মুর্তজা বশীর: জীবন ও কর্ম

Sun, Aug 16, 2020 3:45 PM

মুর্তজা বশীর: জীবন ও কর্ম

মো. কামাল উদ্দিন :এক: ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাড়িতে যখন বই পড়তেন তখন তাঁর সন্তানদের পিতার কাছে যাবার অধিকার ছিল না। এবং সন্তানদের খেলাধূলা করার সময়ে শব্দ করা বারণ ছিল। বাবা বলতে যে লোকটাকে তারা দেখতেন, বুঝতেন সে ছিল টুপি পরা, দাড়িওয়ালা একটা মানুষ, সব সময় পড়ছে।

মুর্তজা বশীরের শৈশবের অনেক স্মৃতি রয়েছে তাঁর বাবার সাথে। তাঁর বাবা টেনিস খেলতেন। বাতিল হওয়া টেনিস বল কুড়ানোর জন্য বাবার সাথে টেনিস কোর্টে যেতেন তিনি। মূর্তজা বশীর তখন হাফ প্যান্ট পরতেন। নামাজের সময় হলে তাঁর বাবা বলতেন - প্যান্টটা হাঁটুর নীচে নামিয়ে নাও।

তাঁর পিতার একটা দোনলা বন্দুক ছিল বেলজিয়ামের তৈরী। ইসলামপুরের এলাহি বখশ দোকান থেকে বন্দুকের গুলি কিনতেন। শীতকালে সন্তানদের নিয়ে তিনি পাখি শিকারে যেতেন। তাঁর পিতার একটাই শখ ছিল পাখি শিকার করা। ঈদের চাঁদ দেখা গেলে তিনি আকাশে গুলি ছুড়তেন।

তাঁর পিতা বেতন পেলে টেবিলের ওপর টাকা ছড়িয়ে দিয়ে তিন ছেলেকে ডেকে বলতেন - তোমাদের যা টাকা লাগে নিয়ে যাও। রূপার পয়সার প্রতি তখন মূর্তজা বশীরের আগ্রহ ছিল। সেগুলো তিনি কুড়িয়ে নিতেন। মূর্তজা বশীরের মা দরজার বাইরে দাড়িয়ে থাকতেন। তিন ভাই টাকা নিয়ে রুম থেকে বের হলে তাদের মা সবার হাত থেকে টাকা নিয়ে একটি ছোট্ট বাক্সে জমাতেন। সেই জমানো টাকা দিয়ে তিনি একটি ফলের বাগান কেনেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পেয়ারা গ্রামে।

মুর্তজা বশীর আটচল্লিশ সালে ক্লাস টেনে পড়তেন। বাড়ির পরিবেশ ভালো লাগে না তাঁর। বাড়ি থেকে পালিয়ে লক্ষ্ণৌ যান, বাসার জন্য মন কেমন করায় ফিরে আসেন। তাঁর পিতা তাঁকে দেখে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন - কোথায় গিয়েছিলে? তিনি বললেন - লক্ষ্ণৌ। তাঁর পিতা ধীর গলায় তাঁকে বললেন - আগ্রায় গিয়ে তাজমহল দেখতে পারতে। 'গ্রামার বইতে পড়েছো না এমিনেন্ট, ইমিনেন্ট প্রিন্সিপাল নটোরিয়াস ফেমাস'। তারপর বললেন - 'আইদার নটোরিয়াস অর ফেমাস, মাঝামাঝি কিছু হও, আমি তা চাই না। ডোন্ট বি অ্যা মিডিওকার'।

মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মুর্তজা বশীরকে বললেন - তুমি আমার পোর্ট্রেট করো। তিনি আচকান ও মাথায় টুপি পরে বসলে মুর্তজা বশীর পিতার পোর্ট্রেট আঁকেন। ১৯৬০ সালে করাচিতে পিতা পুত্রের দেখা হয়। মুর্তজা বশীর তখন লাহোরে আর তাঁর পিতা করাচীতে উর্দু ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের চীফ এডিটর। মুর্তজা বশীর পিতাকে জিজ্ঞেস করেন - ধর্মে কি ছবি আঁকা নিষেধ। তিনি বললেন - না, তুমি আমার প্রতিকৃতি আঁকতে পারো। কিন্তু সেই প্রতিকৃতি দেখে যদি তোমার মনের মধ্যে ভাবের উদয় হয় তবে সেটা শিরক।

মুর্তজা বশীর দেশ-বিদেশের ষ্ট্যাম্প জমাতেন। তখনও সৌদী আরবের ষ্ট্যাম্পে কোনো জীবজন্তু বা বাদশাহর প্রতিকৃতি মুদ্রিত হতো না। কিন্তু এখন হচ্ছে। মুর্তজা বশীর ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বাংলা নামে ম-এর নীচে দীর্ঘ ঊ কার দিতেন। তাঁর পিতা একদিন বললেন - মূর্খের বানানে ম-এর নীচে দীর্ঘ ঊ-কার হয়, তুমি তো মূর্খ নও, তাই তুমি ম-তে লিখবে হ্রস্ব উ-কার। তিনি মুর্তজা বশীর নামটি সহজে মেনে নিতে পারেননি। চিঠিতে পুরো নাম লিখতেন - আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ, তারপর আলিফ দিয়ে মুর্তজা বশীর এবং মাঝ-মধ্যে মুর্তজা বশীর আর্টিষ্ট লিখতেন।

 

দুই

মুর্তজা বশীর যখন ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়েন তখন তাঁর মা তাঁকে আকাশ দেখাতে ছাদে ডেকে নিয়ে যেতেন। বলতেন - দেখ, ঐ যে আকাশে একটা গরুর পাল যাচ্ছে। তিনি বলতেন - কই, আমি তো কিছুই দেখছি না। তাঁর মা বলতেন - ভালো করে দেখ। তিনি আবার আকাশে তাকিয়ে বলতেন - ঠিকই তো, ঐ যে একটা গরুর পাল যাচ্ছে। এভাবেই তাঁর মা শৈশবে তাঁর মধ্যে কল্পনা করার বীজ রোপন করে দেন।

দেশ বিভাগের পূর্বে তাঁর পিতা ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অবসর গ্রহণ করে বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন।এবং সপরিবারে বগুড়া চলে যান। মুর্তজা বশীর বগুড়ার করোনেশন ইনস্টিটিউশনে ১৯৪৬ সালে ক্লাস নাইনে ভর্তি হন এবং ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। সে সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন 'ছাত্র ফেডারেশনে'র সদস্য হন। তিনি পার্টি অফিসের জন্য মার্কস, অ্যাঙ্গেলস, লেনিনের ফুলশিট পোর্ট্রেট করেছিলেন। তখন তাঁর অটোগ্রাফ জমানোর শখ ছিল। দেশ ভাগের বছর কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও তাত্ত্বিক ভবানী সেনের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি এসব পোর্ট্রট দেখে লিখলেন - 'শিল্পীর কাজ হ'ল শোষিত জনগণের ভার দুর্দশা এমনভাবে চিত্রের মাঝে চিত্রের ভিতর দিয়ে ফুটিয়ে তোলা যাতে সে আর্ট সমাজে নবজীবন সৃষ্টি করতে পারে'। তাত্ত্বিকের একথায় তিনি প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত হন।

বায়ান্ন সালে ১৯ বৎসর বয়সে প্রাণের তাগিদেই ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন। ২১ শে ফেব্রুয়ারীর সকালে ৭৯, বেগমবাজারের 'পেয়ারা হাউজ' বাসা থেকে বের হন বাবা-মা'র বারণ অগ্রাহ্য করে। দুপুরের একটু পূর্বে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সাথে তাঁর দেখা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাকের পাশে আসন্ন চিত্র প্রদর্শনী নিয়ে দুজনে আলাপ করেন। পুরো এলাকা থমথমে। একটু পূর্বে কাঁদুনে গ্যাস ছোড়া হয়েছে। বেলা তিনটায় গুলির শব্দে দৌড়ে পালাতে লাগলো সবাই। চারিদিকে আতঙ্ক। ব্যারাকের দক্ষিণ দিকে ভিড় দেখে এগিয়ে যান। গিয়ে দেখেন বেশ লম্বা, শ্যামবর্ণ, মুখমন্ডল পরিস্কারভাবে কামানো, পুরো চেহারা ভিজে আছে ঘামে, আর প্যান্টের নীচ থেকে অঝোরে ঝরছে রক্তের ঢল। সবার সাথে তিনিও গুলিতে আহত ব্যক্তটিকে ধরেন। তাঁর শাদা পায়জামা কে যেনো পিচকিরি দিয়ে আবিরের রং-এ রাঙ্গিয়ে দিলো। তিনি আহতকে তাঁর বুকের কাছে ধরেছেন, মাথা তাঁর মুখের কাছে। আহত ব্যক্তি চোখ তুলে তাকালেন। সে জিভ বের করে বলছে - 'পানি পানি'। তাঁর হাতের রুমালটা ঘামে ও পানিতে ভিজানো ছিল। তিনি ইতস্তত করছিলেন - রুমালটা নিংড়ে দেবেন কি-না। আহত ব্যক্তি হাঁ করে জিভ কাঁপিয়ে ছটফট করছিলো। তিনি রুমালটা তাঁর জিভে নিংড়ে দিলেন। সে ফিসফিস করে বললো - 'আমার নাম- আবুল বরকত, বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন, পল্টন লাইন, আমার বাড়িতে খবর দিয়েন'। সে আর কিছু বলেনি। সবাই মিলে তাঁকে মেডিকেলে নিয়ে গেলেন, সেখানে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জে আহত অনেকেই এসেছে। প্রথম গুলিবিদ্ধ একজনকে তারাই নিয়ে গিয়েছিলেন। নার্স, ডাক্তার সবাই দুঃখে, রাগে বিহ্বল হয়েছিল। মেডিকেল থেকে বের হয়ে আসার সময় তারা স্ট্রেচার একটা লাশ দেখেন। লাশটির মাথার খুলি নেই। মগজটা মনে হয় শুকনা দুর্বা ঘাসে পরে ছিল, তার মধ্যে ঘাস লেগে রয়েছে। ঘাস লেগে থাকা মগজটা তুলে স্ট্রেচারে রেখেছে। এই ঘটনাগুলো বিভিন্ন সময়ে তাঁর ক্যানভাসে উঠে এসেছে। ২১শে ফেব্রুয়ারীর ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হতে পেরে তিনি নিজে গৌরব বোধ করেন।

আবদুর রাজ্জাকের সাথে রিক্সায় করে বাসায় ফিরেন। সেদিন তাঁর পরিধানে ছিল চকলেট রং-এর সার্ট ও শাদা পায়জামা। তাঁর পুরো শরীর বরকতের রক্তে লাল। পিতা ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সন্তানের অপেক্ষায় ঘরে পায়চারি করছিলেন। ছেলেকে দেখে পিতা রাগ করে ধমক দিলেন। মুর্তজা বশীরের খুব অভিমান হলো। হাতের মুঠায় থাকা বরকতের তাজা রক্তমাখা রুমালটি মেলে ধরেন। তাঁর পিতা জিজ্ঞেস করলেন - 'মারা গেছে কেউ'? মাথা নেড়ে তিনি হ্যাঁ জানালেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর স্ত্রীকে বললেন - 'আমার কালো আচকানটা কই'? তাঁর স্ত্রী চামড়ার সুটকেস থেকে আচকানটি বের করে দিলেন। আচকানটি নিয়ে নিজেই দাড়ি ছাঁটার ছোট কাঁচি দিয়ে নীচের অংশের একটি টুকরা কেটে ছেলেকে দিয়ে বলেন - 'আমার হাতে বেঁধে দাও'।

তিন

মুর্তজা বশীর কখনো কল্পনা করেননি যে - তিনি ছবি আঁকবেন। পার্টির নির্দেশে ১৯৪৯ সালে আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। পার্টি থেকে তাঁকে বলা হলো - পার্টির ভাবধারা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ - শিল্পীরা তখন ততটা সমাজ সচেতন ছিল না। বেশিরভাগই বিশ্বাস করতেন, 'আর্ট ফর আর্ট সেক'। তিনি এই মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি আঁকতেন। সভা, সমাবেশ, মিটিং, মিছিলসহ প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। আর্ট ইনস্টিটিউটে প্রথম বর্ষে থাকাকালীন ১৯৫১ সালের জুন মাসে গ্রেফতার হয়ে পাঁচ মাস জেলে ছিলেন বাম রাজনীতি করার কারণে। ঐ সময়ে ছবি আঁকার প্রতি তাঁর মমত্ববোধ তৈরী হয়নি। রাত জেগে পোস্টার আঁকা ও স্ট্রিট কর্ণার মিটিং-এ তাঁর আকর্ষণ ছিল। একদিন সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাসে সামনের সারিতে বসে ছবি আঁকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁর শিক্ষক আনোয়ারুল হক পিছন থেকে তাঁর ঘাড়ে টোকাদিয়ে বলেন - 'ওঠো'। তিনি প্রশ্ন করলেন - কেনো স্যার? শিক্ষক বললেন - এখানে রাজ্জাক বসবে। রাজ্জাক তাঁর সহপাঠি ও সে প্রতিবার ফার্স্ট হয়। মন খারাপ করে জায়গা ছেড়ে দিয়ে বারান্দায় চলে আসেন, অশ্রু গড়িয়ে পরে। শিক্ষক সফিউদ্দিন মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করেন। কারণ জানার পর তাঁকে বললেন - 'বাসায় এসো'। স্বামীবাগে তাঁর বাসায় গিয়ে তিনি অসংখ্য অয়েলে আঁকা ছবি দেখলেন। তিনি মূলত উডকাট ও এচিং করতেন। শিক্ষক সফিউদ্দিন তখন তাঁকে অয়েলে কাজ জরার পরামর্শ দিলেন এবং শেখালেন কিভাবে অয়েলে আঁকার জন্য গ্রাউন্ড প্রিপেয়ার করতে হয়। শিক্ষক আমিনুল ইসলামই তাঁকে অয়েলে কাজ করা শিখিয়ে ছিলেন। জেল থেকে অক্টোবর মাসে ছাড়া পাওয়ার পর ক্লাসে ফিরে আসেন। তখন জল রং দিয়ে কিছুতেই ছবি আঁকতে পারছিলেন না। তিনি শিক্ষক আবেদিন স্যারকে বলেন - আমাকে দিয়ে ছবি আঁকা হবে না। তিনি তখন আমিনুল ইসলামকে ডেকে বললেন - আউটডোরে যাওয়ার সময় তাঁকে সাথে নিয়ে যেতে বলেন। এরপর থেকে শিক্ষক আমিনুল ইসলামের সাথে তিনি বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। তিনি তাঁর অয়েলে ছবি আঁকার অনেক কৌশল ধরিয়ে দিতেন। এভাবে ছবি আঁকার প্রতি তাঁর মনোযোগ বাড়ে।

মুর্তজা বশীর বলেন - 'পুনর্জন্মে বিশ্বাস আমাদের ধর্মে নেই। আরেকবার জন্মালে আমি কখনও শিল্পী হতে চাইব না। আরেকবার জন্মালে আমি একজন সাধারণ মানুষ হতে চাই। কারণ - শিল্পীর জীবন বড় কষ্টের জীবন। আমার ছোট মেয়ের ছবি আঁকার চোখ ও হাত দুটোই ভালো ছিল। আমি তাকে নিরস্ত করেছি। আমি যে কষ্ট করেছি, সেই কষ্ট তাকে করতে হবে - এটা আমি চাই না'।

প্রখ্যাত ভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ'র ছেলে ভাষা সৈনিক, বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭আগষ্ট, আজ শনিবার ১৫আগষ্ট ২০২০ তিনি ইন্তকাল করেন। চিত্রকলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে একুশে পদক পান এবং একই কাজের জন্য মুর্তজা বশীর স্বাধীনতা পুরস্কার পান ২০১৯ পান।

(মুর্তজা বশীর: একজন সংশপ্তক - আহমাদ শামীমের নেয়া সাক্ষাৎকার থেকে সংগৃহীত)

ছবি: সুরভী হাসনীনের প্রোফাইল থেকে সংগৃহীত।

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান