৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৪৬ | সাপ্তাহিক  | ১৯ জুলাই ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

বীথির কাছে চিঠি-২৭

লুনা শিরীন

গত পরশু এই পর্বটা লিখবো বলে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড এ ফাইল  খুলে রেখেছিলাম, কিন্তু এই মুহুরতের আমি আর পরশু,র আমি,র ভিতরে অনেক ফারাক,পরশু আমার মাথায় যা ছিলো,যেভাবে চিন্তাকে গুছিয়ে রেখেছিলাম সেই চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে। গতরাত দশটা থেকে ভা্বছি ,এই য নীলাকে দেখে আসলাম, হৈ হৈ রই রই করে ফিরে আসলাম আমি /শান্তা সহ আমাদের তিন বাচ্চা,দেখতে গিয়েছিলাম নীলাকে,শুনেছিলাম নীলার গল্প শান্তার কাছে অনেক দিন ধরে,সেই নীলাকেই তো দেখে আসলা্ম। যা দেখলাম ,আর যা সুনেছিলাম ,তা কি মিল্লো ? আসলে কি মিলেছিলো কোনদিন ?  ভাবনার সাথে জীবনযাপন ,আর জীবনযাপনের  সাথে মানুষ বা তার যাপিত জীবন, কোনদিন কি মেলে ? কারোই কি মিলেছে ?

না বীথি , বেশী বেশী উচ্চমারগের কথা হয়ে যাচ্ছে ,বরং মুল কথায় আসি । কিন্তু বীথি –মুল কথাটা কি, বলতে পারে কেঊ ? কার  জীবনে কোন বিষয়টা আসল আর নকল কোন ব্যাক্তি মানুষ-ই কি সেটা  স্পষ্ট করে  বলতে পারে ? সবার কথা ছেড়ে দে বীথি – এই আমি ,এই লুনা ,আমাকে জিজ্ঞেস করতো কি  চাই আমি ?  আমি তোকে যা বলবো  তার সাথে আমার গতকালের চাওয়া মিলবে না । কারন, গতকাল যা চেয়েছিলাম আজকে আমি সেখান  থেকে  সরে এসছি , একদিনে আমি জীবনকে আরো যেটুকু বেশী দেখেছি আর জেনেছি সেটার সাথে আমার গতকালের লুনার ফারাক হয়ে গেছে অনেক , যোজন যোজন ফারাক । তাহলে কে বোঝাপড়া করবে আমার চাহিদার সাথে ? আবার এই আমরা  মানুষ – শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই ফিরে ফিরে আসবো, নীল বেদনা খুলে খুলে দেখিয়ে বলবো – এই যে দেখো আমার  হ্রদয় ,আমার  ভিতরে বয়ে যাওয়া রক্তক্ষরণ,আমাকে সুধু বাইরে থেকে দেখো না,প্লীজ – একবার সুদু দেখে নিও কতটা  পোড়া আর দগদগে যন্ত্রনায় আমি  এই জীবন বেছে নিলাম, প্লীজ একবার দেখো তুমি ।

বিথি – নীলাকে দেখে বাসায় ফিরেছি গতকাল রাত দশটায় ,সারারাত ছেড়া ছেড়া ঘুম, হয়েছে । অনেকবার ভেবেছি, কি হবে লিখে ? কেন লিখবো আমি ? আমার লেখায় কতটুকু প্রভাব আছে ? কিন্তু পারলাম না নিজেকে সা্মলাতে । আজ রোববার ,ভোর ৫টা , আমার সুন্য শুনশান ঘরে টাইপ এর শব্ধ হচ্ছে, আমি কথা বলছি তোর সাথে, এই চিঠি আমার একান্ত নিজের কথা বলার জায়গা,আমি ছেলে / মেয়ে হিসেব করি না, সমাজ দেখি না, আমি  সুধু দেখি আমার চোখ, যা দেখেছে আমার চোখ, যা বুঝেছে আমার মন, আমি সেটাই টাইপ করি, কোথাও কোনকিছু  নোট করে রাখি না, নিজেকে  স্থীর করে সুদু বসি কয়েক ঘন্টার জন্য ।  কথা বলি আমার মনের সাথে,আমার চোখ দিয়ে নোনা জল গড়ায়  বেশীর ভাগ সময় । কিন্তু – স্থির থাকে আমার মন-- আর হাতের দশ আঙ্গুল , সৎ থাকার চেষ্টা করি কয়েক  ঘন্টার জন্য , যা লিখি সেটা হুবহুব তোকে জানিয়ে দেই, আমি রিলিফ  বোধ করি । হাল্কা লাগে নিজেকে, মনে হয় ,নীলা না ,যেন আমার বুকের ভিতরে মাত্র এক মুহুরতে একটু ভার কমে গেলো । তেমনি হয়তো নীলাও করেছিলো, যেদিন প্রবল ভালোবেসে,অসীম প্রেম আর গৌরবে জড়াজরি করে রাসেলকে নিয়ে সিডনিতে এসছিলো , সেদিন শশুর-বাড়িতে বলেছিলো, রাসেল সিডনি  ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছে  স্বামীর ভালোবাসা আর আবেদনকে সবার উপরে রেখেছিলো নীলা, আসল সত্য বলেনি কাউকে । এমনকি  নিজেকেও আড়াল করেছিলো , নইলে এত ব্যাথা কি পায় মানুষ ?  এত তুখোড় মেধাবী মেয়ে, ডাক্তার মেয়ে, প্রচন্ড ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো সাধারন এম এ পাশ ছেলে রাসেলকে । নীলার নিজের স্কলারশিপ বা  বিদেশে আসার সুযোগকে কারো সামনে প্রকাশ করেনি, একান্ত সুখ /সংসার আর ভালোবাসার জন্য সব সব ত্যাগ করে প্লেনে উঠেছিলো নীলা মাত্র ১০ বছর আগে, ২০০৬ এ । সিডনিতে ছোট সংসার গুছিয়ে বসেছিলো, আমাকে বলে—জানে লুনা আপা, ঝড়ের মতো আমার জীবন থেকে ২ বছর  চলে গেলো, আমার মনে হয় মাত্র ২ মিনিট, আমি ভোরে বেরিয়ে যাই কাজে, রাসেল বাসাতেই থাকতো , প্রথম কয়েকদিন কথা বলতাম খুব, কিন্তু আস্তে আস্তে পারলাম না, কাজে জড়িয়ে পরতে  হোলো ,গবেষণার কাজে মন না দিলে কাজ হবে না, আর আমার কাজের উপরেই বেতন / সংসার সব চলছে। রাসেলকে বলেছিলাম,শহরটা নিজের মতো বুঝে নিয়ে একটা কাজে জড়িত হতে,আসলে কি জানেন , সারাজীবন আমি খুব এক্টিভ বলেই কি ভালবাসলাম অলস আর  দায়িত্বহীন মানুষ-কে ? নীলা হেসে উঠে ,কি অপূর্ব সুন্দর দেখতে নীলা , ভাবতে পারবি না বীথি তুই ,নীলার দুই গাল বেয়ে যেনো গোলাপের লাল আভা ফুটে ঊঠে,সারা শরীর ,মন আর চোখ দিয়ে যেনো লাবন্য ঝরে পড়ছে । এরপর – ? আমি প্রশ্ন করি, এরপর আর কি ? আমি কনসিভ করলাম, নতুন আনন্দে আর উত্তেজনায় আমার জীবন ভরে উঠলো – ভীষন সুন্দর আর প্রান ভরিয়ে আদর করতে জানতো রাসেল, ও জানতো ,আমি সুধু এই  ভালবাসার কাঙ্গাল হয়ে থাকবো আজন্ম , কিন্তু কই পারলাম বলেন ? ক্ষমা করতে পারলাম রাসেলকে ? একদিন বাড়ী ফিরেছি, হুট করেই শরীরটা খারাপ লাগছিলো, কাজে গিয়েই ২  ঘণ্টার ভিতরে ফিরেছি, সাধারণত আমাকে ডেলি ৮/৯  ঘণ্টা গবেষণার কাজ কোরতে হয়, সেদিন বাড়ি ফিরে দেখি আমার বেডরুমে অন্য মেয়ের গলা, ফিস-ফিস  শব্দ , আমি দরজা খুলে ডুকেছি রাসেল জানতেই পারেনি। অনেকক্ষণ একা  বসেছিলাম আমার নিজের সাজানো সংসারে, আমার গর্ভে তখন সন্তান , আমার সামনে যেনো দুলছিলো পৃথিবী , জানেন আপা, আমি বেচে থাকতে কোনদিন সেই মুহূর্তটা ভুলতে পারবো না, ঠিক আমাকে যেভাবে আদর করতো – একইভাবে আদর করছিলো ওই মেয়েটিকে । আমি বসেই ছিলাম, এত বেশী শূন্য ছিলো সেই অনুভুতি যে মেয়েটি আরো ঘণ্টা—দেড়েক পরে বেরিয়ে যাবার সময় আমাকে দেখলো, প্রথমে মেয়েটি  ছিলো,আর ওকে জড়িয়ে রাসেল ছিলো পিছনে ,সেই শেষবার দেখা রাসেলকে আপা । আমার সবচেয়ে  বড়  অহংকার ছিলো রাসেল , আমি হারিয়ে ফেলেছি,হয়তো এমনই হবার কথা ছিলো । নীলা-র সমস্ত শরীর যেনো দুলে উঠ-ছিলো বীথি । ৯ বছর পরে নীলার সাথে কথা বলছিলাম আমি, গতকাল গিয়েছিলাম শহর থেকে ৪  ঘণ্টার ড্রাইভে দুরের একটা ছোট নিরিবিলি শহরে বেড়াতে, নীলার  বন্ধু  শান্তার সাথে , গিয়ে দেখি – সহসা নীলাকে বাঙালি মেয়ে বলা যাবে না, একটু মোটা, কিন্তু ভীষন রুপবতি। একথা হলফ করে বলা যায় , নীলা ভালো কাজ করে ওই শহরে ,রাসেলকে ফেলে আসার পরে  নীলার ঘর আলো করে এসছে দিহান , নীলার আর রাসেলের ছেলে । নীলা এখন মদ খায়,বেশ অনেকগুলো ছেলের সাথে ওর  বন্ধুত্ব হয়েছিলো,আমাকে বলে,কতজন হবে আপা ? ২০/২৫ জন তো হবেই ? ২০০৬ থেকে ১৪ ,--৯ বছর – ওরে বাবা । নীলা কালো  ঘন চুলে হাত  ডোবায় , বাচ্চারা খেলছে চারপাশে,বিকেলের উজ্জল নরম আলো । আমি বলি, চলো তোমার বেস-মেন্ট দেখে আসি, কি সুন্দর বাড়ি তোমার ,আমরা আগা-ই । হুট করে চোখে পড়ে সারি  ধরা মদের বোতল,১০০/১৫০ মতো হবে, আমি বলি, কি ব্যাপার তুমি খেয়েছো সব নাকি অন্য কেঊ ? নীলা হেসে উঠে বাচ্চাদের মতো,আপা আমি-ই খেয়েছি, সব আমার ,সাজিয়ে রেখেছি ।

আমরা ফিরে আসি বীথি, এই যে  যা যা লিখলাম সব আমার কানে শোনা কথা , লিখলাম আমার ভাষা দিয়ে , হয়তো অনুভুতি বদলে গেলো, ভাষা বদলে গেলো , তুই যখন পড়বি বীথি, তুই মিলিয়ে নিবি তোর জীবনের সাথে। আমরা সবাই তাই করি বীথি,ঘটনা, জীবন , কথা , দুঃখ , আনন্দ , --সব মিলিয়ে নেই নিজেদের জীবনের সাথে, কিন্তু তাতে কি সত্য বদলে যায় বীথি ? আমি কি বলতে পেরেছি কোনদিন, কেন নীলারা আমাকে কাদিয়েছে আজন্ম ? নিজের কান্নার কথা বলতে পারিনি বলেই নির্ভর করি অন্য,র কান্নার উপরে , চেয়ে চেয়ে দেখি আর নিজেকে বলি – ভালোবেসেই মানুষ সবচেয়ে বড়  ক্ষতি করে নিজের,কিন্তু মানুষ নিজেই জানে না সেই সত্য । আদর বীথি ।

৪/০৫/২০১৪

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration