নিজেকে খুঁজতে গিয়েই ঈশ্বরকে পেয়েছিল মানুষ

Sat, Dec 23, 2017 8:57 PM

নিজেকে খুঁজতে গিয়েই ঈশ্বরকে পেয়েছিল মানুষ

স্নেহাশীষ রায়: .মানুষের মনোজগত, অধিকাংশ সময়ে , অপরের দেখানো সত্য দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে। সিলিভিয়া প্লাথের মিরর কবিতায় একটা লাইন এরকম, " I am silver and exact. I have no preconceptions." এই পূর্বধারণা ছাড়া লোক পাওয়া খুব কঠিন। অসংখ্য মানুষের মধ্যে একজন, তার পূর্বধারণার কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে নিজস্ব চোখে পৃথিবীকে অবলোকন করে, এর নামই ক্রিয়েটিভিটি।

জাপানে টয়োটা কোম্পনী নতুন গাড়ী ডিজাইন করার সময় শিশুদের ডেকে এনে মনের সুখে গাড়ী আঁকতে বলে। কারণ বাচ্চাদের হৃদয়, পূর্বধারণায় পূর্ণ থাকে না। তারা নতুন চোখে পৃথিবীকে দেখে।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে, আমাদের প্রতিবেশ, সমাজের বদ্ধমূল ধারনা এমনভাবে বসত গেড়ে বসে যে, নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বলে কিছুই থাকে না।এই আদিগন্ত পূর্বধারণার প্রভাবে আমরা এমনকি বিজ্ঞানীরাও কিম্ভূত সব কান্ড করে বসে।

এরিস্টটল নাকি বলেছিলেন, জড় থেকেই জীবের উৎপত্তি। যেহেতু এরিষ্টটল বলেছে, তাই একদল বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল বেদবাক্য। কিছু কিছু বিজ্ঞানী, অদ্ভূত সব এক্সপিরিমেন্ট ডিজাইন করতে শুরু করে তা প্রমাণের জন্য। একবার এক বিজ্ঞানী ঘোষণা করে ফেলেন যে, জড় থেকে জীবের উৎপত্তি , এটা তিনি পরীক্ষাগারে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

পরীক্ষাটি কি?

তিনি এক প্যাকিং বাক্সে, আবর্জনা রেখে, বাক্সের মুখ বন্ধ করে, একুশ দিন পর গিয়ে দেখে. সেখানে মুষিকের ছানা। এরিষ্টটলের সত্যের প্রভাবে ধরেই নিলেন, আবর্জনা থেকে মুষিকের জন্ম হয়েছে। পরীক্ষা পদ্ধতিটি যে নিতান্ত হাস্যকর, তার বোঝার মত বোধশক্তি তিনি হারিয়ে বসেছিলেন , তার পূর্বধারণা থেকে।

ব্রেখটের গ্যালিলিও নাটকের একটা দৃশ্য এরকম। গ্যালিলিও দূর্বীন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আর চার্চের যাজকদের কাছে আকুতি করছেন, এই দূরবীনে একবার তাকিয়ে দেখো, গ্রহ নক্ষত্রগুলো কোন আকাশের গায়ে আটকে নেই। যাজক মাথা নাড়ছে আর বলছে, এ হতেই পারে না, তুমি যা বলছো তা বাইবেলে নেই। পূর্বধারণা মানুষকে অপরিবর্তনীয় সত্যের খাঁচায় বন্দী করে।

সাধারণ মানুষের , সেই পূর্বধারণার গোলকধাঁধা থেকে মুক্ত হতে পারে না। কিন্তু যাঁদের তৃতীয় নয়নটি আছে, তারা পারে, পৃথিবীকে বদলে দিতে।

মাঝে মাঝে আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবি, পৃথিবী বদলে দেয়া সেই সব তৃতীয় নয়নধারীদের কথা। বিস্ময়ে হতবাক হই, যখন ভাবি, ডারউইন শুধুমাত্র জীবজগত আর পৃকৃতি পর্যবেক্ষণ করে, কেমন করে বলতে সক্ষম হলেন পৃথিবীর সকল প্রাণ, একই পূর্বসূরী থেকে সৃষ্ট। সারা পৃথিবী যখন আদম আর ইভের সন্তান বলে স্বীকার করে নিয়েছে, তখন ডারউইন কেমন ভাবে এই পূর্বধারণার বাইরে এসে বললেন, ন্যাচারাল সিলেকশানের কথা। তখন ডিএনএর আবিষ্কার হয় নি, এমনকি কোষের নিউক্লিয়াসও জানা ছিলো না। রেডিওএক্টিভ ম্যাটারিয়ালের ক্ষয়ের প্যাটার্ণ জানা ছিলো না । পৃথিবী বা মহাবিশ্বের বয়স জানা ছিলো না।

আজ আমরা ডিএনএ রেপ্লিকেশান জানি। জীন মিউটেশান কিভাবে প্রাণীর বৈশিষ্ট পরিবর্তিত করে, তার দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আমরা জানি বিভিন্ন সমগোত্রীয় প্রাণীর ডিএনএ প্যাটার্ণের মাঝে আশ্চর্য মিল। ডারউইন সেই সময়ে বলেছিলেন, বিবর্তন এক স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বিষয়। বিবর্তনের ফলে , যে প্রজাতি যতটা যোগ্য তারাই পৃথিবীতে টিকে থাকে।

মেরু অঞ্চলে বিবর্তনের ফলে সাদা ভাল্লুক টিকে ছিল, কারণ বরফের সাদা হওয়ার কারণে, এরা শিকারে বাড়তি সুবিধা পেতো।

ব্রুনো কোন বিজ্ঞানী ছিলেন না। ছিলেন এক মংক। যে বইগুলো চার্চ নিষিদ্ধ করেছিল, সেই বইগুলো তিনি লুকিয়ে পড়তেন। সে অপরাধে তাকে চার্চ থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু তার তৃতীয় নয়ন ছিল। তিনি উপলব্ধি করেন, মহাবিশ্ব অসীম। তিনি বলতেন, তোমরা ঈশ্বরকে একটি গ্রন্থের মাঝে কেনো বন্দী করছো। অসীম মহাবিশ্বের দিকে তাকাও। তাকাও এক অসীম এক ঈশ্বরের পানে। চার্চ ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারে।

পৃথিবীতে যে ধর্মগুলো এসেছে। সেই সময়কালীন ধারণা ও জ্ঞানের সম্মিলন ঘটেছে গ্রন্তগুলোতে। ধর্মগ্রন্থগুলোর পরতে পরতে তার প্রমাণ রয়েছে। মোট কথা সে সময়ের অর্জিত জ্ঞানের আলোয়, প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষকে একটা আচরণের কাঠামো প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে। সুশৃঙ্খল সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা চেষ্টা করা হয়েছে।

বিজ্ঞান যত ঋদ্ধ হয়েছে। ততই মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়েছে। মহাবিশ্ব থেকে জীববিজ্ঞান , জীববিজ্ঞান থেকে অনুবিজ্ঞান, সবখানেই বিস্ময়। মহাবিশ্বের বিপুল কর্মযজ্ঞ। বিজ্ঞান বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছে। হয়তো পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে,কিন্তু বিজ্ঞানের সৃষ্টির রহস্যের উন্মোচনের যে আাকাঙ্খা, সে আকাঙ্খা কি ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বর খোঁজার চেয়ে ভিন্ন কিছু?

শুধু বিজ্ঞান ব্রুনোর মতো একটি নির্দিষ্ট গন্ডীতে ঈশ্বরকে বন্দী না করে, এক অসীমের মাঝে সৃষ্টির রহস্যের খোঁজ করে চলছে। এক ঈশ্বর কি , বহু-ঈশ্বর অথবা স্বয়ম্ভূ মহাবিশ্ব, বিজ্ঞান তা জানে না। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রচেষ্টা এক চিরন্তন সত্যের খোঁজ।

মানুষ আসলে নিজেকে খুঁজতে গিয়েই , ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছিল। সেই খোঁজটি ক'টি গ্রন্থে সীমাবদ্ধ রাখবে , না অসীমে ছড়িয়ে দেবে তা নির্ভর করছে, পূর্বধারণা মানুষকে কতটুকু আটকে রাখতে পারবে, তার উপর। মানুষ কতটা আস্তিক বা নাস্তিক তার উপর নয়।


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান