যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মূল প্রসঙ্গ অর্থনীতি

Sat, Sep 26, 2020 3:25 PM

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মূল প্রসঙ্গ অর্থনীতি

ডয়েল ম্যাকম্যানাস: যুক্তরাষ্ট্রের এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল অর্থনীতিই ভোটে ক্ষমতাসীন ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরুপের তাস হবে। এমনকি করোনাভাইরাস মার্কিন অর্থনীতিকে মন্দার মধ্যে ফেলার পরও। ট্রাম্প তার হোয়াইট হাউজে আসারও বেশ কয়েক বছর আগে শুরু হওয়া দশককালের সম্প্রসারণের কৃতিত্ব দাবি করে তখন বলেছিলেন, ‘আমি এটা একবার গড়ে তুলেছি এবং আবারও তা করব।’ এমনকি এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রচারণায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের পেছনে থাকলেও বেশিরভাগ সমীক্ষার ফল বলছে, অল্প ব্যবধানে হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার এখনো মনে করে, অর্থনীতিতে সাফল্য অর্জনে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ট্রাম্পেরই। বিচারপতি রুথ ব্যাডের গিন্সবার্গের মৃত্যুর ফলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় একটি ভিন্নমাত্রা যোগ হলেও অর্থনীতির বিবেচনা এই মুহূর্তে সর্বাগ্রে। জো বাইডেন কিছুটা দেরিতে হলে এ ফ্রন্টেই লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ডেমোক্র্যাটিক দলের চ্যালেঞ্জার বাইডেন ক্রমেই বেশি করে অর্থনৈতিক ইস্যুতে ট্রাম্পের সুবিধার দিকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছেন। বাইডেন প্রথমদিকে এবারের নির্বাচনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘জাতির অন্তর’ জয় করার লড়াই হিসেবে। পরে তিনি নজর দেন কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলার ব্যাপারে ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল সাড়ার ওপর। সম্প্রতি দেওয়া ভাষণগুলোতে বাইডেন অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প তার অন্যতম মূল প্রতিশ্রুতি, উৎপাদন খাত আবার চাঙ্গা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বাইডেনের এ অভিযোগ সঠিক। মার্কিন উৎপাদন শিল্প খাত মহামারীর আগেই মন্দায় ছিল। এর অন্যতম কারণ ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ। এছাড়া ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী নিজেকে শ্রমজীবী শ্রেণির সন্তান আর ট্রাম্পকে রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যের ভাগ্যবান উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরেছেন।

 

সিএনএন টাউন হলে বাইডেন বলেন, ‘আমরা এমন সব লোকজনকে দেখে অভ্যস্ত যারা আমাদের দিকে নাক কুঁচকে তাকান। তারা মনে করেন আমরা একটা যন্ত্রণা।...আমি সত্যিই এই প্রচারণাকে দেখছি স্ক্র্যান্টন আর পার্ক অ্যাভিনিউয়ের মধ্যে লড়াই হিসেবে। তার ভাবনায় শেয়ারবাজার ছাড়া আর কিছু নেই।’ বাইডেনের এই যুক্তির লক্ষ্য মূলত ২০০৮ সালে বারাক ওবামাকে সমর্থনকারী কর্মজীবী  শ্রেণির শে^তাঙ্গ ভোটারদের পক্ষে টানা, বিশেষ করে পেনসিলভানিয়া, উইসকনসিন ও মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রধান অঙ্গরাজ্যে। ওই ভোটাররা তখন ওবামাকে সমর্থন করলেও ২০১৬ সালে মন পরিবর্তন করে ট্রাম্পকে ভোট দেয়।

 

দেশে চাকরি ফিরিয়ে আনা : জো বাইডেন তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দুটি বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। ঘণ্টাপ্রতি ফেডারেল ন্যূনতম মজুরি সোয়া ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫ ডলার করা এবং পণ্য উৎপাদনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্রয়ে দেশে তৈরি পণ্য কেনা বৃদ্ধি, কঠোর ‘আমেরিকান পণ্য কিনুন’ নীতি কার্যকর করা, বিদেশে কর্মসংস্থান স্থানান্তরকারী কোম্পানিগুলোর ওপর করের সাজা আরোপ এবং চাকরি দেশে ফিরিয়ে আনা কোম্পানিকে পুরস্কৃত করা। এই নীতিগত বিষয়গুলো বাইডেনের বিশদ অর্থনৈতিক অবস্থানের একটি অংশ মাত্র। ‘বিল্ডিং ব্যাক বেটার’ শিরোনামের ভারীক্কি এ নীতিমালায় আছে ৪৭টি প্রস্তাব। এতে উল্লেখ করা অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা, অসুস্থতাকালীন বেতন এবং পিতৃত্ব-মাতৃত্বকালীন ছুটির সম্প্রসারণ, বেশিরভাগ পরিবারের জন্য চাইল্ড কেয়ার ট্যাক্স ক্রেডিট বৃদ্ধি, সার্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান এবং প্রবীণ যত্নে ভর্তুকি বৃদ্ধি।

 

ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ অনুকূল জ্বালানির ক্ষেত্রেও উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ‘বিশ্ব উষ্ণায়নের কথা শুনলেই আমার কর্মসংস্থানের কথা মনে হয়’, গত সপ্তাহে বলেন বাইডেন। বাইডেনকে অর্থনৈতিক খাতে আরও বেশি মানুষকে মন জোগানো কথা বলার আহ্বান জানানো প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট ও অন্যরা তার প্রশংসা করছেন। ‘উনি সঠিক পথেই হাঁটছেন’, ডেমোক্র্যাটিক দলের দীর্ঘদিনের কৌশলবিদ স্ট্যানলি গ্রিনবার্গ বলেছেন আমাকে। অতীতে কিন্তু বাইডেনের সমালোচকই ছিলেন তিনি। গ্রিনবার্গের মতে, বাইডেন ট্রাম্পের সঙ্গে শক্তিশালী বৈপরীত্য তুলে ধরছেন। জো বাইডেনের আর্থিক ব্যয়ের প্রস্তাবগুলো অনুযায়ী আগামী দশ বছরে আনুমানিক ৫.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় জিডিপির ২৪ শতাংশে উঠবে। এ হিসাব ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ওয়ার্টন স্কুলের গবেষকদের। এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে সর্বোচ্চ স্থিতিশীল কেন্দ্রীয় ব্যয়। তবে তা ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয় এবং ২০২০ সালের চলমান মহামারীর জন্য নেওয়া অস্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলোর চেয়ে কম। বাইডেন এই ব্যয়ের বেশিরভাগের সংস্থান করবেন বড় বড় কর্পোরেটগুলো এবং ৪ লাখ ডলার বা তার বেশি আয় করা ব্যক্তিদের ওপর কর বাড়িয়ে।

 

‘ন্যায্য অংশ পরিশোধ করুক’ : গত সপ্তাহে মিনেসোটায় বাইডেন বলেন, ‘আমি কাউকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছি না। তবে কী আর বলব! এখন অতি ধনী ও কর্পোরেট আমেরিকার উচিত তাদের ন্যায্য অংশ শোধ করতে শুরু করা।’ সব মিলিয়ে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীর পরিকল্পনাটি যা দাঁড়াচ্ছে তা ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয়ের পরে বারাক ওবামার গৃহীত ব্যবস্থার তুলনায় ব্যয় এবং কর বৃদ্ধি উভয় দিক থেকেই যথেষ্ট বড়। তবে এটাও মানতে হবে, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বর্তমান সংকটের প্রভাব ওবামার সময়ের ঘটনার তুলনায় বেশি। সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থাগুলোর মাধ্যমে বাইডেন কেবল ট্রাম্পের সঙ্গে বৈপরীত্যই সৃষ্টি করেননি, নিজের দলকেও ঐক্যবদ্ধ করেছেন। নিজের মতো ঘাটতি বিষয়ে সতর্ক মধ্যপন্থি থেকে সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী বার্নি স্যান্ডার্সের মতো ব্যাপক ব্যয়ে আগ্রহী প্রগতিশীলদের এক ছাতার নিচে এনেছেন। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টি এ বছর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স টুইটারে লিখেছেন, ‘জো বাইডেন পুরোই ঠিক পথে রয়েছেন’। ‘ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বড়ভাবেই বাঁ দিকে ঝুঁকেছে। আদর্শিক যুক্তির কারণে নয়, বরং বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে,’ বলেছেন বাইডেনের দীর্ঘদিনের পরামর্শদাতা জ্যারেড বার্নস্টাইন। ‘আমাদের পরিকল্পনাগুলো বড় বড়, কারণ সমস্যাগুলোও বড়।’ তবে প্রেসিডেন্ট হলে বাইডেন এই জাতীয় বড় বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না তা নির্ভর করবে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটেরও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কি না তার ওপর। কারণ উচ্চ-আয়ের পরিবারগুলোর ওপর করারোপ বেশিরভাগ রিপাবলিকান রাজনীতিকেরই ঘোর অপছন্দের বিষয়। আর বাড়তি উপার্জন ছাড়া বাইডেনের জন্য পরিবেশ অনুকূল জ¦ালানি বা চাইল্ড কেয়ার খাতে অনুদান  দেওয়ার অর্থ আসবে না।

 

ভোটারদের সামনে পছন্দটা কঠিন আর স্পষ্ট : একটি হস্তক্ষেপবাদী সরকার যারা স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে কষ্টের সময় পাড়ি দিতে সাহায্য করার জন্য ধনীদের ওপর কর বাড়াতে চায় আর অর্থনীতিকে নিজে নিজে সুস্থ হওয়ার সুযোগ দিতে কম কর এবং নিয়ন্ত্রণহীনতার ওপর নির্ভর করা একটি ধনিকবান্ধব সরকার। তাই যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন কেবল জাতির ‘অন্তর জয়ের’ মধ্যে সীমিত নেই, এখন তা আয়-রোজগার আর হিসাবের খাতার বিষয়ও।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক কলামনিস্ট

গাল্ফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

সূত্র: দেশরুপান্তর


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান