ছৈয়া হাগলার হাঁক

Fri, Aug 7, 2020 12:10 AM

ছৈয়া হাগলার হাঁক

আজাদ বুলবুল : এক. হাটবার মজা লোটার দিন। চারপাশে ছড়ানো পাকা গাব, ডাঁসা পেয়ারা আর আখের ছোবড়ার মিলিত ঘ্রান । ওদিকে ডুগডুগির আওয়াজে নেচে ওঠে মন। বানরের খেলা, তাসের জাদু, বিষধর নাগিন নিয়ে সাপুড়ের অপেক্ষা হাটের চেহারাটাই যেন পাল্টে দেয়। বাবরি দোলানো কবিয়ালের পুঁথিপাঠ আর ভাঙা হারমোনিয়াম বাজিয়ে নেচে গেয়ে বলবর্ধক সালসা বেচা বিক্রি শুরুর আগেই সাঁঝ নামে। শো শো আওয়াজ তুলে সাদা আলো ছড়ায় হ্যাজাক বাত্তি। ততক্ষণে আমাদের হুশ ফেরে। ছৈয়দ আহমদের বদবাক্য শোনার সুখ থেকে আমরা বঞ্চিত হই। হাটবারে তার নতুন গালি না শুনলে, তার থেকে নয়া গফ না জানলে সপ্তাহ জুড়ে আমাদের কথার ভাণ্ডার যে কৃপণ হয়ে থাকবে। আফসোসের দলা তাই আটকে থাকে গলার কফে। নয়তো, ছৈয়দের বচন "হোন্দের কাপড়ে হড়চে টান/ মোল্লার বাইত্তন খয়রাত আন"- নিয়েই আগামী হাটবার পযর্ন্ত সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

দুই.

কিন্তু কে জানতো, মাগরেবের পরে মল্লিকা মাদরাসার তালেবে এলেমরা চাঁদতারা পতাকা নিয়ে নারায়ে তকবির শ্লোগান তুলবে। শীর্ণ গলার মিলিত আওয়াজ গোস্তহাটা, কামার গল্লি কাঁপিয়ে দেবে। মাথার টুপি কোচড়ে গুঁজে ঝাপের লাঠি বাগিয়ে তেড়ে আসবে। আগস্ট ট্র্যাজেডির শোকাবহ ঘটনাকে তাচ্ছিল্য করে একজন মুখ বাঁকিয়ে বলবে "মইজ্জারে গুষ্টিশুদ্ধ শেষ কইচ্ছি। ছৈয়া হমুন্দির ছাড়ন নাই।"

তেঁড়া ছৈয়দের বিরুদ্ধে মোল্লা মাওলানাদের কেন এতো ক্ষোভ! কেন তাচ্ছিল্যের এই ঘৃন্য আয়োজন? আমরা কিছু বুঝার আগেই হাটুরে কিল, যেটা নাকি ভুতেও যোগায়, সেটার চুড়ান্ত আয়োজনে কোমরে গামছা বাঁধবে অনেকেই। ভোড় চৌতালের রাজা ছৈয়দ আহমদ। গালিরাজ হিসেবে সুখ্যাতির কারণে পারতপক্ষে কেউ তাকে ঘাটাতে চাইবে না। কিন্তু মধ্য আগস্টে বদলে গেছে হাওয়া। কালো রাতের পর্দা বদলে দিয়েছে সোনার স্বপ্ন। জনক হারানোর দীর্ঘশ্বাস বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে ধলপ্রহরের রাতে। ইঁদুর হয়ে যারা এতোদিন গর্তে লুকিয়েছিলো, তাদের মধ্যে এখন সিংহের জোস। শেয়ালের শংকা মাথায় নিয়ে রাজাকার, আলবদর, শান্তিকমিটির যে লোকগুলো লুকিয়ে চুরিয়ে দিন কাটাতো তারাই এখন তর্জন গর্জন দেয়। বিচার, সালিসে মুরুব্বি সেজে বিসমিল্লাহর জোয়ারে ভাসতে শুরু করে। ছৈয়দ পাগলের মতো আউল-বাউলদের নাকানি চুবানি দিতে নতুন শরিয়তি ফতোয়া জারি করে। ওরস, মেলা, যাত্রাপালা, কবিগানের বিরুদ্ধে কোমর বাঁধে। ছৈয়দ কথন "না হিনচে হোগায় হিনচে কাপড়/ হোগায় করে হাঁপর হাঁপর" এর মতোই নতুন জোসে তারা বলিয়ান হয়। টুপি, দাড়ি, সুরমা, আতরের জেল্লায় এক এক জন মর্দে মোমিন হয়ে ওঠে। মাঝারে মাঝারে মজবুর হয়ে ঘোরা ছৈয়দের ঢোল-করতাল বাজিয়ে নাচ গান বেদাৎ কর্ম। শ্যামপুরের দরগায় দরবারি বোনদের সাথে ঢলাঢলিতো শরিয়তের বরখেলাপ। এ বেশরিয়তি কাজের দায়ে অপরাধী সাজানো গেলে গণপিটুনিটা জায়েজ করা যায়। তাকে কী সামনা সামনি আঘাত করা সম্ভব? কূটচালে ঘায়েল করতে গনপিটুনীর বিকল্প নাই। আর হাটুরে কিলের আয়োজনের জন্য হাটবারইতো মোক্ষম ক্ষণ। জনান্তিকে শোনা যায়, "ছৈয়ার ছৈয়ালী আইজ খতম"।

তিন.

গোমাতলি, কুন্দিসপাড়া, কইলতান নগর, সোনাচাকায় ছৈয়দ আহমদকে ঘিরে নানামুখি গল্প-গুজব ডালপালা ছড়ায়। এগুলো অনেক সময় রূপকথাকেও হার মানায়। জ্বীন-ভূত ছাড়ানো, পেত্নী-পিশাচ তাড়ানোর কাহিনিগুলোতে অতিরঞ্জনই অলংকার। এসব গল্পের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ না জাগলেও কার্যকারণ নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুসরৎ কারও থাকে না। যেমন নোয়াখালির এসডিও স্যার এদিকটায় ট্যুরে এলে দফাদার, মেম্বার, মিয়া-ভুঁইয়া কারো খোঁজ না নিয়ে ছৈয়দের তত্ত্ব-তালাশ করেন। বিশ পঞ্চাশের পাত্তি ডুকিয়ে দেন ছৈয়দের পকেটে। রামগঞ্জের সার্কেল অফিসার তাকে কাছে পেলে তাজিমের সাথে কথা বলেন। শরীল স্বাস্থ্যেট খবর নেন। রক্ষীবাহিনীর এক বড়োকর্তা দিনকয় আগে ছৈয়া হাগলার ছন-বাঁশের ভাঙা ঘরের দাওয়ায় বসে নীচু গলায় শলাপরামর্শ করে গিয়েছে। তারিফ করেছে ছোট বউ মরিয়ম বানু ওরফে মৈরার হাতে বানানো গুড়ের শরবত খেয়ে। এসব কথা গাঁ গেরামের কে না জানে? বেবাক মানুষ অবাক এই ভেবে; এমপি বেলায়েত মিয়া, চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান সুধারামী, মুক্তিযোদ্ধা গাজী মাশিহুর রহমান, ম্যাজিস্ট্রেড হাসান সাহেব, কমান্ডার লুৎফুর রহমান— সবাইকে কোন মন্ত্রবলে হাত করে রেখেছে ছৈয়া পাগলা? আমরা ভাবি, এটা নিশ্চয়ই ধুলি পড়ার কেরামতি! কিংবা জ্বীনের বাদশার কারসাজি। নইলে সাদামাটা এই পাগলাটে লোকটার প্রতি সবার এতো পক্ষপাতিত্ব কেন?

 

চার.

আগস্টের কালো রাতের পর নেতা-খেতা অনেকেই চুপসে গেছে। মুখে কুলুপ এঁটে ধৈর্যের চরম পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে। মাথা নীচু করে হজম করেছে বিরুদ্ধবাদীদের কুৎসা। কিন্তু ছৈয়দ পাগলার মুখ বন্ধ করবে এমন মর্দ এ তল্লাটে আছে কি কেউ? মুখ তার আলগাই থেকে যায়। মুজিব হত্যাকারীদের শাপ শাপান্ত করা দিয়েই শুরু হয় তার দিন। দত্তপাড়ার জোড়া দিঘি, দেওয়ানজিদের ভাঙা প্রাসাদ, লোনা পাথারের নীরস জমি আর খিলপাড়া হাইস্কুল মাঠকে সাক্ষী মেনে ছৈয়দ অভিশাপের বন্যা ভাসায়। মল্লিকা দিঘির পাড় ঈদগাঁ মাঠের বুড়ো বটগাছটির গোড়ায় বড়োসড়ো একদল ডোয়া পিপড়ার ঘাড়ে দায়ের কোপ বসিয়ে বিড়বিড় গলায় বলে, "ধইচ্চি হমুন্দিরে! শেখরে মারি হলাবি কোনাই? কোনান্দি যাবি তোরা? তোগো দানা ছ্যেচি ত্যানা বানাইয়ুম। গেঁডি ভাঙি রক্ত খাইউম।" হঠাৎ সটান দাঁড়িয়ে পশ্চিমে মুখ করে উচ্চস্বরে হাঁক ছাড়ে— "তোগো উরপে খোদার গজব হড়বো রে বেইমান। গলায় হাহাকার তুলে বলেন, তোগো উরপে খোদার নালৎ হড়বো। "

তার এমনিতরো কথা শুনে ইঁদুর শেয়াল থেকে সিংহ হয়ে ওঠা লোকেরা বলে- "হক্কুনের দোয়ায় গরু মরেনা রে ছৈয়া। বাকশালের দিন শেষ, বিছমিল্লার বাংলাদেশ।" তারা ভাবে, আর্মী দিয়ে ধরিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে ভালোমতো ছ্যাচা দিলেই ছৈয়দের বকবকানি থেমে যাবে। পাগল ছাগল ঠাউরে এই সেয়ানাকে রেহাই দেয়ার মানেই হয় না। ইনডিয়ার চর হিসাবে সাজানো গেলে ছৈয়ার কোমরে দড়ি পড়তে কতক্ষণ! বুটের লাথি আর রুলের গুতো খেলে পাগলামী, ক্ষ্যাপামী সব পানি হয়ে যেতে বাধ্য।

পাঁচ.

ছৈয়দ আহমদের ক্ষ্যাপাটে আচরণ তার স্বভাবের অংশ। কবে, কখন সে স্বাভাবিক আচরণ করেছে তা আমাদের মতো পোলাপানের জানার কথা নয়। ইতিউতি করে, ঠাসবুনুনি হয়ে তার সম্পর্কে যেসব কথা ইথারে ভাসে সেগুলো চোখ বড় বড় করে শুনি আর অবাক হয়ে থুতু ছিটিয়ে তিনকদম পিছিয়ে আসি। আমাদের চেহারা সুরুত, চলাফেরা, পোশাক আসাক দেখলেই বুঝবেন, চুয়াত্তোরের অভাবটাকে থোড়াই কেয়ার করে কেমন গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছি। পাঁজরায় হাড় জিরজিরে চিহ্ন বিলীন।চোখে মুখে এখন তেল চেকনাই ভাব। হ্যাঁ, স্বীকার করছি অভাব দিয়েছিলো হানা। কিন্তু গৃহস্ত ঘরের ছেলেদের আউষের ফ্যান খাওয়া তো স্বাভাবিকই ছিলো। কোরানো নারিকেল দিয়ে লবন ঢেলে ফ্যান খেয়েছি পেটপুরে। আটার জাউ, খুদের ভাত খেতে মন্দ লেগেছে কী ? আরে বাবা! শালুক কী আমরা আগে খাইনি? কচুর লতি, কলার থোড়, নালিতাশাক, পুটিশাপলা এসব খেয়েছি ঠিকই তাই বলে থালায় ভাত জোটেনি এমনটা হয় নি কখনো। আমরা দলবেঁধে চলি এমন তিন জনের অভিমত— দূর্ভিক্ষকাল কাটাতে ছৈয়দ আহমদের তেমন বেগ পোহাতে হয়নি।

তা হবেই বা কেন? তিনি কী আর পাঁচ দশ জনের মতো? কলেরার বালাই তাড়াতে তার মতো ওস্তাদ আপনি কই পাবেন? ওলা বিবির ভয়ে আমরা যখন ঘরদোর বেঁধে সিঁটিয়ে আছি, তিনি তখন বল্লম উঁচিয়ে তাড়া করছেন প্রেতাত্মা। গুটিবসন্তের ভয়ে আপনার পেটের ভাত যখন চাল হয়ে আছে তখন ছৈয়দ আহমদ অমাবশ্যার রাতে গোরস্থানে শুয়ে হুম হা, হুম হা স্বরে জিকির করে ভুষ্টি নাশ করছে বদ বালাইয়ের জ্ঞাতিগোষ্ঠী। তাহলে জনাব, আলুটা, মুলোটা, মোরগটা, ছাগলটা দিয়েই তো সন্তুষ্ট করতে হতো তাকে। এসব ভেট ঘাড়ে, মাথায় করে চুয়াত্তরের অভাবী কালকে দাবড়িয়ে এগিয়ে চলা ছৈয়দের ঢেউ খেলানো বাবরি চুল, কুচকুচে কালো লম্বা গোঁফ, সাদা ঝকঝকে দাঁতের কিড়মিড় করা বিকট ভঙ্গী আর হাতে ঝোলানো চকচকে লোহার ত্রিশুল দণ্ডটি দেখলে আপনিও বুঝবেন— লোকে তার আসল নাম ঝেঁটে ফেলে "ছইয়া হাগলা" নামে কেন ডাকে?

 

ছয়.

ছৈয়দ পাগলার পাগলামির সাক্ষী রামগঞ্জের সন্মুখ লড়াই, মান্দারির চোরাগোপ্তা হামলা, বজরার রক্তক্ষয়ী অপারেশান। আরো খোলাসা করে যদি বলি, দত্তপাড়া, সোমপাড়া, সাহাপুর, দশঘরিয়ার তাবৎ সমাচার বিবিসির খবরের আগে নানা ভেক ধরে যোগাড় করার জাদুকর সে। রাজাকারদের কুমন্ত্রনার পাতানো জাল ছিঁড়ে হাইডআউটের রোজনামচা তৈরি হতো তার দেয়া ছক কেটে। হানাদার বাহিনীর গতিবিধি, চর-দালালের আখড়া, শান্তি কমিটির মেজাজ-মর্জি কীকরে যে শুঁকে শুঁকে মুসাবিদা করতো ছৈয়দ আহমদ তার তল-কিনারা বের করার সাধ্য গ্রুপ কমান্ডারের ছিলো না। খিলপাড়া বাজারের মেছোহাটায় কান পাতলে জাইল্যাদের বাতচিতে শুনতে পাবেন তার পাগলামীর ছিটাছাঁটা বৃত্তান্ত। জেলে পল্লীর নারীদেরকে রাজাকারের লোলুপ চোখ থেকে কী নিপূন কৌশলে রক্ষা করেছিলো তার অবিশ্বাস্য গল্প। তবে এসব গল্পের চাইতে আমরা তার ভূত তাড়ানো, কলেরার বালাই দৌড়ানো, গুটি বসন্তের ওলাবিবিকে প্যাদানো, ভেদবমির শীতলাকে পরাভূত করার কাহিনি শুনে উজ্জীবিত হই। আর মনে মনে ভাবি, তাঁর মতো করে হাঁক ছেড়ে, দাঁত কিড়মিড়িয়ে, পেত্নী তাড়িয়ে আমরাও ধামালিয়া পাথারের শোলমাছ বাড়ি বয়ে আনবো।

 

আমার গিট্টু দেয়ার জ্ঞান হয়নি, তাই লুঙ্গি কাঁধে ঝোলানো। ওস্তাদের পাজামার পাছাতে মস্ত ফাঁক, হিসু করার সময় বসলেই হয়, দড়ি খোলার দরকার পড়ে না। সাগরেদের একহাতে সাইকেলের পুরাতন টায়ার, আরেক হাতে প্রায় খুলেপড়া হাফপ্যান্ট। বোতামের অভাবে পাটের দড়িতে বাঁধা। ওস্তাদ সাগরেদকে নিয়ে আমরা সাহসী হওয়ার পণ করি। মল্লিকার দিঘির গহীন কালো জলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দৈত্যের ঠিকুজি খুঁজতে ছৈয়দ আহমদের অনুকরণে হাঁক ছাড়ি। তার মতো কাঁধ নাচিয়ে বিড়বিড় করে বলি, "ডরাইলে ডর, ভরি দিলে কী চ্যাঙের ডর?"

 

সাত.

ওই নয়টা মাস ছৈয়দ পাগলা ঘুরে বেড়িয়েছে চর্কির মতো। মৃত সহযোদ্ধার অর্ধগলিত লাশ সৎকার করেছে নিজ উদ্যোগে। পাঞ্জাবি, পাঠান হানাদারদের নাস্তানাবুদ করেছে দেশি কৌশলে। আলবদর সমর্থক মোল্লাদের প্যাদানি দিয়েছে রহিমগঞ্জ বাজারে। সোনাচাকার রাজাকার আনোয়ার হোসেনের গায়ে হাত তোলার সাহস হয়নি। কিন্তু স্বরচিত কবিতার হুল ফুটিয়ে ঘায়েল করতে ছাড়েনি। চিলা দিঘির পাড়ে এক দুপুরে এই জামাত নেতাকে পেয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেছিলো—

মালানা মৌলুভী, মাখতো চোখে সুরমা, খাইতো কতো বিরিয়ানী/ এখন খায় ধাক্কা কনি, আরও খায় দৌড়ানি।

রাজাকার পেয়ার হোসেন আর শাজাহান ধরা পড়েছে। দিঘির পাড়ে ঈদের মাঠে জমায়েত শত শত লোকের সামনে হত্যা করা হবে তাদের। কমান্ডার অলিউল্লাহ সুবেদার চান হত্যার ঘটনাটি নৃশংসভাবে হোক। রাজাকারির শাস্তি দেখে অন্যরা যেন ভয় পায়। আলবদর, আল সামস বাহিনীতে যোগ দিতে যেন নিরুৎসাহিত হয়। তাহলে খোঁজো কোনো এক নিপূণ হত্যারককে। কার বুকের পাটায় ছটপট করে দেশদ্রোহীর বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা? ডাক পড়ে ছৈয়দ আহমদের। গোঁফ নাচিয়ে লাল কাপড়ে প্যাচানো লৌহদন্ড উঁচিয়ে হাজির হয় সে। তার হাত দিয়েই সম্পন্ন হয় রাজাকার নিধনের লোমহর্ষক কার্যক্রম।

 

পাগলামীর আরও নমুনা আছে। মান্দারির কুখ্যাত রাজাকার ননী চেয়ারম্যানকে হত্যার পর তার উদোম লাশের গলায় ফাঁস লাগিয়ে বটগাছে ঝুলিয়ে রাখে মুক্তিযোদ্ধারা। মানুষ দেখুক। বেইমানীর শাস্তি কতো ভয়ানক, লোকে বুঝুক। নাফারমানীর শাস্তি কত ভয়ঙ্কর হয়, সেটা সবাই জানুক! ননী চেয়ারম্যান লক্ষ্মীপুর, মাইজদী, চৌমুহনীর হানাদার ক্যাম্পে চরাঞ্চল থেকে ধরে আনা সুন্দরী মেয়েদের সাপ্লাই দিতো। আর্মি ক্যাম্পে পাঠানোর আগে একরাত নিজে চেখে দেখতো। প্রতিরাতে মেয়ে মানুষের রোদনে ভারী হয়ে উঠতো চেয়ারম্যানের বৈঠকঘর। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাথার ঝাঁকড়া চুলে মস্ত ঝাকুনি দিয়ে দাঁতে কিড়মিড় আওয়াজ তুলে লাশের সামনে এগিয়ে যায় ছৈয়দ পাগলা। কোমরে গোঁজা ড্যাগার দিয়ে ঘ্যাচাং করে ননীর ননুটা কেটে নেয়। তারপর সেটি ঘৃনাভরে লাশের মুখে ভেতর ঠেসে দিয়ে হাঁক ছাড়ে, "খা, বালা করি খা। এতোদিন বেডির বোদা খাইছত, এইবার নিজের চনু খা।"

 

আট.

ছৈয়দ পাগলার কোমরে দড়ি বেঁধে ধানহাটায় আনা হয়েছে। দেয়া হয়েছে হালকা চড় থাপ্পড়। সালিসরা আগেই সাজিয়ে রেখেছে নালিশ। যাকে তাকে গালিগালাজ করে সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট করা, মাঝারে মাঝারে নর্তন-কুর্দনের মাধ্যমে শরিয়ত বিরোধী কার্যকলাপে অংশ নেয়া, বে নামজি ও বে রোজাদারি হয়েও কথায় কথায় মাওলানা মৌলভীদের চরিত্রহরণসহ রোগ-মহামারী তাড়ানোর নামে বেদাত কার্যকলাপের অভিযোগে তাকে কঠিন শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

 

আমরা খুশি হই এই ভেবে, ক'টা কানমলা দিয়ে বা জুতার মালা পরিয়ে, ডেন্ডরি বাজিয়ে হাটের এমাথা ওমাথা ঘুরিয়ে শেষ হবে শাস্তিপর্ব। কারণ রাজাকার ননী চেয়রাম্যানের নুনু কাটা, পেয়ার হোসেন, শাহজানকে বেয়ানেট খু্ঁচিয়ে পৈশাচিক কায়দায় রক্তাক্ত করা, শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার প্রতিবাদে ঘাতকদের গালিগালাজ করা, তাদের নির্বংশ হওয়ার অভিশাপ দেয়ার অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়নি। অতএব, তার মাথার চুল কেটে, গোবর ঢেলে দেয়ার শাস্তি নির্ধারণ হলেও আমরা অবাক হবো না। ছৈয়দের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে আমাদের বলতে ইচ্ছে করবে—

"কিও কাগু, কতা কন্না ক্যা? আন্নের হাঁক ডাক গেছে কোনাই?"

গোঁফ নাচিয়ে, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দুলিয়ে, দাঁত কিড়মিড়িয়ে বুকের খাঁচায় জমে থাকা অব্যক্ত কথাগুলো ছৈয়দ আহমদ বলতে শুরু করলে আসন্ন গণপিটুনির কোলাহলে তা চাপা পড়ে যাবে।

আপনি এই হট্টগোলের ভীড়ে কান পাতলে শুনতে পাবেন, ছৈয়দ পাগলা গলা কাঁপিয়ে বলছে, "শেখ সাব যেই দ্যাশঅ বাঁচি থাকতো হারে নঅ, হেই দ্যাশো ছৈয়া হাগলার হাঁক ছাড়নের দরকার কী?"

 

৬ আগস্ট ২০২০


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান