কাদের নিয়ে গঠিত হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ?
নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকার ইস্যুতে দুই জোটের আলোচনার সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে। কেননা জনাব শেখ হাসিনাসহ মহাজোটের নেতারা বারবার বলেছেন, তত্ত্বাবদায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের কোন পরিকল্পনা সরকারের নেই। আমরা ২০০৭-৮ সালের মতো পরিস্থিতিতে কোনমতেই ফিরে যেতে চাই না। নির্বাচনকালীন প্রয়োজনে থাকতে পারে সর্বদলীয় সরকার। বিরোধী জোটও আগের মতোই বলছেন, তত্ত্বাবদায়ক সরকারের অধীনেই হতে হবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই ইস্যুতেই হতে হবে আলোচনা। আসলে এই ইস্যুটি এখন উভয় জোটের জন্যই মনে হয় বেটিং। তারা ভাবছেন তত্ত্বাবদায়ক নামক এই বেটিং ইস্যুতে পিছিয়ে গেলে পরবর্তীতে নির্বাচন নামক ফিল্ডিংয়েও জিতার সম্ভাবনা কমে যাবে। তাই এই তত্ত্বাবদায়ক ইস্যুতে হারতে চাচ্ছেন না কেউ। এমতাবস্থায় নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকার পুনপ্রর্বতনের দাবিতে বিরোধী জোটের চলমান আন্দোল যতটা জোরদার হবার সম্ভাবনা ছিলো ততটা হচ্ছে না। এর নানাবিদ কারণের মধ্যে সরকারি দমন-পীড়ণ ও বিরোধী জোটের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং তাদের রাজনৈতি অবস্থান উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে যোদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে তাদের অন্তরে বাহিরে দ্বৈত অবস্থান নিজেদের প্রগতিশীল নেতা-কর্মী-সমর্থ এবং জনসাধারণের কাছে পরিস্কার হয়ে যাওয়ার কারণে তারা এখন আগের তুলনায় অনেকটাই শুভশক্তি হীন বলে মনে করেন অনেকেই। সাম্প্রতিক হরতাল জনিত নাশকতাও বিরোধী জোটে অপশক্তি বা বহিশক্তির সত্রিয়তারই প্রমান। এই অপশক্তি/বহিশক্তির অপকর্মের দায়ভার নেতাদের ঘাড়ে চাপার কারণে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনপ্রবর্তনের দাবিতে শুভ শক্তির সমন্বয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন জোরদার করার সুযোগ ও পরিবেশ এখন আর নেই বললেই চলে। তদুপরি গণজাগরণ আন্দোলন এবং হেফাজত আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গের বিরোধীতা বা সমর্থন- অংশগ্রহণের ফলে এদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষের বিশেষ করে গণ্যমান্যদের আসল চেহারা এখন সবার কাছেই পরিস্কার। কেউ রাজনীতিতে সক্রিয় থাকুক বা না-ই থাকুক তাদের অবস্থান এখন আর অস্পষ্ট নেই। এমন কি, যে ইমাম সাহেবের পিছনে নামাজ আদায় করছেন মুসলমানগণ সেই ইমাম সাহেব কোন্ মার্কয় ভোট দিতেন বা দিবেন তা জানাছিলো না এতোদিন। এখন তা-ও পরিস্কার সবার কাছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশী বিদেশী কোন চাপের কারণে বা সদিচ্ছা জাগ্রত হবার ফলে যদি ক্ষমতাশীন মহাজোট সরকার নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনপ্রবর্তন করে, তাহলে কী বর্তমান রাজনৈতি অস্থিরতা কেটে যাবে না কি আরো বেড়ে যাবে? প্রথমত, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকার গঠন করার জন্য সকল দলের বিশেষ করে পুরাতন দুই জোট এবং সাম্প্রতিক আর্বিভূত দুই শক্তির সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ মানুষ বাছাই বা নির্বাচন করা অসম্ভব। কারণ বর্তমানে এদেশে এমন দু’একজন বিচারপতি, ব্যারিস্টার, এডভোকেট, সম্পাদক, সাংবাদিক, ভিসি, অধ্যক্ষ, হেডস্যার, শিক্ষক, শিল্পপতি, শিল্পী-সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, এনজিও প্রধান, সচিব, আমলা, ইমাম, হুজুর, মোয়াজ্জিন খোঁজে পাওয়া যাবে না যাদেরকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকারের প্রধান বা সদস্য হিসেবে সবাই সাদরে মেনে নিবে। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসকেওতো মেনে নিবে না সব দল! বিরোধী দলীয় নেতার কথামতে বলতে হয় পাগল আর শিশু ব্যতীত কেউ নিরপেক্ষ নেই। আসলে সত্য পক্ষইতো নিরপেক্ষ। এমন মানুষতো থাকতে হবে এবং আছে যিনি সত্য পক্ষ অবলম্বন করবেন তাঁর প্রতিটি কথায় ও কাজে। কিন্তু বর্তমান রাজনীতির ময়দানে তাঁরা আসবেন না এবং তাঁদেরকে আনাও হবে না। এই রাজনীতির ময়দানে নিরপেক্ষ হিসেবে হয়ত স্থান পাবে এমন জন, যাদের দৃষ্টিতে সত্য-মিথ্যার মিশ্রনই সত্য বা সঠিক। যেমন: একজন বললেন- ‘তিনে দু’য়ে পাঁচ’। আরেকজন বললেন- ‘না, তিন দু’গুণে ছয়’। অন্য একজন (তথাকথিত নিরপেক্ষ) এসে বললেন- ‘তোমাদের কারোরটাই সঠিক নয়; তিনে দু’য়ে মিলে সাড়ে পাঁচই হয়’। এমন বর্ণচোরা নিরপেক্ষ কিংবা পাগল/শিশু দিয়েতো আর সরকার গঠন করা চলবে না। যারা দু’পক্ষকেই খুশি রাখার অসৎউদ্দেশে বলে থাকেন- ‘তিনে দু’য়ে মিলে সাড়ে পাঁচই হয়’ সেইসব নিরপেক্ষরা(?) আসলে কি সত্য পক্ষ? তাদের নিয়ে কি গঠন করা সম্ভব নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¡াবধায়ক সরকার? যারা বিভিন্ন ফরমুলা আবিষ্কার করছেন তারা কি দিতে পারবেন এমন দশজন মানুষের একটি তালিকা যে দশজনকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¡াবদায়ক সরকারের প্রধান ও সদস্য হিসেবে মেনে নিবে বিবাদমান রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ? অথবা এমন দশজন মানুষ কি আছেন যারা এই আস্থা নিয়ে প্রকাশ করবেন নিজেদের নাম যে, আমাদেরকে সাদরে নিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¡বাবধায় সরকার গঠন করতে সম্মত হবে সকল রাজনৈক ও অরাজনৈতি দল এবং জোট? যদি তা না হয় তো সংবিধান পুনঃ সংশোধন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃ প্রবর্তন করা কি আরো বিপদজনক নয় দেশ ও জাতির জন্য? আমরা যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন মিডিয়াতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃ প্রবর্তনের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করি তাদের উচিৎ হবে, আগে নির্দদলীয় নিরপেক্ষ এবং সকল দল ও জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য মানুষ বাছাই করা, তারপর সেই তত্ত্বাবদায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃ প্রবর্তনের কথা বলা। অন্যথায় কোন না কোন ভাবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবদায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃ প্রবর্তন করা সম্ভব হলেও; দেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেইরূপ সরকার গঠন করা মোটেও সম্ভব হবে না! [ মো. রহমত উল্লাহ্ - শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট। Email: md.rahamotullah52@gmail.com ]
| পাঠকের মন্তব্য |