কানাডায় বাস করে যেন তারা অন্য জাতীয়তাবোধে দীক্ষিত না হয়

Tue, May 5, 2020 10:39 PM

কানাডায় বাস করে যেন তারা অন্য জাতীয়তাবোধে দীক্ষিত না হয়

স্নেহাশীষ রয়: টরোন্টো শহরে, কিছু মসজিদের সশব্দে , মাগরিবের আযানের অনুমতি দেয়া হয়েছে, শুধুমাত্র রমজান মাসে। টরোন্টোবাসী ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা মত দিয়ে দিয়েছে, কানাডা হলো স্বর্গ।

অনেকেই শব্দদূষণের অজুহাত তুলে, আযান বন্ধ করার জন্য, অনলাইন পিটিশানের লিংক পাঠিয়েছে, আমার ইনবক্সে। আমি তাঁদের একমত পোষণ করি নি। আমি সাইন করি নি। কারণ, মা'গরিবের আযানে যতটা শব্দ হয়, তার চেয়ে অনেকগুণ তীব্রতর শব্দ তুলে, বিভৎস হার্লে ডেভিডসন মোটর বাইকগুলো, আমার বাড়ীর পাশের রাস্তাকে অতিক্রম করে যায়, এমনকি রাত দুপুরেও। এই মোটর বাইকগুলো টরোন্টোর বুকে চলার অনুমতি থাকলে, শব্দদূষণের অজুহাতে আযান বন্ধ করা ঠিক নয়। শুধুমাত্র, আবাসিক এলাকায়, বা হাসপাতালের কাছে, সশব্দ আযান যেন, পিড়ীত মানুষদের ক্ষতির কারণ না হয়, সে খেয়ালটুকু রাখতে হবে।

আমরা যাঁরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তাঁদের কাছে, এই শব্দ সহনীয় হয়ে উঠার কথা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নিভৃতচারী কানাডিয়ান সাদারা যতটা বিরক্তবোধ করছে, তার চেয়ে বেশী বিরক্তবোধ করছে, বাংলাদেশ ভারত থেকে আসা অমুসলিম অভিবাসীরা।আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে, এই অমুসলিম অভিবাসীদের এই মানসিক অবস্থার বোঝার চেষ্টা করি।

 

আমি আশির দশক থেকে বাংলাদেশে বড় হয়ে উঠেছি, নব্বইয়ের দশক দেখেছি, তারপরও আরও একযুগ দেখেছি, বাংলাদেশে। এই দীর্ঘ বত্রিশ বছরে, একটা সমাজকে বদলে যেতে দেখেছি। মানুষের ক্রয়সক্ষমতা বেড়েছে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভেতর ধর্ম ঢুকেছে , মানুষের ধর্মচর্চার ধরণটিই যেন বদলে গেছে। আমি ছোটবেলায় দেখেছি পূজা ঈদ যেন সার্বজনীন উৎসব। কিন্তু পূজায় খাওয়া, বা বড় দিনে যাওয়া কতটা ধর্মসিদ্ধ, তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে নি। সময়ের সাথে সাথে, মানুষ বিভিন্ন প্রশ্ন করতে শুরু করলো। আমাদের স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিভাষাগুলো পরিবর্তে, পিউর আরবী বলার অভ্যাস শুরু হলো। বর্তমান বাংলাদেশের যে পিউরিটান ইসলাম চর্চা, তার তেমন দেখা যেতো না। ধর্মের সাথে, স্থানীয় সংস্কৃতির যে মিলিত রূপটি ছিল ইসলামের, তা পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এমনকি, শহীদ মিনারে, ফুল দেয়া কতটা ইসলাম সম্মত সে প্রশ্নগুলোও আসতে থাকলো।

 

রাজনীতির মূল গুটি হলো ইসলাম। রাজনীতিরা প্রমাণ করার চেষ্টা করলো কে কতটা মুসলিম। একাধিক বিবাহ-বহির্ভূত নারী কেলেংকারী নিয়েও, এরশাদ সাহেব, সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম প্রবর্তন করে প্রমান দিলেন , তিনি আসলে কতটা সাচ্চা মুসলমান। বিটিভিতে অনুষ্ঠান থামিয়ে, আযান প্রচার শুরু হলো। আমি ছেলেবেলায়, থান্ডার ক্যাটস নামের একটা কার্টুন দেখার জন্য সারা সপ্তাহ ধরে বসে থাকতাম।। কিন্তু সেই অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে, চল্লিশ মিনিটি ধর্মচর্চা, ধর্মশিক্ষার অনুষ্ঠান দেখানো হতো। কোরান পাঠের আসরে, আমার ফেভারিট অংশ ছিল, ' আখরোদা আওয়ান, আ'নীল হামদুল্লিল্লাহ হি মুবারাকাতো' বলে অনুষ্ঠানটি যখন ক্বারী হাবিবুল্লাহ সিরাজী শেষ করতেন। প্রতিটি আযান, আযানের দো'আ আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি কি এগুলো দেখতে চেয়েছি, থান্ডার ক্যাটসের জগতে বাস করা ক'টি শিশু তা দেখতে চায়?

 

তারপর নব্বইয়ের দশকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। ইফতারের জন্য রমজান, সেমাই আর চালের রুটির জন্য ছোট ঈদ, আমার বিশেষ পছন্দের ছিল।

আমার বড় ভাই শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। হলে, একটি ছাত্রসংগঠনের নেতারা, এসে দিনের বেলায় কেন্টিন, তালা লাগিয়ে দিয়ে যেতো রমজানে। যাঁরা রোজা রাখে না, তাঁরা খাবে কোথায়? যাঁর আলসারের সমস্যা, সে কি সারাদিন ধরে জল খেয়ে থাকবে? আমার ভাই বাঁশি বাজাতো। একদিন সেই ছাত্রসংগঠনের ছেলেরা বাঁশি ভেঙ্গে দিয়ে গেলো। আমার ভাই জেদী ছিল, সেও যোগ দিলো, প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনে। তাঁর পুরো শিক্ষাজীবন ধ্বংস হয়ে যায় । আমার পুরো পরিবার ভীষণ রকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। আমার শিক্ষক বাবা একদিন বলেছিলেন, ' বাঘের থাবায় মানুষ যেমন কষ্ট পায়, তিনি আমার বড় ভাইয়ের শিক্ষাজীবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়, ততটুকু কষ্ট পেয়েছেন'।

 

চুরানব্বই সালে, একবার জগন্নাথ হলে, পুলিশ ঢুকে, সম্ভবত ৩১শে জানুয়ারী । তখন ছিল রোজার মাস। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ছেলেরা দুপুরের খাবার খাচ্ছিল। পুলিশ ঢুকে বললো, ' রোজার সময় কি খাস, মালাউনের জাত।' লাথি দিয়ে ফেলে দিল ভাতের থালা।

 

তারপর চাকুরীতে ঢুকলাম। কল্যাণপুরে অফিস। আমরা অফিসেই দুপুরের খাবার খাই। রমজান মাস শুরু হলেই, শংকিত থাকতাম। রমজান শুরু হলেই, পুরা কেন্টিনের চেয়ার টেবিল সরিয়ে, অস্থায়ী মসজিদের পরিণত হতো কেন্টিনটি। আমি ব্যাচেলর ছিলাম শুরুতে। আমি অন্যদের মতো রাতে সেহরী করে আসি নি। দুপুর বেলায়, রোজা না রাখা মানুষগুলো কোথায় খাবে, কোন ভাবনা নেই। কেবল যেন জোর করে চাপিয়ে দেবার সংস্কৃতি, ব্যক্তিস্বাধীনতার হরণ। কোন বিবেচনা বোধ নেই। শুধু আছে একধরণের অবসেসিভ কম্পালসান।

ধর্মচর্চা মূলত: ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়। আমি এভাবেই দেখি। কাছে পিঠে, হাসপাতাল কিংবা আবাসিক এলাকা না থাকলে, আযান দেয়াটি দোষের কিছু না। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসী মানুষগুলো যেন সেই চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতির ট্রমাটিকে ভুলতে পারে না। কেউ শংকিত হয়। কেউ ঘৃণা করে।

 

কানাডার মুসলিম অভিবাসীরা তাঁদের ধর্ম পালন করবে। কানাডার সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্টই হলো, অন্য সংস্কৃতিকে গ্রহণ করা। শুধু খেয়াল রাখতে হবে , কানাডা অভিবাসী মুসলিমরাও যেন, কানাডার কালচারকে মন থেকে গ্রহণ করে। কানাডার সুবিধা নিয়ে যেন ছেলেমেয়েরা কানাডার নাগরিক হয়। এমন কিছু যেন না করে, যাতে সাংস্কৃতিক বিভেদ তৈরী হয়। কানাডায় বাস করে যেন তারা অন্য জাতীয়তাবোধে দীক্ষিত না হয়। তবে সেটিই হবে সবচেয়ে দু:খজনক ঘটনা।


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান