২য় বর্ষ সংখ্যা ৪৯, জুলাই ০৬, ২০১১ । বুধবার 

বাঙালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়

 

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ
এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও বহু ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে বাঙ্গালী এক স্বাধীন জাতি হিসাবে আত্ম প্রকাশ করেছে। আজ তাই আত্ম পরিচয়ের সন্ধানে আমাদেরও জানা প্রয়োজন বাঙ্গালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়। বাঙ্গালী জাতির আত্মপরিচয়ের ঠিকানা বাংলাদেশ হঠাৎ করে জš§ নেয় নি। এক সুপ্রাচীন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এর সৃষ্টি। পূর্বে দক্ষিণ গোলার্ধে একটি বড় ভূখন্ড ছিলÑ গন্ডোয়াল্যান্ড । এক সময় গন্ডোয়াল্যান্ডে ফাটল  ধরে। পরবর্তীতে এশিয়া ভূ-খন্ডে এসে তা ধাক্কা খায়। এবং উক্ত ভূ-খন্ডের মাঝের পলি, পাললিক শিলা সংকোচিত হয়ে হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি করে। প্রায় চার কোটি বছর পূর্বে সৃষ্ট হিমালয় পর্বত থেকে প্রতি বছর ১০২০ কোটি টন পলি এসে বঙ্গীয় বদ্বীপটি গড়ে তুলেছে। এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। আনুমানিক ১০ লক্ষ বছর আগে প্ল্েেষ্টাসিন যুগে অর্থাৎ প্রতœপ্রস্তর যুগেরও বহু পূর্বে বাংলাদেশে প্রথম মানুষের আগমন ঘটে। প্রতœপ্রস্তর যুগকে প্রাগৈতিহাসিক যুগও বলা হয়ে থাকে। এ যুগ মানুষের লিপি আবিষ্কারের কালের পূর্ব পর্যন্ত। স্থায়ীত্ব ৬ লক্ষ থেকে সাড়ে ৫ হাজার বছর পূর্ব পর্যন্ত । অঞ্চল ভেদে এ সময় কাল বিভিন্ন হতে পারে। প্রায় ১০ হাজার বছর পূর্বে আসামের শিলং এলাকা থেকে সিলেটে মানুষের আগমন ঘটে। সিলেটের জৈন্তিয়াপুর এলাকার মেগালিথিক সংস্কৃতির ধারক বিশালাকার পাথরের সমাধি ও সৌধ তার পরিচয় বাহক। সুদূর ইংল্যান্ডেও অনুরূপ নির্দশন মেলে।সেখানকার সেসব মানুষেরা আর্যভাষারও প্রবর্তনকারী। এটা যোগসূত্র কী তা গবেষণা সাপেক্ষ। ভারতের বিভিন্ন স্থানের মতন বাংলাদেশেও প্রতœপ্রস্তর যুগের বিভিন্ন হাতিয়ার ও প্রতœপ্রস্তর যুগের নির্দশন মিলেছে। এবং সে সব স্থানে নব্য প্রস্তর যুগেরও নির্দশনও মিলেছে। এ থেকে তখন এ অঞ্চলে মানুষের বসবাসের সাক্ষ্য পাওয়া যায়।
উপমহাদেশে যুগে যুগে যে সব জনধারা এসে মিশেছে তার মধ্যে সবার আগে এসেছে নিগ্রোয়েডরা। বাংলার পশ্চিমে ও পূর্বে মাল পাহাড়ী ও নাগাদের মধ্যে এই উপাদান মেলে। এরপরে এসেছে আদি অষ্ট্রিকরা। এরপর পারস্য তুর্কিস্থান থেকে শকেরা এসে উপমহাদেশের দক্ষিন ও পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বাঙ্গালীর রক্তে এদের প্রভাব লক্ষ্যনীয়। তাছাড়া ইন্দোচীন, দক্ষিন পূর্বাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জ ও মায়ানমরের জন গোষ্ঠীর সাথে নানা ভাবে আমাদের রক্তের মিশ্রণ চলেছে। এভাবেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই নানা জাতির সাথে রক্তের মিশ্রণ অব্যাহত ভাবে চলছে। আর এভাবেই আমাদের রক্তের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে তিন মহাদেশ জোড়া বিভিন্ন জন গোষ্ঠীর।
এ প্রসঙ্গে আধুনিক নৃ-বিজ্ঞানীদের মতের ভিত্তিতে অতি সংক্ষিপ্ত একটি বংশগত চিত্র দেখানোর চেষ্টা করবো। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষ তথা বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ একই প্রজাতিভুক্ত। তবে নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রধানত (ক) প্রাকৃতিক নির্বাচন (খ) ভৌগলিক এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (গ) আন্তর্মিলন,এই তিনটি কারনে অব্যাহতভাবে অসংখ্য রকমের নৃ-জাতি রূপের সৃষ্টি হয়ে চলেছে। বর্তমানে পৃথিবীতে ৩২টির বেশী নৃজাতির অস্তিত্ব রয়েছে।

 

ঐতিহাসিক কালেরও বহু আগে থেকেই প্রতœপ্রস্তর যুগ থেকেই এই উপমহাদেশে নানা জনগোষ্ঠীর নানা জন স্রোত এসেছে। আফ্রিকার কালো নিগ্রোয়েড মানুষেরা এসেছে প্রথম। আফ্রিকা থেকে আরব উপকূল হয়ে পারস্য উপকূল বেয়ে তারা এ উপমহাদেশে এসে ত্রƒমে ছড়িয়ে পড়ে।পূর্ব আসামের নাগাদের মধ্যে এই রক্ত ধারার অস্তিত্ব বিদ্যমান। এমনকি তারা আন্দামান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এদের পরে  আসে আদি অষ্ট্রেলীয় বা অষ্ট্রিকরা। তারা আসে প্রতœ প্রস্তর যুগের সংস্কৃতি নিয়ে ।ছড়িয়ে পড়ে আরব- আফগান থেকে অষ্ট্রেলিয়া পলিনেশিয়ায়। অষ্ট্রিক কোন জন গোষ্ঠীর নাম নয়। উপমহাদেশের কোল, মুন্ডা ও নিকোবর দ্বীপবাসীর ভাষা অষ্ঠ্রিক গোষ্ঠীর অর্ন্তভুক্ত। অষ্ট্রিকদের পরে আসে দ্রাবিড়ভাষী লোকেরা। জনতত্ত্বেও বিচরে এরাও অষ্ট্রিক। তারা উপমহাদেশে আসে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে।

বাঙ্গালীর রক্তে দ্রাবিড় জাতির প্রভাবে বেশ শক্তিশালী। তাই দ্রাবিড় জাতি সম্পর্কে যথাসম্ভব  ধারণা আমাদের  আতœপরিচয়ের প্রয়োজনেই জরুরী। অনেক নৃ-বিজ্ঞানী দ্রাবিড় জাতিকে ইন্দোভূমধ্য বৈশিষ্ট্য বেশী বলে ইন্দোভূমধ্য নৃ-গোষ্ঠী ভুক্ত করেন। কিন্তু বর্তমান প্রচলিত মতে দ্রাবিড় নিগ্রোয়েড এবং ইউরেশিয় নৃগোষ্ঠীয় সংযোজী নৃ গোষ্ঠী। এবং ভারত বর্ষেই আগমনের পরে তারা এ বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। পশ্চিম দিক থেকে আগত আরেকটি জন ধারায় সাক্ষাৎ পাওয়া যায় । তাত্ত্বিক ভাষায় যাদের বলা হয় পশ্চিমী চওড়া বা গোলমাথা জনধারা। তাদের আগমন কাল দ্রাবিড়দের আগে না পরে নিশ্চিত হওয়া যায় না। 
প্রাগৈতিহাসিক কালে আর্যভাষী নর্ডিক ও মঙ্গোলরা উপমহাদেশে আসে সবার পরে। তবে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মৌর্য শাসনামলে বাংলায় আর্যরা  এসে এখানে বসবাস  শুরু করে। আমাদের এ পূর্বাঞ্চলে আসতে আসতে তাদের রক্তে স্থানীয় রক্তের মিশ্রণ হয়ে যাওয়ায় বাংগালীর রক্তে নর্ডিক আর্য উপাদান খুবই কম। এর পর এখানে অনেক জাতি এলেও তাদের প্রভাব নৃতাত্ত্বিক বিচারে নগন্য। বাঙ্গালীর নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অর্জনে যে সমস্ত নৃগোষ্ঠীর সম্মিলিত অবদান অত্যনমশ গুরুত্বপূর্ণ তাদের বিষয়ে কিছু বলা দরকার।
পন্ডিতরা মনে করেন বেদে বর্নিত নিষাদরাই দ্রাবিড়। বাঙ্গালীর সব স্তরে এদের রক্ত প্রচুর পরিমানে ছড়িয়ে আছে । এরাই বাঙ্গালীর পূর্বপুরুষÑ দ্রাবিড়-মুন্ডা দীর্ঘমুন্ড জনধারা। সিংহলের ভেড্ডাদেও সাথে মিল থাকায় তাদের  ভেড্ডিডও বলা হয়ে থাকে । এরা ভাষায় অষ্ট্রিক। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও মানসিক গড়নে এদের প্রভাব খুবই গভীর। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এ জনগোষ্ঠীর প্রভাব বেশ স্পষ্ট,বেশী প্রভাব উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিন পূর্বাঞ্চলে। মগ-চাকমাদেও বাদ দিলেও নিম্ন বর্ণের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে এদের প্রভাব প্রচুর । উত্তর-বঙ্গের কোচ ও রাজবংশীদের খাঁটি মঙ্গোলীয় বৈশিষ্ট্য। আলপাইনদের আগমন কাল দ্রাবিড়দের আগে না পরে নিশ্চিত না হওয়া গেলেও বৈদিক আর্যদেরও আগে আলপাইন গোলমুন্ড  এই জনধারার মানুষের এদেশে আগমন।বাংলাদেশের উচ্চ বর্ণের মানুষের মধ্যে এধারার বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায। আর্য ও তৎপরবর্তী বিভিন্ন জাতির আগমন ঘটলেও  ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাদের যত প্রভাবই থাকÑ নৃতাত্ত্বিক প্রভাব অতি নগন্য।আজ বাঙ্গালী দেখলেই চেনা যায়। বাঙ্গালীরা দেখতে সবদিক দিয়েই মাঝারি গোছের। তত লম্বা নয় তত বেঁটে নয়,তত ফর্সা নয় তত কালো নয়, নাক একদম সুউচ্চ নয় আবার চেপ্টাও নয ।  আর্যপূর্ব  বাংলায়  আগত নানা জনধারার মিশ্রনে  সৃষ্ট যে শংকর জাতি, তারাই বাঙ্গালী Ñএই হলো বাঙ্গালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়।  বালায় আর্য ও তৎপরবর্তী সময়ে আগত  বিভিন্ন জাতির সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে কোল, মোন্ডা, সাঁওতাল, নাগা, কুকী. তিব্বতী, কাছাড়­ী, অহোম প্রভৃতি যে আমাদের রক্তের নিকট আত্মীয়  তা আমরা ভুলতে বসেছি...!
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, jsb.shuvo@gmail.com