৮ময় বর্ষ সংখ্যা ৪২ | সাপ্তাহিক  | ২১ জুন ২০১৭ | বুধবার
কী ঘটছে জানুন, আপনার কথা জানান

কানাডায় উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের কল্যাণে PBSCU

মাহমুদ হাসান

ইমিগ্রেশনের স্বর্গরাজ্য কানাডা। পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের সেকেন্ড হোম হিসেবে খ্যাত এই দেশে পৃথিবীর প্রায় সকল প্রান্ত থেকে হাজার ধরণের মানুষ ইমিগ্রেশন নিয়ে আসেন বসবাস করতে। এঁদের অনেকের লক্ষ্য থাকে উন্নত জীবনযাপন, অনেকের লক্ষ্য থাকে অর্থলগ্নি করা আবার অনেকের লক্ষ্য থাকে শুধুই রাজনৈতিক আত্নগোপন করা বা আশ্রয় প্রার্থনা করা। আয়তনের বিচারে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডার জনসংখ্যা কেবল সাড়ে তিন কোটি হওয়ার ফলে কানাডিয়ান সরকারও ইমিগ্র্যান্টদের স্বাগত জানায় তাঁদের দেশে। আমেরিকা-ব্রিটেন-রাশিয়া-চায়না থেকে শুরু করে সিরিয়া-মিশর বা ভারত-পাকিস্তান সব দেশের নাগরিকদেরই দেখা মিলবে কানাডাতে। বাংলাদেশের নাগরিকরাও পিছিয়ে নেই, প্রায় চল্লিশ বছরেরও অধিক সময় ধরে বাংলাদেশিরা বসবাস করে আসছেন কানাডাতে।

ইমিগ্রেশন মূখ্য হওয়ার কারণে কানাডাতে সব ধরণের, সকল পেশার মানুষই আসেন বিভিন্ন দেশ থেকে। স্কিলড ওয়ার্কার হিসেবে এমন অনেক পেশাজীবি আসেন যাঁদের পেশার ক্ষেত্রে একাডেমিক শিক্ষাটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আবার ব্যবসায়ী হিসেবে যাঁরা আসেন তাঁদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় একাডেমিক শিক্ষাটা মূখ্য নয়। বাংলাদেশ থেকে স্কিলড ওয়ার্কার বা ব্যবসায়ী হিসেবে কানাডায় ইমিগ্রেশন নিয়ে এসেছেন এমন সংখ্যাটা কম নয়। অপরদিকে কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের, ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ের প্রথম দিকে থাকা বেশ কিছু ইউনিভার্সিটি কানাডাতে আছে। কাজেই বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে কানাডায় ছাত্র হিসেবে আসা মানুষের সংখ্যাটাও নেহায়েত কম নয়। এই ছাত্রদের অনেকেই আবার ছাত্রজীবন শেষ করার পর কানাডায় পাকাপাকিভাবে থেকে যান।

বাংলাদেশ থেকে ইমিগ্র্যান্টরা কানাডায় বহু বছর ধরে বসবাস করা শুরু করলেও ছাত্র হিসেবে বাংলাদেশিদের কানাডায় আসার ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। দুই একজন আগে যে এখানে উচ্চ শিক্ষার্থে আসেননি তা নয়, তবে মূলত আমেরিকার পাশাপাশি কানাডাতেও যে মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে আসা যায় এই বিষয়টা বাংলাদেশিরা মোটামুটিভাবে সহজভাবে নিতে শুরু করেছেন দশ-পনের বছর হবে। ২০০৩/০৪ থেকে প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশিরা কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স-পিএইচডি প্রোগ্রামে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে আসতে শুরু করলেন। অন্যান্য দেশের ছাত্রদের মতোই, বাংলাদেশী ছাত্ররাও উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর কেউ কেউ কানাডায় পাকাপাকিভাবে থেকে যাওয়া শুরু করলেন।

দেশ থেকে কানাডাতে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে পড়তে আসতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল তথ্যের সহজলভ্যতা। দেশ থেকে সদ্য গ্রাজুয়েশন শেষ করা তরুণ-তরুণীরা ভাল ফলাফল, প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি আর তীব্র মেধা নিয়েও কেবলমাত্র সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যটি না পাওয়ার কারণে পছন্দসই বিশ্ববিদ্যালয়ে বা নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেন না অনেকেই। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষে ২০১২তে ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোর তৎকালীন পিএইচডি ছাত্র আবদুল্লাহ আল মারুফ ফেসবুক ভিত্তিক Prospective Bangladeshi Students in Canadian Universities (PBSCU) নামে একটি গ্রুপ তৈরী করেন। তাঁর এই প্রকল্পে কানাডার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নত বাংলাদেশি ছাত্ররা এগিয়ে আসেন ভর্তিচ্ছু ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মুক্ত তথ্য প্রদানে। সেই সময়ের ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার গ্র্যাজুয়েট ছাত্র ইয়াফি মুনতাসির ও ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার গ্র্যাজুয়েট ছাত্রী মেহনাজ ইসলাম ফেরদৌসি সহ অনেকের অবদানে গ্রুপে বিনামূল্যে ভর্তি ও ভিসা প্রাপ্তি সংক্রান্ত তথ্যের একটা মুক্ত ভান্ডার তৈরী হয়ে যায় দ্রুতই। সেই তথ্যভান্ডারের পাশাপাশি থাকে ভর্তি সংক্রান্ত যে কোন তথ্য চেয়ে সাহায্য পোস্ট করার সুবিধা। ইতিমধ্যে কানাডায় চলে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকেন। দেখতে দেখতে এই গ্রুপে ভর্তিচ্ছু ও আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রীদের ভীড় বাড়তে থাকে। ২০১২ তে শুরু করার পর মাত্র পাঁচ বছরে এই গ্রুপ থেকে কয়েক শত ছাত্র-ছাত্রী বিনামূল্যে তথ্য ও সাহায্য নিয়ে কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে উচ্চ শিক্ষার্থে এসেছেন। তাঁদের বেশিরভাগই শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে মাস্টার্স বা পিএইচডি করছেন। পূর্ববর্তী বাংলাদেশি ছাত্রদের আচরণ ও মেধা ভাল থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ছাত্রদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সঙ্গে সহজে ও বিনামূল্যে PBSCU গ্রুপ থেকে তথ্য পাওয়ার কারণে বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চ শিক্ষার জন্য মান সম্মত আবেদনপত্র করা থেকে শুরু করে সঠিক নিয়মে ও অসত্য তথ্য পরিহার করে ভিসার জন্য আবেদন করা পর্যন্ত সকল বিষয়ে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। ফলে দিন দিন কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি ছাত্রদের সংখ্যা বাড়ছেই। এই ছাত্রদের মাঝে যাঁরা পড়াশোনা শেষ করার পর কানাডায় থেকে যাচ্ছেন তাঁরা মাইক্রোসফট, গুগল, এমাজন, আইবিএম সহ বিশ্বের স্বনামধন্য ও বিখ্যাত সব প্রতিষ্ঠানে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। সার্বিক সংখ্যার বিচারে ক্ষুদ্র হলেও মূল্যবান এই উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরীতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করছে PBSCU।

সম্প্রতি PBSCU গ্রুপের সদস্য সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়েছে। এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর আব্দুল্লাহ আল মারুফ এই প্রসঙ্গে বলেন – ‘এটা একটা বিরাট অর্জন। মাত্র পাঁচ বছরে পঞ্চাশ হাজার শিক্ষিত ও উচ্চ-শিক্ষার্থে আগ্রহী মানুষের একটা প্লাটফর্ম আমরা তৈরী করতে পেরেছি, এবং সেখানে বিনামূল্যে তথ্য-পরামর্শ দিয়ে অনেকের জীবন পরিবর্তনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের আছে প্রায় তিরিশ জন সদস্যের একটা মডারেশন টিম যাঁরা গ্রুপের জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। আর আছেন অসংখ্য অগুণতি কন্ট্রিবিউটরগণ, যাঁরা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে অন্যদের সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।‘ ভবিষ্যতে এই গ্রুপের কর্মকান্ড আরও বেশি প্রসারিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এই গ্রুপের মডারেশন টিমের ভবিষ্যত পরিকল্পনার মাঝে আছে দেশের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে নিয়মিত কানাডার ইউনিভার্সিটিতে উচ্চ শিক্ষার ব্যাপারে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আয়োজন করা, বর্তমানে কানাডা থেকে ডিগ্রি নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন কানাডাতে, তাঁদের মাধ্যমে নতুনদের চাকরি পেতে সাহায্য করা সহ আরও অনেক কিছু।

এই গ্রুপের পাশাপাশি কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য, বিশেষত যাঁরা কানাডায় পড়াশোনা শেষ করেছেন তাঁদের নানাবিধ তথ্য-পরামর্শ-নেটওয়ার্কিং এর জন্য Canadian Alumni Association of Bangladesh (CAAB) নামে আরও একটি গ্রুপ PBSCU এর অঙ্গ-সংগঠন হিসেবে চলছে।

পাঠকের মন্তব্য

শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

জন্মদিন/শুভেচ্ছা/অভিনন্দন


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

কাজ চাই/বাড়ি ভাড়া


শ্রেণীভুক্ত বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন/অনুভূতি


 
 
নিবন্ধন করুন/ Registration