৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৪৯ | সাপ্তাহিক  | ১৬ আগস্ট ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

শোক দিবসে জঙ্গি-থাবায় উদ্ভুত উপলব্ধি

ফেরদৌস আরেফীন

১৫ আগস্ট ২০১৭, মঙ্গলবার, সকাল ৬ টা ৩৩ মিনিটে, জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর একে একে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যাক্তিবর্গ সেখানে শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সেখানে পৌঁছনোর মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টা আগে রাত ৩ টার দিকে, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে মাত্র ৪০০ মিটার দুরত্বে এবং মাত্র ৪ মিনিটের হাঁটাপথের ফারাকে, পান্থপথের ‘ওলিও গ্রিন হ্যাভেন’ নামের একটি আবাসিক হোটেলের চতুর্থ তলায় ৩০১ নম্বর কক্ষে শক্তিশালী বোমাসহ একজন জঙ্গি অবস্থান করছে বলে নিশ্চিত হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই হোটেলটি ঘিরে ফেলে। প্রায় ৭ ঘন্টা ধরে ঘিরে রাখার পর, বেলা পৌনে দশটার দিকে ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ নামের ৪৫  মিনিটের অভিযান যৌথভাবে শুরু করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও সোয়াট টিম। অভিযান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই হোটেলে অবস্থানরত ওই জঙ্গি বিকট শব্দে তার সঙ্গে থাকা শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়, যাতে ওই জঙ্গি নিজে নিহত হয়, একজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয় এবং হোটেলের দেয়ালের একটি বড় অংশ ধসে সামনের রাস্তায় পড়ে যায়। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, নিহত ওই জঙ্গির নাম সাইফুল ইসলাম, সে খুলনা বিএল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র এবং তার গ্রামের বাড়ি খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের নবাটি গ্রামে। সাইফুলের বাবা স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। বিএল কলেজে ভর্তির আগে জঙ্গি সাইফুল মাদ্রাসায় পড়ালেখা করতো এবং সে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলো বলেও জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ আরও নিশ্চিত করেছে যে, চলতি আগস্ট মাসের ৭ তারিখে বাবা-মাকে চাকরি সম্পর্কিত কাজের কথা বলে ঢাকা আসে সাইফুল। তবে সে কোন জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত, তা নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

পান্থপথে অবস্থিত স্কয়ার, শমরিতা ও বিআরবি হাসপাতালে ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের সঙ্গী তাদের পরিবারের সদস্যদের অস্থায়ী থাকার জায়গা হিসেবে ‘ওলিও গ্রিন হ্যাভেন’ নামের এই হোটেলটি বেশ পরিচিত।  অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ৩২ নম্বরের খুব কাছাকাছি এরকম একটি আবাসিক হোটেলে শক্তিশালী বিস্ফোরকসহ ওঁত পেতে থাকা এই জঙ্গিটিকে ঘিরে ফেলতে আর মাত্র ৩/৪ ঘন্টা দেরি হয়ে গেলে কী ধরনের নাশকতা ঘটে যেতে পারতো, তা কল্পনা করতে গিয়ে আমার গা বারবার শিউরে উঠেছে। রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী অবধি পৌঁছুতে না পারলেও, সেই জঙ্গি যদি ৩২ নম্বরমূখী কোনো একটি মিছিলের ওপর ওই ভয়াবহ বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলতে পারতো, হয়তো আবারো ১৫ আগস্ট কিংবা ২১ আগস্ট অথবা রমনা বটমূলের মতো আরো একটি রক্তের নদী দেখতে হতো আমাদের।

 

জরুরি বিষয় হলো এই যে, এবারের এই লোমহর্ষক ঘটনাটি একইসঙ্গে বেশ কয়েকটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি এনে দিয়েছে আমাদের সামনে। প্রথমতঃ এসব উগ্র জঙ্গিরা একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধী এবং পঁচাত্তরের খুনীদেরই বংশধর এবং সেই চক্রের অসমাপ্ত কাজেই তারা নিয়জিত। দ্বিতীয়তঃ এতদিন ঢাকা থেকে বেশ দূরের বিভিন্ন জেলাশহর ও গ্রামাঞ্চলে  জঙ্গি আস্তানার খবর পাওয়া গেলেও, এবার জঙ্গিরা  সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে খোদ রাজধানীর একেবারে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে, যার মাধ্যমে এদের নিয়মিত সাংগঠনিক তৎপরতা ও চরম বেপরোয়া মনোবৃত্তির পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তৃতীয়তঃ জঙ্গিরা এবার যত্রতত্র এলোপাতাড়ি বোমাবাজি থেকে সরে এসে আবারও ২০০১ সালের সেই রমনা বটমূলের বোমা হামলা স্টাইলে বাঙালির আবেগময় দিবস ও জনসমাগম টার্গেট করে সুপরিকল্পিত হামলায় মনোনিবেশ করেছে। চতুর্থতঃ সরকারের প্রাণপণ চেষ্টা ও অসংখ্য বহুমুখী উদ্যোগের পরও, সার্বিকভাবে জঙ্গিবাদী তৎপরতায় মদদ ও অর্থায়ন বন্ধ না হয়ে উপরন্তু বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আগের তুলনায় এসব মদদ বেশ গোছানোও হয়েছে। পঞ্চমতঃ আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় শেষ মুহূর্তে এরকম একটি ভয়াবহ তৎপরতা রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে -যা মোটা দাগে এদের সাফল্য বলে মনে করা হলেও প্রকৃত বাস্তবতার বিচারে `কানের একদম পাশ দিয়ে গুলি চলে যাওয়া`র মতোই চরম ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রতিরোধ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করতে হচ্ছে; যে প্রতিরোধটি আর অল্প কয়েক ঘন্টা দেরিতে হলেই আরেকটি রমনা বটমূল অথবা ২১ আগস্ট ধরনের ম্যাসাকার ঘটে যেতে পারতো এবং সেক্ষেত্রে আবারও অনেক রক্ত আর লাশের ওপর দিয়ে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর খাতায় তাদের অগণিত ব্যর্থতার সঙ্গে আরো একটি নতুন ব্যর্থতার গল্প যোগ হতো। আর সবশেষ উপলব্ধিটি হলো, দীর্ঘ ৪৬ বছর পর "প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো" -বঙ্গবন্ধুর সেই উদাত্ত আহ্বানটি আজ আবারও নতুন করে আমাদের চেতনায়  জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ানোর জন্য আত্মসত্বা থেকে নিঃসৃত একটি আত্মতাড়া হয়ে জেগে উঠলো।

 

পঁচাত্তরের শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে এবং একাত্তরের চেতনার উদ্বুদ্ধ হয়ে, আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, হাতে হাত মিলিয়ে, আমাদের সর্বশক্তি নিয়ে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তেই রুখে দাঁড়াতে হবে। আর সামান্য দেরি করলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের এতদিনের সব সংগ্রাম-ত্যাগ-প্রয়াস একদম  বিফলে চলে যেতে পারে, জাতি আবারও নিমজ্জিত হয়ে যেতে পারে পঁচাত্তরের মতো সেই বিভীষিকাময় আতঙ্কে আর হতাশায়। জঙ্গিবাদের কালো থাবায়  আর যেন একটি প্রাণও ঝরে না যায় -এটাই হোক আমাদের একমাত্র চ্যালেঞ্জ।

 

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration