> সামাজিক অন্ধত্ব আর একজন রুমানার বহুমুখী লড়াই
> মূলধারার স্কুল ক্লাশরুমেই বাংলা
> ৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন হচ্ছে কি?
> তুরস্কের নির্বাচন এবং আমাদের রাজনীতি
শিক্ষার নামে মানসিক নির্যাতন: শিশুদের বাঁচাতে হবে!
আবদুস সোবহান বাচ্চু
শিশু শিক্ষা সারা দুনিয়া ব্যপী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এর যথাযথ অনুশীলনের উপর নির্ভর করে একটি শিশুর, একটি পরিবারের, একটি দেশের, একটি জাতির ভবিষ্যত। শিক্ষাদানকে ব্রত হিসেবে, অঙ্গীকার আর দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে দেশে দেশে যুগে যুগে মনীষিগণ ব্যপক পর্যবেক্ষণ ও লব্ধ জ্ঞানসমৃদ্ধ করে বিভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতির আবিস্কার ও প্রচলন করে আসছিলেন। আমাদের দেশেও তা অনুসৃত হয়ে আসছে বহুকাল ধরে।
সময় পাল্টেছে, পাল্টেছে শিক্ষার ধরণ, পরিবেশ, সুযোগ ও চর্চ্চার ইতিবৃত্ত। শিক্ষাধারা আজ বিজ্ঞানমনষ্ক ও গবেষণালব্ধ। বিশ্বব্যপী পন্ডিতবর্গ সদা জাগ্রত তা আরো সমৃদ্ধ করতে, আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে। কিন্তু আমাদের দেশে তা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা ভেবে দেখবার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে সবার অলক্ষ্যে। শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে আমাদের আজকের শিক্ষা রীতি ভয়ানক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যা একটু ব্যাখ্যা না করলেই নয়।
শিশু শিক্ষায় আমাদের দেশে প্রচলিত রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষা ধারা। গত দুই দশকের বিচারে প্রথমিক শিক্ষা মানে অবহেলা, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা মানে অবৈজ্ঞানিক এবং মাদরাসা শিক্ষা মানে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার অবহেলার কারণ মূলত: আমাদের মানসিক দৈন্যতার কারেণে শিক্ষকতাকে আর দশটা সাধারণ সরকারী চাকুরী মনে করা, প্রাথমিক শিক্ষাকে বিনামূল্যে করতে গিয়ে গুরুত্বহীন ও শ্রেণী বৈষম্যে তৈরী করে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের ছিন্নমূল জনগোষ্ঠির প্রতিষ্ঠান করে ফেলা। এবং এই মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থার মত একটি বৈজ্ঞানিক শিক্ষা পদ্ধতির নামে ছোট ছোট শিশুদের জিম্মি করে দিনের পর দিন নীরবে চলছে শিক্ষা বাণিজ্য। বইয়ের পাহাড়, খাতার বাহার, ইস্কুল, হোম ওয়ার্ক, প্রাইভেট... ছোট শিশুটির মাথা হেট। মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে লিখেছি এর আগে, আজ তার আর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। তবে সময় পাল্টেছে, প্রাথমিক শিক্ষায় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। মাদরাসা শিক্ষাকে যুগোপযুগী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্ডারগার্টেনগুলোকে একটি সুষ্ঠু নীতিমালার আওতায় আনা, তাদের শিক্ষকদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেয়া আজকে সময়ের চাহিদা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের অধিকাংশ বাবা-মা নিজ সন্তানের সময়ের দাবী মেটাতে না পেরে, তার আবদারগুলোকে যন্ত্রনা মনে করে তাকে তড়িঘড়ি ইস্কুলে ভর্তি করার মানসিকতা অনকটাই স্পষ্ট। তার পরেই আম গাছে তাল ফলানোর অযাচিত চেষ্টায় রত হন। এবং তৃতীয় শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধের মাধ্যমে রণে ভঙ্গ দেন।
শিশুর বয়স চার হতে না হতেই তাকে ভর্তি করা হয় পে¬-গ্র“পে। কত বয়স দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়–য়া ছাত্র বা ছাত্রীটির? তার বয়সে কতটা শব্দ গ্রহণ বা ধারণ করার ক্ষমতা তৈরী হয়? একবার ভেবে দেখেছেন কি? ওই বয়সে আপনি কত সময় পড়তেন আর কত সময় খেলতেন তা কি আপনার মনে আছে? বিবেকের বোতামগুলো খুলে দেখেছেন কি আপনার সন্তানের কোন খেলাধুলার সময় নেই? ঘুম থেকে উঠে ইস্কুল, ইস্কুল শেষ হতে না হতেই কোচিং, বিকেলে প্রাইভেট, রাতে নাইট কেয়ার ও হোম ওয়ার্ক আবার সকালে ইস্কুল। রবীন্দ্রনাথের “তোতা কাহীনি” আজ আরেকবার পড়ে দেখুন তো আপনার সন্তান আর সেই পাখিটির মধ্যে তফাৎ কোথায়?
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “শিশুর মন যতটুকু শিক্ষার উপর কর্তৃত্ত লাভ করিতে পারে, সামান্য হইলেও সেটুকু শিক্ষাই শিক্ষা। আর যাহা শিক্ষা নাম ধরিয়া মনকে আচ্ছন্ন করিয়া দেয় তাহাকে পড়ানো বলিতে পার, কিন্তু তাহা শেখানো নহে।” আজকে আমরা যারা শিক্ষক তারা শুধু পড়াই আর যারা অভিভাবক তারা পড়াতেই দেন। এখানে শেখার কোন সুযোগ নাই আর সন্তানের পিতা-মাতা হিসেবে এ কথাটি আপনাকেই উপলব্ধি করতে হবে, এ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে নিতে হবে। ভর্তি পরীক্ষা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে গিয়ে শিশুর মন শুধু আচ্ছন্নই হয় না রীতিমত আতংকিত হয়ে পরে। কখনো তাকিয়ে দেখেছেন কি পড়াশুনার নামে একটি শিশুর জীবন থেকে কেড়ে নেয়া হচ্ছে তার মধুর শৈশব? হত্যা করা হচ্ছে তার স্বাভাবিক বিকাশ? অবমূল্যায়ণ করা হচ্ছে তার মেধা ও মনন? এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সম্পর্কে কোন ধারণা আছে কি আপনার?
মনো বিজ্ঞানীরা এ সম্পর্কে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেন, শিশুর উপর অপরিনত বয়সে এহেন অবৈজ্ঞানিক চাপের কারণে শিশুর মস্তিস্ক স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে শিশু অদূর ভবিষ্যতে হতাশাগ্রস্থ, অপরাধ প্রবণ ও আত্মহত্যার মত সর্বনাশা পথে ধাবিত হতে পারে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ জাতি গঠনের প্রয়োজনে শিশুকে অবশ্যই তার শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। আমাদের দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিউরোলজি বিভাগের একটি পরিসংখ্যান আমাদের ভীষন ভাবিয়ে তোলে আর তা হচ্ছে; গত চল্লিশ বছরের মধ্যে প্রথম ত্রিশ বছরে তাদের রোগিদের মধ্যে ৭০শতাংশ ছিল চল্লিশোর্ধ মানুষ আর তার পরবর্তী দশ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায় ৮২শতাংশ হচ্ছে তৃতীয় থেকে নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। এর বেশিরভাগই অবৈজ্ঞানীক, অযৌক্তিক, অপরিনত বয়সে পড়াশুনার নামে অতিরিক্ত চাপের কারন। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হকের ভাষায়; “আম পুঁতলে চিরকাল আম হইয়াছে, জাম পুঁতলে জাম; সময়ে ফলের গাছে আতি মিষ্ট ফল না ধইরা, ধরে কর্মফল।” আজ আমরা আমাদের অবুঝ শিশুদের নিয়ে নিজেরা আরো বেশি অবুঝ হয়ে যা শুরু করেছি তার ফল বা কর্মফল কে ভোগ করবে? ভেবেছেন কী? অগনিত পরীক্ষার্থীর মাঝে অযৌক্তিক প্রশ্নের প্রাচীর ডিঙেয়ে হাতে গোনা যে ক’জন সুযোগ করে নিতে পারে তাদের বাইরে যে সুযোগ বঞ্চিত, পরাজিত হাজারো শিশু তাদের কী অবস্থা দেখেছেন কী?
পরিবারে এ শিশুটি তখন আখ্যা পায় গর্ধভ। গঞ্জনা, তাচ্ছিল্য, অবহেলা, অসম্মান তখন তার নিত্য সংগী। ছোট্ট মানুষটির ছোট্ট মনেও যে না পারার কষ্ট থাকতে পারে, তারও যে তখন আপনজনের সান্ত্বনা প্রয়োজন এ কথা তখন বেমালুম ভুলে যাই আমরা। এসময়ে অনেক শিশুই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরে, শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পরে। দিনের পর দিন শিক্ষার নামে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে, তার ধারণ ক্ষমতাকে বিবেচনায় না এনে, নিরবিচ্ছিন্ন, নিরানন্দ শিক্ষা বোঝা অনবরত চাপিয়ে যাঁরা দিয়েছেন এবং যাঁরা দেবার সুযোগ করে দিয়েছেন তার উভয়েই শিশুর উপর মানসিক নির্যাতন করেছেন যা যে কোন সভ্য দেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সম্মানিত অভিভাবক, আপনার সন্তানকে আপনার চেয়ে বেশি ভাল কে বাসতে পারে বলুন? গুটি কয়েক শিক্ষক নিজেদের অর্থ লিপ্সাকে চরিতার্থ করার জন্যে বছরের শুরুতেই আপনাকে প্রলুব্ধ করে, বাধ্য করে আপনার সন্তানকে কোচিং নির্ভর করতে। কী পড়ানো হয় সেখানে? তার যৌক্তিকতা কতটুকু? আপনার শিশুর ধারণ ক্ষমতা কতটুকু? দ্বিতীয শ্রেণীর শিশুটিকে চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণীর অংক কষানোর কী মানে থাকতে পারে আপনি কেন তা খুঁজে দেখছেন না? ভর্তি কোচিং বা শিক্ষা বাণিজ্যের নামে যে সর্বনাশা খেলা চলছে আজ সারা দেশময় আপনি আপনার সন্তানকে কেন তার “ঘুটি” হওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন? মানসিক দৈন্যতার কারনে যারা নিজেদের সন্তানকে মেধাহীন ভেবে সম্ভাবনার সকল দরজা বন্ধ দেখছেন আপনি কেন তাদের কাতারে দাঁড়িয়ে নিজের বোধ বুদ্ধিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন? শুধুমাত্র আপনি এ অযৌক্তিক অনাচার রূখে দাঁড়ান, মুহুর্তে থেমে যাবে সব। মহাকাল সৃষ্টির পর থেকে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুড়তো হাজার কোটি বছর ধরে। ১৭৭৩ সালেম মার্চ মাসে একজন নিরস্ত্র, রাজক্ষমতাহীন ‘গ্যালেলিও’ তা ঘুড়িয়ে দিলেন এবং সেদিন থেকে আজতক পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। চোখ মেলে দেখুন, আপনার প্রতিশ্র“তিশীল অভিভাবক হিসাবে সংগ্রামী কর্মকান্ডে পরীক্ষিত সহযোদ্ধা ও অংশীদারের অভাব নেই। আর যদি তা না হয় তবে পৃথিবীর নিয়ম মিথ্যা হয়ে যাবে, সূর্যকে আবার ঘুরতে হবে পৃথিবীর চারদিকে।
আজ সময় পাল্টেছে। নিরবিচ্ছিন্ন জিম্মিদশা আজ আর নেই। পঞ্চম শ্রেণীতে সমাপনী পরীক্ষা। ইস্কুল শিক্ষকের নিয়মিত নির্যাতনের যাতাকলের বাইরে শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর প্রথম অনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি । অষ্টম শ্রেণীতে জে.এস.সি শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুর দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এর বাইরে নিয়মিত ক্লাসগুলোতে যে পরীক্ষা হচ্ছে তার ফলাফল প্রভাবান্বিত করার তেমন কোন কারন নেই। সাধারণ স্বাভাবিক ফলাফল যথেষ্ট।
তবে এর পাশাপাশি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উলে¬খ করতে চাই সম্প্রতি আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শিশুদের উপর থেকে বইয়ের বোঝা কমানোর কথা বলেছেন। শিক্ষার নামে চাপ কমাতে বলেছেন। শিশু শিক্ষাকে আনন্দঘন করে তোলার কথা বলেছেন। আমরা সর্বগ্রে দ্রুত এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। শুধু বলা নয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে সবিনয় অনুরোধ এটাকে কর্মযজ্ঞে পরিণত করুন। তার জন্যে প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ সহায়তা করা, আইন করা বা কঠোর, কঠিন শাস্তির বিধান তৈরী করা যেতে পারে। শিশুদের প্রতি আপনার এ স্নেহাস্পদ উপলব্ধিতে দেশের মোট জনসংখ্যার কুড়ি শতাংশ শিশু আপনাকে তাদের অভিভাবক মনে করে তৃপ্ত, ধন্য। রবীন্দ্রনাথের মতে “ শিক্ষর ক্ষেত্রে শিশুকে চিন্তার স্বাধীনতা, ভাবের স্বাধীনতা এবং ইচ্ছার স্বাধীনতা দিতে হইবে। শিক্ষাকালীন শিশুর পরিবেশ হইবে সহজ, স্বচ্ছন্দ, সজীব।” আর তাই শুধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন স্নেহময়ী মা হিসেবে আগামী দিনের দেশের কর্ণধারদের শিক্ষার নামে মানসিক নির্যাতনের হাত থেকে মুক্ত, স্বাধীন, সাবলীলভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ অবারিত করবেন প্রত্যাশা করছি। শুধুমাত্র আপনার হস্তক্ষেপেই এর সহজ সমাধান সম্ভব। সম্প্রতি ঢাকার শিশুদের আপনি লটারির মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছেন। বিষয়টি অত্যন্ত যৌক্তিক, ফলপ্রসু ও সময়োপযোগী বটে। এ ধারাটি বহাল থাক, এ সুযোগটি অবারিত হোক সারাদেশের শিশুদের জন্য। বছরের শুরুতেই ঘোষিত হোক এ পরিকল্পনার কথা। কেননা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে শিক্ষার নামে শিশুর উপর মানসিক নির্যাতনের প্রক্রিয়া।
দেশের শিশু সংগঠন মুকুল ফৌজ, চাঁদের হাট, খেলাঘর আসর, ফুলকুঁড়ি মেলা, কচি-কাাঁচার আসর কী অসার ভূমিকা পালন করবে এ বিষয়ে! শিশুরাও তো মানুষ, তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কোন উচ্চারণ অনুপস্থিত কেন এখানে? আমরা মনে করি সারা দেশময় বয়ে যাওয়া শিক্ষার নামে এ নীরব নির্যাতনের হাত থেকে দেশের আগামী কর্ণধার আজকের শিশুদের স্বাভাবিকভাবে বাঁচাতে প্রতিটি বিবেকবান মানুষের সোচ্চার হওয়া উচিত আজ এখনই।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, নীপবন প্রিপারেটরি ইস্কুল,কো-চেয়ারম্যান ও প্রশিক্ষক, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, বরিশাল কিন্ডারগার্টেন ফোরাম,admib@nipobon.net