তাকে পাল্টে অন্যজনকে সে জায়গায় দেয়া হবে। কিন্তু তারা ভোট দিয়ে ফেললে সেটা ফিরিয়ে নেয়া যায়, এমন কোন তথ্য কোথাও মেলেনি।

ইলেকটরদের নির্বাচন করে দল। কোন কোন রাজ্যে দলের কাউন্সিলে তাদের মনোনীত করা হয়। কোথাও অন্য কায়দায় নিবেদিত বিশ্বস্তজনকে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তারা লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন দলের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। এরপর, একটা স্টেটে যে দল বেশী ভোট পাবেন, সে স্টেটে সিনেট ও হাউসের আসন যতোগুলো ততোজন ইলেকটর তারা। এর মানে, যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ সিনেট আর ৪৩৫ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ মিলে ৫৩৫ জনের সাথে যোগ হয় ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া-ডিসির অতিরিক্ত তিনজন ইলেকটর। মোট ৫৩৮ জন।   

২০১৬ সালে ৮ জন ডেমোক্রেট ইলেকটর কিন্তু হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দেন নি। ২জন রিপাবলিকান ইলেকটর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দেননি। সেবার ১০ টা ইলেকটোরাল ভোটে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের ঘটনা ঘটেছিলো। হিলারি শিবিরের তিনজনের ভোট বাতিল বলে গণ্য হয় সেবার। বাকি ৫ জন ব্যালটে থাকা অন্য প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। এদের তিনজনই ভোট দিয়েছিলেন রিপাবলিকান কলিন পাওয়েলকে। যিনি নির্বাচন দৌঁড় থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এবং হিলারিকে সমর্থন দিয়েছিলেন। বার্নি স্যান্ডার্স সেবার ৩ জনের ভোট পেয়েছিলেন, ২টা বাতিল হয়ে যায়।

এই ফেইথলেস ইলেকটরদের আরো নানা কাহিনী আছে। বড় ঘটনা ঘটেছিলো ১৮৭২ সালে। সেবার নির্বাচনের পরদিন বিজয়ী প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ৬৩ জন ইলেকটর তাদের বৈঠকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে অন্যজনকে ভোট দেয়ায় ফেইথলেস বলে গণ্য হয়েছিলেন।  ১৮৩৬ সালে ভার্জিনিয়ার ২৩ জন ডেমোক্রেট ইলেকটরের সবাই তাদের বিজয়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রিচার্ড এম জনসনকে ভোট না দিতে বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে এক ভোটে সংখ্যাগরিষ্টতা পান নি তিনি। সে পদে আবার নির্বাচন হয়েছিলো। আমেরিকার ইতিহাসে সেটি এর ধরণে একমাত্র ঘটনা।

বিভিন্ন সময়ে বিশ্বাসভঙ্গের নানা ঘটনা ঘটিয়েছেন ইলেকটররা। ৯০ জন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে নিয়ে। ৭৫জন ভাইস প্রেসিডেন্টকে নিয়ে। গত ৭ দশকে সবচেয়ে বড় ১০ জনের বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে ২০১৬ সালে। হিলারি ক্লিনটন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানায়। ২০০০ আর ২০০৪ সালেও একজন করে ফেইথলেস ইলেকটর বলে গণ্য হয়েছেন।

গত চার বছরে আমেরিকায় অনেক কিছু পাল্টেছে।

লেখক: সোহেল মাহমুদ, নিউইয়র্কে বসবাসরত সাংবাদিক

আরো পড়ুন: ইলেকটোরাল কলেজ এবং ফেইথলেস ইলেকটর।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান