হাজী সেলিমের দায়মুক্তি বনাম বঙ্গবন্ধু কন্যার দৃঢ়তা

Tue, Oct 27, 2020 11:06 PM

হাজী সেলিমের দায়মুক্তি বনাম বঙ্গবন্ধু কন্যার দৃঢ়তা

মোঃ মাহমুদ হাসান: সুখবর ই বটে! অপরাধ সংগঠনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই দাপুটে নেতা হাজী সেলিম পুত্র, কমিশনার ইরফান সেলিম র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার।আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষনিক অভিযানের কারনে সামরিক কায়দায় অত্যন্ত সুসজ্জিত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ একখানা ওয়াকিটকির সাম্রাজ্য ও জনগনের দেখার সৌভাগ্য হলো। দেশী-বিদেশী মদ, ইয়াবা, আধুনিক লাইসেন্স বিহীন অস্ত্রসহ আরও কত কি!!

জনপ্রিয় নেতা হাজী সেলিম, দীর্ঘ দিন যাবত দাপুটে জনপ্রতিনিধি, সিটি করপোরেশন থেকে মহান জাতীয় সংসদ, কমিশনার থেকে রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা, এমন একজন ব্যক্তির বাসভবনে বেআইনি কাজ কারবারের এলাহি আয়োজন দেখে বুঝতে বাকী থাকে না অতি দাপুটেদের কাছে আইন কত নস্যি। জনাব সেলিম হয়তো এর মাঝে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজবেন, আদালতে নিজ পুত্রকে নির্দোষ প্রমাণের সকল চেষ্টাই চালাবেন, দেশের সংবিধান তাকে সেই অধিকার দিয়েছে, এতে আমজনতার কোন আপত্তি নেই কিন্তু দিনে দুপুরে জন সমক্ষে তার গুনধর পুত্র নৌবাহিনীর লেফটেনেন্ট ও তার বিদুষী স্ত্রীর সংগে যে অশালীন ও নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন, সে দায় টি মেনে নিয়ে জাতির কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে সংসদ সদস্যের মতো এমন পদটি ছেড়ে দিয়ে আইন কে তা নিজস্ব গতিতে চলার সুযোগ করে দিবেন কি?

 

প্রশাসন অনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে প্রভাবমুক্ত হলে কত দ্রুত সাফল্য আসে ইরফান সেলিমের ঘটনা ই তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। নিজে সিটি করপোরেশন কমিশনার, বাবা-শশুড় এমপি, শাশুড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান, পাহাড়সম বিত্ত বৈভব, তবু ও শেষ রক্ষা হয়নি। ঘটনার ফলাফল জনমনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির আগেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ জনমনে সস্তি এনে দিয়েছে, আমজনতা অভিনন্দন জানিয়েছে, সেই সাথে ক্ষমতাহীন সাধারন মানুষ ও আশায় বুক বেঁধেছে। এমপি সেলিম হয়তো বলবেন আইনের দৃষ্টিতে প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির অপকর্মের দায় তো সংগঠক ব্যক্তির উপর ই বর্তায়, তাহলে তিনি কেন দায় নিবেন? দৃঢ়তার সাথে জিজ্ঞেস করতে চাই, ভাবমূর্তি রক্ষায় শেখ হাসিনা যদি ছাত্রলীগ, যুবলীগে ছুরি চালাতে পারেন, তাহলে নিজ পরিবারে আইনের শাসনের অভ্যাস তৈরীতে ব্যর্থতার দায় কি তার উপর বর্তায় না? কর্মির ইমেজে যদি দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে পুত্রকান্ডে জনাব সেলিমের ইমেজ সংকট কোথায় দাঁড়াতে পারে আইন প্রনেতা মহোদয় তা ভেবে দেখবেন কি?

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুবার নিজ দলের নেতা কর্মীদের সতর্ক করেছেন, নানাবিধ হুংকার দিয়েছেন। 'চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী ' - এই দূর্নীতিবাজ, লোভী, পাপিষ্ঠরা রং বেরংগের মুজিব কোটের আড়ালে সব কিছুকে তোড়াই কেয়ার করে দুর্দান্ত প্রতাপে সকল অপকর্মের গতি কে ই যেন আরও তরান্বিত করেছেন। যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগের পর ফরিদপুরে সারাসি অভিযান চালিয়েছেন, দুর্দিনের কান্ডারী জাতির জনকের স্নেহধন্য হানিফ পুত্র খোকন কে ও গলাধাক্কা দিয়েছেন। জননেত্রীর উপায়হীন এমন সুদৃঢ় কান্ডে জাতি আশায় বুক বেঁধেছে। জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ, নারীর ক্ষমতায়ন,মাতৃ-শিশু মৃত্যুর হার, গড় আয়ু সহ নানাবিধ সূচকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ঈর্ষনীয় সাফল্যে এগিয়ে চলা বাংলাদেশ কে মানবিকতা, মূল্যবোধ আর নীতি নিষ্ঠায় এগিয়ে নেয়ার এখনি শ্রেষ্ঠ সময়।

 

সিলেট আর বেগমগঞ্জের মর্মস্পর্শী ঘটনার পর সর্বোচ্চ শাস্তির দ্রুতগতির অধ্যাদেশ প্রশংসার দাবি রাখে, দক্ষিণ বাংলার এক আদালতে সাত কর্ম দিবসে ধর্ষন মামলার রায়, টাংগাইলের আদালতে ধর্ষকদের ফাঁসির আদেশ জনমনে কিছুটা প্রশান্তি আনলেও, নৈতিক অবক্ষয় রোধে নানা রকম সামাজিক উদ্যোগের পাশাপাশি মাদক নির্মূলে সত্যিকারের জিরো টলারেন্সের বিকল্প নেই। বিট পুলিশিং ভালো ভূমিকা রাখলেও সর্ব শ্রেনীর প্রতিনিধি সমন্বয়ে এর সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই প্রতিরোধ গড়ে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ হওয়া পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সময়ের পরিক্রমায় কিছুটা ম্লান হলেও পরিবার পরিজন কে হুমকির মুখে রেখে কোভিড কালে যে প্রশংসনীয় ভুমিকা রেখেছে, তাতে প্রতীয়মান আমাদের পুলিশ বাহিনী চাইলে ই পৃথিবীর সেরা মানবিক বাহিনীতে পরিনত হতে পারে। দক্ষতা আর পেশাদারিত্বে চৌকষ আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী কে কাজে লাগিয়ে প্রদীপ, আকবরের মতো নগন্য সংখ্যক অপেশাদার লোভীদের ছেটে ফেলে বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় আর বিকল্প কি আছে?

 

হাজী সেলিমের পিলে চমকানো রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য অনেক, দলের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ  ত্যাগ তিতিক্ষাও আছে, দুঃসময়ে সামনের কাতারে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম ও করেছেন, নিজ এলাকার মানুষের কাছে ও যে জনপ্রিয়, জনরায়ে তা বারবার প্রমাণ ও করেছেন কিন্তু বৈচিত্র্যময় জীবনে এমন চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে কিনা জানিনা তবে সঠিক ও বিচক্ষন একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এবারও তিনি সারাজীবনের জন্য জনতার নেতা হয়েই থাকতে পারেন। বিশ্বাস করতে চাই, অর্থ বিত্তে উঁচু কাতারের হলেও তিনি জাতির জনকের আদর্শকে হ্রদয়ে লালন করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলার প্রত্যাশা করেন। যদি তা ই হয়, তবে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে আইন প্রণেতার মহান গুরু দায়িত্ব টি ছেড়ে দিয়ে একদিকে সরকার তথা শেখ হাসিনার সদিচ্ছা বাসতবায়নে যেমন সহযোগিতা করতে পারেন,  অন্যদিক এক সুমহান দৃষ্টান্ত স্তাপনের মাধ্যমে সারাজীবন জননন্দিত নেতা হয়ে মানুষের মনে স্তান করে নিতে পারেন।

 

বাংলার রাজনৈতিক ভূগোলে নিজ আলোতে উদ্ভাসিত হওয়ার মতো ক্ষেত্র এখনো তৈরী হয়নি, আর শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়ার আকাংখা পরিপন্থী আচরণ যে আত্নঘাতী হয় নিকট অতীতে এর অগনিত প্রমাণ তো আছে ই। আ স ম রব, শাহজাহান সিরাজ এর মতো ডাকসাইটেরা পারেন নি, কোরবান আলী, শাহ মোয়াজ্জেমরা ব্যর্থ হয়েছেন, খালেদা জিয়া কে ছেড়ে ওবায়দুর রহমান, কর্নেল অলি পারেন নি। মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মুক্তি সংগ্রামের বীর বিক্রম, দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে যার অসামান্য অবদান, সামরিক শাসন বিরোধী গনতন্ত্রের সংগ্রামে সামনের কাতারে নেতৃত্ব দিয়েছেন, খালেদা জিয়ার ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কে বাতিলের দাবিতে জনতার মঞ্চ গঠনে প্রয়াত মেয়র হানিফের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একদলীয় সরকারের পতন কে তরান্বিত করেছিলেন। পারিবারিক ইমেজ সংকটে তিনি ও শেখ হাসিনার অনুকম্পা পান নি, তার ই মেয়ে জামাই আইনের শাসনে ই আজ জেলবন্দী। বহুবিধ বার্তা শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  নিশ্চয় ই আজ কঠোরতার পথে, জনগনের প্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মুজিব কন্যা হবেন আপোসহীন, এটি ই তো হবে চিরায়ত সত্য, তাহলে সরকারের পদক্ষেপ কে সাধুবাদ জানিয়ে নৈতিক ব্যর্থতার দায়ভার কাঁধে নিয়ে সাংসদের পদটি ছেড়ে দিয়ে চিরদিনের জন্য জননেতা হতে হাজী সেলিম আপত্তি না করলে সেটি ই তো হতে পারে ইমেজ রক্ষার উৎস।

লেখকঃ উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

অক্টোবর ২৫, ২০২০, আলবার্টা, কানাডা


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান