বীথির কাছে চিঠি-৪১

Sun, Dec 3, 2017 2:55 PM

 বীথির কাছে চিঠি-৪১

লুনা শিরীন : জোহরের নামাজ সেরে এইমাত্র ইনেদের বাসার মেইন ফ্লোরে  এলাম। আমার ঘড়িতে এখন বিকেল পৌনে ছয়টা । সাগা  কথা বলছে ওর বন্ধুর সাথে ,আবার  ডিনারও রেডি করছে। মাত্র ১৭ বছরের মেয়ে, কিন্তু বন্ধুর ব্যাপারে কি ভীষণ সৎ আর  ডিভোটেড ,ভাবলেই ভালো লাগে ।

গতকাল বলেছিলাম তোকে ইনেদের কথা,  শেষ করেছিলাম ,আবার সেখান থেকেই শুরু করবো বলে । কিন্তু একদিনের ভিতরেই ভাবনার আর অনুভুতির কত কত রঙ বদলায় , মানুষ হবার এই এক  বিচিত্র খেলা ,ক্ষণে ক্ষণে  রং বদলায়, এই ভালো লাগে তো এই আবার বিষণ্ণতায় ভরে যায় মন। যাইহোক , গতকাল ইনেদের সাথে ইফতার করলাম, করতে বাধ্য হলাম, কারন ইনেদ বসে থাকলো আমার জন্য রাত নয়টা অব্ধি , জুস বানিয়ে দিলো, আমাকে সঙ্গ দিলো যদিও ওর ডিনার সাতটার ভিতরেই শেষ । এই দেশে তাই নিয়ম ,  আমি নিজেও কিন্তু এই নিয়ম খুব ভালো মানি বীথি ।

 এই বাড়িটার তিনটা ফ্লোর, নীচে বেসমেন্ট, মাঝের ফ্লোর বা  মেইন ফ্লোর ,আর উপর তালায় তিনটা আলাদা ঘর । ইনেদের দুই মেয়ে গিয়েছে ওদের নানী বাসায় , তাই এক রুমে আছে সাগা,অন্যরুমে ইনেদ , আর মাস্টার বেডরুমে আমি । থাকার  কথা ছিলো বেসমেন্ট এ , কিন্তু থাকতে হচ্ছে বাড়ির সবচেয়ে বড় ঘরে,এর নাম কি রেজেক ? আসলেই তাই বীথি, আমাদের এই বাড়ির নিয়ম হচ্ছে, যার যার খাবার সে সে তৈরি করবে, কিনবে এবং রান্না শেষে কিচেন ক্লীন করে বের হবে। আমি গতকাল মানে সোমবারেই আসার সময় তিনটা বড় মাছে পিস রান্না করে এনেছি আমার বাসা থেকে, আমি জানি আমাকে রোজা ভাঙতে হবে, তাই প্রস্তুতি সব নেয়াই আছে। সেইমত গতকাল করেছিলাম সবজি খিচুরি, ইনেদ কে বললাম তুমি আমার সাথে খাবে, কোন কথা শুনবো না । সামান্য দুটো ভাত বা খাবার তাই না বীথি , কি যে  ধন্যবাদ দিতে থাকলো বার বার করে, আমি  মনে মনে  বললাম , ইনেদ -- তোমাকে পেয়ে যে আমার কতখানি উপাকার হোলো সেটা তোমার জানার কথা না। এই যে দুমাস নাইয়া নেই, আমার শুন্য  বাড়িতে  ফিরতে হচ্ছে না, একা ইফতার করতে হচ্ছে না, এইসব প্রবল আনুভুতি কি আমি ইনেদকে বোঝাতে পারবো , নাকি সেটা সম্ভব বল ?

আসলে কি জানিস, জীবন একটা মায়ার  খেলা , শুধুই মায়া দিয়ে ভরে থাকা জীবনের রহস্য, ঘোর লাগা এক সময় পাড় করি আমরা। এই যে তোকে লিখি, আমি একটানা বসে লিখে ফেলি, যেনো কথা বলছি তোর সাথে, তুই বসে আছিস আমার সামনে, মনের ভিতরের সব সব কষ্ট / দুঃখ / হাহাকার – চাপকলের পানির মতো বেড়িয়ে আসে , তারপর ভাবি, কি লিখছি এইসব ? কিন্তু যখন দেখি কেউ লিখছে – আবার কবে লিখবে আপু ? তখন মন উচাটন হয়ে উঠে—তাহলে নীল বেদনার পাহাড় আমি একাই শুধু বয়ে বেড়াই না, আরো কেউ আছে আমার সঙ্গী ? আমার কথা শুনে তারাও হয়তো কিছুখন ভাবে আমাকে ।

অন্য একটা কথা বীথি, গত দুদিন হলো দেখছি, হুমায়ুন আহমেদ এর নাটক কুসুম – ১৯৮১ সালে লেখা নাটক,গরীব বাবা /মা পয়সার অভাবে বেচে দিয়েছে মেয়ে কুসুমকে।  সুবর্ণ হয়েছে কুসুম ,অভিনয় কাকে বলে, হুউ হুউ করে কাঁদছি আর মনে পড়ছে ফেলে আসা দেশকে, আমার দুঃখিনী দেশ,অভাবে অনটনে  -- মানুষ দিশা হারিয়ে ফেলে বীথি। গরীব মানুষের কি গাটস থাকে, নাকি থাকে সৎ থাকার মতো প্রবল সাহস ? থাকে শুধু বেচে থাকবার তীব্র বাসনা,আমি সেই দেশের মেয়ে বীথি, খুব কাছে থেকে বলতে পারিস নিজের জীবন দিয়ে সেইসব  মানুষকে  দেখেছি আমি। আবার  এও জানি, শুধু সেই সরল মানুষদেরই থাকে বুক উজাড় করা ভালোবাসা।

 জানিস তুই?—কষ্ট আর দুখ দেখলেই শুধু দেশ এর কথা মনে পড়ে আমার, আমি ফেলে এসছি  কিছু সময় , কিছু ভালোবাসা , জীবনের সেরা সৃতি,যা বুকে করে বেচে থাকতে হবে বাকী জীবন, বেচে হয়তো থাকবো, কিন্তু সুখ কি পায় মানুষ মনের ভিতর  থেকে ?  আজ দশ বছর আছি বিদেশে বীথি ,আমি একা না , প্রতিটা মানুষ ,যারাই আমার মতো প্রবাসী,আমি সবার হয়ে বলতে পারি, কেউ মোট ৬০ সেকেন্ড-ও নিজের অতীত ভুলে থাকে না,প্রিয়জনকে ভুলে থাকে না, দেশকে ভুলে থাকে না, কিন্তু তবুও বেচে থাকে মানুষ । এই এক অদ্ভুত জীবন আমরা পাড় করি বীথি , শুধুই মনে হয় –ঐ যে দুর – বহুদূর – ওখানেই বুঝি সব সুখ ।

 ইনেদের বেডরুমে , দুটো আলাদা আলাদা জারে অসাধারন দুটো মাছ রাখা আছে,গাড় নীল, সবুজ আর হলুদের লম্বা ঝালড় মাছ দুটোর, সাদা রুপোলী স্বচ্ছ পানিতে মাছ দুটো ঘুরছে ,অনেক অনেকক্ষন তাকিয়ে থেকে সকালে ইনেদ কে বলি—তুমি ওদের আলাদা রেখেছো কেন, ওদেরকে এক জারে রাখলে কি হয় ? ইনেদ বলে –লুনা ওরা ফাইটার , একসাথে থাকলে যুদ্ধ করে ,বলেই ইনেদ হাসে। তাইতো , এই যে শুধুই  সঙ্গী খোঁজার তাড়না মানুষের – প্রতিদিন যুদ্ধ করতে করতে মানুষ  এক একটি বিছিন্ন দ্বীপ হচ্ছে  ক্রমাগত, কোথায় যেতে চাই আমরা ? কার কাছে ? জানি নিজেরাই?  আদর বীথি ।

৮/০৭/২০১৪

আরো পড়ুন: বীথির কাছে চিটি-৪০


সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
Designed & Developed by Tiger Cage Technology
উপরে যান