যুদ্ধাপরাধ বিচার জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন
মুহম্মদ আবু তাহের
এতোদিন পরে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের একটি ট্রাইবুনালের মাধ্যমে ৭১-এর যুদ্ধাপরাধ বিচারের কার্যক্রম যখন একটা পর্যায়ে পৌছতে যাচ্ছে, তখন এযাবৎ যারা নানাভাবে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে চেষ্টা করে আসছিল তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থার মতো একটা মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন করে জল ঘোলা করতে মাঠে নেমেছে; যেহেতু ঘোলা জলে মাছ শিকারই তাদের পেশা। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে যে সরকার-ব্যবস্থা অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে, এবং যখন সংসদে সংবিধান সংশোধনী আকারে একটি বিলের ওপর উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ অবারিত, তখন যুদ্ধাপরাধী-আকীর্ণ ধর্মের ধ্বজাধারী ও আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত মতলববাজ দু’টি দল সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা সত্ত্বেও রাজপথে সরকার পতনের আন্দোলনে নেমেছে। কেন কার স্বার্থে সে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।
নিয়মতান্ত্রিকতায় তাদের ভয়ানক অনীহা, কারণ তারা এযাবৎ প্রতিবার ক্ষমতায় এসেছে সদর দরজা দিয়ে নয়, চোরা খিড়কিপথে হত্যা, সন্ত্রাস,ভোট ডাকাতি ও কালোটাকার বাহনে। যেসমস্ত নির্বাচনে জনমতের স্বচ্ছ প্রতিফলন ঘটেছে বলে সারা বিশ্বের সচেতন মানুষের অভিমত, একটি চিহ্নিত চক্র সেই নির্বাচনকে পাতানো বলে অভিহিত করতে ছাড়েনি। দুই হাজার আট ও ঊনিশশ’ সত্তরের নির্বাচনের কথাই বলছি। নির্বাচনের ফল যাতে কালো টাকা ও পেশীশক্তির হোতারা হাইজ্যাক করতে না পারে সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রেখে চরম নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে দুটো নির্বাচনেই সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন অতি তৎপর। অথচ বি.এন.পি.বলেছে এ দু’টো নির্বাচন নাকি নীল নক্সার এবং আওয়ামী লীগকে ওরাই নাকি ক্ষমতায় বসিয়েছে। এবং কে না জানে আওয়ামী লীগ সামরিক প্রভাব বলয়ের ঘোর বিরোধী বরং বি.এন.পি.-রই জন্ম এক সামরিক একনায়কের ঔরশে !
একাত্তুরের নজীরবিহীন পৈশাচিক বর্বরতার বিচার কার্য প্রায় চল্লিশ বছর পর হচ্ছে যার পদ্ধতিগত প্রস্তুতি নিতেই লেগেছে প্রায় এক বছর । যদি মুক্তিযুদ্ধ সফল না হতো এবং কোনোভাবে ওরা বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রমাণ করতে পারতো তাহলে কি তারা বিচারের স্বচ্ছতার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ বা কোনকিছুর পরোয়া করতো ? একাত্তুরের স্টাইলেই লক্ষ লক্ষ লোককে লাইনে দাঁড় করিয়ে একদিনেই ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা বিশ্ব জনমতকে একফোটা তোয়াক্কাও করতো না। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর এক রাতে আলবদররা যেভাবে বুদ্ধিজীবীদের নিধন করেছে, আরও এক সপ্তাহ সময় পেলে ওরা সারা দেশে সমস্ত প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার বীজ সমূলে উৎপাটিত করে ফেলতো। পচাত্তরেও তো দেখেছি জিয়াউর রহমান তার পথের কাঁটা মুক্তিযুদ্ধে পা-হারানো বীরযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে কেমন একটা প্রহসনের বিচারে রাতারাতি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলেন; যদিও পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ে সে বিচার অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। পরাজিত হয়েও সপরিবারে বঙ্গবন্ধুসহ চার নেতা, আহসানুল্লাহ মাস্টার, এস, এম, কিবরিয়া, আইভি রহমান সহ অসংখ্য দেশপ্রেমিক নেতা, কর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করতে তাদের বুক এতটুকুও কাপেনি, জিতলে যে কী করতো তা কল্পনা করতেও গা শিউরে ওঠে!
আমাদের ভাষা সংস্কৃতি ও শত বর্ষের স্রাম্পদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য ত্রিশ লাখ শহীদ ও পৌনে তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে বাঙালী জাতীয়তাবাদের উত্থান হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীরা তা প্রতিহত করতে সে দিন যেমন তৎপর ছিল আজও তেমনি আছে। বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তানী আদর্শের মানবতাবাদ-বর্জিত উগ্র ধর্মান্ধতাকে চির নির্বাসন দিয়ে জাতি হিসাবে আমাদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সত্তা প্রতিষ্ঠা ও চিরস্থায়ী করনের জন্য যুদ্ধাপরাধীদেও বিচার সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরী।
mdabutaher7@gmail.com