কেন ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে!

Mon, Jan 14, 2019 10:44 AM

কেন ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে!

মাসকা্ওয়াথ আহসান: একটি ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে জাল ভোট দেয়ার সময় কয়েকজন নারীকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনারা তো একবার ভোট দিয়েছেন! আবার ভোট দেবার জন্য দাড়িয়ে আছেন কেন! তাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমতী নারী উত্তর দেয়, ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে!

 

এই যে নৈতিকতার নিম্নমান; এটিই বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামাজিক নৈতিকতার গড় মান। শুধু জালভোট দেবার ক্ষেত্রে নয়; প্রতিটি অনৈতিক কাজের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার জনগোষ্ঠীর একই যৌক্তিকতা; ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে।

 

জালভোটের ওপর দাঁড়িয়ে বিজয় উদযাপনের সময়; গ্রামের নারীদের মতো নগরের নারীকে যদি জিজ্ঞেস করা যায়, আপনি কেন এই জালভোটের বিজয় উদযাপন করছেন, তার যৌক্তিকতাও ঐ একটিই; ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে!

 

দুর্নীতিবাজকে যদি জিজ্ঞেস করা যায়; আপনি দুর্নীতি কেন করেন! তার উত্তর ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে!

 

খুনীকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি খুন কেন করেন; তার উত্তর, ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে!

 

শিল্পপতিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, শ্রমিকদের কেন এতো কম মজুরি দেন; তার উত্তর ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে!

দার্শনিক সক্রেটিসের মতে, যারা অন্যায় করে; তাদের কাছে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ স্পষ্ট নয়; তারা ন্যায় ভেবেই অন্যায়টি করে। সে কারণে কেন তাকে অন্যায়ের জন্য তিরস্কার করা হচ্ছে; তা সে বুঝতে পারে না।

এরকম অবস্থায় ইউরোপের সমাজও একসময় এমন ছিলো। তারা ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে; তাই ঘুরে ঘুরে নৌকা ডাকাতি ও ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন করে বেড়াতো। কিন্তু তাদের গড় শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ন্যায়-অন্যায়ের ধারণাগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের সামাজিক শৃংখলা দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণ হবার ও মানুষ হিসেবে প্রত্যেকে সমান সম্মান পাবার অধিকার রাখে; এই স্বাভাবিক বোধটি জায়গা করে নেয় ন্যায়ের ধারণা হিসেবে।

 

এই শিক্ষা বিকাশে ইহুদি-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলো যেভাবে এগিয়ে গেছে; মুসলমান ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী

এলাকাগুলো সেভাবে এগুতে পারেনি।

 

শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা দুটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠী হিন্দু-মুসলমানদের যৌথ বসতস্থল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সে কারণেই ভয়ংকর একটি এলাকা। যাদের ন্যায়-অন্যায় বোধ নেই; তারা ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে; তাই চুরি-ডাকাতি-খুন-ধর্ষণ-দাঙ্গা-গালাগালের নরক বা দোজখ হিসেবে গড়ে তুলেছে দক্ষিণ এশিয়াকে। এখানে ধর্ম-দেশপ্রেমের আফিম খাইয়ে দুদল মানুষের দাঙ্গা লাগিয়ে দেয়া আর লুন্ঠন প্রধানতম পেশা।

একে তো অশিক্ষিত; তারপর ঐতিহ্যের শেকড়ে যাদের শ্রেণীপ্রথা লালিত; সেখানে শূদ্র-বৈশ্য-কায়স্থ থেকে ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণ-এর জীবন লাভই একমাত্র জীনগত স্বপ্ন। তারমানে দরিদ্র ও কৃষক- শ্রমিকদের শোষণ করে উপার্জন ও সম্পন্ন জীবন লাভটাই প্রতিটি মানুষের জীবনের লক্ষ্য এখানে। এই শ্রেণী উত্থানের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে; তাই মানবতা বিরোধী সব অপরাধ অস্বীকার করতে সক্ষম এরা। কারণ ন্যায়-অন্যায়ের কোন স্পষ্ট বোধ নেই তাদের।

এই বিপুল অশিক্ষিত দক্ষিণ এশিয় জনগোষ্ঠীর ভোটে ও জালভোটে তাদের প্রতিনিধিত্বশীল লোকেরাই নির্বাচিত হয়। ফলে এ এক অর্ধমূর্খের স্বর্গ।

এই লেখাটি দক্ষিণ-এশিয়ার মানুষের একচুয়ালাইজেশান; বা সমাজ-নৈতিকতা ও সভ্যতার কোনস্তরে তাদের অবস্থান; তা অনুধাবন ও আত্মোপলব্ধির জন্য লেখা। কারণ সভ্যতার সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থানে বসে; অন্ধের হাতি দেখার মতো; হাতির কান, দাঁত বা শূড় ধরে ঐটিকেই উন্নয়ন বলে চিহ্নিত করা আর মিথ্যে আশার আলোর ঘুড়ি উড়িয়ে উড়িয়েও একবিংশ শতকে এসে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সবচেয়ে অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একজন; এই আত্মপরিচয়ের চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর নেই।

যতদিন পর্যন্ত ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা স্পষ্ট হচ্ছে না এ এলাকার সমাজ মননে; ততদিন এই " ভাল্লাগে, খুশির ঠ্যালায়, ঘোরতে" বোধের স্তরের নির্বোধ নরকচক্রে ঘুরপাক খাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও সমাজগুলো।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান