টেলিভিশন সাংবাদিকতা, টেলিভিশন ব্যবসা

Sun, Jul 7, 2019 1:44 PM

টেলিভিশন সাংবাদিকতা, টেলিভিশন ব্যবসা

ইমিতিয়াজ মাহমুদ: ১) শুধু সময় টেলিভিশন নয়, যতটুকু জানি আরও অনেক টেলিভিশন চ্যানেলই ওদের কর্মীদের সাথে খুবই অন্যায় আচরণ করে। বিশেষ করে সংবাদ শাখায় যারা কাজ করেন ওদের সাথে।

 

টেলিভিশন ব্যাবসার সাথে আমার সেরকম কোন যোগাযোগ নাই। মনিভাই একটা টেলিভিশন চ্যানেলের এমডি ছিলেন অনেকদিন। মনিভাই আমার বন্ধু মুশতাকের বড় ভাই। তিনি গত হয়েছেন বছর ঘুরে গেছে। আমার ক্লায়েন্ট একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে একবার অনুরোধ এসেছিল একটা নিউজচ্যানেল কিনে নেওয়ার জন্যে। সেই উপলক্ষ্যে ঐ প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সাথে কয়েকদিন কথা হয়েছে টেলিভিশন ব্যাবসার নানান দিক নিয়ে। ওদের বর্তমান ব্যাবসার যে ধরন তার সাথে টেলিভিশন ব্যাবসার কোন মিল নাই। আর টেলিভিশন ব্যাবসায় বিনিয়োগ আর লাভ লোকসানের হিসাবটাও আমরা মিলাতে পারছিলাম না। ফলে সেই প্রস্তাবটি খুবই বিনয়ের সাথে এড়ানো হয়েছে সেবার।

 

সেইবারই আমি জানতে পারি যে টেলিভিশনের সংবাদকর্মীদের বেতন ভাতা ও সুযোগ সুবিধা এইসব খুব ভাল নয়। সাংবাদিকদের জন্যে ওয়েজ বোর্ড আছে, অয়েজ বোর্ডের যে এওয়ার্ড, সে অনুযায়ী সংবাদপত্রগুলির মধ্যে দুইটা কি তিনটা সংবাদপত্র বেতন দেয়। বাকি এই যে শত শত খবরের কাগজ দেখেন, এরা সাংবাদিকদের ঠকায়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলি বেতন দেয় তারচেয়েও কম। আপনার চেনা পরিচিত কোন টেলিভিশন সংবাদকর্মী থাকলে তাকে জিজ্ঞাসা করে টাকার অংকগুলি জেনে নিতে পারেন। শুনলে আপনি ভিমরি খাবেন।

 

বলতে পারেন যে এতো কম বেতন তাইলে ওরা এই চাকরী করে কেন? করে কারণ প্যাশন আছে সাংবাদিকতা নিয়ে। আর গ্ল্যামারটা আছে। সেই সাথে চাকুরীর বাজারে আকাল। সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা করতে চায় বা সম্প্রচার মাধ্যমে কাজ করতে চায়

 

একটা গ্ল্যামার তো আছে সর্বত্র। আমাদের এখানে প্রথম যখন একুশে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু করে, তখন ঐ চ্যানেলের রিপোর্টাররা সারা দেশে একেকজন বিশাল তারকা খ্যাতি উপভোগ করতেন। একুশে তখন স্যাটেলাইট ও টেরিস্টেরিয়াল দুইভাবেই সম্প্রচার হতো। ওদেরকে বলতে পারেন আমাদের প্রথম প্রজন্মের টেলিভিশন সাংবাদিক। এখনো পর্যন্ত ওরাও আমাদের দেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার জগতে সবচেয়ে শীর্ষ অবস্থানগুলিতে বিরাজ করছেন। এমন কি ওদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতার যারা ওরাও কেউ কেউ কোন চ্যানেলের শীর্ষ পদে রয়েছেন।

 

(২)

এই গ্ল্যামারটা আছে। প্যাশন আছে। সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা করতে চায় বা সম্প্রচার মাধ্যমের সাথে থাকতে চায় ওদের জন্যে টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করা একটা আনন্দদায়ক ব্যাপার। ফলে ওরা অনেক কম টাকাতেও কাজ করে। কিন্তু টেলিভিশনে সংবাদকর্মীদেরকে যে কি পরিস্থিতিতে কাজ করতে হয় সেটা কেবল বেতনের টাকার হিসাবে আপনি বুঝতে পারবেন না।

 

যারা প্রথম চাকরী নেয় বা অপেক্ষাকৃত নতুন তারা যে বেতন পায় সেই বেতনে আপনি ঢাকা একজন ড্রাইভার পাবেন না। ঠাট্টা নয়। টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করে এরকম নতুন রিপোর্টারের বেতন ঐ চ্যানেলেরই ড্রাইভারের চেয়ে কম এরকম আমি আপনাকে নাম ধরে ধরে বলতে পারবো। এটাও না হয় মেনে নেওয়া যায়, আপনি ধরে নিলেন যে প্রফেশনাল ধরণের কাজগুলিতে শুরুতে বেতন একটু কম হয়। কিন্তু পর্যায়ক্রমে তো বাড়বে, নাকি? সেই বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বা ইনক্রিমেন্টের যে কি হাল সে তো আপনি ইতিমধ্যে সম্ভবত জেনেছেন।

 

তার উপরে আছে চাকুরীর অনিশ্চয়তা। চাকুরীর ন্যুনতম গ্যারান্টি নাই। ইচ্ছা হলে রাখবে, ইচ্ছা হলে বের করে দিবে। এই অনিশ্চয়তা শুধু যে নবীন সংবাদকর্মীদের বেলায় সেটা কিন্তু না। সিনিয়ার ধরনের যারা আছেন ওদেরও একই অবস্থা। এই তো কয়েকদিন আগে একটা টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ শাখা হঠাৎ করে দিল বন্ধ করে। ঐ শাখায় যারা কর্মী ছিলেন সম্পাদক ছিলেন সকলেই একদিন সকাল বেলা বেকার হয়ে গেলেন। আমি জানিনা সেইসব সাংবাদিকদের এইরকম অকস্মাৎ চাকুরিচ্যুতির কারণে কোনপ্রকার ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ ইত্যাদি কিছু দেওয়া হয়েছিল কিনা। অনুমান করি যে সেরকম কছুই ওদের ভাগ্যে মিলেনাই। সিনিয়ার একজন দুইজন অন্য কোন চ্যানেলে চাকুরী জুটিয়ে নিয়েছেন বটে, অপেক্ষাকৃত তরুণদের অবস্থা কি তাও জানিনা।

 

আর নারীদের কথা? সেই ভয়াবহ অবস্থার কথা শুনলে আপনি চমকে উঠবেন। আমি তো চমকেই উঠেছিলাম যখন জেনেছি যে নারী যে নারী সংবাদকর্মীদেরকে মাত্রিত্বকালিন ছুটিটাও দেওয়া হয় না। প্রেজেন্টার হোক বা রিপোর্টার হোক, একজন নারী যখন সন্তান সম্ভবা থাকেন, তখন তো তাকে একটা বেতন সহ ছুটি দিতে হয়। সেই সাথে দিতে হয় সন্তান জন্মদানের পরেও বিনা বেতনে ঐচ্ছিক ছুটির অপশন। আমি যেটা জেনেছি গর্ভধারণ করলে নারী সংবাদকর্মীকে ওরা চাকুরী থেকেই বের করে দেয়। ওরা তো আবার চালু আছে, এইসবের কোন রেকর্ড হয়তো আপনি খুঁজে পাবেন না। ওদের এইচআর ডিপার্টমেন্টগুলি এইগুলি ঠিকঠাক সামলে রাখে। সংবাদকর্মীটিকে বলা হয় একটা পদত্যাগ পত্র স্বাক্ষর করে দিতে। ব্যাস হয়ে গেল। নারী সংবাদকর্মীটি খুব বেশী প্রতিবাদও করতে পারে না। তাকে তো এই ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজ করতে হবে। কার সাথে ঝগড়া করবে? কয়জনের সাথে ঝগড়া করবে?

 

আমাদের অতি পরিচিত টেলিভিশন সংবাদকর্মী বীথি তো ফেসবুকে পোস্ট দিয়েই জানিয়েছেন ওর সাথে কি হয়েছে। স্লিভলেস পরে রিপোর্ট করেছে বলে সময় টিভিতে তাকে রিপোর্টিং থেকে বসিয়ে দিয়ে রেখেছিল। বুঝেন অবস্থা। একজন রিপোর্টার স্লিভলেস পরেছে বলে তাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। অনেকটা সাময়িক বরখাস্ত করার মতো।

 

(৩)

আমি জানিনা সব টেলিভিশনে একই অবস্থা কিনা। এমনিই বন্ধুদের সাথে কথা বলে জেনেছি যে দুই একটা চ্যানেলে পরিস্থিতি একটু ভাল। কিন্তু নারীদের মাত্রিত্বকালিন ছুটির ব্যাপারে সম্ভবত প্রায় সব চ্যানলেই একই অবস্থা। কোন চ্যানেলে যদি এর ব্যাতিক্রম থাকে, তাইলে সে তো সুখের খবর আরকি।

 

এখন কথা হচ্ছে এইগুলির প্রতিকার কি? ব্যক্তিগতভাবে একেকজন রিপোর্টার কি চ্যানেলের সাথে প্রতিটা ইস্যুতে ঝগড়া করবে? মামলা মোকদ্দমা করবে? কোর্ট কাচারিতে দৌড়াবে? সেটা তো সম্ভব না। কেন সম্ভব নয়? কারণ একটা টেলিভিশন চ্যানেল আর একজন পুঁচকে রিপোর্টারের মধ্যে তো সেই ভারসাম্যটা নেই। রিপোর্টার বেচারা যদি লেবার কোর্টে দৌড়াতে থাকে কথায় কথায় তাইলে সে কাজ করবে কি করে? আর মামলাবাজি করে টিকে থাকারও একটা ব্যাপার আছে। একটা টেলিভিশন চ্যানেলের পক্ষে বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু একলা একটা রিপোর্টারের জন্যে তো কাজটা সহজ নয়।

 

এইজন্যেই ইউনিয়ন থাকে। ইউনিয়নগুলির কাজটা কি? এইগুলি দেখবে। সংবাদকর্মীরা যেন ওদের অধিকারগুলি ভোগ করতে পারে। ন্যুনতম কিছু অধিকার আছে যেগুলি প্রতিটা সংবাদকর্মীর প্রাপ্য- যে কোন শ্রমিকের মতোই। এগুলি কি? ওয়েজ বোর্ডের বেঁধে দেওয়া ন্যুনতম মজুরীটা যেন পায়। বিনা নোটিশে বা বিনা ক্ষতিপূরণে যেন কাউকে কাউকে চাকুরী থেকে ছাঁটাই করা না হয়। যথাযথ নোটিশ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে যেন কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। আর মাতৃত্বকালীন ছুটিটা যেন নারীরা ঠিকমত পায়। গর্ভধারণের জন্যে যেন কেউ চাকুরী না হারায়।

 

চিন্তা করতে পারেন, একজন সংবাদকর্মীকে গর্ভধারণের 'অপরাধে' চাকরী থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। একবার দুইবার নয়, অনেকবার ঘটেছে এই ঘটনা। সাংবাদিকদের কোন ইউনিয়ন থেকে এইটার বিরুদ্ধে কোন উচ্চবাচ্য আপনি কোনদিন শুনেছেন? আমি শুনিনি। অথচ আমাদের এখানে সাংবাদিকদের ইউনিয়নগুলি কিন্তু বেশ শক্তিশালী। কয়েকদিন আগে আমরা দেখেছি এইরকম একটা ইউনিয়ন তার শক্তিধর পেশী দেখাচ্ছে একজন সংস্কৃতিকর্মীর বিরুদ্ধে। এই পেশীটা আপনারা টেলিভিশন চ্যানেলগুলিকে দেখাতে পারেন না?

 

(৪)

সাংবাদিকদের ইউনিয়নগুলি কতোটা শক্তি ধরে আপনি অনুমান করতে পারেন? পুরুষদের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ চলছে, বিশ্বকাপ নিয়েই একটা উদাহরণ দিই। এটা আমার দেখা। বিলাতে সাংবাদিকদের একটা ইউনিয়নের ধর্মঘটের কারণে ১৯৮৩ সনে ক্রিকেট বিশ্বকাপের কয়েকটা খেলার লাইভ টেলিকাস্ট হয়নি, ঐ খেলাগুলির কোন রেকর্ডেড ভিডিওও নাই। যতদূর মনে পড়ে, যে খেলাটিতে কপিল দেব ১৭৫ রান করেছিলেন, সেইটাও সেই স্ট্রাইকের মধ্যে পড়েছিল। এই কারণে সেই ঐতিহাসিক ইনিংসটির কোন ভিডিও আপনি পাবেন না।

 

না, ধর্মঘট তো পছন্দের ব্যাপার না। ধর্মঘটের উদাহরণটা দিলাম এই জন্যে যে ইউনিয়নগুলি ওদের সদস্যদের ন্যায্য স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় কি ভূমিকা রাখতে পারে সেটার একটা ইলাস্ট্রেশন যেন আপনি পান। পশ্চিমে ইউনিয়নগুলি অনেক শক্ত। ওরা সংবাদকর্মীদের চাকুরীর নানারকম শর্ত মালিকদের সাথে আলাপ আলোচনা করে ঠিক করে নেয়। কোন কোন সংবাদকর্মী এইসব শর্তের চেয়ে কম সুবিধা নিয়ে চাকুরী করতে পারে না। টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে এটা আছে কিনা জানিনা, কিন্তু পশ্চিমে অনেক ইন্ডাস্ট্রিতেই এমন কায়দা করা আছে যে ইউনিয়নের সদস্য না হলে আপনি চাকুরীই করতে পারবেন না।

 

এই যে একটা ছেলে চাকুরীর ক্ষেত্রে অপমানিত লাঞ্ছিত হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলো, এইখানে আমাদের সাংবাদিক ইউনিয়নগুলির একটু কাজ করা দরকার না? আমি বলছি না যে টেলিভিশন চ্যানেলটিই দোষী বা আত্মহত্যা চেষ্টার জন্যে দায়ী। ইনক্রিমেন্ট একজন কর্মী পাবে কি পাবে না সে তো আর আপনি বা আমি বাইরে থেকে বলতে পারবো না। কিন্তু ইউনিয়ন তো ঘটনাটা যাচাই করে দেখতে পারে। দেখতে পারে যে আসলেই এই ছেলেটার সাথে অন্যায় হয়েছে কিনা।

 

(৫)

সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্র ওদের আচরণ ওদের ইউনিয়ন এইসব নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা করা যোগ্যতা সম্ভবত আমার নাই। বড় বড় বাঘা বাঘা অভিজ্ঞ সাংবাদিক সম্পাদকরা আছেন। তিনকাল দেখেছেন এরকম ঝানু মাথাও আছেন অনেক। আর আমি তো ওদের পেশার লোকও নই। তথাপি, তথাপি, অতি বিনয়ের সাথে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের কাছে এই অনুরোধ কি করতে পারিনা যে টেলিভিশন সংবাদকর্মীদের এইসব অনুযোগ অভিযোগ মেহেরবানী করে একটু দেখেন? আপনারা যদি ওদের অধিকারের দিকটা না দেখেন, তাইলে ওরা তো শোষণের শিকার হবেই।

 

আমি একজন বয়স্ক নাগরিক। রোজার ঈদের আগে ব্যাংকে গেছি জরুরী কাজে, ব্যাংকের কর্মচারীরা আমাকে সিনিয়ার সিটিজেনদের লাইনে দাড় করিয়ে দিয়েছে। আমার একটু ইয়ে লেগেছে, ব্যাটারা কি আমাকে বুড়া ভেবেছে নাকি! কিন্তু কিছু বলিনাই। সিনিয়ার সিটিজেনদের লাইনে না দাঁড়ালে বিশাল এক কিউএর পিছনে দাঁড়াতে হয়। যখন জেলখানায় গেলাম, জেলের লোকজন মানে অন্য কয়েদিরা আর জেলগার্ডরা আমাকে কেউ মুরুব্বী ডাকছিল, কেউ আঙ্কেল। সেখানেও ঐ বুড়ো ভাব ধরে একটু সুবিধা নিয়েছি। অতোটা বুড়ো হয়তো হইনি, কিন্তু বয়স তো কম হয়নি। আমার মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।

 

আমার তো মাথায় ভাবনা আসে, ইউনিয়নগুলি যদি ঠিকঠাক মতো ওদের দায়িত্ব পালন না করে, তাইলে নতুনদের কি হবে? কিভাবে কাজ করবে ওরা? কিভাবে মেধাবী ছেলেমেয়েরা এই পেশায় আসবে? আমার একটা মেয়ে যদি টেলিভিশন সাংবাদিকতায় যেতে চায় দুই কি তিন বছর পর, সেও কি এইরকম নির্যাতন বঞ্চনার শিকার হবে?


Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান