৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৪৬ | সাপ্তাহিক  | ১৯ জুলাই ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

আরশিতে দেখা কলমে লেখা-১২/ ক্যাথরিণঃ গ্রীস্মকালীন বন্ধু

সাজ্জাদ আলী

ক্যাথির সাথে প্রথম দেখা সেই ২০১২ সালে। গ্রীস্মকালের রবিবারগুলোতে ভোরের আবহাওয়া এবং তাপমাত্রা ভাল থাকলেই হাঁটতে বেরিয়ে পড়ি। তো সে বছর এক ভোরে হাঁটছিলাম টরন্টো’র বিখ্যাত এডওয়ার্ড গার্ডেনের একেবারে ভেতরের দিকটায়। ইচ্ছা করেই বাগানের পাহাড়ি অংশের উঁচুনিচু পথ দিয়ে উঠানামা করছিলাম। চারিদিকটা একেবারেই শান্ত ও নিরিবিলি। হাঁটার পথের দুধারের বনোফুলগুলোকে যেন ওদের মতো করেই বাড়তে দেওয়া হয়েছে। শত রকমের নাম না জানা সব ফুল, গন্ধ নেই কারোরই তবে বর্ণচ্ছটা আছে।

 

ক্লান্তি কাটাতে এক সময় পথের পাশেই ফেলে রাখা বিশালাকার লাল রংয়ের একটা পাথর খন্ডের উপরে বসে পড়লাম। দেখি দুপাশের বনোফুলের উপরে পতঙ্গরা বসছে আর উড়ছে। দুএকটাকে মধুর মাছি বলেও মনে হলো। ঘাড়ে ঝোলানো ক্যামেরাটি হাতে নিয়ে ফুলের উপরে বসে মধু আহরণরত পোকার ক্লোজআপ ছবি তোলার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু প্রতিটি ছবিই ঘোলাটে হচ্ছিলো। ক্যামেরা অপারেশনটি আমি আর রপ্ত করতে পারলাম না। ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে ফুলের উপরে বসা হলদে রংয়ের একটি ফড়িংকে ক্লোজ করে ফোকাস রিং ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছবিটিকে পরিস্কার করার কসরত করছি, এমন সময় পেছন থেকে সুমিষ্ট নারি কন্ঠস্বর! মে আই সিট?

 

নারী কন্ঠে চিত্ত তরঙ্গিত হলো! ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালাম। দেখি ৩৫/৪০ বছরের এক তন্বী দাঁড়িয়ে। কৃশকায়, কিন্তু দেখতে সে অতীব মনোরম। পরনে হাফ প্যান্ট, গায়ে ঢিলেঢালা হাতাকাটা গেঞ্জি। পায়ের সাদা রংয়ের রানিং সু তাঁর ধবধবে সাদা ঊরুর সাথে মিলেমিশে একাকার। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘামে সকালের রোদটি পড়ায় মুখশ্রী যেন শতগুণ বেড়েছে। সহস্র বনোফুলের মধ্যে যেন আরো একটি অচেনা ফুল সে! আবারো জিজ্ঞাসা করলো, “মে আই সিট বিসাইড ইউ?” ততক্ষণে আমার ঘোর কেটেছে। বললাম হা নিশ্চয়ই বসো বসো। বসেই হাতখানা বাড়িয়ে বললো, আমার নাম ক্যাথরিণ, ক্যাথি! তুমি?

 

ওর হাতে হাত মিলিয়ে আমার নাম বললাম। তুলতুলে হাতখানা, অনিচ্ছায় ছাড়তে হলো। পিঠে ঝোলানো ব্যাগ থেকে টিসু পেপার বের করে মুখ ও ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে জিজ্ঞাসা করলো, এখানটায় বুঝি নিয়মিত হাঁটতে আসো? বললাম, হাঁটি নিয়ম করেই, তবে এক জায়গায় দ্বিতীয়বার আসি না। ডাগর চোখদুটো বড় করে বললো, তার মানে কি, একটু বুঝিয়ে বলোতো? বললাম, আমি প্রতি রবিবার ভোরে হাঁটতে বের হই বটে, তবে একেক দিন একক জায়গায়। যেমন আজ এখানে, পরের রবিবার অন্য কোন ওয়াকিং ট্রেইলে হাঁটবো।

 

কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থেকে জানতে চাইলো, হাঁটার জায়গা পাল্টাও কেন? বললাম, কি জানো ক্যাথি প্রতিটি ওয়াকিং ট্রেইলে ভৌগলিক অবস্থানগত তফাৎ আছে, গাছপালার রকম আলাদা, পাখির কিচিরমিচিরও ভিন্ন, কোনটায় বা নদী/লেকের পাড় ঘেঁষে হাঁটার পথ! জায়গা পাল্টিয়ে পাল্টিয়ে আমি এই বৈচিত্রগুলো উপভোগ করি। এক মনে ক্যাথি শুনছিলো আমার কথা। এবার বলে উঠলো, সামনের রবিবারে কোথায় যাবে ঠিক করেছো কি? মোটামুটি ঠিক, বললাম আমি। সেদিন যাবো ওকভিল সিটির মরিসন ক্রিক ট্রেইলে।

 

মুহুর্তেই ক্যাথি যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল! খানিক বাদে বললো, হা আমার হাসবেন্ডের কাছে শুনেছিলাম মরিসন ক্রিকের নৈসর্গীক সৌন্দর্য নাকি অপরূপ! আমাকে সেখানটায় সে নিয়ে যেতেও চেয়েছিলো! কিন্তু তা আর হলো কই! বললাম, একদিন তাহলে যেও, ঘুরে এসো। সে বললো আমি তো ড্রাইভ করি না, আর পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশনে ওখানটায় শুধু যেতে আসতেই ৫/৬ ঘন্টা সময় দরকার। তার উপরে ট্রেইলটা হেঁটে দেখতে আরো ঘন্টা দুই। পুরোটা দিন মেয়েটাকে বাড়িতে একা রেখে বাইরে থাকা সম্ভব না। দুপুরের মধ্যে ফিরতে পারলে যাওয়া যেত।

 

তোমার স্বামী নিশ্চয়ই ড্রাইভ করেন? বললাম আমি। মাথা নিচু করে ক্যাথি বললো, ড্রাইভ করতে যেয়েইতো সে মারা গেল! ওর কথায় যেন সমস্ত এডওয়ার্ড গার্ডেনে শোক নেমে এলো! পত্র-পল্লবের সঞ্চালন থেমে গেল, ফুলের উপরে বসা পতঙ্গগুলো যেন আর নড়ছে না, সরোবরের পানির স্রোত থমকে দাঁড়ালো যেন! স্তব্ধ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ! তাঁর দুচোখ ভরা অশ্রু! খানিক বাদে বললাম, আই অ্যাম সো সরি টু হিয়ার দ্যাট ক্যাথি! নিজেকে সামলে নিয়ে টিস্যু পেপারে চোখ মুছতে মুছতে সে বললো, টেক ইট ইজি! আই গট টু ইমেশোনাল!

 

ক্যাথির কথা বলবার বিশেষ একটা স্টাইল আছে। শুনলে মনে হবে যেন আমাদের কতদিনের জানাশোনা। অতি সাবলীল এপ্রোচ তাঁর। মাত্র দশ মিনিট আগেই যে আমাদের পরিচয় হয়েছে সেটা বিশ্বাস করতেও যেন কষ্ট হয়। প্রসঙ্গ পাল্টে ও বললো, আজ ছবি তোলার জন্য যুৎসই কোন সাবজেক্ট পেলে কি? মৃদু হেসে বললাম, আমার তোলা সব ছবিই পঁচা হয়ে যায়। কারণ এই ক্যামেরাটির অপারেশন অতি জটিল, এটির যথাযথ ব্যবহার আমি জানি না। তবুও সখের বশে হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াই! ও বললো, আমার একটা ছবি তুলে দাও। বললাম, তোমার মুখখানা এখন বেদনা বিধুর, ছবিতে তো তা ধরা পড়বে! বললো, সে জন্যেইতো ছবি তুলতে চাইছি, তুমি তোল। বিভিন্ন এ্যাঙ্গল থেকে ওর ৪/৫টা ছবি তুললাম। ছবিগুলো দেখে বললো, তুমি মিথ্যা বলেছো, তোমার ছবি তোলার হাত ভাল।

 

বিশ্রামের সময় অতিক্রান্ত, ক্যাথির থেকে বিদায় নেবার পালা। বললাম, তোমার ই-মেইল এড্রেসটা পেলে ছবিগুলো পাঠিয়ে দিতে পারি। আমার ফোনে ওর ই-মেইল এড্রেসটি টেক্সট করে বললো, এটা আমার সেলুলার ফোনের নম্বর, সেইভ করে নাও। তোমারটা সেইভ করেছি। বিদায় নেবার ঠিক আগে বললাম, ক্যাথি তোমাকে একটা কথা বলতে ইচ্ছা করছে। যদিও তোমার সাথে আমার পরিচয়ের দৈর্ঘ সে কথা বলার উপযুক্ত নয়, তবুও বলতে মন চাইছে। সে বললো, বলে ফেল সংকোচ করো না। বললাম, তুমি চাইলে সামনের রবিবার আমার সাথে মরিসন ক্রিকে যেতে পারো। মধ্যাহ্নের মধ্যেই আমরা ফিরতে পারবো। হো হো করে হেসে উঠলো সে, বললো তুমি কি আমার বন্ধু না প্রেমিক, যে তোমার সাথে যাবো আমি? হাসি থামিয়ে কাছে ঘেঁষে আমার বাঁ হাতখানা দুহাতে ধরে মৃদু স্বরে বললো, আচ্ছা যাবো। ওর রসবোধে আবিষ্ঠ হয়ে সেদিনের মতো বিদায় নিলাম।

 

বিগত ক’বছরে অন্তত পনেরটি রবিবার সকালে ক্যাথি আর আমি বহু পথ একসাথে হেঁটেছি। কখনও কাঁকর বিছানো পথে, কখনও গহীন বনোপথে, কখনও মেঠো পথে, কখনও বা লেক পাড়ের বালুকাময় পথে। শুনেছি ওর কথা, বলেছি নিজেকে। ব্যক্তি-সম্পর্ক বিস্তারে ক্যাথির পরিমিতি বোধ দেখে আমি সংযম শিখেছি। পথ চলতে চলতে আমি তাঁর চরিত্রের সারল্যে মুগ্ধ থেকেছি, তাঁর কমনীয় রূপ-ব্যক্তিত্ব উপভোগ করেছি। ক্যাথিকে ছাড়া যেদিন হাঁটতে হয় সেদিনের পথ আর ফুরোতে চায় না!

 

গত জুনের দ্বিতীয় রবিবারে হাঁটাহাটি শেষে গাড়িতে বসেই ক্যাথি বললো, আজ তুমি আমাকে আমার বাড়ির কাছাকছি কোন একটা হালাল মাংসের দোকানে নামিয়ে দেবে। মনে মনে ভাবলাম, ওর আবার “হালাল” দরকার পড়লো কেন! কিছু সময় বাদে আবার বললো, তোমার জন্য আজ আমি রাঁধবো, তুমি কিন্তু ডিনার করবে আমার সাথে। এতো দেখছি “সম্পর্কের” একটি নতুন বাঁক! পরিচয় বেশ ক’বছরের হলেও, সেটা ওই “হাঁটাহাটির” মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কেউ কারো বাড়তি খবর রাখতে চাইনি।

 

আমাদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বটা আসলে গ্রীস্মকালীন! শীতের ন’মাস সাকুল্যে দুতিনবার ফোনে হাই হ্যালো হয়। আর গ্রীস্ম এলেই যে রবিবারটায় ক্যাথি আমার সাথে বেরুতে ইচ্ছা করে তার দুএকদিন আগে সেই আমাকে ফোন করে জানায়। আমি ওকে ওর বাড়ি থেকে গাড়িতে তুলে নেই এবং ফিরতি পথে নামিয়ে দেই। আজ অব্দি কেউ কারো বাড়িতে যাইনি। এই প্রথম তাঁর বাসায় যাবার আমন্ত্রণ পেলাম। আমি নীরবে গাড়ি চালাচ্ছি। সে বললো, তুমি ডিনারে আসছো তো? বললাম, ক’টায় পৌঁছুতে হবে বলো? সাড়ে ছ’টার মধ্যে আমি ডিনার সারি, সে ভাবেই এসো। বললো সে।

 

ক্যাথির জন্য এক তোড়া ফুল, আর ওর মেয়ের জন্য “গডিভা” ব্রান্ডের দামী এক প্যাকেট চকলেট কিনে ঠিক সাড়ে ছ’টায় ওর দরজায় বেল বাজালাম। প্যাপিলন জাতের সুদৃশ্য ছোট্ট একটা কুকুর কোলে নিয়ে উচ্ছসিত ক্যাথরিণ দরজা খুলে সম্ভাষণ জানালো। ওর ঘরদোর যে পরিচ্ছন্ন দেখবো সেটা প্রত্যাশিত। বসার ঘর, রান্না ও খাবার ঘর সব একসাথে, একেবারে ওপেন কনসেপ্ট। বড়সড় কক্ষের এক কোনে সোফা, টেলিভিশন রাখা, আরেক কোনে ঢাউস সাইজের একটা বইয়ের আলমারী। প্রতিটা তাক বইয়ে ঠাসা, ফ্লোরে পর্যন্ত বই রাখা। আরেক কোনে গান শোনার যন্ত্রপাতি। রেকর্ড প্লেয়ারের পাশ দিয়ে লংপ্লে রেকর্ডগুলো থরে থরে সাজানো। পাশেই ক্যাসেট ও সিডি প্লেয়ার। দেয়ালের সাথে বিশেষভাবে নির্মিত তাকে কয়েকশত সিডি-ক্যাসেট রাখা। গানের সংগ্রহগুলো দেখছিলাম, বেটোফেন সিমফোনি থেকে শুরু করে এলটন জন, মাইকেল জ্যাকসন, ম্যাডোনা, বব ডিলোন, -ইত্যাদি অজস্র কালেকশন তাঁর।

 

খাবার টেবিলে যেতে তাড়া দিলো সে। তখনও চকলেটের প্যাকেটটি আমার হাতে। বললাম, তোমার কন্যাকে ডাকো, সে বাড়িতে নেই? এতক্ষণে প্যাকেটটির দিকে ক্যাথির চোখ পড়লো। বললো, ও তুমি তার জন্য চকলেট এনেছো? কিন্তু চকলেট তো সে খেতে পারে না। তবুও তুমি দাও ওকে। কুকুরটি পাশে ঘুরঘুর করছিলো। কোলে তুলে বললো, দেখ আংকেল তোমার জন্য চকলেট এনেছেন। দাও প্যাকেটটা, হাত বাড়িয়ে ক্যাথিই নিলো ওটা। কিছুক্ষণ প্যাকেটটি কুকুকটির মুখের সাথে ঘষলো। তারপরে টেবিলের এক কোনে রেখে খাবার পরিবেশনে মনোযোগী হলো। আমি পলকহীন দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ক্যাথির দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার দৃষ্টির ভাষা বোধকরি সে বুঝলো। বললো, ওই আমার মেয়ে, ওর নাম টিনা। গম্ভীর ক্যাথি এবার যেন আদেশ করলো, খাওয়া শুরু করো, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

 

ডিনার শেষে দুজনে কোনার সোফাটায় গিয়ে বসলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, টিনার বয়স কতো? বললো, পাঁচ বছর চার মাস, তবে আমি ওকে সাড়ে চার বছর আগে পেয়েছি। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাক্তার যেদিন আমাকে চুড়ান্তভাবে জানালো যে, আমি কখনওই সন্তান ধারণ করতে পারবো না, সেদিনই আমার স্বামী টিনাকে বাড়িতে এনেছিলো। আমরা দুজনে সন্তানের স্নেহে ওকে বড় করে তুলেছি। জান, টিনা আমার স্বামীর খুব ভক্ত ছিলো। সারাক্ষণ তাঁর গা বাইতো! তাঁর হাতে খাবে, তাঁর সাথে খেলবে, তাঁর কোলের মধ্যে ঘুমাবে, তাঁর কোলেই পায়খানা-প্রস্রাব করবে। আর মাইকেলও জীবন দিয়ে ভালবাসতো টিনাকে, -বলে চলেছে ক্যাথি। টিনা বাড়িতে আসার পরে মাঝেমধ্যে তো মনে হতো, মাইকেলের কাছে আমার প্রয়োজন কমে গেছে। মনে মনে টিনাকে হিংসাও করেছি, জানো! আজ আমার সমস্ত চেতনা জুড়েই শুধু টিনা, ও আমার কাছে মাইকেলের প্রতিচ্ছবি! ওর মধ্যেই আমি মৃত স্বামীকে খুঁজে ফিরি! টিনাই এখন আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

 

প্রচুর কথা বলে ক্যাথি। আর নিজস্ব ডাইলেক্টে যখন দ্রুততার সাথে বলে, তখন ওর ইংরেজি আমার বুঝতে অসুবিধা হয়। আমার মুখের অভিব্যাক্তি দেখে ও সেটা বুঝতেও পারে। তখন থেমে গিয়ে বলে, এবার তুমি বলো। তবে সে রাতে ওকেই বলতে দিলাম। মাইকেলের সাথে ওর পরিচয়, পরিণয়, সংসার জীবন, তাঁর অপঘাত মৃত্যু, ওর একাকিত্ব, এমন সব বিষয়গুলো স্বত:প্রণোদিত হয়ে বলছিলো একে একে। কখনও গম্ভীর, কখনও উচ্ছল, কখনও বা অশ্রুসজল! রাত দেড়টা নাগাদ আমি ঘড়ির দিকে চাইলাম। খোসা ছাড়ানো বাদাম চিবুতে চিবুতে এতগুলো ঘন্টা কথা বলে কাটিয়ে দিয়েছি! বললাম, ক্যাথি আজ যে উঠতে হয়। সিঙ্গেল মাদারের বাড়িতে রাত্র দ্বিপ্রহরের পরে থাকাটা ঝুকিপূর্ণ! সে হাসতে হাসতে শেষ, বললো তুমি তো কোন উত্তাপই দেখালে না! আমার মতো একজন সুন্দরীর ঘরে এতটা রাত অব্দি থাকলে, অথচ বেডরুম মুখি হওয়ার জন্য কোনরকম উসখুস করলে না! আমি ওর রসবোধের “উঁচুমাত্রা” ভাল করেই জানি, বললাম গুড নাইট ক্যাথি!

 

এর একদিন পরেই সকাল সকাল ক্যাথির ফোন! কি ব্যাপার আজ তো মঙ্গলবার! ক্যাথিতো হাঁটতে যাওয়ার স্কেজুয়াল ঠিক করার প্রয়োজন ছাড়া আমাকে ফোন করে না! আর এতগুলো বছরে সেই ফোনটি তো শনি বা শুক্রবারেই পেয়েছি! আজ কেন তবে অদিনে-অবেলায় এ ফোন! ফোন ধরে গুডমর্নিং বলতেই অপর প্রান্ত থেকে ক্যাথি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। কি হয়েছে কাঁদছো কেন? বারে বারে জিজ্ঞাসা করছি। কিন্তু সে কান্নার বেগ সম্বরণ করে কথাই বলতে পারছে না! খানিক বাদে শুধু বললো, কিছুক্ষণ আগে টিনা মরে গেছে! ও মাই গড! বলো কি! আমি আসছি এখনই!

 

ছুটে গেলাম ওর বাড়িতে। দরজা খোলাই ছিলো। ঢুকে দেখি মৃত টিনাকে সামনে রেখে ফ্লোরে পা ছড়িয়ে বসে অঝোর ধারায় কাঁদছে ক্যাথি। সে কান্নার কোন শব্দ নেই, শুধু ফল্গু ধারার মতো অশ্রু ঝরছে! আমি পাশে বসে ওর কাঁধে হাত রাখলাম। এবার সে উচ্চস্বরে ডুকরে কেঁদে উঠলো! কাঁদছে আর বলছে, পৃথিবীতে আমার কথা শোনার মতো আর কেউ রইলো না! মা নেই, বাবা নেই, ভাই-বোন কেউ নেই, স্বামী নেই, টিনাও চলে গেল! জানো, এখন তুমি ছাড়া এ পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই, যাকে আমার কান্না শোনাতে পারি। হাতখানা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, তুমি আমার কান্নাটুকু অন্তত শুনবে তো? মুক ও বধির আমি, কতক্ষণ বসে ছিলাম ওর পাশে মনে নেই! এ অনাথিনীর এমনতর প্রশ্নের কি জবাব দেবো আমি! কখন যেন আমার চোখেও অশ্রুফোটা দেখা দিয়েছিলো সেদিন!       

 

(লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration