অরক্ষিত মাঠ প্রশাসন ঃ উল্টো পথের যাত্রা

Tue, Sep 8, 2020 8:26 PM

অরক্ষিত মাঠ প্রশাসন ঃ উল্টো পথের যাত্রা

মোঃ মাহমুদ হাসান : বাংলাদেশের আমলারা এখন অনেক বেশী  ক্ষমতাবান। গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়, রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের সুযোগে আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হবে, এটি অত্যন্ত বাস্তব এবং নিতান্তই অপ্রত্যাশিত কোন ব্যাপার নয়। আর মাঠ প্রশাসনের ডিসি, ইউএনও, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী হাকিম রা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।  সরকার আরোপিত নীতিমালা বাস্তবায়ন, প্রয়োগ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের তদারকি ও সমন্নয়ের মধ্যেই আর তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নেই, পরিস্থিতি মোকাবিলা আর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহনে আমলাদের মতামত ইদানিংকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের তরুণ আমলাদের জন্য রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে গড়ে উঠা সুবিধাবাদী শ্রেণী ও চরম নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট নানাবিধ সামাজিক সমস্যার মূখোমুখি হয়ে দায়িত্বপালন চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব ওয়াহিদা খানম ও তার মুক্তিযোদ্ধা পিতার উপর নিকৃষ্টতম কায়দায় বর্বর হামলা।

ওয়াহিদা খানমের উপর নিষ্ঠুরতম হামলা আমাকে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে, কোমলমতি নিষ্পাপ শিশু সন্তানের সামনে মায়ের উপর হাতুড়ি পেঠা নির্মম জীবননাশী আক্রমণ,যে মেয়ে সন্তান কে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা পিতা সারাজীবন গৌরব করে বেড়াতো, সেই আদুরে কন্যাকে বাঁচাতে গিয়ে, তিনি ও মৃত্যু শয্যায়। কোমলমতি শিশুটির মনে এই  জঘন্য ঘটনার সূদুরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে ভাবলে আতংকে আমার শিহরণ জাগে।  ওয়াহিদা খানমের বর মাঠ প্রশাসনের আর একজন নির্বাহী কর্মকর্তা রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত। এই মানুষটির ব্যক্তি ও কর্মজীবনে এই নিষ্ঠুর ঘটনার প্রভাব নিয়ে আমার রাষ্ট্র নিয়ন্তারা ভেবেছেন কি? ঘটনা পরবর্তী সময়ে দ্রুত হাসপাতালে স্তানান্তর, উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনিক তৎপরতা এসবই কি এধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে কোন স্থয়ী সমাধান?

 

 গনমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানতে পারি, আমলাদের রক্ষায় গানম্যান নিয়োগের দাবী উঠেছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় সশস্ত্র আনসার নিয়োগের কথা বলেছেন - এর কোনটিই কি এসব সমস্যার কোন টেকসই  সমাধান? যে দেশে খুনের মামলার আসামি নেতার পাশে বসে থাকলে প্রটোকল দেয়া পুলিশ কর্মকর্তা তাকে পলাতক হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, সে দেশে আনসার আর গানম্যান এর বন্দুক, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জীবন রক্ষায় সচল হওয়ার উপায় আছে কি?

অনেকেই হয়তো বলে থাকবেন, এমন ঘটনা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে ও ঘটে, এমন বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনভাবেই রাষ্ট্রচিন্তার কারণ হতে পারে না, বিনয়ের সাথে বলবো অধ্যাবধি ওয়াহিদা খানমের ঘটনায় প্রাপ্ত তথ্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে এর সাথে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, অর্থনৈতিক দূবৃত্তায়ন এবং ভয়াবহ মাদকের সংশ্লিষ্টতা ও সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধের প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত। বিপরীতে উন্নত দেশের এমন ঘটনাগুলো ব্যক্তি কেন্দ্রিক স্খলনের সাথে জড়িত থাকলেও সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, প্রশাসনিক সহমর্মিতা থাকে শুন্যের কৌটায়।

 

যেনতেন ভাবে বিত্ত অর্জনের তীব্র বাসনা যেন সমাজ ব্যবস্থার নিত্ত অনুসংগ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার কুপ্রভাব সামাজিক জীবনকে অস্তির করে তুলেছে। ব্যক্তি, পরিবার, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, এর বিয়োগাত্তক পরিনতিতে নিদারুন নির্মমতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মনস্তাত্ত্বিক বিবেচনায় একজন মাদকাসক্ত মানুষ যেমন তার পিতা মাতার গায়ে হাত তুলতে বুকে চাপ অনুভব করেনা, তেমনি লাগামহীন অর্থনৈতিক দূর্বৃত্তরা চারপাশে থাকা মানুষগুলোকে ও নিজ শ্রেণীর ভাবতেই সাচ্ছন্দ্য অনুভব করে, রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন তাদেরকে করে তুলে আর ও বেশী অপ্রতিরোধ্য। দখল, বেদখলের সংস্কৃতি, মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন, অর্থনৈতিক দূর্বৃত্তায়নে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে না পারলে অানসারের বন্ধুক, অার সশস্ত্র গানম্যান কোনভাবেই মাঠ প্রশাসনের অামলাদের জীবন রক্ষার প্রতিষেধক হতে পারে না।

 

দূর্যোগে, দূর্বিপাকে রাজনৈতিক, সামাজিক নেতারা জনগনের পাশে থাকাটাই যখন প্রত্যাশিত ছিলো, কোভিড পেনডেমিকে কিছু ব্যতিক্রম বাদে এর বিপরীত চিত্র টি ই অামাদের সামনে ফুটে উঠেছে। শাসক,অার বিরোধী দলের জীবন ভয়ে অাতংকিত নেতারা ঘরবন্দী হয়েছে, বাকপটু সমাজপতিরা ঘরমুখো বিলাসী জীবনে মুখ লুকিয়েছে। এমন কঠিন সময়ে ও সিভিল অার পুলিশ প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের অামলারা নিজের জীবন কে তুচ্ছ করে, পরিবার-পরিজনকে জীবন -মরনের হুমকিতে ফেলে জনগনের পাশে থেকেছে,  দেশপ্রেমের সঞ্জিবনী শক্তি ছাড়া এমন কাজ কে করতে পারে বলুন! এমনতর পরিস্থিতিতে মাঠ প্রশাসনের একজন গর্বিত সদস্য হাতুড়ি পিটার শিকার হলে, অামার বিক্ষুব্ধ হওয়া খুব অন্যায় হবে কি?

 

এগিয়েছে প্রিয় বাংলাদেশ, তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে দুনিয়া কাঁপানো পরাশক্তি ও অাজ সম্মানের চোখে দেখে। জিডিপি, অার রিজার্ভ এর জোরে দিশেহারা জাতির বৈষম্য আজ লাগামহীন, সুষম বন্টন -এতো কল্পনাবিলাসী ই বটে। দূর্নীতি আর মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন রোধ এখন সময়ের দাবী। এ দু'টি ক্ষেত্রের উন্নয়ন একদিকে যেমন ভবিষ্যত প্রজন্ম কে রক্ষায় রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা, তেমনি বৈষম্য দূরীকরণে ও হতে পারে একটি সুন্দর গ্রহণযোগ্য উদ্ভাবন। অনেকেই হয়তো বলবেন, নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরী না করে দূর্নীতির লাগামটানা সপ্ন বিলাসী নয় কি? একমত হলেও বলতে চাই, মজ্জাগত দূর্নীতি কে ও একটি সার্বজনীন বাধ্যতামূলক কর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের সাফল্য সর্বজনবিদিত, একটি ক্রাসপ্রোগ্রামের আওতায় প্রত্যেক ব্যক্তির অনুকুলে তার সমস্ত সম্পদ কে একটি পরিচিতি নাম্বারের অধীনে এনে শ্রেনীভিত্তিক বাধ্যতামূলক নিয়মিত কর ব্যবস্থাপনার আওতায় অানতে পারলে একদিকে যেমন বৈষম্য দূরীকরণে তা ফলদায়ক হতে পারে, অন্যদিকে যেনতেন উপায়ে বিত্তের বাসনায় মত্ত লোভাতুর শ্রেণীর অপ্রতিরোধ্য আখাংকাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কানাডা, অষ্টেলিয়ার মতো দেশগুলোর কর ব্যবস্থাপনাকে মডেল হিসেবে অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে শাসক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুদৃঢ় সদিচ্ছা ব্যতিত এমন পরিকল্পনা কল্পনাবিলাসী হতে বাধ্য। বাংলাদেশের ভিত্তিমূলে ছিলো একটি সুখী, সুন্দর, বৈষম্যহীন অর্থনীতির অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থার সপ্ন, এ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়েই ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৩০ লক্ষ মানুষ আত্নাহুতি দিয়েছিল। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন, ও মাদকের মতো ভয়াবহ সামাজিক সমস্যার টেকসই সমাধান না করে শুধুমাত্র সিভিল অার পুলিশ প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে একটি পুলিশি রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেও, দেশের জন্য আত্নাহুতি দেয়া জাতির গর্বিত সন্তানদের প্রতি যেমন অবজ্ঞার শামিল হবে, তেমনই জাতির জনকের অামৃত্যু লালিত বাসনা বৈষম্যহীন অর্থনীতির সুখী, সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার সপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

লেখক: মোঃ মাহমুদ হাসান, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

ক্যালগেরি, আলবার্টা, কানাডা

সেপ্টেম্বর ৬, ২০২০


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান