বঙ্গবন্ধু ও বিরোধী রাজনৈতিক জোট 

Fri, Jan 5, 2018 11:51 PM

বঙ্গবন্ধু ও বিরোধী রাজনৈতিক জোট 

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু: বর্তমান বিশ্বে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা আছেন  যারা ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকা সত্ত্বেও তাদের নিয়ে পক্ষ বিপক্ষে সমালোচনা করা হয়l ভারতের গান্ধী পাকিস্তানের জিন্নাহ আলজেরিয়ার মুমেদীন যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোl এমনকি সাউথ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা সহ বিশ্ব নেতাদের বিপক্ষে কথা বলা হয়ে থাকেl তার মানে ১০০% জনপ্রিয়তা তাহলে কোনো নেতারই ছিল নাl ঠিক তেমনি বাংলার মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বেলায়ও আমরা তার কোনো বেতিক্ক্রম দেখি নাl তবে এসকল বিশ্ব নেতাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সমালোচকেরা প্রমান করতে বের্থ হওয়ায় তারা এখনো ইতিহাসে অমর হয়ে আছেনl যেমন আছেন আমাদের বঙ্গবন্ধুl

 

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যারা সমালোচনা করেন তাদের অনেকই ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষেl অতীতে এই মহান নেতাকে ইতিহাস থেকে বার বার মুছে ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছে এবং এখনো একটি রাজনৈতিক জোট থেকে বঙ্গবন্ধুকে কঠাক্ষ করে বক্তব্য রাখা হয়। একথা সত্য যে বাংলাদেশের ১০০% বাঙালি স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে ছিল নাl থাকলে হানাদার পাকিস্তানিরা রাজাকার আলবদর আল শামস সহ বিভিন্ন বাঙালি বাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে পারতো নাl এখনো এরা দেশে ও বিদেশে নামে বেনামে  ইন্টারনেটের মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেlযে বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু বিশ্বে সুপরিচিত করেছেন সেই মহান নেতার বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছেl এই অপশক্তি এখনো স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে  করে  চলছে না না  ষড়যন্ত্রl

 

আজকের বাংলাদেশে নিজেদের এই ভয়ংকর রূপকে ঢাকার অপচেষ্টা করতে গিয়ে তারা ধর্মীয় স্লোগান তুলে জাতিকে বিভক্ত করছেl এদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে ইসলাম বিরোধী বেক্তি হিসেবে দাড় করানোর চেষ্টা করছে। বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকে ভুলভাবে বেখ্যা দেওয়া হচ্ছেl বঙ্গবন্ধু সবসময় বলেছেন ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়l  ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ  হলো যার  যার  ধর্ম  যার  যারl যে বঙ্গবন্ধুকে তারা মিথ্যা অভিযোগে ইসলাম  বিরোধী হিসেবে দাড়া করার  চেষ্টা  চালাচ্ছে সেই নেতা স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামকে সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

 

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর পরই রাশিয়াতে অনুষ্ঠিত তাবলীগ সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে জামাত প্রেরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। রাজধানী ঢাকার আজকের এই বিশাল কাকরাইলের মসজিদের জন্য জমি বরাদ্ধ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বিশ্ব এজতেমার জন্য টঙ্গীতে সরকারি জায়গা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে পবিত্র হজ্জ পালনের জন্য বিমান ভাড়া করা সহ সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ঢাকার সোবানবাগ মসজিদের উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৩ সালে পাকিস্থানে অনুষ্ঠিত ইসলামী সন্মেলনে যোগদান করে মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন বাঙালি জাতির পিতাবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।

 

এমন একজন মহান বেক্তির বিরুদ্ধে এখনো বাংলাদেশে রাজনীতির মাঠে মিথ্যা অপপ্রচার ছড়িয়ে জনগনকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এদের সবচেয়ে বড় ভয় মুক্তিযুদ্ধের সত্য ও জীবন্ত ইতিহাস। যেইতিহাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা বিপক্ষে ছিলl যে ইতিহাসের নেতৃত্বে ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। যে ইতিহাসের আদর্শ হলো একটি ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ। যেইতিহাসের আদর্শ হলো যার যার ধর্ম যার যারl যে ইতিহাসের আদর্শ হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ। যে ইতিহাসের আদর্শ হলো শোষিতের গণতন্ত্র। যে ইতিহাসের আদর্শ হলো একটি সমাজতান্ত্রিকবাংলাদেশ।

 

আমার কথা হলো বর্তমান সরকারের ভুল ত্রূটি, অন্যায় অত্যাচার অবিচার, দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি সহ ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার সকলেরই আছেl শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার যে সবকিছুই ভালো করছে সে কথা আমি কখনই বলবো নাl সুতরাং সমালোচনা করতে হলে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিয়ে মিথ্যা কথা না বলে সরকারের বিরুদ্ধে গঠনমূলক সমালোচনায় এগিয়ে আসুনl বিষয়টি  নিয়ে বাংলাদেশের  সরকার বিরোধী  রাজনৈতিক  দলগুলোর একটু  চিন্তাভাবনা  করবেন কিl ইতিহাস বিকৃত নয়, বঙ্গবন্ধু বিরোধী মিথ্যা প্রচারণা নয়, করুন সরকার বিরোধী গঠনমূলক সমালোচনাl

 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে  বড়  শক্তি  বাংলাদেশের  মুক্তিযুদ্ধ  ও  বঙ্গবন্ধুl সুতরাং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে  রাজনৈতিক যুদ্ধে নামতে হলে দেশে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবেl প্রতিষ্ঠা করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একটি নুতন ঐক্য  জোটl  তাহলে  আওয়ামী লীগ আর এখনকার মতো ততটা শক্ত অবস্থানে হয়তো নাও থাকতে পারেl দেশের মানুষ চায় বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটি  শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক জোটl  এধরণের জোট কখনো বিএনপি জামায়াত জোটের মতো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করবে নাl করবে শুধু বর্তমান সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাl 

 

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকিয়ে দেখুনl সেদেশের শক্তিশালী কংগ্রেসকে কিভাবে পরাজিত করে রক্ষণশীল ধর্মীয় দলের নেতা মুদি এখন ক্ষমতায়l এজায়গায় আসতে তিনি ও তার দল কি কখনো গান্ধীর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন? পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে দেখুনl সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি কখনো জিন্নার বিরুদ্ধে কথা বলছে? নিশ্চই নাl গান্ধী ও জিন্নাহ ভারত ও পাকিস্তানকে স্বাধীন করেছেনl ভারতীয় ও পাকিস্তানিরা তাদের নেতাকে সন্মান করতে পারলে আমরা কেন বঙ্গবন্ধুকে সন্মান দেখাতে পারবো না? বঙ্গবন্ধু তো বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেনl গণতান্ত্রিক অধিকার আছে বলে আপনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করবেন? গণতান্ত্রিক অধিকার আছে বলে কি আপনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়াবেন?

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক অধ্যাপক যিনি বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী গত বৎসর স্টকহল্মে তার এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে এসে এক  বাঙালি আসরে বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ জামাল সম্পর্কে মিথ্যা বানোয়াট কথা বলছিলেনl আমি তখন তাকে  থামিয়ে দিয়ে প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, একজন শিক্ষক হয়ে আপনি কেন এধরণের মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছেন? শেখ জামালকে আমি যত কাছে থেকে দেখেছি আপনি হয়তো তা দেখেননিl তিনি আমার কোথায় থতমত খেয়ে গেলেনl খবর নিয়ে জানলাম তিনি একসময় পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এন এস এফ এর নেতা ছিলেনl এই বেক্তি এখনো বাংলাদেশের ইংরেজি পত্রিকায় ভারত বিরোধী না না কল্প কাহিনী লিখে থাকেনl এসকল ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদকেরা কট্টর আওয়ামী লীগ বিরোধী বলে দেশে পরিচিতl সুতরাং তারা প্রকাশ করবেন না তো  প্রকাশ করবে কে? এভাবেই বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুর পরিবার নিয়ে আজ ছড়ানো হয় না না মিথ্যা অপবাদl

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। তার দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আজ আমরা যে কোনো রাজনৈতিক দল করি না কেন একটি বাস্তব সত্যকে আমাদের অবশ্যই গ্রহণ করে চলতে হবে, একটি সত্য ইতিহাসকে অবশ্যই আমাদের মানতে হবে। বঙ্গবন্ধু কোনো দলের নেতা নয়, কোনো দলীয় নেতা নয়। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতীয় নেতা, জাতির পিতা, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্রষ্টা। ভারতে গান্ধী, পাকিস্থানে জিন্নাহ আর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু।

 

এপ্রসঙ্গে অনেকে বঙ্গবন্ধুকে দলীয়করণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে থাকেন। কিন্তু এখানে দলীয়করণের প্রশ্ন আসবে কেন? বঙ্গবন্ধুর ছবি, বঙ্গবন্ধুর কথা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সব দলের মধ্যেই থাকা উচিত। আওয়ামী লীগ কি কখনো বলেছে যে বঙ্গবন্ধু শুধুই আওয়ামী লীগের? আওয়ামী লীগ কি কখনো বলেছে যে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল বঙ্গবন্ধুর ছবি বেবহার করতে পারবে না? আওয়ামী লীগ কি কখনো বলেছে যে বঙ্গবন্ধুকে আর কেউ জাতির পিতা বলে আখ্যায়িত করতে পারবে না? আওয়ামী লীগ কি কখনো বলেছে যে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস ও  ১৭  মার্চ  বঙ্গবন্ধুর  জন্মদিন  অন্যান্য কোনো রাজনৈতিক দল পালন করতে পারবে না? আজ যারা এসকল কথা বলছেন তারা পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যই বলছেন। তবে রাজনৈতিক দলের পোস্টার বা দলীয় সভা ছাড়া বেক্তিগত প্রচারে বঙ্গবন্ধুর ছবি বেবহার করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে সমালোচনা আসতে পারে।যারা নির্বাচনী প্রচারে, সভা সমিতিতে, নিজের ব্যক্তিগত প্রচারে বঙ্গবন্ধুর ছবি বেবহার করেন তাদের এবেপারে সরকারের সতর্ক হওয়া উচিত। বেক্তিগত প্রচারে বঙ্গবন্ধুর ছবি বেবহার অনেকআগেই  সরকারকে বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল সরকার এবেপারে আইন করে যেখানে সেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি বেবহার নিষিদ্ধ করতে পারে। বঙ্গবন্ধুর ছবি সসন্মানে দেশের সব রাজনৈতিক দলতাদের প্রচারে বেবহার করতে পারবে কিন্তু কোনো বেক্তিগত প্রচারে নয়। জমি জায়্গা দখলদারিতে, দোকান পাঠ ঘরবাড়ি দখলে যারা আজ বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙ্গিয়ে বেবহার করছে তাদের বিরুদ্ধেসরকারের কঠোর বেবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এরা মূলতো বঙ্গবন্ধু ও তার প্রাণ প্রিয় সংগঠন আওয়ামী লীগকে তাদের বেক্তগত স্বার্থে বেবহার করছেশুধু বঙ্গবন্ধুর ছবি কেন, আওয়ামী লীগ নেত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ কোনো রাজনৈতিক নেতাদের ছবি যেন কেউ বেবহার করতে না পারেl রাজনীতিতে দলীয় প্রধান কিংবাবঙ্গবন্ধুর ছবি আসবে কেন? আসবে আদর্শ, আসবে কর্মসূচি, আসবে পরিকল্পনাl আর সেই সাথে যে ব্যক্তি দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তার নিজস্ব ছবিl সরকারের উচিত হবে ছবি নিয়েরাজনীতির বিরুদ্ধে আইন পাশ করাl সব কথার শেষ কথা হলো বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একটি  বিরোধী রাজনৈতিক জোটl

 

লেখককাউন্টি কাউন্সিলার স্টকহল্ম কাউন্টি কাউন্সিল


External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান