বীথির কাছে চিঠি-৪৩

Sat, Dec 23, 2017 12:12 AM

বীথির কাছে চিঠি-৪৩

লুনা শিরীন : বিকেল পৌণে সাতটা,ইনেদের বাসায় আবার তিনদিনের  সময় শুরু হলো । এ এক অদ্ভুত জীবন বেধে দিয়েছে  বিধাতা আমার জন্য। হয়তো সবার জন্যই, কিন্তু আমি বলছি আমার কথা । নিশ্চয়ই অনেকের সাথেই আমার অনুভুতি মিলে যাবে,যেতেই হবে। তুই কি জানিস বীথি, সারাজীবন ধরে তুই যা যা ভয় পাবি বা যা এড়িয়ে চলতে চাইবি বা যা যা মন থেকে অপছন্দ করবি, বা খুব সাধারন ভাবে যা যা করতে চাইবি না তাই তোর পায়ে পায়ে ঘুরবে আজন্ম ? সেই সবগুলো বিষয়ের সাথেই তোকে জীবন পাড় করতে হবে, সেগুলোর সাথেই তোকে যুঝতে হবে, যা তুই করতে চাস নি কখনই ? আমার নানী বলতেন মানুষের শত্রু হচ্ছে তার মনের বাঘ, এর কোন অন্যথা নেই । কেন জীবন এমন ? আমি যা চাইনি, তাই কেন আমাকে তাড়িয়ে নেবে প্রতিক্ষণ ? বা যা কখনো হয়তো মনের ভুলে চেয়েছি সেটা আসবে জীবনে কিন্তু খুব  ডিফরেন্ট ফর্ম এ—যা  আমি আদৌ ভাবি-ই নি, কিন্তু কেন ? আমি এই কেনর উত্তর খুঁজেছি বীথি , বলতে পারিস, ইদানিং খুব বেশী করে খুঁজছি আর খুঁজতে গিয়ে জীবনের কোন  থৈ পাইনি কোথাও । না নিজের জীবনে, না খুউব কাছে কারো জীবনে । সবাই এমন জায়গায় দাড়িয়ে আছি, মনে হয় পিছে ভুল করে ফেলে এসেছি আসল সময়গুলো।

 অন্য একটা গল্প বলি তোকে।  মনে  আছে রুবিনা আন্টি আর রায়হান আঙ্কেল-কে তোর ? মনে আছে বীথি, তোদের তো একটু  রিলেটিভও হয় ওনারা। ঐ যে আমাদের ছোটবেলায় দেখা অসম্ভব সুন্দর কাপোল, আমরা বলতাম, আন্টি আঙ্কেল মেইড ফর ইচ আদার , ইস কি ভীষন সুন্দর দুইজনই – সমান যোগ্য, সমান ভাবে সুন্দর। আমরা তখন ক্লাস টেন /নাইনে পড়ি তাই না বীথি ? কোথাও খুৎ ধরার  কোন কায়দা নেই আঙ্কেল আন্টির । আমাদের চোখে তখন পুরুষ মানুষের ঘোর। আহহ রে সেই ঘো্র যে কত বেশী  আসলেই ঘোর ( মিথ্যা ঘোর) সেটা না বুঝলেই বোধ হয় বেচে যেতাম এক জীবনে। সেই রায়হান আঙ্কেল কে অনেক অনেক পরে, মানে ধর আমার বয়স যখন  ৩৫/৩৬, একদিন আমি প্রশ্ন করেছিলাম, জানিনা তোকে বলা ঠিক হচ্ছে কিনা, আঙ্কেলকে যে কোন ঘটনার কারনেই হোক আমি প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা আঙ্কেল –এই যে আপনার এত সেক্স ড্রাইভ ,আপনি এত অন্য মহিলাদের সাথে মেশেন আন্টি জানে না সেটা ? আঙ্কেল আত্মবিশ্বাসের হাসি হেসে বললেন – তোমার আন্টি আমার চাহিদা মীট করতে পারে না, অনেকটাই পারে না বলতে পারো  –তাই তাকে মানতেই হয় যে আমি অন্য কোথাও যাবো এবং নিজেকে  শান্ত করবো । আমার বিশ্বাশ তখন আঙ্কেলদের সংসার জীবন ১৬ / ১৭ বছর পেরিয়ে গ্যাছে ।

বীথি, আবার ও বলছি আমার নিজের সংসার জীবনের অভিজ্ঞতা মাত্র ৬/৭ বছরের,একটা গোটা জীবনের কাছে এই সময়টা ভীষন ভীষন সামান্য, আমি যখন নিজ দায়িত্বে সংসার ছেড়েছি তখন  সেটা অতটা বুঝিনি, আজকে যতটা বুঝি। আর সেই  বুঝকে মেলাতে গিয়েই আমি মানুষের খুব নাড়ীর খবর জানতে চাই। বুঝতে  চাই আসলে কি  মানুষ ভালোবেসে সংসার করে নাকি সংসারই টিকে থাকবার জন্য আপেক্ষিক ভাবে ভালো পথ তাই সংসার করে ? সুযোগের অভাবে চরিত্রবান কি আমরা  সবাই ,নাকি কেউ কেউ সুযোগ পাবার পরেও মাথা উঁচু করে ভালোবেসে বেঁচে থাকে ?  আমি জানি বীথি ,পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ কাজ হোলো কথা বলা, বিশেষ করে বড় কথা বলা, কিন্তু জানিস আপু, এর বাইরেও মানুষ আছে, অফকোর্স আছে। অনেক আগে তোকে বলেছিলাম আমার পাশের রুমে বসে ইটালীর মেয়ে , ৪৬ বছর বয়সী মেরিনা , ও বলে ,লুনা আমি  ভালোবেসে সংসার করি, আমার অনেক অনেক টানাটানি আছে কিন্তু আমাদের রিলেশন-এ কোন আচড় নেই, আমি নেক্সট লাইফে আবার এই পার্টনারকেই চাই । তেমনি  আমার জীবনেও অনেক সময় গড়িয়ে গেছে, আমি কিন্তু তসবি হাতে যোগীনি হয়ে বসে থাকিনি।  দেখতে হয়েছে নানান জীবন , কিন্তু যেহেতু এখোনো ওই টুকু শেষ হয়ে যাইনি তাই ভাবি – শুধুইই কি ভুল ছিলো এই জীবনে ? না ভুল থেকে প্রবল শিক্ষাও আছে অন্য অনেকের মতো আমার ব্যাক্তিগত জীবনে । তাই  শুধু  সম্পর্কের ব্যাপারে সততা খুঁজে  ফিরি । যদিও অনেকে বলেছেন – অন্য সবকিছু পাবেন আপনি কিন্ত সৎ মানুষ( ছেলে /মেয়ে) খুব কঠিন। প্রশ্ন করি নিজেকেই,আমরা কি আসলেই সম্পর্কের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল নাকি অনেকটাই এখানে মুখোশ পরি বা পরতে বাধ্য হই ? হয়তো ভালোবেসে কারো সাথে থাকার মতো  ভাগ্য হয়নি আমার তাই এমন অলীক স্বপ্ন নিয়ে বাঁচি আর মেলাতে থাকি একটার পর একটা পুতির মালা।  কিন্তু মালা কি গাঁথতে পারি বীথি ? সম্পূর্ণ মালা গাঁথতে চাই আমি ,আমাদের  যাপিত  জীবনের মতই বার বার এই মালা থেকে পুতি খসে যায়।  সুতোয় জট বেধে যায়।  কোন মেয়েকে যখন বলি – খুব ভেবে বলতো  --এমন জীবন কি চেয়েছিলো তুমি ? আসলে প্রশ্ন করি নিজেকেই, গভীর করে নিজেকেই খুঁজে ফেরা এই জীবন আমাদের সবার।

 শেষ করার আগে বলি – আমার এই লেখা পরে অনেকে জিজ্ঞেস করে , বীথিটা আসলে কে ? আপনার কোন প্রেমিক ? যার নাম বলতে পারছেন না বলে বীথি বলছেন ? বা আরো বলে – আসলেই কি  বীথি বলে কেউ আছে ? আপনি কি সত্যিই কথা বলেন নাকি বানিয়ে বানিয়ে লেখেন ? আবার আমাকে যারা খুব কাছে থেকে চেনে তারা বলে—লুনা তোর লেখার নীচে নাম লিখিস কেন ? কোন দরকার নেই , এই লেখা পড়লেই বোঝা যায় তুই কথা বলছিস । আমি হাসি বীথি –তুই আমার সেই বন্ধু যার ফেসবুক নেই, যে আমার কোন লেখা পরতে পারে না, আমি খুব  খোলা মন নিয়ে তোকে লিখি কারন আমি জানি তুই আমার লেখা পরিস না ।  মন খুলে কথা বলতে না পারলে কবে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম—তোকে কি করে জানাই – আমার জন্য তোর এই খোলা জানালা আমাকে কতটা  বাঁচিয়ে রাখে। এবার উঠি বীথি,ইনেদ ডাকছে,রাত নয়টা । কাল আবার লিখবো ।

২১ /০৭/২০১৪

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিঠি-৪২


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান