সেই যে আমার নানা রংয়ের দিনগুলি

Wed, Dec 27, 2017 12:10 AM

সেই যে আমার নানা রংয়ের দিনগুলি

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল। দেশের রাজনীতিকে উল্টোমুখো করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিরোধ হিসেবেই জন্ম নিয়েছিলো সংগঠনটি। না, রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, সংস্কৃতি দিয়ে দেশ এবং রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা। তার পর তো ইতিহাস। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তো এই সংগঠনটি হয়ে উঠেছিলো অপরিহার্য্য শক্তি।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলকে যারা গড়ে তুলেছেন, বিভিন্ন সময়ে এই সংগঠনটির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন, তাদের ভাবনাগুলো, স্মৃতিকথাগুলোকে গ্রন্থিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের পক্ষে  আহমেদ হোসেন। টরন্টোতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের উদ্যোগের সাথে ছিলেন, এখনো চেতনায় সেই স্পিরিটকেই ধারন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল নিয়ে বিভিন্নজনের স্মৃতিগাঁথাগুলো গ্রন্থিত হয়ে পাঠকের হাতে যাবার আগে সেগুলো ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করবে নতুনদেশ । আপনাদের মতামতকেও আমরাও সাদরে গ্রহন করবো।– বিভাগীয় সম্পাদক, নতুনদেশ।)

মারুনা রাহী : কত স্মৃতি, কত কথা । লিখতে বসে বাঁশ বাগানে গহীন রাতে সারিসারি জোনাকির মত জ্বলছে আর নিবছে । সেই স্মৃতি যার কিছু টলমলে নদীর জলে আলোর ঝিলিক, কিছু বা শীতের ভোরে কুয়াশায় ঢাকা ।

আশির দশকের মাঝামাঝি, সে কি উত্তাল সময় ।পুরো দেশ তখন স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলনে ফুঁসছে। সেই সময়টাতে এই আমি কলেজের গন্ডী পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্নিঝরা সবুজ সব মাঠে পা রাখছি একটু একটু করে । টি, এস, সি, হাকিম চত্বর, মধুর ক্যানন্টিন.... নতুন এক ভূবন, নতুন করে নিজের পরিচয়, আর কত রকমের কর্মকান্ড, সব দেখি আবাক এক শিশুর মতো বিস্ময়ে । আশেপাশের বন্ধুরা সব রাজনীতি করছে , মিছিলে যাচ্ছে, কত প্রান আর উচ্ছলতা তাদের । স্বৈর সরকারকে উৎক্ষাত করতে হবে, সময়টাকে বদলাতে হবে, আরো কত নতুনের প্রত্যয় তাদের । এর মধ্যে আমি কোথায়? নিজের জায়গা খুঁজছি তখন, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না আমি ঠিক কোন কাজে লাগি ? নিজেকে মনে হয় বিশাল সরোবরে কনা এক প্লাংকটন ।এ রকম সময়ে বন্ধু রীতা ( সামছিয়া আফরিন ) এসে বললো ডাকসুতে নতুন সদস্য নেয়া হচ্ছে, ঢুকে পড় । রীতা আগে থেকেই সদস্য, ওর অভয় বানী মাথায় করে আবেদন করলাম ।এরপর সাক্ষাত্কার পর্ব, কিছুই তো পারি না। না গান, না নাচ, না অভিনয়। কেবল মাত্র আবৃত্তি করছি একটু আধটু অন্য একটি দলের হয়ে । হবে টা কি আমাকে দিয়ে? সাক্ষাৎকার নিলেন লাকী ভাই । মনে সংশয় পারবো তো দলে ঢুকতে? হবে তো আমার জায়গা অনেকের মাঝে? পেরেছিলাম আর তারপর দেখি কি বিপুল উৎসাহে কাজ হচ্ছে সেখানে । নাটক, গান , আবৃত্তি শিল্পের সব শাখাতেই তাদের দুর্দান্ত পদচারনা ।

এখানে এসে দেখলাম লিয়াকত আলী লাকী নামের এক অসাধারন মানুষকে। কি নিষ্ঠা তার, সাধারন পাথর কেটে নিত্য নতুন প্রতিমা বানাচ্ছেন । সেই সাধারন পাথর আমি এবং আমার মতো আমরা । সদস্য প্রাপ্তির পর নবীনদের নিয়ে এক ঘরোয়া আসর বসলো টি, এস, সি র দোতলায় । আমরা নতুনেরা সংকুচিত । লাকী ভাই বললেন ' আমরা আমরা' র গল্প । লাকী ভাইর কাছ থেকে সেই ধার করা গল্প এখনো যে আমি কত জায়গায় করি । লাকী ভাইয়ের মতো এমনি করে অনুপ্রেরনা দিতে আমি আমার জীবনে খুব কম মানুষকেই দেখেছি । গান পারো না তো কি, গলা মেলাও হয়ে যাবে । আবৃত্তি পারো , তুমি অভিনয় ও পারবে । ব্যাস হয়ে গেল । এই হলেন লাকী ভাই । তো এই সাংস্কৃতিক দলে ঢুকে অংশ হলাম স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের। বৃন্দ আবৃত্তি তখন আন্দোলনের এক হাতিয়ার, আমি তার একটি অংশ । এই ভাবনায় আমি আজো পুলকিত হই । আমি বসে থাকিনি, ক্ষুদ্র হলেও আমি প্রতিবাদ করেছি অন্যায়ের এই ভাবনায় আমি আজো রোমান্ছিত হই । চর্চা হচ্ছে বৃন্দ আবৃত্তি দিনের পর দিন, সেই বৃন্দ আবৃত্তি নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করছি হেথায়, হোথায়। কখনো কখনো আশেপাশের মফস্বল শহরেও যাচ্ছি । এ ছাড়াও রয়েছে ২১, ২৬, ১৬, কবিতা উৎসব ইত্যাদি । মহড়ার কারনে বাড়ী ফেরার বাস মিস করে থেকে যাচ্ছি কখনো শামসুন্নাহার হলে, কখনো রোকেয়া হলে ।এর মধ্যে বন্ধু বানী দলের হয়ে শামসুন্নাহার হলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহন করলো। সেই সময় তার হয়ে প্রচার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম । হলে একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হলো । অন্যান্য সব শিল্পীর সাথে সে সন্ধ্যায় আরো ছিলেন শ্রদ্ধেয় ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়, বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক শ্রদ্ধেয় কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী ।

সে এক অন্য সময়, অন্য রকম কিছু করার এক আত্মবিশ্বাসে ।দলে রয়েছেন বড় ভাই বোনেরা আহমেদ ভাই, আনিস ভাই, আমান ভাই, জিয়া ভাই, শ্যামল ভাই, কিসলু ভাই, রহিম ভাই, ডালিয়া আপা, শিমু আপা, সুনীতা দি, অনীতা দি, .... আরো কত নাম । মুগ্ধ হয়ে দেখি তাদের কর্মকান্ড আর ভাবি, আমাকেও হতে হবে ওদের মতো । আরো রয়েছে সংগে বন্ধু রীতা, বানী, ইমা, সূবর্না ও আরো অনেকে যাদের মুখ স্মৃতিতে অম্লান কিন্তু সময়ের বিস্মৃতিতে নামগুলো গেছে হারিয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক দল, দলের মাঝে সুবর্ন দিন আজো আমাকে দুর্মর এক আপ্লুতায় তাড়িত করে । নব্বুয়ের শুরুতে স্বৈরচার পতনের বিজয় মন্চে ছিল আমার শেষ অংশগ্রহন দলের হয়ে । তারপর থেকে প্রবাসী জীবন, সে ও তো কতগুলো সময় পেরিয়ে এসেছি । কত টুকু দিয়েছি, কত টুকু পেয়েছি সে হিসাব নয়, যে শিক্ষা , যে প্রশিক্ষন, যে চেতনা পেয়েছি দলের কাছ থেকে, দলের মানুষগুলোর কাছ থেকে সে বিশাল । বিশাল তার প্রভাব । আর তাই আজো এই প্রবাসে সকল সীমাবদ্ধতাকে দু’হাতে সরিয়ে বাংলা সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত রেখেছি নিজেকে বিভিন্ন রকমের প্রয়াসে । শুধু মাত্র আত্মতুষ্টি বা স্বীকৃতি নয়, এ এক ধরনের প্রত্যয় এবং অঙ্গীকার আমার দেশের প্রতি, যে দেশ আমাকে বাঙ্গালী পরিচয় দিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতিক দলের প্রতি যে আমাকে এই ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করেছে, উন্মুক্ত করেছে আমার সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেনতার দুয়ার ।

আরো পড়ুন: আমরা সুন্দরের অতন্দ্র প্রহরী


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
External links are provided for reference purposes. This website is not responsible for the content of externel/internal sites.
উপরে যান