ঐতিহ্যবাহী ফক্স থিয়েটারে এবারের টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল

Thu, Jul 11, 2019 7:00 PM

ঐতিহ্যবাহী ফক্স থিয়েটারে এবারের টরন্টো মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল

মনিস রফিক : পৃথিবীর প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয় ১৮৯৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বরে প্যারিসের গ্রান্ড ক্যাফেতে। সেদিন  লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রায় এক মিনিট দৈর্ঘ্যের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবার প্রায় একশ পঁচিশ বছরের মধ্যে চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পকলা আর ইন্ডাস্ট্রি।

১৯১৫ সালে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ নির্মিত পৃথিবীর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনী চলচ্চিত্র "দ্য বার্থ অব এ নেশন" মুক্তি পাওয়ার এক বছর পূর্বে কানাডার টরন্টোর মূল শহরের লেক অন্টারিও'র কোল ঘেঁষে তৈরি হয়েছিল কানাডার দ্বিতীয় প্রাচীনতম প্রেক্ষাগৃহ 'ফক্স থিয়েটার'। আর্থার ব্রুক ওয়েবস্টারের উদ্যেগে গড়ে ওঠা এই থিয়েটারকে তখন ডাকা হতো "পাসটাইম থিয়েটার" নামে।

প্রতিষ্ঠার এক বছর পর এটার নামকরণ করা হয় সেই সময়ের ব্রিটিশ রাজপুত্র অষ্টম এডওয়ার্ডের নামে "প্রিন্স এডওয়ার্ড থিয়েটার"। আমাদের নিশ্চয় জানা আছে, ১৯৩৬ সালে প্রিন্স অষ্টম এডওর্য়াড ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু ওয়ালিস শিম্পসন নামের এক আমেরিকান তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য পরের বছরই তাঁকে ব্রিটিশ সিংহাসন ছাড়তে হয়। প্রিন্স এডওর্য়াডের সিংহাসন ত্যাগ করার বছরই থিয়েটারটি নাম বদলে রাখা হয় "ফক্স থিয়েটার"।

আর্থার ব্রুক ওয়েবস্টার ও তাঁর উত্তরসূরীরা দীর্ঘ নব্বই বছর এই থিয়েটার পরিচালনা করেছিলেন। এক সময় পৃথিবীর কালজয়ী সব চলচ্চিত্র প্রথম মুক্তি পেত এখানেই। সেই সময় দূর- দূরান্ত থেকে সিনেমাপ্রেমী সব দর্শক ছুটে আসতো অন্টারিও লেকের কোল ঘেঁষা টরন্টোর এই প্রেক্ষাগৃহে। কালের বিবর্তনে কিছুটা ম্রিয়মান ও জৌলুসহীন হয়ে যাওয়া এই প্রেক্ষাগৃহটির লোকসানের ব্যয়ভার ওয়েবস্টার পরিবার টানতে না পেরে প্রায় এক যুগ আগে সিদ্ধান্ত নেয় কানাডার দ্বিতীয় প্রাচীনতম থিয়েটারকে ভেঙ্গে অন্য কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের। কিন্তু এতে বাধ সাধে এলাকার জনগণ। তারা কিছুতেই তাদের এই ঐতিহ্যকে বিনষ্ট বা হাত ছাড়া হতে দেন নি। ফলে নিজেরা সমবায়ের ভিত্তিতে অর্থ সংগ্রহ করে ২০০৭ সালে এর মালিকানা নিয়ে নেন। সেই থেকে "ফক্স থিয়েটার" এর মালিক এখন সেই এলাকার জনগণ। নিজেদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে নতুনভাবে সাজানো এই প্রেক্ষাগৃহটিতে বর্তমানে দু'এক জন বেতনভূক সদস্য বাদ দিলে আর সবাই স্বেচ্ছাশ্রমী। সব চেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২৪৮ সিটের  এই প্রেক্ষাগৃহটিতে বর্তমানে প্রতিদিন টরন্টোর যে কোন প্রেক্ষাগৃহের তুলনায় অনেক বেশী দর্শক সমাগম হয়। আর এই দর্শকদের অধিকাংশই হচ্ছেন বয়স্ক জনগণ যারা শুধু চলচ্চিত্র উপভোগ করার জন্য পঞ্চাশ বা একশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আসেন। এখানে এসে তাঁরা স্মরণ করেন তাঁদের অতীতকে, আর ছুঁয়ে দেখেন তাঁদের যৌবনের দিনগুলিকে যখন "ফক্স থিয়েটার" আর তার একশ মিটার দূরের ওন্টারিও লেকের বীচ'টি ছিল টরন্টোর প্রধানতম প্রাণকেন্দ্র।

সেই ঐতিহাসিক "ফক্স থিয়েটার"এ দ্বিতীয় বারের মত হতে যাচ্ছে টরন্টো ফিল্ম ফোরাম আয়োজিত তৃতীয় মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। ১৪টি ভাষার ২৫টি স্বল্প ও পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কাহিনী এবং প্রামাণ্য চলচ্চিত্র দেখানো হবে এই চলচ্চিত্র উৎসবে। এই চলচ্চিত্রের অধিকাংশই থাকবে বাংলাদেশের অসম্ভব মেধাবী সব তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের চলচ্চিত্র। পুঁজির দৌরাত্বে এই সব মেধাবী ও সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজ সাধারণত প্রেক্ষাগৃহগামী চলচ্চিত্র দর্শকদের সামনে আসে না।

২০১৪ সালে টরন্টো ফিল্ম ফোরাম প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিকল্পধারা ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের চলচ্চিত্র দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত করা। এবারের চলচ্চিত্র উৎসবের প্রায় সব চলচ্চিত্রই হচ্ছে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের এমন সব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্র, যারা চলচ্চিত্রকে মনে প্রাণে ভালোবাসেন একটি শিল্পমাধ্যম হিসেবে এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরতে চান আমাদের সমাজ, চিন্তা আর স্বপ্নকে।

তিন দিনব্যাপী এই চলচ্চিত্র উৎসব সবার জন্য উন্মুক্ত। বিনা মূল্যে এ উৎসবের টিকিট সংগ্রহ করতে যোগাযোগ করুন টরন্টোর ৩০০০ ড্যানফোর্থ এভিনিউ এ অবস্থিত টরন্টো ফিল্ম ফোরাম এর কার্যালয়ে অথবা মেইল করুন torontofilmforum2014@gmail.com এ।

নিছক বিনোদনের বাইরে জীবনমুখী শৈল্পিক চলচ্চিত্র দেখার জন্য সবার আমন্ত্রণ রইল টরন্টো ফিল্ম ফোরাম আয়োজিত তৃতীয় মাল্টিকালচারাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, টরন্টো - ২০১৯ এ।

        মনিস রফিক, সাধারণ সম্পাদক,  টরন্টো ফিল্ম ফোরাম


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান