ফজলুল হক খোন্দকার: একজন আদর্শ রাজনীতিকের প্রতিকৃতি
ড. আবদুল হাই সিদ্দিক(ফজলুল হক খোন্দকার ১৯২৬ সালের ৩ জুলাই নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বাহেরচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী ছিলেন। ২০১২ সালের ১৯ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।)
সত্যিকারের একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন ফজলুল হক খোন্দকার। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন গণমানুষের নেতা, কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের আপনজন। এক কথায় বলতে গেলে, তিনি ছিলেন সৎ ও আদর্শবান রাজনীতিকের প্রতিকৃতি। তাঁর গোটা জীবনটি ছিল ত্যাগের–ভোগের নয়। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর কর্মজীবনটি অতিবাহিত করেন। আজীবন মানুষকে ভালোবেসেছেন হৃদয় দিয়ে। জনগণের শ্রদ্ধা-ভালোবাসাও পেয়েছেন বিপুলভাবে। মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য ছিলেন না, কিন্তু তাঁর স্থান ছিল সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ের গভীরে। বটবৃক্ষের মত সুশীতল ছায়া হয়ে ছিলেন সবার মাথার ওপর। সেখানে ধর্ম-বর্ণ কিংবা দল-মতের বাছ-বিচার করেননি কখনও। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে তিনি ছিলেন রায়পুরার রাজনৈতিক অঙ্গনের বাতিঘর। বরেণ্য এই রাজনীতিবিদ নেহায়েত একজন ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন একটি ইনস্টিটিউশন।
পঁচাশি বছরের জীবন। তাঁর গোটা জীবনটি কেটেছে মহৎ কর্মের মধ্য দিয়ে। গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। ষাটের দশকে আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। গড়ে তুলেছেন কৃষক সংগঠন, যার শেকড় প্রোথিত ছিল সারাদেশে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব প্রদানে ছিল তাঁর অগ্রণী ভূমিকা। নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন সামাজিক আন্দোলনেও। শিক্ষা বিস্তার, সমাজ সংস্কার, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ রক্ষাসহ নানারকম সামাজিক আন্দোলনে বরাবরই ছিলেন অগ্রনায়কের ভূমিকায়। জাতীয় জীবনে যে কোন দুর্যোগে সবসময়ই ছিলেন জনতার পাশে। আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন এই মহৎ মানুষটি।
জননেতা ফজলুল হক খোন্দকার ছিলেন সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক। মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আজীবন কাজ করে গেছেন। দেশ ও জনগণের কল্যাণ করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ন্যাপ করেছেন। এক পর্যায়ে গড়ে তুলেছিলেন নতুন রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রী পার্টি। ছিলেন নীতিনির্ধারকের ভূমিকায়। জীবনের শেষ বেলায় প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন দল গণফোরামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। যখন যে দলের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না কেন নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে কোনদিন তিনি আপোষ করেননি। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিপক্ষ ছিল বটে, কেউ তাঁর শত্রু ছিল না। তিনি নিজেও কাউকে শত্রু মনে করেন নি; অন্য মানুষও কেউ তাঁকে শত্রু ভাবেন নি। বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর এক বিশাল ভক্তগোষ্ঠী। তিনি কোন্ রাজনৈতিক দলে আছেন কিংবা নতুন কোন্ রাজনৈতিক দলে গেছেন – সেটি তাঁদের কাছে কোন বিবেচ্য বিষয় ছিল না। তারা সবসময় তাদের ‘খোন্দকার স্যার’ এর সঙ্গেই ছিলেন। এমন বিরল আস্থা , বিশ্বাস ও ভালোবাসার অটুট বন্ধন তিনি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। নিজের যোগ্যতাবলেই রায়পুরা ও আশপাশের অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি অভিভাবকের স্থান করে নিয়েছিলেন। মানুষের হৃদয়ে এভাবে স্থান করে নেওয়ার সৌভাগ্য অনেক রাজনীতিকের ভাগ্যেই ঘটে না। যেসব রাজনীতিক মানুষকে ভালোবাসতে পারেননি, তারাও মানুষের ভালোবাসা পাননি। আদর্শহীন ও লুটেরা রাজনীতিক যারা তারা বিত্ত-বৈভবের মালিক হতে পারেন; কিন্তু তারা কখনও মানুষের হৃদয়ে জায়গা পাননি, পাবেন না। তারা হারিয়ে গেছেন কিংবা হারিয়ে যাবেন। কিন্তু ফজলুল হক খোন্দকার চিরদিন বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে। কারণ, তিনি ছিলেন মাটি ও মানুষের নেতা।
.........................................................................................................................................
ড. আবদুল হাই সিদ্দিক: অ্যাডভাইজার নিউজ, বাংলাভিশন এবং
সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পি আই বি)।
| পাঠকের মন্তব্য |