৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৪২ | সাপ্তাহিক  | ২১ জুন ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

বীথির কাছে চিঠি-২৩

লুনা শিরীন

রান্নাঘরে কাজ করছিলাম আর তোর সাথে কথা বলছিলাম, মানে তোকে লেখা চিঠির সাথে । সেদিন একজন আমাকে জিজ্ঞেস করছে,আচ্ছা, বীথিটা কে? সত্যিই কি কেঊ আছে ? নাকি আপনি বানিয়েছেন কাউকে ? আমি কি করে বলি ,তুই জলজ্যান্ত একজন সত্যিকার মানুষ এবং আমার সত্যিকার  বন্ধু । যদিও কয়েকজন অবশ্যই সেটা জানে। যাইহোক , শুরু হয়েছে তিনদিনের ছুটি, ঘরমুখো মানুষ তিনদিনের জন্য বাজার-ঘাট করে বাড়ি ফিরছে।

 এই নর্থ-আমেরিকা এক অদ্ভুত দেশ জানিস , সবাই ঘরে থাকতে ভালোবাসে। কারন এই দেশে কাজ মানে সত্যিকার কাজ, আর তাই ছুটি মানে সত্যিকার ছুটি, সবকিছু থেকে মুক্তি, কাজ আর ঘর সম্পূর্ণ আলাদা জগত,আর সেখানে যদি আমার মতো চাকরির আনন্দ থাকে, তাহলে তো কথাই নেই । কথাটা সবাই কিভাবে নেয় জানিনা কিন্তু আমি বলি সবাইকে,এই দেশে যদি জব স্যাটিসফেকশন এর উপরে জরিপ করা হয়, আমি প্রথম হবো। বাংলাদেশে আমি  চাকরি করেছি সব মিলিয়ে ১০ বছর কিন্তু কানাডায় চাকরি করে যে আরাম পেলাম বা পাচ্ছি তা আর কোন কিছুর সাথেই তুলনা হয় না । আজকে  ডাক্তার এর কাছে যাবার ছিলো তাই ৩  ঘন্টা আগে বেড়িয়েছি , তবুও পথে ভীড়, তোকে আগেই বলেছি বাড়ি  ফেরার পথে আমাকে কমকরে হলেও দেড়-ঘন্টার উপরে  ড্রাইভ করতে হয়,আর সেই সময়টা আমি মানুষের বিচিত্র জীবন নিয়ে ভাবি,ভাবতেই থাকি, আর আমার সব ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু মানুষের সাথে মানুষের জটিল সম্পর্ক জাল। আর সেই সম্পর্কের নানান দিক  ধরেই আমি ভাবতে থাকি,কোথা থেকে শুরু করেছিলাম আর  কোথায় শেষ হবে এই জীবন ? আমার নিজের কাছেই নিজের  বিস্ময় কাটে না বীথি , আমি নিজেই বুঝি না, কি  শুনি এইসব ? আবার ভাবি, কই  ঠিকই তো বলছে সবাই, আমি ও তো জানি এইসবই সত্যি কথা তবুও শুনতে বা মানতে এত অদ্ভুত লাগে কেন ? এই আমরাই তো, এই আমরাই তো এইসব করছি যুগ যুগ ধরে , এই মানুষেরাই তো , কিন্তু সেই সত্য যখনই চোখের সামনে চলে আসে, ধরা পড়ে যায় তাহলেই সব বিপত্তি তাই না বীথী ?

আজকে ফোন করেছিলো,লস এঞ্জেলেস  থেকে একটা মেয়ে,আমার লেখার রেগুলার পাঠক। প্রায় ফোন করে, আমার সাথে কথা হয় দীর্ঘক্ষণ , আর স্বাভাবিক--ভাবেই এমন  কথোপকথন এর ভিতর দিয়েই বেরিয়ে আসে ব্যাক্তি-জীবনের লুকিয়ে থাকা নানান টানাপোড়েন। আমি বিহ্বল হয়ে ভাবতে ভাবতে এক সময় লিখতে বসি , নিজেকে হাল্কা করি  তোর সাথে কথা বলে। মেয়েটি সংসার করছে  আজ প্রায় ১৫ বছর , আমার সাথে পরিচয় এর প্রথম প্রথম বেশ উত্তেজনা ছড়াতো, বলতো না  না লুনা, শোন অনেক দেখেছি, আর না, আমি আর সংসার এর  সাথে নাই, আমি দেশ  ছেড়েছি, এবার বাচ্চা নিয়ে নিজের মতো আরামে থাকবো। আমার স্বামী যা পারে করুক , সেও  ৯/১০ মাস আগের কথা । আস্তে আস্তে , মেয়েটা থিতু হতে থাকে, সুর নরম হতে থাকে, আমিও বলি, কি লাভ একা হবার? যদি থাকতে পারিস থেকে যা, একা জীবন বহন করাও কিন্তু কম কষ্টের না। যাক এভাবেই চলতে থাকে, মেয়েটা বেশ বেশ ম্যাচিউর ,অনেক সময় আমার মনে হয় , আহহহ – এভাবে তো আমি ভাবিনি, মেয়েটার একটা ভালো বন্ধুও আছে, যার সাথে , খুব বুঝে সুনে মেয়েটি মেশে, আবেগে জড়িয়ে পরে না, আমাকে বলে, লুনা তুমি তো বোকা, ভীষন বোকা মেয়ে তুমি, সব কিছু নিজের করে চাও কেন ? ওটা  হলেই তো  বিপদ বাড়ে ,  শান্তি চলে যায় , যে কোন  সম্পর্ক রাখতে হয়  হিসেবের বাইরে, তুমি বোঝ না কেন ? রিমি বলতে থাকে, জানো—লুনা ছোটবেলা থেকে আমরা একজন মহিলাকে ফুপু ডাকতাম, অনেক পরে জেনেছি ওই মহিলা আমার বাবার বিশেষ প্রিয় মানুষ, আমার মায়ের-ও একজন বিশেষ মানুষ আছেন জানো, আর আমার বোন –বা বোন জামাই , কার কথা বললে তুমি বিশ্বাস করবে  বলো ?  সবার , সবার একজন করে আলাদা মানুষ আছে,এভাবেই  মানুষ বাচে জানো । শুধু তুমি দেখি স্বপ্নের ঘোরে বাস করো, এটা ক্যামন কথা লুনা ? তুমি বুঝতে চাও না কেন ? কামনা / বাসনার মানুষ আর ঘর-সংসার করার মানুষ এক না । দুইটা দুই হিসাব , জানো আরো রগরগে কথা বলতে পারি তোমাকে, তুমি আবার লিখতে বোসো না যেনো ।আমার স্বামীর পক্ষের দুই সুন্দরী মামীশাশুড়ি  আছেন, অসম্বভ সুন্দর ওই দুজন মামী, ওই দুই মামীর সাথেই তাদের খালাতো ভাইদের রিলেশন, দীর্ঘদিনের রিলেশন ।

 জানিস বীথি, আমি আর আগাই না, আমার ভালো লাগে না,আমি জানি সব কথাগুলো সত্য কিন্তু এই মুখোশ-ধারী জীবন আমি যাপন  করতে  চাই না বলেই  একদিন সংসার ছেড়েছিলাম, আমিও জেনেছিলাম ও বিশ্বাস করেছিলাম সংসারের  চক্রের ভিতরে অনেক অনেক চোরা-বালি থাকে, আমরা সেই চোরা-স্রোতেই জীবন পাড় করি । কিন্তু সত্য কি জানিস , সেটা হয়তো বাংলাদেশ , বা  একান্তই আমাদের কালচার, বা  পৃথিবীর সব দেশের মানুষের ভিতরেই এই দ্বিমুখী রূপ আছে, আমার ভিতরেও আছে, কিন্তু আজকে আমি এমন –একটা বয়সে বা সময়ে এসে  পৌঁছেছি , আমি এখন মন থেকে বিশ্বাস করি, গোজামিল দিয়ে জীবন চালানো যায় কিন্তু সুখী হওয়া অসম্ভব , আমি সবাইকে ফাকি দিতে পারি কিন্তু নিজেকে ? হিসেব করে অনেক  কিছু আমি নিশ্চয়ই পাবো, টাকা /বাড়ি/ গাড়ি / স্বামী / সব কিছুই হিসেব করে পাবো , কিন্তু সৎ সুখ ? বা নিজের কাছে বড় হয়ে বাচা  ? সেটা কি  হিসেব করে হয়েছে কোনদিন ? আমি এমন একটা দেশে আছি বীথি ,এখানে জোর করে কাঊকে কিছু করতে হয় না, এখানে সমজ তুই-ই , তুই তোর মতো বাচবি, কেউ জোর করে তোকে কিছু করতে পারবে না, যদি তোর সায় না  থাকে, বাংলাদেশে এভাবে বাচা কঠিন সেটা আমি নিজেই দেখে এসছি । আমি অনেক অনেক পথ হেঁটেছি বীথি, তুই জানিস সেটা, জীবনের নোংরামী আমার ও কাছে থেকে দেখা আছে, পোড়া দাগ দগদগে হয়ে লেগে আছে বুকের মাঝখানে, কিন্তু আর না বীথি। আর কোন আপোষ না , নিখাদ / নিরেট  তৃপ্তি চাই , যা চাই  সবটুকু চাই , না পেলে না পাবো , কিন্তু এই সবটুকু আবেগ  চাওয়ার ও দেবার  জায়গায়  আর কোন আপোষ না।   হয়তো হবে, নইলে না। কিন্তু হাল ছেড়ে নিজের কাছে অপরাধী হয়ে বাচবো কেন বল ? আমি যা মানি আমি তাই চাইবো , যা মানি না, যা দিনের আলোর মতো জ্বলজ্বলে না সেই অন্ধ – গলিতে কেন হেটে যাবো ? আমার সিডি- তে আজকে সুনছিলাম  সেই প্রিয় গান --- আমি আজ আকাশের মতো একেলা,আমার খুব প্রিয় একটা গান। লম্বা ছুটি , এর ভিতরেই একদিন তোকে ফোন দেবো , কথা বলবো , ক্যামন ? আদর ।

লুনা , ১৭/০৪/২০১৪

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration