যুদ্ধ, বাবা এবং শৈশব-৩

Sat, Jan 6, 2018 12:02 AM

যুদ্ধ, বাবা এবং শৈশব-৩

মিতা হোসেন: নতুন গন্তব্যে যাবার জন্য আমাদের নৌকো দরকার হলো। নৌকো করে যাচ্ছি তো যাচ্ছি-ই। কখন এই যাত্রা শেষ হবে কেউ জানেনা। খাল পার হলাম, নদী পার হলাম। নৌকো চলছে তো চলছেই। কিছুটা পথ আবার ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে হেঁটে পার হতে হয়েছিল।  এক মামার হাত ধরে আমি হাঁটছি । মা ভাই রানাকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন, আর বোন ছোট খালার হাত ধরে হাঁটছে। পা গেঁথে যাচ্ছে ধান ক্ষেতের কাদা জলে। মামা তার প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়েছেন। আমি এখন চিন্তা করলে আমার হাত পা অবশ হয়ে আসে, আমার মা কেমন করে আমাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে বাবাকে ছাড়া এভাবে দিনগুলো পার করেছিলেন! পরিস্থিতি কি বাধ্য করে মানুষকে মানিয়ে নিতে সব? আর আমি? আমি মামার হাত ধরে হাঁটছি আর ভাবছি, বাবা কি করে জানতে পাবেন আমরা যে এখন নানা বাড়ীতে নেই? মনটা হু হু করে উঠতো তাঁর কথা চিন্তা করে। বাবা যদি কখনো চলে আসেন নানা বাড়ীতে? কেউ তো নেই ওখানে। বাবা কি করে আমাদের খুঁজে পাবেন? এসব ভেবে চোখ মুছতে মুছতে হাঁটছি মামার সাথে। এই দৃশ্যটা এখনো মাঝে মাঝে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাবা বাবা করে, বাবার কথা ভেবে আমার দিনগুলোর বেশ অনেকটা সময় বিষন্ন হয়ে থাকত। ঐ দিনগুলোকে যেন এখনো দিব্যি দেখতে পাই, সেই সাথে ছোট্ট নিজেকেও। হায়রে পোড়া স্মৃতি, পিছু ছাড়েনা আমায়!

নতুন গন্তব্যে যেয়ে পেলাম আরো কিছু সাথী। ঐ সময়টা বেশ ভাল মনে আছে আমার, কারণ গাছে ওঠার হাতেখড়ি আমার ঐ বাড়ীতে যেয়ে। পরিবারটি ছিল গ্রামের এক ধনী পরিবার। অনেকে মিলে থাকত এক বাড়ীতে। বিরাট বাড়ী, অনেকগুলো ঘর সেখানে। একটি ঘরের কথা প্রায়ই মনে পড়ে, বিরাট বিরাট মাটির পাত্রে চাল রাখা থাকত। ধানের গোলাও ঐ প্রথম দেখেছিলাম। বিভিন্ন রকমের চালের সাথে তখনি পরিচয় হয়েছিল। মনে আছে লাল রঙের চাল আছে জানতে পেরে খুব অবাক হয়েছিলাম। তার আগে ধারণা ছিল, লাল শাক দিয়ে ভাত মাখলেই বুঝি ভাত লাল হয়। 

এই বাড়ীতে এক মামার কথা মনে পড়ে। সমবয়সী সবাই দেখা যাচ্ছে সম্পর্কে আমার মামা অথবা খালা হয়। ঐ মামাটা আমাদের চাইতে কয়েক বছরের বড় ছিলেন। তাঁর নাম আজ আর আমার মনে নেই, তবে তিনি যে অবলীলায় শুয়ো পোকাগুলো হাত দিয়ে ধরে ফেলতেন, এটা মনে আছে। আমি এই মামার বেশ ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, তার এ সমস্ত সাহসী কাজকারবার এর জন্যেই। বুলবুলিরাও ছিল আমাদের সাথে। আমি, বুলবুলি আর ঐ মামা-খালারা মিলে কি যে হুল্লোড় করেছি ঐ সময়টায়। দল বেঁধে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোতো ছিলই, আরো কত কি যে করতাম। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে মাঝে মাঝে এত অস্থির লাগে! এই বাড়ীটির পুকুর ছিল বেশ বড়। আমার সব সঙ্গীসাথীরা পুকুরে নেমে চোখের পলকে সাঁতরিয়ে অন্য পাড়ে চলে যাচ্ছে, আর আমি অসহায়ের মত তা চেয়ে চেয়ে দেখছি। এখানেও চেষ্টা চলতে থাকল আমাকে সাঁতার শেখাবার, কিন্তু নাহ, আমাকে দিয়ে ঐ কাজটি আর হলো না। এখানে এভাবে পুকুরে গোসল করবার সময় পরিচয় হলো জোঁক নামক এক রক্তচোষা পোকার সাথে। এই ক্ষুদ্র জিনিসটিকে খুব ভয় পেতাম আমি, এখনো পাই। 

বিকেলের কিছু আগে, আবার কখনো সকাল এগারোটার দিকে, মিস্টি আলু অথবা ভুট্টা পুড়িয়ে লাইন দিয়ে বসিয়ে আমাদের, মানে সব বাচ্চাদের খেতে দেয়া হতো। কি যে মজা লাগত! সবাই মিলে বসে খাচ্ছি, আর খুনসুঁটি করছি, ওটাই মজা! কি নির্মল আনন্দ! লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে সেই পোড়া মিষ্টি আলু আর ভুট্টার গন্ধ নাকে এসে লাগছে। এগুলো সবই ছিল ওদের নিজেদের ক্ষেতের। ঢেকিতে কিভাবে ধান থেকে চাল আলাদা করা হয়, ওখানেই প্রথম দেখেছিলাম। ঐ বাড়ীর খালারা, মামীরা ঘোমটা মাথায় ঢেকীতে পাড় দিচ্ছেন, আর একজন ঢেকীর সামনে বসে, গর্তমত একটা জায়গায় বার বার হাত দিয়ে ধানগুলোকে নেড়ে দিচ্ছেন। যিনি এই কাজটি করতেন, তাঁর হাতের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতাম মনে পড়ে। আমার ভয় হত, যদি ঐ মোটা কাঠের গুড়িটা তাঁর হাতের ওপর পড়ে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখতাম কেউ ব্যথা পাচ্ছেনা, বাহ! 

সন্ধ্যায় উঠোনে বসে চলতো খেলা। কত রকমের খেলাই না খেলতাম আমরা! ঐ সময়টাতে শিখেছিলাম, আকাশের তারাগুলো যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে যায়, তখন চোখ বন্ধ করে মনে মনে যা চাওয়া যায়, তা-ই নাকি ফলে যায়। আমি খুব চেষ্টা করতেম ঐ সময়ে তারার দিকে তাকিয়ে সেটার ছুটে যাওয়া দেখতে, আর আমার বাবার জন্য দোয়া চাইতে। আমার বাবা যেন ভাল থাকেন। তাঁকে যেন মিলিটারিরা খুঁজে না পায়। 

এই বাড়ীতে ঠিক কতদিন ছিলাম মনে নেই। একসময় ফিরে যাবার সময় হলো। প্রথমে গেলাম মায়ের সেই সম্পর্কিত বোনের বাড়ী। ওখানে এসে জানা গেল, ওদের এক দুলাভাই, যিনি সবসময় আসতেন, আর সবার সাথে বেশ মজা করতেন, তিনি মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী আমাদের সাথে ছিলেন যতদূর মনে পড়ে। ক্রমে ঐ বাড়ী থেকে ভোলায় নানা বাড়ীতে ফিরে এলাম। বাড়ীর অন্যরাও যার যার নিরাপদ জায়গা থেকে ফিরে এলো। জানা গেল আল্লাহ’র অশেষ রহমতে সবাই নিরাপদেই ছিলেন। এর মধ্যেই ঈদ এসে গেল।  আমার মা নিজে দোকানে যেয়ে আমাদের জন্য জামার কাপড় কিনে নিয়ে এলেন। ছোট খালার এক বান্ধবী হাসনু খালাকে খবর দেয়া হলো। তিনি খুব ভাল সেলাই জানতেন। আমার মায়ের শখ হলো আমার জন্য গারারা বানাবেন। হাসনু খালাকে বুঝিয়ে দেয়া হলো। তিনিও বুঝে নিয়ে চলে গেলেন। সবুজ রঙের সেই গারারাটির কথা আজো মনে আছে আমার!

সময়টা আসলে কি ছিল আমার মনে নেই, যুদ্ধের শেষের দিকেই হবে হয়ত। একদিন পুকুর পাড়ে, নানাবাড়ীর মসজিদের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি আছে, ওখানে বেশ জোরে জোরে রিকশার টুং টাং ঘন্টা বাজানোর শব্দ শোনা যেতে থাকল। কে যেন জোরে বলে উঠলো, ‘আরে, সিরুদা আসছে দেখি’। আমার কানে মনে হলো কেউ যেন মধু ঢেলে দিল। বাবা এসেছেন? আমার বাবা এসেছেন? কি করছিলাম মনে নেই, শুধু মনে আছে বিদ্যুৎ গতিতে এক দৌড়ে নানাবাড়ীর পেছনের সবজি বাগান আর পুকুরের মাঝখান দিয়ে যে পথটা ঐ রাস্তার দিকে চলে গেছে, গেট খুলে ঐ রাস্তায় যেয়ে উপস্থিত আমি। আরে তাইতো? আমার বাবাকেই তো দেখা যাচ্ছে রিকশায়। আমাকে দেখে আমার বাবার মুখে যে হাসিটা ফুটে উঠেছিল, ঐ রকম বেহেশতি হাসি আমি আজ পর্যন্ত আর কোথাও দেখিনি। আর আমি মনে মনে ভাবছি আল্লাহ আমার বাবাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমার কথা রেখেছেন। বাবা আমাকে কোলে তুলে নিলেন। কাজের লোকেরা রিকশা থেকে মাল-পত্র নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ঈদের আনন্দ যেন আমার মা আর তাঁর তিন সন্তানের জন্য দ্বিগুণ, তিনগুণ হয়ে ধরা দিয়েছিল। 

সবাই অধীর আগ্রহে বাবার কাছে ঢাকার খবর জানতে চাইল। সন্ধ্যায় বাবার কোল ঘেঁষে বসে পরম নিশ্চিন্ততায় হারিকেনের আলোয় সেইসব গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল আমার আর কিছুই জানার দরকার নেই। কিছুই আর শোনার দরকার নেই, আমার বাবা আমাদের কাছে ফিরে এসেছেন, আমার আর কিছুই চাইনা। আমার যুদ্ধ অবশেষে শেষ হলো। কিন্তু দেশের যুদ্ধ? 

ঈদের কদিন পরে বাবার সাথেই ফিরে এলাম ঢাকায়। ঢাকায় ফিরে আসবার কিছুদিন পরই একদিন জানতে পেলাম অনেক বুদ্ধিজীবিদের কথা, যাদের ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আমার বাবার ক’জন বন্ধু ছিলেন। একজনের কথা মনে আছে, ডক্টর আলীম, তিনি চক্ষু বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আমাকে বাবা তাঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন আমার চোখ দেখাতে। ঐ সময়েই আরো কিছু নামের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম যাদের হত্যা করা হয়েছিল। শহীদুল্লাহ কায়সার, আলতাফ মাহমুদ তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। 

এই ঘটনার দুদিন পরেই এলো সেই বিশেষ দিনটি, ১৬ই ডিসেম্বর। চারদিকে শুধু উল্লাস আর আনন্দ যা আমাদের ছোটোদেরও ছুঁয়ে গেছিল। টেলিভিশনে দেখলাম পাকিস্তানের আত্মসমর্পন। ছাদে যেয়ে নতুন জন্ম নেয়া বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলাম। সব জায়গায় আনন্দধ্বনি ‘জয় বাংলা’। রেডিও টেলিভিশনে সব সময় বাজছে জাগরণের গান। চারিদিকে উৎসবের আমেজ। ততদিনে আশে পাশের বাড়ির লোকেরাও ফিরতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার দিকে পাড়ার অনেকে চলে আসত আমাদের বাসায় টেলিভিশনে স্বাধীন বাংলাদেশকে দেখার জন্য। হুল্লোর আর হুল্লোর। মনে আছে বঙ্গবন্ধুকে যেদিন ফিরিয়ে আনা হলো, আমাদের বাসায় অনেক ভীড়। সবাই টেলিভিশনে ঐ বিশেষ মানুষটিকে দেখবার জন্য অধীর! আমরা দেখলাম বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। এত আনন্দের পাশাপাশি আরেকটি আনন্দ হলো, সবাইকে উপরের ক্লাশে উঠিয়ে দেয়া হলো কোন পরীক্ষা ছাড়াই। তৃতীয় শ্রেণীতে উঠলাম আমি। 

সেই ১৯৭১ এর পর কত গুলো দিন পার হয়ে গেল। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ঐ সময় স্বাধীনতা বলতে বুঝেছিলাম আমরা আর পাকিস্তানের সঙ্গে নেই। আমরা এখন স্বতন্ত্র একটি দেশ। আমরা এখন আর পাকিস্তানের তৈরী করা আইন-কানুন মেনে চলবো না, নিজেরাই নিজেদের আইন তৈরী করবো। নিজেরাই নিজেদের ভাল বুঝে সেভাবে চলবো। বড় হতে হতে যুদ্ধের বিষয়ে সবিস্তারে পড়েছি। জেনেছি এর ইতিহাস। বিরাঙ্গনাদের আর যুদ্ধ জননীদের কথা জেনে চোখের পানি ফেলেছি। আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠেছে। কত কত বাড়ী ঘর পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল জেনেছি। 

এখন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ভালভাবেই অনুধাবন করতে পারি। সেই শৈশবে যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝবার জন্য বাবা’র কপালের ভাঁজে লক্ষ্য রাখতে হতো। বড়দের মুখের ভাষা পড়বার চেষ্টা করতে হতো। এখন আর তার দরকার হয়না। আজ নিজেই বুঝতে পারি সব কিছু। আর তাই থেকে থেকে অহরহ মনের মাঝে প্রশ্ন জাগে, ১৯৭১ এর ডিসেম্বর এ বাংলাদেশ কি সত্যি স্বাধীন হয়েছিল? এত এত রক্তের বিনিময়ে, এত এত তাজা প্রাণ এর বিনিময়ে, এত এত মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে যে স্বাধীনতার আস্বাদ আমরা পেয়েছিলাম, তা কি সত্যি ছিল? আর একটি যুদ্ধ কি দরকার এখন বাংলাদেশের জন্য?

কিন্তু এবারের যুদ্ধটা কার বিরুদ্ধে? এবার কে আমাদের শত্রু? কার কাছ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে এবার? এই প্রশ্নের উত্তর কি কারো জানা আছে? 

নিউ ইয়র্ক, ডিসেম্বর ২০১৭

আরো পড়ুন:  যুদ্ধ, বাবা এবং শৈশব-২


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান