৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৪৬ | সাপ্তাহিক  | ১৯ জুলাই ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

ব্রিজটির নাম ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজ’ রাখা হোক

ফারুক ওয়াহিদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের কাজলকালো তিতাস নদীর ত্রিমোহনায় নির্মিত দেশের প্রথম একমাত্র ‘ওয়াই ব্রিজ’ শুভ উদ্বোধনের অপেক্ষায়। আশা করা যাচ্ছে স্বপ্নের এই ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজ’ উদ্বোধন করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা- এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, কুমিল্লার হোমনা এবং মুরাদনগর উপজেলার লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী মানুষ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিরাট এলাকার মুক্তিকামী জনগণকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।

উদ্বোধনের আগেই কাজলকালো তিতাস নদীর ত্রিমোহনায় নান্দনিক, দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক নির্মাণশৈলী এই সেতুটির নাম ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজ’ বা ‘জয়বাংলা ওয়াই সেতু’ নামে কেন আখ্যায়িত করলাম? উত্তরে বলবো- এই অঞ্চলের তিতাস তীরের সোঁদা মাটির একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জোড়ালো প্রাণের দাবী জানিয়ে বলবো- প্রাকৃতিক মায়াবী অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে এই ব্রিজটি তিতাস নদীর ত্রিমোহনায় এই স্থানটি অত্যন্ত স্নিগ্ধ নয়ানাভিরাম এবং বড়ই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে এখানে তিতাস নদীর ত্রিমোহনায় নৌকায় ২৪ ঘন্টা মুক্তিযোদ্ধাদের টহল ছিল এবং আমি নিজেও টহল দিয়েছি এ্যাম্বুস পেতেছি- যার জন্য হানাদার পাকিস্তানি আর্মি বাঞ্ছারামপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প রূপসদী জমিদার বাড়িটি এ্যাটাক(রেইড) করতে কোনোদিন সাহস পায়নি এবং নয় মাসই রূপসদী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে লাল-সবুজের মধ্যে সোনালি মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের নতুন পতাকা পতপত করে উড়েছে- পাকিস্তানি আর্মির নৌপথে তিতাস নদীর বুক চিরে গানবোট নিয়ে রূপসদী যাওয়ার এই একটিই সহজ পথ ছিল- কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারেও সদা সতর্কদৃষ্টি থাকায় ও এ্যাম্বুস পেতে বসে থাকার জন্য এবং দেশি নৌকা যোগে তিতাস নদীতে কড়া টহল দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি আর্মি মুক্ত এলাকায় যেতে সাহস পায়নি- রাতের আঁধারে মুক্তিসেনাদের এই সতর্কতা ও তীক্ষ্ণ সজাগদৃষ্টিমূলক টহলকে কবি শাসসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার পংক্তির সাথেই তুলনা করা যায়- “স্বাধীনতা তুমি অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।” বাঞ্ছারামপুর-হোমনা-মুরাদনগরের নতুন প্রজন্ম এবং দেশবাসী হয়তো জানেনই না তিতাস নদীর ত্রিমোহনায় নির্মিত ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজে’এর এই নদীপথের স্থানটি মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে কতো ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

“শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময়ও কলেমা পাঠের সঙ্গে ‘জয়বাংলা’ উচ্চারণ করব আমি” –বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হ্যাঁ, একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকের সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বীরের বেশে গর্ব করে বাঙালি হিসেবে ঠিক এভাবেই বুকফুলিয়ে ‘জয়বাংলা’-র ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের রুদ্রধ্বনি শিহরণ জাগা শ্লোগান ‘জয়বাংলা’! ‘জয়বাংলা’ ছিল মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান, মুক্তিযোদ্ধাদের শ্লোগান, বাঙালির শ্লোগান, যুদ্ধে যাবার শ্লোগান, যুদ্ধে বিজয়ের শ্লোগান- ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান-এর মাধ্যমে আমরা বাঙালিরা পেয়েছি একটি মানচিত্র- একটি লালসবুজ পতাকা- একটি জাতীয় সংগীত- অর্থাৎ ‘জয়বাংলা’ আমাদের আত্মপরিচয়- জাতীয় ঐক্যের প্রতীক- এককথায় বাংলাদেশের পরিচয়ই হলো ‘জয়বাংলা’। অথচ মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান বঙ্গবন্ধুর এই ‘জয়বাংলা’ নামে বাংলাদেশে স্বাধীনতার এতোবছর পরও কোনো ব্রিজ বা স্থাপনার নাম নাই যা ভাবলে বুকে অনেক যন্ত্রণা হয় অনেক কষ্ট হয় অবাক হয়ে যাই এবং হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায়। তাই বাঞ্ছারামপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে আমার অশ্রুভেজা আবেগময় প্রশ্ন- বাংলাদেশে এই নান্দনিক ব্যাতিক্রমধর্মী ইংরেজি ওয়াই অক্ষরের ন্যায় একমাত্র স্বপ্নের ব্রিজটির নাম কেন নয় ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজ’? এই নামকরণের ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধাদের একমাত্র অভিভাবক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আশু সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি- মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ের কথা অন্তরের কথা একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যাই দূর থেকে শুনতে পান।

কাজলকালো তিতাস নদীর ত্রিমোহনার সেতুটির পশ্চিম প্রান্ত থাকছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের ভুরভুরিয়া, পূর্বে চরলহনিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্বে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর বাজারকে সংযুক্ত করেছে। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ৭৭১.২০ মিটার এবং প্রস্থ ৮.১০ মিটার- সেতুতে পাইল হয়েছে ৩০২টি এবং ২৫টি মজবুত ভুমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন বেইজের উপর নির্মিত। সেতুটিতে থাকছে বিশ্বমানের কমপিউটারাইসড অত্যাধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাফিক লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম যা বাংলাদেশের অন্য কোনো সেতুতে নেই- ব্রিজটির গায়ে রাতে জ্বলবে লাল-সবুজ রঙয়ের আলোকসজ্জায় সজ্জিত যার প্রতিবিম্ব এসে পড়বে কাজলকালো তিতাস নদীর জলে। ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজ’এর উপর দিয়ে যাবে যানবাহন এবং নিচ দিয়ে তিতাসের বুকে তরঙ্গমালা সৃষ্টি করে চলবে লঞ্চ, ইঞ্জিন চালিত নৌকা, মালবাহী কার্গো নৌযান ও পাল তোলা দেশি নৌকা যা তৃতীয় নয়নে কল্পনা করলে শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে! ভবিষ্যতে যদি কখনো চার লেনের যান চলাচল করতে চায় সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে সেতুটিতে তাই যানজটের কোনো সম্ভাবনাই নেই। বাংলাদেশের প্রথম ওয়াই সেতুটির মোট ব্যয় ১১২ কোটি টাকা সব মিলিয়ে এশিয়ায় এমন সেতু দ্বিতীয়টি আর নেই- এ জন্য এটিকে এশিয়ার সর্ববৃহৎ ওয়াই সেতু হিসেবে দাবি করা যায়। সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১১ সালের ১৬ জুন এবং সেতুটি নির্মাণ করছে বাংলাদেশ ও চীনের জয়েন্টভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান ডব্লিউএম সিজি-নাভানা জেভি। সেতুটি শুভ উদ্বোধন হলে মুরাদনগর-কুমিল্লা ও ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যোগাযোগ অত্যন্ত সহজ হবে। ইংরেজি ওয়াই আকৃতির দেশের প্রথম এই ব্রিজে যে মন কেড়ে নেওয়া আর্কিটেকচারাল ভিউ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের আর কোথাও কোনো ব্রিজে তা নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, কুমিল্লার হোমনা এবং মুরাদনগরকে উপজেলাকে একসূত্রে বেঁধেছে তিতাস নদীর ত্রিমোহনায় নির্মিত বিশাল এই নান্দনিক সেতু। অন্যদিকে অবসান হবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, নবীনগর ও কুমিল্লার মুরাদনগর, তিতাস, হোমনা, চান্দিনার লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ-কষ্ট। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগে কমে আসবে দু-তিন ঘণ্টা সময়। সেতুটি নির্মাণের ফলে মুরাদনগর-কুমিল্লা ও ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যোগাযোগ সহজ হবে- এ ছাড়া চট্টগ্রাম-ঢাকার বিকল্প পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হবে এ সেতু। স্বপ্নের এই সেতু চালু হলে জালের মতো বিস্তার করে চারদিকে নদীবেষ্টিত ঢাকার উপকণ্ঠে হলেও বিপ্লব ঘটে যাবে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা প্রাচ্যের ভেনিস বাঞ্ছারামপুরের চেহারা- এযেনো ‘তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।’

তিতাস নদীর এই ত্রিমোহনাটি এমনিতেই নান্দনিক- তাই দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটির উদ্বোধন হয়ে গেলে এ অঞ্চলের বিনোদনের নতুন মাত্রা যুক্ত হবে এবং স্থানীয়ভাবে পর্যটন শিল্পের বিরাট বিকাশ ঘটে যাবে- শুধু বাংলাদেশের অন্য জেলাগুলো থেকে পর্যটক আগমন নয়- এই স্থাপনা দেখতে বাড়ির কাছে আরশিনগর ত্রিপুরা তথা আগরতলা থেকেও অনেক পর্যটক আসবেন বলে আশা করা যাচ্ছে- কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, কুমিল্লার হোমনা এবং মুরাদনগর হলো আগরতলাবাসীদের বেশির ভাগেরই পূর্বপুরুষদের বাড়ি। তাই এখন থেকেই যদি পর্যটকদের কথা চিন্তা করে বিশ্রামাগার, ভালো মানের রোস্তরা, পানীয়জলের সুব্যবস্থা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আলোর ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা এবং মানসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থা না করা হয়- তাহলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের চাপে হিমসীম খেয়ে যাবে কতৃপক্ষ।

তবে এই ব্রিজটির একশতভাগ সুফল পেতে তৃতীয় মেঘনা সেতু অর্থাৎ আড়াইহাজারের গোপালদী (বিষনন্দী) টু বাঞ্ছারামপুর(কড়িকান্দি ফেরিঘাট) প্রায় ২ কিলোমিটার প্রশস্ত অত্যন্ত গভীর ঘরস্রোতা সুনীল উত্তাল মেঘনা নদীর  উপর আরেকটি স্বপ্নের ব্রিজের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে অত্যন্ত সুখের বিষয় চীনের অর্থায়নে এরই মধ্যে তৃতীয় মেঘনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং খুব শিঘ্রই এর নির্মাণ কাজ শুরু হবে। বর্তমানে এই রুটে আড়াইহাজারের গোপালদী (বিষনন্দী) টু বাঞ্ছারামপুর(কড়িকান্দি) এই রুটে ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে। তবে এই ব্যস্ততম রুটে উত্তাল মেঘনায় যে ছোট আকারের ফেরি দেওয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল- এখানে মেঘনা যেকোনো সময় ফুঁসে উত্তাল হয়ে উঠে তখন প্রচন্ড স্রোত আর বিশাল আকারের ঢেউয়ের আঘাতে যানবাহন বোঝাই ছোট আকারের ফেরিগুলো কাগজের নৌকার মতো বিপজ্জনকভাবে দুলতে থাকে। তারপরও প্রয়োজনের তাগিদে বাঞ্ছারামপুরের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিচ্ছে এ যেন- “তবু তরী বাইতে হবে /খেয়া পারে নিতে হবে /যতই ঝড় উঠুক সাগরে।”

তবে তিতাস নদীর ত্রিমোহনায় নিমির্ত স্বপ্নের ওয়াই সেতু এবং আড়াইহাজারের গোপালদী (বিষনন্দী) টু বাঞ্ছারামপুর(কড়িকান্দি) প্রায় ২ কিলোমিটার প্রশস্ত অত্যন্ত গভীর ঘরস্রোতা সুনীল উত্তাল মেঘনা নদীর উপর আরেকটি স্বপ্নের তৃতীয় মেঘনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার নেপথ্যে যে একজন কারিগর নীরবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন সেই স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন বাঞ্ছারামপুর উপজেলা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেইন(অব.)এবি তাজুল ইসলাম এমপি। তাই বাংলাদেশের প্রথম একমাত্র ‘ওয়াই ব্রিজ’ এর নাম ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজ’ রাখার জন্য একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেইন(অব.)এবি তাজুল ইসলাম এমপি-র আশু সুদৃষ্টি আকর্ষণ করে আকুল আবেদন জানাচ্ছি। সবশেষে বলবো স্বপ্নের ‘ওয়াই ব্রিজ’টির নাম ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজ’ রাখা হোক বা নাইবা হোক আমি বলেই যাব ব্রিজটির নাম ‘জয়বাংলা ওয়াই ব্রিজ’। 

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা [২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া]

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration