মিষ্টি কুমড়া ফুল

Thu, Sep 3, 2020 10:00 PM

মিষ্টি কুমড়া ফুল

মো: কামালউদ্দিন : করোনাকালে বিকালে পার্কে হাঁটতে যাই। আবাসিক এলাকায় পার্কটির চারপাশে প্রতিটি বাড়ির বাগানে নাম না জানা হৃদয় হরণ করা নানান রঙের ফুল গাছ। একটি এনজিও ক্লাবের সামনে বিশাল কাঠের বাক্স আকৃতির টবে হৃষ্টপুষ্ট মিষ্টি কুমড়ার গাছ। গাছের ডগা হেলেদুলে অতি আনন্দে মাটিতে নেমে এসে লুটোপুটি খেলছে।

গাছ দেখেই অনুমিত হলো, এই এলাকায় সাদা'দের বসবাস। চাষী বাংলাদেশী না এবং সে এসব কুমড়া শাকের মতো আবর্জনা খায় না। চায়নিজরা তাদের বাগান থেকে তুলে এনে মিষ্টি কুমড়া শাক ও ফুল চায়নিজ মার্কেটের রাস্তায় বসে বিক্রি করে। এই ফুল ও শাক বাংলাদেশী গ্রোসারীতে পাওয়া যায় না। লাউ শাক, পুঁই শাক ও লাল শাক দেশীয় গ্রোসারীগুলিতে পাওয়া যায়। কারণ সামারে সবাই বাগানে চাষ করে উদ্বৃত্ত অংশ প্যাকেট করে গ্রোসারীতে বিক্রী'র জন্য দিয়ে যায়।

মিষ্টি কুমড়া ফুলের বড়া ও চিংড়ী মাছ দিয়ে মিষ্টি কুমড়া শাক রান্না করা তরকারী টেবিলে খাবার সময় আমাকে যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অতি উৎসাহী হয়ে এনজিও ক্লাবের ম্যানেজারকে সকালে তার অফিস সময়ে গিয়ে খুঁজি। শত শত বই শিশুদের জন্য টেবিলে ছড়ানো। তিনি মিটিং থেকে এসে সাক্ষাৎ দিয়ে সরাসরি বললেন, দেখো আমি তো দূরে থাকি, এক প্রতিবেশীকে গাছ লাগানোর দায়িত্ব দিয়েছি। সে রোজ সকালে এসে গাছে ওয়াটারিং করে। তুমি বরং তাঁর কাছ থেকে অনুমতি নাও।

তারপর দিন সকাল আটটায় গিয়ে দেখি - চাষী গাছে পানি দিয়ে ফুরুত। বিকালের হাঁটার কোর্স সকালেই পার্ক পর্যন্ত হেঁটে পুরা করে নিরাশ হয়ে বিরস বদনে বাসায় ফিরি। মিষ্টি কুমড়ার ফুলের বড়া টেবিল থেকে আবারো হাতছানি দিলে আবার পরদিন সকাল সাড়ে সাতটায় যথাস্থানে পৌঁছি। সকালের আলোয় মিষ্টি কুমড়ার ফুলের বাঁধ ভাঙ্গা হাসি টব থেকে ছড়িয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর গাছের মালিক মহিলা হাসিমুখে বাগানে এলেন।

এগিয়ে মুখে কৃত্রিম হাসির রেশ ছড়িয়ে বলি - হায়, গুড মর্ণিং কেমন আছো? কি নাম তোমার? আমি ক্যাসি স্কট। তুমি কেমন আছো? ভালো, তুমি এ গাছের বীজ কোথায় পাও? তুমি কি এসব শাক খাও? সীড লাইব্রেরী থেকে অন লাইনে ফ্রি সীড সংগ্রহ করি। ওদের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, বিনিময়ে আমি আবার বৎসর শেষে ওদের সীড দেবো। আমি এ শাক খাই না। তুমি না খেলে কি করো এসব গাছ দিয়ে? গাছ মরে গেলে ঐ যে দেখো ঐ ড্রামে ভরে পঁচিয়ে সার করে নেক্সট ইয়ারে আবার গাছ লাগাই। এ শাক না খেলে তুমি এ গাছ কেনোই বা চাষ করছো? বলতে পারো প্রকৃতির প্রতি এক ধরণের দায়বদ্ধতা। জানো, আমরা তো এ শাক ও ফুল খেতে অভ্যস্থ। তুমি যদি অনুমতি দাও তা'হলে। আবারো ক্যাসি স্কট অসাধারণ হাসি দিয়ে বললেন - আচ্ছা তোমার যতটুকু ভালো লাগে নাও। কিন্তু পরাগায়নের জন্য কিছু ফুল রেখে দিও। হ্যাঁ, আমি মেল ফ্লাওয়ার দেখে অল্প কয়েকটা নেবো, ফিমেল ফ্লাওয়ার ছিঁড়বো না।

অনুমতি নিয়ে প্রথম ডগাটা কাটার পর দেখি - মহিলার ফর্সা চেহারা গাছ কাটার বেদনায় রক্ত শূন্য হয়ে নীল ছায়া নেমে এসেছে। সকালের আলোয় বেদনার্ত এ নারীর বেদনা তাড়ানোর জন্য পাতা কাটার বিরতি দিয়ে তাঁর সাথে বাক্যালাপ শুরু করি। এ পার্কে তোলা আমার ছবি "সকালের আলোর ঝর্ণা" তাঁকে দেখাই। আমার তোলা ছবি দেখে বেদনার নীল ছায়া অপসৃত হয়ে তাঁর চেহারায় সকালের সেই মিষ্টি, সুন্দর হাসিটি ফিরে এলে আমি আবার কুমড়ার ডগা, ফুল ও পাতা সংগ্রহের জন্য নিষ্ঠুর, নির্দয়ের মত অবলীলায় মিষ্টি কুমড়া গাছে ছুরি চালাই। ছুরির আঘাতে মিষ্টি কুমড়ার ফুলের হাসি ভেঙ্গে যাওয়া কাঁচের টুকরার মতো ঝনঝন শব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান