৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৩৪ | সাপ্তাহিক  | ২৬ এপ্রিল ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

বীথির কাছে চিঠি-১৫

লুনা শিরীন

বীথি, বিকেল পৌণে ৬টার দিকে হবে, বাইরে উজ্জল দিনের আলো, গত চিঠিতে লিখেছি তোকে,  এই শহরে আস্তে আস্তে দিনের আলো বাড়বে, মাত্র  কয়েকদিনের ভিতরেই  দেখতে পাবো উজ্জল  এপ্রিল / মে  মাস চলে আসছে। আজকে অফিস থেকে ফেরার সময় আমি আর একটা বেটে মোটা মতো সাদা মেয়ে একসাথে  লিফটে উঠলাম, মেয়েটির হাতে লেটার বক্স থেকে নেয়া  চিঠি , আমার হাতেও তাই । মেয়েটি আমার ফ্লোর  নাম্বার  জিজ্ঞেস করে আমার দিকে তাকিয়ে  একটু হাসলো, বললাম, আমাদের দু-জনের হাতেই বিল , শুধুই  বিলস । মেয়েটি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল – জানো সময় সময় ভাবি, কেউ চিঠি লিখবে, স্বার্থহীন চিঠি – জানতে চাইবে , ক্যামন আছি ? কিন্তু সেটা কখনই হয়না , বলেই মেয়েটা আবার হাসে। ততক্ষণে আমার ফ্লোর এসে গেছে, আমি নেমে যাবার আগে  বললাম, ইউ মেইড মাই ডে ।

 বিশ্বাস কর বীথি – এই যে তোকে লিখতে বসেছি, এখন রাত  সোয়া আটটা বাজে, কাল অফিস আছে,  ভোর ৪/৫ টায় ঘুম ভেঙ্গে যায় , বেডে যাই নয়টার ভিতরে , অফিস থেকে ফিরেই নামাজ  পড়ি , আবার ভাবিস না যে , নামাজ পরি মানেই আমি একদম ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করি, বরং আমি নামাজ পড়ি-- না বুঝে , কি সুরা বলছি, আল্লাহকে কি বলছি কিছুই  বুঝি না , কিন্তু নামাজ পরলে আমার মানসিক প্রশান্তি আসে, তাই পড়ি।  এরপর নাইয়ার সাথে কথা বলতে বলতে পরের দিনের জন্য তৈরি হই, কি কাপড় পরবো, কাল  অফিসে কি কি  ব্যাস্ততা আছে, কি কি মিটিং আছে , ওয়েদার ক্যামন এসব এর সাথে মিলিয়ে ড্রেস রেডি করি, আমার প্রিয় জায়গা  রান্না ঘর সেখানে দাড়িয়ে , নাইয়ার আমার রাতের  খাবার বারি, সারা   সপ্তাহের খাবার শনি / রবিবারেই রেডি করে   ফ্রীজে রাখা হয় তাই সপ্তাহের অন্যদিন  চুলা ধরানো হয় না—ঠিক এই নিয়মে জীবন চলছে গত ৫ বছর ।

 যত বেশী দিন যাচ্ছে তত  যেন নিয়মের কাছে জীবন  বাধা পরে যাচ্ছে , কিন্ত তবুও তো মানুষ আমরা সবাই তাই না বীথী ? এই চিথি সুরু করার আগে তোকে বলছিলাম , আমাদের সব বন্ধুদের জীবন লিখবো , বিশেষ করে মেয়েদের জীবন , কিন্তু বীথি, নিজের জীবনের কোন  কুল/ কিনারা যে পাই না এখনো ? কেন লিফটের ওই মেয়েটার কথা এমন প্রবল-ভাবে বুকের ভিতরে বাজলো যে আমি তোকে এই অসময়ে লিখতে বসে গেলাম ? আমার কি কারো চিঠি পাবার কথা ছিলো , স্বার্থহীন চিঠি ? আমি ও কি কোনদিন স্বপ্ন দেখতাম --  নিঃস্বার্থভাবে কেউ জানতে চাইবে ক্যামন আছো লুনা ? আমি  দেখেছিলাম এমন স্বপ্ন কোনদিন ?

 জানিস বীথি , আমার নতুন হোনডা সাদা  গাড়িতে সিডি প্লেয়ারটা বেশ ভালো—বেশ সুন্দর পরিস্কার সাউন্ড আসে, ভোর ৫ টায় যখন বাবুকে তালা দিয়ে অন্ধকারের বুক চীরে আমি ১২৫/৩০ মাইল স্পীডে হাইওয়ে  দাবড়ে টরোন্টো ছেড়ে ব্রামটনের দিকে যেতে থাকি, তখন গান  হয় আমার প্রানের সঙ্গী – গত ৪/৫ দিন হলো শুনছি  নজরুল গীতি – মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেবো খোপায় তারার ফুল , জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা মরনে কেন তারে দিতে এলে ফুল , গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় ,  মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম – এই সব গান শুনতে  শুনতে আমি  হঠাত্ত বুঝতে পারি – আমি অনেক জোরে গাড়ি চালাচ্ছি , আমার চোখ ঝপসা হচ্ছে, এক মুহুর্তে অসাবধানে অনেক বড় বিপদ হবে, ঘরে ঘুমন্ত ছেলে , আমি দ্রুত হাতে চোখ মুছে ফেলি , কান্না,র বিলাসিতা আমার না , বুঝতে পারি এটা বাস্তব , কঠিন জীবন , বাস্তবে কেউ ফুল নিয়ে আসেনি,  বাস্তবে  আমরা এই মানুষরা ডলারের হিসেব করেছি, নির্মম ভাবে সেই হিসেবে আমি মার খেয়ে ফিরে এসছি বীথি, আমার সঙ্গী হয়েছে আমার অন্ধ আবেগ । একসময় এসব ভাবতে ভাবতেই  পৌছে যাই জীমে, ট্রেড মিলের স্পীড বাড়িয়ে দিতে দিতে ভাবি—আরো একটা দিন শুরু হবে আজ। আদর তোকে বিথি ।

১৮/ ০৩/২০১৪

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration