আমাদের গীটারের বরপুত্র

Mon, Aug 13, 2018 12:40 AM

আমাদের গীটারের বরপুত্র

সায়ীদ যাদিদ:সত্তরের শেষার্ধ থেকে আশি এবং নব্বুইয়ের দশক জুড়ে প্রচুর হাওয়াইয়ান গীটার বাদন শুনেছি। বিশেষ করে ভারতের কাজী অনিরুদ্ধ, সুনীল গাঙ্গুলি, বটুক নন্দী এবং বাংলাদেশের প্রধানত: এনামুল কবির, ষ্টেলা স্বপ্না মন্ডল এবং বাবুল কান্তি সেন। বাংলাদেশে এঁদের মধ্যে এনামুল কবিরই একমাত্র শিল্পী যিনি হাওয়াইয়ান ইলেকট্রিক গীটারকে সর্বগামী প্রতিষ্ঠা, পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছেন। Recital বা গানের সুর বাদনে বাঁশী, বেহালা, হারমোনিয়ম, পিয়ানো, ব্যান্জো ইত্যাদি বহুবিধ যন্ত্রের ব্যবহার হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু ইলেকট্রিক গীটার তার tonal quality এবং যান্ত্রিক অন্যান্য সুবিধার কারনে সবার উপরে স্থান করে নিয়েছে। গানের সুরে যন্ত্র বাদনের যত জনপ্রিয়তা তা বলতে গেলে গীটারকে কেন্দ্র করেই। ভারতে দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়ের বেহালায় রবীন্দ্র সংগীত বাদন এবং ভি বালসারার ইউনিভক্স বাদন যন্ত্র দুটির জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। আর বিশ্বমোহন ভাট গীটারে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বাজাতে বাজাতে মোহন বীণা নামে একটি নুতন গীটারই বানিয়ে ফেলেছেন। সে যাক, আমরা কথা বলছিলাম গিটারে গানের সুর বাদন প্রসঙ্গে। তো, এই জায়গায় এসে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত একটি মাত্র নামই বিখ্যাত হয়েছে - এনামুল কবির

১৯৫৮ সালে গীটার হাতে নিয়ে ১৯৬৪ সালে রেডিওতে বাজাতে শুরু করা ৭৭ বছর বয়সী এই তরুনের সি ডি, ক্যাসেট বেরিয়েছে ৫৪ টি, স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ২৩ টি আর আত্মজীবনী গ্রন্থ বেরিয়েছে একটি। এছাড়া বেশ কিছু গানের স্টাফ নোটেশন তৈরী করেছেন তিনি যা বাঙালি বংশোদ্ভূত প্রবাসী ছেলে মেয়ে যারা পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে সংগীত শিখছেন, তাদের কাজে লাগবে। চিন্তা-চেতনায় প্রচন্ড রকম বাঙালি, দেশপ্রেমিক শিল্পী এনামুল কবির বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছয়টি গান রচনা ও সুর করে স্বরলিপি সহ রেকর্ড করেছেন। এখনো শিল্পী এনামুল কবির সমান জনপ্রিয়, সমান কর্মব্যস্ত, সমান সৃষ্টিশীল। অনেকগুলো সংগঠন-সংস্থার কর্মকান্ড ছাড়াও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন দেশে বিদেশের অসংখ্য ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাদানের কাজে। এইসব বহুবিধ ব্যস্ততার ফাঁকেই তিনি টরন্টো এসে ১১ই আগষ্ট রয়াল কানাডিয়ান লিজিয়ন হলে তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহীদের গীটারে, কথায়, গানে ও গল্পে মাতিয়ে গেলেন প্রায় তিন-তিনটি ঘন্টা।

সর্বজনমান্য লেখক আকবর হোসেন এবং উদীচীর প্রাক্তন সভাপতি এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জনাব আজিজুল মালিকের স্মৃতি তর্পণ এবং শিল্পী-সান্নিধ্যের বর্ণনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের প্রথমেই রবীন্দ্র সংগীত সংস্থার পক্ষ থেকে সভাপতি জনাব শাহজাহান কামাল তাঁকে স্মারক প্রদান করে সম্মানিত করেন জনাব আজিজুল মালিককে সাথে নিয়ে। এনামুল কবির প্রত্যুত্তোরে কৃতজ্ঞতা জানালেন গিটারে ‘এ মনিহার আমায় নাহি সাজে’-র দু লাইন বাজিয়ে। এরপর মুল অনুষ্ঠানে শিল্পী বাজালেন প্রায় ২০ টির মত গান - রবীন্দ্র সংগীত, ভারতীয় ও বাংলাদেশী আধুনিক গান, লালন গীতি, পল্লী গীতি, সিলেট ও চট্টগ্রামের আন্চলিক গান ইত্যাদি। এর মধ্যে শিল্পী দুটি গান স্বকন্ঠে এবং আরো দুটি গান তাঁর স্বনামধন্য, লব্ধপ্রতিষ্ঠ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কন্যা নাহিদ কবির কাকলীর সাথে গাইলেন দ্বৈত কন্ঠে। লক্ষ্য করা গেল, শিল্পীর বাজানোর চেয়ে গাওয়ার প্রতি অনুরাগ কিছু কম নয় ! কিছুটা ক্ষেদ কি রয়ে গেল তাঁর জীবনে, যন্ত্র তাঁর কন্ঠকে অতিক্রম করে যাওয়ায় ! তা কেন হবে ? আমরা তো তাকে জানি গিটারের গুরু হিসেবে। না, আমাদের কোন ক্ষেদ নেই, কোন আক্ষেপ নেই।

গাওয়া এবং বাজানোর ফাঁকে ফাঁকে চলছিল শিল্পীর স্মৃতি রোমন্থন। তা যেমন স্ত্রী পুত্র পরিবারকে নিয়ে, তেমনি বঙ্গবন্ধুর সাথে নৌবিহারে তাঁকে গান শোনানো, ভোলায় গিয়ে রিক্সা চালকের সাথে কথোপকথন, কিংবা ধানমন্ডি লেকের পাড়ে তার নিয়মিত আড্ডার মত অসংখ্য স্মৃতি জাগানিয়া দৃশ্যপট গুলো শ্রোতা দর্শকের মানসপটে তুলে ধরছিলেন কখনোবা হাস্যরসের ফল্গুধারায় আবার কখনোবা দু:খ ভারাক্রান্ত, আবেগমথিত, ব্যাথা জাগানিয়া আবহের অনুভবে। সব মিলিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল ঘরোয়া আবহে আনুষ্ঠানিক পরিবেশনা। যার ফলে দর্শক শ্রোতা যতটা না গীটার বাদন শুনতে পেয়েছেন তারচে’ বেশী করে পেয়েছেন গিটারের পেছনের মানুষটির শিল্পী সত্বাকে। এই ধরনের অনুষ্ঠানের এটাই লাভ- শিল্পের চেয়ে শিল্পীকে আরো বেশী করে পাওয়া। এই বেশী করে পাওয়াকে আরো পূর্ণতা দিয়েছেন শিল্পী-তনয়া কাকলী এবং ছাত্র সুমন খালিদ তাঁদের স্মৃতিচারনের মধ্য দিয়ে।

এদিনের অনুষ্ঠানে শিল্পী এনামুল কবিরকে যন্ত্র সংগীতে সহযোগিতা করেছেন সজীব চৌধুরী তবলায়, জুনায়েদ আনোয়ার দোতারায় এবং সুমন খালিদ (শিল্পীর প্রাক্তন ছাত্র ) কিবোর্ডে। অনুষ্ঠানটি পূর্বপার উপস্থাপনা করেছেন সুকন্ঠী মেরী রাশেদিন। জানা মতে, ইতোমধ্যেই এন আর বি টেলিভিশন এবং বাংলা টেলিভিশন, কানাডা শিল্পী এনামুল কবিরের সাক্ষাৎকার ধারন করেছেন এবং সামাজিক প্রচার মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। আর এর সব কিছুই প্রমাণ করে, খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার দিনমনি মধ্যগগন পার হলেও শ্রোতার হৃদয়ে তাঁর অধিষ্ঠান এখনো কতোটা গভীরে !

টরন্টো শহরে আমাদের বেশ কিছু পূজ্য পূজারী আছেন যারা লক্ষ্মী-সরস্বতীর পূজো করেন শুধু কায়-মন-বাক্যে নয়, কায়-ধন-বাক্যেও করেন বৈ কি ! যার ফলশ্রুতীতে আমরা, আম দর্শকশ্রোতা বিনা মূল্যে কিংবা নাম মাত্র মূল্যে মহার্ঘ সব অনুষ্ঠানাদি ভোগ-উপভোগ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারি। যথার্থই তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন নাহিদ কবির কাকলী। আমাদের দর্শক শ্রোতাদের পক্ষ থেকেও তাঁদের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা। ধন্যবাদ নাহিদ এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই বিখ্যাত অথচ অমায়িক, যাকে বলে down to the earth শিল্পীকে তাঁর ভক্তদের সাথে মিলবার সুযোগ করে দেয়ার জন্যে।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান