৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৩৭ | সাপ্তাহিক  | ১৭ মে ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

আরশিতে দেখা কলমে লেখা -০৭/প্যাকেট বন্দি কফি-কাপ!

সাজ্জাদ আলী

নিত্যদিনই আমার গাড়িতে ক্লায়েন্ট এবং বন্ধুরা উঠেন। অন্তত তাদের কথা ভেবে গাড়িখানা আমাকে পরিচ্ছন্ন রাখতেই হয়। প্রতিদিনকার অভ্যাস মতো সেদিন রাতেও কাজ শেষে বাড়ির ড্রাইভওয়েতে গাড়ি পার্ক করে পেছনের দরজা খুলে সিটের পা রাখার জায়গাগুলো ছাফ-সুতোরের উদ্যোগ নিয়েছি। দেখি সেখানে একটি সুদৃশ্য উপহার-প্যাকেট পড়ে আছে। বুঝে নিলাম আজ যাঁরা গাড়িতে উঠেছিলেন, ওটা তাঁরাই কেউ না কেউ ফেলে গিয়েছেন।

 

প্যাকেটটি বনেদি কফিশপ ব্রান্ড “স্টারবাক্স” এর মনোগ্রামযুক্ত। আন্দাজ ছয় ইঞ্চি বাই চার ইঞ্চি সাইজের হবে। আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে বোঝা যায় ভেতরে শক্ত কিছু একটা, কফির দানা নয় মোটেই। জামা কাপড় ছেড়ে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসে, যাঁরা আজ গাড়িতে উঠেছিলেন একে একে তাঁদের ফোন করতে থাকলাম। “আমার গাড়িতে একটা প্যাকেট ফেলে গিয়েছেন কি ?” -এমন প্রশ্নে সবাই “না” সূচক জবাব দিলেন। এখন কি করি প্যাকেটটা নিয়ে? এতো দেখছি খানিকটা উটকো ঝামেলাই তৈরি হলো!

 

সেদিনই কাজ শেষে সন্ধ্যার পরে ঘনিষ্ট একজন সহকর্মীর সাথে আসন্ন একটি ইভেন্ট নিয়ে কথা বলতে একটি রেঁস্তোরায় বসেছিলাম। ওই দিন সে সর্ব শেষ আমার গাড়িতে উঠেছিলো। এই মানুষটির সাথে আমার “ঘনিষ্টতা” অভিনব ধরণের, একেবারেই আটপৌরে নয়! যে কোন বিষয়ে চিন্তার মৌলিক জায়গাটুকু দুজনের শতভাগ মিলে যায়। কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে মতের মিল থেকে মতান্তরই বেশি। কলহকালীন সময়ে রাগের বদলে অনুরাগের বাস্পে ভরে থাকে উভয়ের মন। কত তাড়াতাড়ি সম্পর্কের সেই মালিন্য কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়, সেই তাড়নায় ব্যাকুল হই দুজনেই।

 

“আমরা পরস্পরের কাছের মানুষ” -এমনটা কখনও নিজেদের মধ্যে বলা-কওয়া’র দরকার পড়েনি। চলন-বলনে সে সত্য আমরা নিত্য উপলব্ধি করি। পারস্পরিক সম্পর্কের অম্ল-মধুর পথ পরিক্রমায় কোন এক বিরল ধরণের অগম্য-অদৃশ্য সূতো বাঁধা আছে। সে সূতোয় টান পড়লে অন্তর ব্যথিত হয়। আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াটি “বন্ধুত্বের” থেকে অনেকখানি বর্ধিত, আবার “প্রেমের” ধারের কাছেও নয়। সম্পর্কটিকে সঠিকভাবে নামকরণ করা প্রায় অসম্ভব, তবে “প্রেমময় বন্ধুত্ব” কথাটি বেশ কাছাকাছি মনে হয়।

 

তো প্রিয় এই মানুষটিকে প্যাকেটটি ফেলে যাওয়া নিয়ে ফোন করার কোন তাগিদ অনুভব করিনি। কারণ সে বসেছিলো সামনের সিটে। আমার গাড়িতে ওটিই তার জন্য নির্ধারিত আসন। তার গাড়িতেও আমার আসন সামনেই (যখনই উঠি)। প্যাকেট ওর হলে সেটা গাড়ির সামনের অংশেই থাকবার কথা, পেছনে নয়।

 

এর আগেও সে দুএকবার ভুল করে গাড়ির সামনের অংশেই তার ব্যবহার্য ফেলে গিয়েছে। একবার তো তার ফোনসেট আমার গাড়িতে রেখে গিয়েছিল। সেই ফোন থেকে কারো সাথে তার টেক্সট-সংলাপ আমি পড়ে ফেলি কিনা, -সেই দুশ্চিন্তায় এক রাতেই তার মাথার চুলে পাক ধরেছিলো। সেদিনই তার ফোন থেকে প্রথম বুঝতে পারি যে আমার কাছে গোপন করবার মতো ব্যাক্তি-সম্পর্ক তার অন্যের সাথে রয়েছে। তা থাকতেই পারে, আমার ওই “বুঝতে পারা” পর্যন্তই প্রয়োজন। সম্পর্ক-গল্পের বাকি অংশে আমি আগ্রহহীন।

 

তো সে রাতে অনুমান বারোটা নাগাদ সেই ফোন করলো। বরাবরের মতো গতানুগতিক আলতু-ফালতু কিছু কথা বললাম খানিকক্ষণ। এক পর্যায়ে বললাম, জানিস কে যেন আজ আমার গাড়িতে একটা প্যাকেট ফেলে গ্যাছে। যাঁরা আজ উঠেছিলো তাঁদের সবাইকে ফোন করেছি, কিন্তু ওটার মালিক ওরা কেউ না। সে বললো তাহলে তো ওটা তোরই, তুই রেখে দে! কি সব আবোল-তাবোল বকিস, বললাম আমি। কার না কার কি দরকারি জিনিস, আমি রাখতে যাবো কেন?

 

তার উল্টো প্রশ্ন, কেউ যখন ওটার মালিকানা দাবি করছে না, তখন সুদৃশ্য ওই প্যাকেটটা কি তুই ডাষ্টবিনে ফেলবি? এই দাঁড়া! প্যাকেটটা যে সুদৃশ্য তা তুই কি করে জানিস? গাড়িতে কি তাহলে ওটা তুইও দেখেছিস? জিজ্ঞাসা আমার। আরে না তা না, এমনেই “সুদৃশ্য” কথাটা বললাম আর কি! তুই না হয় ওটা রেখেই দে! আবারো বললো সে। খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললাম, প্যাকেটটা নিয়ে আমি বিপাকে পড়েছি! পারলে উপায় বল, নইলে চুপ যা। বদ কোথাকার, খালি বকর বকর করিস!

 

প্রসঙ্গ পাল্টে আমি পূর্বে কথিত সেই ইভেন্ট আয়োজনের খুঁটিনাটি নিয়ে ওর সাথে কথা বলা শুরু করলাম। অনুষ্ঠানটি কোথায় করা যায়, এবারে শ্রোতা কাঁরা থাকবেন, কাঁরা গাইবেন, উপস্থাপক পাল্টানো দরকার পড়বে কি না, -এমন সব নীতি নির্ধারণী বিষয় নিয়ে আমরা প্রায় ঘন্টা দেড়েক ফোনালাপ করলাম। সারা দিনের কর্ম-কান্তি আর গভীর রাতের ফোনালাপে আমি ততক্ষণে অবসন্ন। বললাম, মাথাটা খুব ধরেছে রে! তুই তো আর টিপে দিবি না! এখন না হয় ফোনটা রাখ, ঘুমোবো এবার। ও বললো, আচ্ছা ঘুমো তাহলে। আর শোন, ওই প্যাকেটটা আবার যেন কাউকে দিয়ে দিস না। ওটা তোর জন্য! এখন ঘুমো, বলেই ফোনের লাইন কেটে দিলো। 

 

ঘুম কি আর আসে! এতদিনে তার থেকে একটা কিছু উপহার (!) পাওয়া গেল! অবচেতনে মনে হলো সে যেন সুদৃশ্য মোড়কে নিজেকে বন্দি করে অগোচরেই আমার কাছে রেখে গেছে। এমন একটা কিছু পাবার জন্য আমি কি বছরের পর বছর অপেক্ষা করিনি! তবে আজ যে প্রক্রিয়ায় তা পেলাম, তাকে তো ঠিক “পাওয়া” বলা চলে না! এতো তার ফেলে যাওয়া জিনিস “কুড়িয়ে পাওয়া” বলেই মনে হচ্ছে আমার। হঠাৎই “পাওয়ার আনন্দ” চুপসে গেল!

 

সোফায় শুয়ে শুয়ে রাতের বাকিটুকু ভেবেছি, উপহারটা তো সে ফেলে রেখে গেছে! হাতে তুলে তো দেয়নি! সম্বোধনহীন এ অর্ঘ্য আমি কেমনে গ্রহন করি? এ তার কৌশলী আচরণ! তার চরিত্রে সারল্য থেকে কৌশলেরই আধিক্য। সব সময় সকলের কাছে নিজেকে “গুছিয়ে উপস্থাপনের” তীব্র প্রবণতা তার। জীবনের সহজতম ও হৃদ্যতাপূর্ণ জায়গাগুলোতেও তাকে অকারণেই কপট হতে দেখি। প্রয়োজনে যেন “অস্বীকার করা যায়” -প্রতিটি পদক্ষেপেই এমন একটি সুযোগ (!) তৈরি করে রাখে সে। “গোপনে বলো”, “গোপনে চলো”, “গোপন রাখ” -এই তার জীবনের ব্রত! সত্য বলতে কি কৌশল,সতর্কতা আর গোপনীয়তার বলয়ে সে তার নিজের জীবনটাকেই দুর্বিসহ করে তুলেছে। এ সত্যটি সেও জানে, কিন্তু মানে না কখনওই!

 

পরদিন ভোরে ফোনের টেক্সট মেসেজের শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। পড়ে দেখি ও লিখেছে, “গুডমর্নিং! প্যাকেটটির মধ্যে একটা কফির কাপ আছে, এই কাপে কফি খেয়ে তোর প্রতিটি দিন শুরু হোক -এই আমার চাওয়া”। ভেতরে ভেতরে খুব অনুরাগ জন্মালো বার্তাটি পড়ে। শুয়ে শুয়েই ফিরতি বার্তায় লিখলাম, “কোন কাপ? যেটা তুই গাড়িতে ফেলে গেছিস? আচ্ছা তোর সমস্যাটা কি, বলতো? তুই যা যখন যেভাবে চাস, তা পেয়ে যাস! আবার না চাইতেও অনেক কিছু পাস। কখনও কি তোর মনে হয় না আমারও কিছু পাওয়া উচিৎ?” আবার লিকচার শুরু করলি তুই! যা উঠে পড়, সেভটেভ করে হাতমুখ ধুয়ে কফি বানিয়ে ঐ কাপে ঢেলে খা। দেখবি অন্য রকম স্বাদ লাগবে আজকের কফি, -ফোন বার্তা পাঠালো সে।

 

আমি লিখলাম, দ্যাখ তোর বাদরামি মার্কা অবহেলা অনেক সহ্য করেছি। আর না! এই কাপটি তুই নিজের হাতে আমাকে না দেওয়া পর্যন্ত ওটি আমি গ্রহন করবো না। সে লিখলো, বাহ রে! আমি তোকে দেবো ভেবে কত ঘুরাঘুরি করে ওটা কিনেছি! আর তুই এখন শক্ত কথা শুনাচ্ছিস! লিখলাম, তোর কাপেই তো কফি খেতে চাই। কিন্তু তা কি তুই এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে খাওয়াবি? সে লিখলো, তাচ্ছিল্য বলছিস কেন? আমি লিখলাম, নাটক করিস না তো, ন্যাকা! তুই কি ভেবেছিস গাড়িতে ফেলে যাওয়া তোর উপহারের উপরে আমি হুমড়ি খেয়ে পড়বো? ভদ্রতার কথা না হয় বাদই দিলাম, উপহার দেবার একটা অন্তর্নিহিত নিবেদনও তো আছে, না কি?

 

আরো লিখলাম, শোন যতদিন না উপহারটি আমার হাতে তুলে দিবি; ততদিন ওটা সযতনে গাড়ির ট্রাঙ্কেই থাকবে। দ্রুতই ফিরতি বার্তায় সে লিখলো, আচ্ছা আচ্ছা রাগ করিস না, আপাতত ওটা তাহলে গাড়িতেই রাখ। যেভাবে দিলে তোর মনটা খুশি হবে, আমিও তোকে ওটা সেভাবেই দিতে চাই! তবে আমার আরো সময় লাগবে।

 

মনে মনে বললাম (ফোনের টেক্সটে আর এটা লিখলাম না), সময়তো তোর লাগবেই! যেভাবে অকুপাইড (!) হয়ে আছিস! যাই হোক, প্যাকেটটি আজও আমার গাড়িতেই আছে। ওটি পাবার ইচ্ছাটিও আছে। দৃশ্যত: মনে হয় এই কফির কাপটি প্যাকেট বন্দিই থাকবে সবদিন। জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনে আমাকে হয়তো ভিন্ন ভিন্ন কাপেই নিরন্তর কফির পিপাসা মিটাতে হবে!

(লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী)

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration