স্বপ্নিল দিনগুলি

Tue, Jan 9, 2018 6:28 AM

স্বপ্নিল দিনগুলি

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।

মৃদুলা রশীদ :  দিন চলে যায়, কিন্তু মনের কোনে স্মৃতি জাগ্রত থাকে। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। জীবনের মধুরতম দিনগুলি হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।১৯৮২/৮৩ সেশনে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। হলে থাকার সুবাদে সাংস্কৃতিক সব কর্মকান্ড নাগালের মধ্যেই ছিল। প্রথমে আমি কন্ঠশীলনে আবৃতি শিখতাম। কন্ঠশীলনে অনুশীলনের সময় সাংস্কৃতিক দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখতাম এবং মনে মনে সদস্য হওয়ার ইচ্ছে পোষন করতাম। একদিন চলে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষন। আমার বন্ধু চম্পা বললো , তুই ঢাবি সাংস্কৃতিক দলে জয়েন কর।আমি আর তুই একসাথে গান গাইতে পারবো ।সেই আমার পথচলা।

"স্মৃতিচারনের "জন্য যখন আহমেদ বললো তখন মনের মধ্যে স্মৃতিগুলি দোলা দিচ্ছিল। যেহেতু লেখার অভ্যেস নেই তাই গুছিয়ে লিখে তা পড়ার যোগ্য করে তোলাও একটা বড় ব্যাপার। তাই এই বিলম্ব। সালটা ছিল ১৯৮৫।চম্পার কথামত দরখাস্ত করলাম। সাংস্কৃতিক দলে সদস্য হবার জন্য জগন্নাথ হলের স্বপন দা এবং বন্ধু তরুনের বেশ অবদান ছিল। সাক্ষাতকারে লাকিভাই অনেক প্রশ্ন করলেন গান নিয়ে। তারপর রাজনীতি নিয়ে। যখন শুনলেন আমার বাড়ী গোপালগঞ্জ এবং আমি আওয়ামী ঘরনার রাজনীতি করি , তখন আমার প্রতি স্নেহ একটু বেড়ে গেল। এরপর শুরু হল প্রতিদিনকার মত গানের প্রাক্টিস এবং বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করা। দলের সদস্য থাকাকালীন সময়ের অনেক স্মৃতি মনের মনিকোঠায় উকি দেয়। মনে হয় কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি। জীবনের সেই স্বপ্নিল দিনগুলি আজো ভাস্বর হয়ে আছে। দলের সাথে যুক্ত হয়ে মনে হচ্ছিল , জীবনের আরেকটি অধ্যায়ে উপনীত হলাম। প্রতিটি বিকেল কাটতো আমাদের টিএসসি সাংস্কৃতিক দলে।একদিন সেখানে না গেলে মনে হত কি যেন মিস করছি।বিভিন্ন জায়গায় অনু্ষ্ঠান করার জন্য নাচ গান আবৃতি ও নাটকের মহড়া হত।ঢাকার অনেক জায়গায় অনুষ্ঠান করেছি। এছাড়া ঢাকার বাইরেও অনুষ্ঠান করেছি।

একবার লাকি ভাইয়ের গ্রামের বাড়ীতে গেলাম অনেক কষ্টে। এখনকার মত যাতায়াত ব্যবস্হা তখন ভাল ছিল না। প্রথমে রিক্সায় সদরঘাট, সেখান থেকে লঞ্চ, তারপর ট্রলার এবং শেষে বাসে করে পৌঁছলাম গন্তব্য স্হলে। লঞ্চে বসে অনেকে গান করছে আবার কেউ আবৃতি করছে। কেইবা তাস খেলছে। পথের মধ্যে জিয়াভাই অনেক মজার গল্প বলে সবাইকে হাসাচ্ছিলেন। ঐদিন আমি আর চম্পা এত হেসেছিলাম যে , আজো মনে পড়ে সেই স্মৃতি। দলের মধ্যে অনেকে আমাকে একটা কিছু বলে ক্ষ্যাপাতো।এত বছর পরে এটি আমি ভুলে গেছি কিন্তু দলের অনেক ট্যালেন্ট সদস্য আছে যারা আমাকে সেই ক্ষ্যাপানোর কথাটা মনে করিয়ে দিল। আমি ভীষনভাবে অবাক হলাম , যেটা আমি ভুলে গেছি কিন্তু ওরা মনে রেখেছে। প্রায়ই রাতে অনুস্ঠান হত এবং হলে ফিরতে দেরী হত। কিন্তু হল থেকে তেমন  পারমিশান দিত না। বড় প্রোগ্রামের জন্য পারমিশান পাওয়া যেত। এভাবে একদিন বুয়েটে অনুষ্ঠান করতে গেলাম কিন্তু হলে ঢুকতে দিচ্ছিল না। উপায়ন্ত না দেখে আমরা গেলাম নাদিরা আপার বাসায় নীলক্ষেত। একবার গেলাম জাহাঙ্গীর নগর অনুষ্ঠান করতে। ফিরতে রাত হওয়ার জন্য হলে ঢুকতে পারছিলাম না। লাকি ভাইকে দিয়ে হাউজ টিউটরকে ফোন করে পরে হলে গেলাম।

দলে আমার প্রিয় বান্ধবী ছিল চম্পা। আমরা একই সাবজেক্ট এ পড়তাম এবং দুইজন ছিলাম হরিহর আত্মা।একই জায়গায় বসা , লাইনে পাশাপাশি দাঁড়াতাম সারাক্ষন গল্প হাসাহাসি করা দুইজনের ছিল নিত্য দিনের বিষয় । এটা নিয়ে পিনুদার কাছে অনেক বকা খেয়েছি। পিনুদা বলতেন , তোমার হাসি শামসুন নাহার হল থেকে শোনা যায়। শুনে আমি আরো হাসতাম।

একবার অনুষ্ঠানে ,কাজী নজরুলের --- বল বীর, দুর্গম গিরি , শিকল পরা ছল মোদের এই -- বিভিণ্ন গান মুখস্হ করার জন্য বলা হল। কিন্তু কারোরই মুখস্হ হত না। যাকে ধরে সেই পারেনা। আর এটা নিয়ে আমরা আরো হাসতাম। দলে গান শিখাতেন শ্যামলদা। উনার শিখানোর স্টাইলটা দারুন ছিল। ঐসব গান যখন শুনি তখন শ্যামল দাকে ভীষন মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা ---"বাঁধ ভেঙ্গে দাও "।শ্যামলদা--- "বলতেন দাঁত ভেঙ্গে দাও "।অনেক মজা করে গান শিখাতেন। ১৯৮৫/৮৬ সালে যখন মান্নান স্যার ভিসি হলেন। তখন উনাকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য দল থেকে আয়োজন করা হল। এ উপলক্ষে নাচ গান আবৃতি মিলে প্রতিদিন রিহার্সাল হত। তখন "নতুন দল ছাত্র সমাজ" নামে এরশাদের দলের কিছু ছেলে আমাদের টিএসসিতে ধাওয়া করলো। দলের ফটোগ্রাফার ছিলেন শিবুদা। উনি আমাকে আর চম্পাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন টিএসসির টয়লেটের ভিতর। সেখানে কিছুক্ষন থাকার পর টিএসসির পিছন গেইট দিয়ে হলে চলে গেলাম। সেই বিভিষিকাময় দিনের কথা আজো অম্লান।

৮৮সালের ভীষণ বন্যা হল। আমরা গেলাম বিটিভিতে উন্মেষের একটা প্রোগ্রাম করতে। ষড়ঋতু উপর ছয়টা গান গাওয়া হল। সাথে ছিল নাচ। আরেকবার সুজিতদার পরিচালনায় বিটিভিতে গাইলাম কাজী নজরুল ইসলামের "আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম প্রিয় "---এই গানটা। তখন বাংলা বিভাগের রফিকুল ইসলাম স্যারের বাসায় প্রাক্টিস হত। বাসাটা ছিল শহীদ মিনারের কাছে। ওখানে একদিন এলেন গনসংগীতের স্বনামধন্য গায়ক শেখ লুৎফর রহমান। এই গানটা শেখালেন --- "ওঠরে চাষী জগতবাসী ধর কষে লাঙ্গল "---- প্রতিটি অনুষ্ঠানে এত প্রাণ ছিল যে ভোলার মত নয়। আমাদের সময়ে জাতীয় "কবিতা উৎসব "শুরু হয়েছিল। তখন রাজু ভাস্কর্যের সামনের রাস্তা বন্ধ করে কবিতা উৎসব হত। সাংস্কৃতিক দলের পক্ষ থেকে উদ্বোধনীর দিন অনুষ্ঠান হত। কোথায় কি অনুষ্ঠান করেছি সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা হল দলের প্রতিটি সদস্য ছিল দল অন্ত প্রান। একদিন দলে(টিএসসি) তে না গেলে মনে হত দিনটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। ডাকসু সাংস্কৃতিক দলটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটা নিরেট আনন্দের জায়গা। যেখানে গেলে অনেক কষ্ট লাঘব হত।অনেক অনুষ্ঠানে দলের গানটা গাওয়া হত।আর যদি লাকি ভাই থাকতেন তাহলে ভূপেন হাজারিকার "আজ জীবন খুঁজে পাবি "গানটা গাওয়া হত।কি অদ্ভূত সুন্দর করে লাকি ভাই গানের স্হায়ীটা গাইতেন। পরে আমরা সবাই মিলে হাতে তালি দিয়ে গানটা গাইতাম। এছাড়া আমাদের দলীয় সঙ্গীতটাও ভীষন প্রিয় ছিল। আজো আমি দলের গানটা প্রায়ই গুনগুন করে গাই। সর্বোপরি দলের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আবার ঐদিনগুলি ফিরে পেতে ইচ্ছে করে।

আরো পড়ুন :সেই যে আমার নানা রংয়ের দিনগুলি

 


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান